ট্রাভেল ও ট্যুরিজমনাগরিক মতামতনাটোরশিরোনাম-২

সংস্কারের নামে রানী ভবানীর রাজপ্রাসাদের স্থাপত্যশৈলীর বিকৃতি

মাহবুব হোসেন

গ্রিক দেবীর মাথার ওপর ছিল সাপের ফণী। সংস্কারের পর সেই সর্পফণী হয়ে গেছে পুঁতির মালার মতো। দেবীর চেহারায়ও এসেছে পরিবর্তন। স্থাপত্যশৈলীর এমন বিকৃতি ঘটেছে রানী ভবানীর রাজপ্রাসাদে।
দীর্ঘদিন পর নাটোরের ঐতিহ্যবাহী এ রাজবাড়ির ছোট তরফ ও বড় তরফের সংস্কারকাজ শুরু করেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। কিন্তু দক্ষ শিল্পীর পরিবর্তে সাধারণ নির্মাণ শ্রমিক দিয়ে সংস্কারকাজ করানোর ফলে বিকৃতির শিকার হচ্ছে এ পুরাকীর্তি। সংস্কারের সময় বিকৃত করা হয়েছে রাজবাড়ির বিভিন্ন নকশা, দেবশিশুসহ নানা আকৃতি।
গত জুনে রানী ভবানীর রাজবাড়ির ছোট তরফ ও বড় তরফের সংস্কারকাজ শুরু হয়। এ সংস্কারকাজে বড় তরফের জন্য ৫ লাখ ও ছোট তরফের জন্য ১০ লাখ টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। সংস্কারের এ দায়িত্ব পেয়েছেন গোলাম ফারুক নামে এক ঠিকাদার।
সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, এরই মধ্যে বড় তরফের বাইরে সিমেন্ট-বালির কাজ করা হয়েছে। ভাঙা দরজা পুনরায় মেরামত করার জন্য কাঠের কাজও করা হচ্ছে। কিন্তু বড় তরফের মূল ফটকের ওপর দেবশিশুর প্রতিকৃতি সংস্কার করতে গিয়ে বিকৃতিই ঘটানো হয়েছে। রাজপ্রাসাদের মূল ফটকের উপরের নকশাতেও বিকৃতি ঘটিয়েছেন সংস্কারকাজে নিয়োজিত নির্মাণ শ্রমিকরা, যা খুব সহজেই চোখে পড়ছে দর্শনার্থীদের।রানী ভবানীর রাজপ্রাসাদের

এছাড়া ছোট তরফের মূল প্রাসাদের দক্ষিণ অংশে সংস্কার করতে গিয়ে প্রাসাদের লম্বা নকশাকে বিকৃত করে আঁকাবাঁকা বানানো হয়েছে। প্রাসাদের ফোয়ারের বিপরীত দিকে গ্রিক দেবীর মাথার ওপর সাপের নকশা ও চেহারাও বিকৃত করা হয়েছে। একইভাবে বিকৃতি ঘটেছে ছোট তরফের পেছনের অংশের কিছু নকশায়ও।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ আইন ১৯৯৬ অনুযায়ী, প্রত্নতাত্ত্বিক কোনো স্থাপনা সংস্কারের ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণের সময় ব্যবহূত উপাদান দিয়েই তা করতে হবে। সংস্কারের সময় ভবনের গায়ে নতুন কোনো দাগ বা নকশা বিকৃত করা যাবে না। ভবনের কোনো স্থাপত্যই পরিবর্তনের সুযোগ নেই ওই আইনে। আইন অমান্য করে কেউ এসব স্থাপনা বিকৃত করলে তাদের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানাসহ শাস্তির কথাও বলা হয়েছে আইনে। রানী ভবানীর প্রাসাদের ক্ষেত্রে আইনের সব বিষয়ই অমান্য করা হয়েছে বলে মনে করছেন ঐতিহ্য অন্বেষণের চেয়ারম্যান ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক কোনো স্থাপনার সংস্কারকাজ অবশ্যই প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণবিদের তত্ত্বাবধানে হওয়ার কথা। ছবি দেখে ও স্থানীয়দের বর্ণনা শুনে মনে হচ্ছে, পুরো কাজটিই করা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। রানী ভবানীর রাজবাড়ি নির্মিত হয়েছে চুন-সুরকি ও চুন-বালি দিয়ে। সে হিসাবে এ ভবনের সংস্কারে সিমেন্ট ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। ভবনে সিমেন্টের ব্যবহার ও এর নকশা পরিবর্তন দুটিই দণ্ডনীয় অপরাধ। অদক্ষ লোক দিয়ে ঐতিহ্যবাহী একটি স্থাপনাকে ধ্বংস করার দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। আমরা এ ধরনের কাজের তীব্র প্রতিবাদ জানাই।

