বাগমারাশিরোনাম

ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া উপাচার্য : বান কি-মুনকে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি!

এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নাকি আলফ্রেড নোবেল পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছে।

ডেস্ক রির্পোট : অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শুনেছেন? রাজশাহীর বাগমারায় নাকি এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। অথচ সেখানে এর কোনও অবকাঠামো, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-কর্মচারী কিছুই নেই। মূলত একটি মাদ্রাসাকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দাবি করে নিজেকে স্বঘোষিত উপাচার্য (ভিসি) ভাবছেন মো. রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। তার দাবি,চ্যান্সেলর হিসেবে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি-মুনকে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি! হলফনামা করা একটি ঘোষণাপত্রে ভুয়া ভিসি আরও উল্লেখ করেন,বিশ্ববিদ্যালয়টি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও জাতিসংঘের মহাসচিব কর্তৃক অনুমোদিত। শুধু তাই নয়,এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নাকি আলফ্রেড নোবেল পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছে।

স্বঘোষিত উপাচার্যের অভিযোগ,আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া সত্ত্বেও অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে কোনও অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে না সরকার। এ কারণে গত ১৩ আগস্ট রাজশাহীর ভবানীগঞ্জ সোনালী ব্যাংক শাখায় চিঠি দিয়েছেন তিনি। এতে উল্লেখ করা হয়, ‘অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে সরকারি বরাদ্দের ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার মধ্য থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির সঞ্চয়ী ব্যাংক হিসাব নং-০১০২৪৮৬৩-এর অনুকূলে ৬০ লাখ টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো।’ ওই চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, বিশ্বব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক এমনকি সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে।

২০১৬ সালের মে মাসে নিজেকে নামধারী অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও উপাচার্য দাবি করেন মো. রফিকুল ইসলাম। ওই বছরের ২০ জুলাই একটি লিফলেটে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি-মুনের ছবি ব্যবহার করে তিনি দাবি করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০১৪ সালের ২৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক অনুমোদন পেয়েছে। একই সময় ইউজিসিকে চিঠি দিয়ে অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নামধারী প্রতিষ্ঠানটির স্বঘোষিত উপাচার্য রফিকুল ইসলাম ইউজিসিতে কয়েক বছর ধরে চিঠি দিচ্ছে। অথচ এটি একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান। এ নামে দেশে কোনও প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত নেই। তাই দুই বছর আগে রাজশাহী জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল। এরপর তারা একটি রিপোর্টও দিয়েছিল।’

গত বছরের ২২ অক্টোবর রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপারকে দেওয়া এক চিঠিতে রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায় ইউজিসি। এছাড়া জাতীয় দৈনিকে তথাকথিত বিশ্ববিদ্যালয়টির অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সতর্কীকরণ গণবিজ্ঞপ্তিও প্রকাশিত হয়। ইউজিসি’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘মানুষকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে এদের প্রতারণামূলক কার্যক্রম সম্পর্কে সতর্ক থাকার জন্য গত বছর পত্রিকায় একটি গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছিলাম আমরা।’

এ বছরের ১২ জুন ইউজিসি’র পক্ষ থেকে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসকে আরেকটি চিঠি দিয়ে নামধারী বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বঘোষিত উপাচার্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। গত ২৮ জুলাই রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাসরিন আক্তার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ইউজিসিকে বলা হয়, ‘গত ২১ জুলাই বিকালে নামধারী বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অভিযান চালানো হয়েছে। সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির কোনও অবকাঠামো পাওয়া যায়নি। তবে অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম দাখিল মাদ্রাসার সাইনবোর্ড ও জরাজীর্ণ অবকাঠামো দেখা গেছে।’

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ সাধারণ মানুষের বরাত দিয়ে বাগমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসের ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘প্রতিষ্ঠানটিকে অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামী দাখিল মাদ্রাসা হিসেবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ একইসঙ্গে রফিকুল ইসলামের ভুয়া প্রচারণার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে অবহিত করার জন্য স্থানীয়দের বলা হয়।

এদিকে, ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট রাজশাহী জেলা প্রশাসককে দেওয়া এক চিঠিতে ইউজিসি জানায়, অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নামধারী প্রতিষ্ঠানটি সরকার কর্তৃক অনুমোদিত নয়। এর সব ধরনের কার্যক্রম অবৈধ ও বেআইনি। নামধারী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচারণার কারণে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এছাড়া স্বঘোষিত উপাচার্য রফিকুল ইসলামের কর্মকাণ্ডে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ অবস্থায় যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে কমিশনকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। এরপর ৪ সেপ্টেম্বর ইউজিসিকে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে পাঠানো এক চিঠিতে নামধারী বিশ্ববিদ্যালয়টির সাইনবোর্ড উচ্ছেদের বিষয়ে নিশ্চিত করা হয়।

এদিকে মো. রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, ‘২০১১ সালে একটি দৈনিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়,দেশের মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়নে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসাগুলোকে অ্যাফিলিয়েট ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে সরকারের। কুষ্টিয়ায় অবস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে এসব মাদ্রাসাকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ওই প্রজ্ঞাপন দেখে আমরা আবেদন করি। সরকার আমাদের মাদ্রাসাকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতীয় সংসদ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়টির নামে সরকার ও বিশ্বব্যাংক ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই অর্থ ছাড় করা হচ্ছে না।’ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া উপাচার্য : বান কি-মুনকে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি!

তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,এমন কোনও প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউন থেকে জানতে চাওয়া হয় মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমানের কাছে। তার বক্তব্য হলো, ‘এ ধরনের প্রজ্ঞাপন কখনও জারি হয়নি বলেই জানি। ওই মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল যা যা দাবি করছেন সেসবের কোনও সত্যতা নেই। মাদ্রাসাকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, এমন নথি আমাদের কাছে নেই।’

নিজেকে অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামী দাখিল মাদ্রাসার সাবেক প্রিন্সিপালও দাবি করেছেন মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘আমি ডিগ্রি পাস। মাদ্রাসাটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অনুমোদন পাওয়ার সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়। আমি যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন গবেষণা করেছি ও আইনটি প্রণয়ন করেছি,তাই আমাকে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়। আমি এখন আমার নামের পাশে ড. লিখতে পারি। মাদ্রাসাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হওয়া ও আমাকে ডক্টরেট স্বীকৃতি দেওয়াসহ সব ডকুমেন্ট আমার কাছে আছে। আমি এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে গিয়ে জেলও খেটেছি। আমাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল। গত বছর ছাড়া পেয়ে আবার কাজে নেমে পড়েছি। আমাদের অ্যাকাউন্টে টাকা দেওয়ার জন্য সোনালী ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। টাকা দিলে ৬০০ একর জায়গার ওপর বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপন করা হবে।’

সরকারি অর্থ বরাদ্দ ও কাগুজে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে হিসাব নম্বর প্রসঙ্গে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ সোনালী ব্যাংক শাখার ম্যানেজার তারিক হাসানের কাছে জানতে চাওয়া হয়। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামী মাদ্রাসা নামে একটি ইবতেদায়ী মাদ্রাসা ছিল বলে এলাকার মানুষের কাছে শুনেছি। কিন্তু বাস্তব ঘটনা হলো, সেখানে এখন ওই মাদ্রাসার কোনও অস্তিত্ব নেই। শুধু তাই নয়, রফিকুল ইসলাম নামে যে ব্যক্তি আমাদের শাখায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে যে অ্যাকাউন্ট আছে বলে দাবি করছেন তা অসত্য। ওই অ্যাকাউন্ট প্রায় ১৫ বছর আগে খোলা হয়, তাও রফিকুল ইসলামের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট এটি। বহুদিন কোনও লেনদেন না থাকায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সেটি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। সুতরাং এসব তথ্য সবই মিথ্যা ও বানোয়াট।’

ভবানীগঞ্জ সোনালী ব্যাংক শাখার ম্যানেজারের তথ্য অনুযায়ী, ‘রফিকুল ইসলামের এমন কর্মকাণ্ডের কারণে তার বিরুদ্ধে স্থায়ী প্রশাসন ব্যবস্থাও নিয়েছে কয়েকবার। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে জামিনে বেরিয়ে তিনি আবারও একই কাজ শুরু করেছেন। মাঝে মধ্যে তাকে আমাদের ব্যাংকের গেটে দেখা যায়। কিন্তু তাকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। কখনও ঢুকলেও কিছুক্ষণ বসে থেকে নিজেই চলে যান তিনি। এই লোকটা মূলত সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন।’

স্বঘোষিত উপাচার্য মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে প্রতারণায় আরও অনেকে জড়িত বলে মনে করছেন ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান। তার মন্তব্য,‘এরা সম্ভবত সংঘবদ্ধ কোনও চক্র। এদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’   সুত্র: বাংলা ট্রিবিউন/বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close