জানা যায়, ঈদের পর থেকে দরজা সংস্কার ও প্রাসাদ রঙ করার কাজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন শ্রমিকরা। ভাঙা দরজাগুলো মেরামতের জন্য সেগুন গাছের কাঠ প্রস্তুত করা হচ্ছে। এসব কাজ দেখভালের দায়িত্বে আছেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বগুড়া আঞ্চলিক অফিসের গবেষণা সহকারী শাওলী তালুকদার। সপ্তাহে দুদিন তিনি রাজবাড়ির সংস্কারকাজ পরিদর্শন করেন। যদিও সংস্কারের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এত দিন বিকৃত নকশাগুলো চোখে পড়েনি তার।
সংস্কারের নামে মূল স্থাপত্যশৈলী পরিবর্তন করা হচ্ছে জানার পর তিনি বলেন, নকশার কাজ এ অর্থবছরে ধরা হয়নি। তাছাড়া নকশা সংস্কার করে বিকৃত করার কথা নয়।
শাওলী তালুকদারের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চিত্রশিল্পী সৈয়দ মাসুম রেজাকে সঙ্গে নিয়ে রাজবাড়ির বড় তরফ ও ছোট তরফে ঘটে যাওয়া বিকৃতিগুলো শাওলী তালুকদারকে দেখানো হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, নকশার কাজ এ অর্থবছরে করার কথা নয়। তার পরও শ্রমিকরা এ কাজ করেছে। এতে স্থাপত্যশৈলী বিকৃত করে কার্টুন বানানো হয়েছে। বিষয়টি যদি আরডি (রিজিওনাল ডিরেক্টর) জানেন, তাহলে তিনি সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।
এ সময় চিত্রশিল্পী সৈয়দ মাসুম রেজা বলেন, রানী ভবানীর রাজবাড়ি নাটোরের ঐতিহ্য এবং দেশের অন্যতম পুরাকৃর্তি। এ রাজবাড়ির সঙ্গে অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ইতিহাস বিজড়িত এ রাজপ্রাসাদের সংস্কারকাজ কোনো দক্ষ শিল্পীকে দিয়ে না করিয়ে অদক্ষ নির্মাণ শ্রমিক দিয়ে করানো হচ্ছে। যার ফলে বিকৃতি ঘটছে নকশায়। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
নাটোর জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ভাস্কর বাগচি বলেন, স্পষ্ট ভাবে আইনে বলা রয়েছে, ঐতিহাসিক স্থাপনায় কোন বিকৃতি ঘটানো যাবে না। কিন্তু প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর সে কাজটিই করছে। বিকৃতি ঘটিয়ে তারা আইন লংঘন করেছে। এই আইন লংঘনের দায়ে তাদের জেল জরিমানা এবং শ্বস্তি হতে পারে।রানী ভবানীর রাজপ্রাসাদের

এদিকে সংস্কারের নামে রাজবাড়ির স্থাপত্যশৈলী বিকৃতির ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে নাটোরের সচেতন মহল। এ বিষয়ে সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম নান্টু বলেন, ঐতিহ্যবাহী রানী ভবানীর রাজবাড়ি সংস্কার নাটোরবাসীর প্রাণের দাবি ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন পর সংস্কারকাজ শুরু হলেও ঠিকভাবে কাজগুলো করা হচ্ছে না। নকশা ও স্থাপত্যশৈলী পরিবর্তন করা হচ্ছে। দক্ষ কোনো কারিগরকে দিয়ে সংস্কার না করে অদক্ষ রাজমিস্ত্রি দিয়ে সংস্কারকাজ করানোর কারণে এমনটি ঘটছে। আমার চাইব দক্ষ কারিগর দিয়ে রাজবাড়িটি সংস্কার করা হোক।
কবি রফিকুল কাদির বলেন, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা নষ্ট করা কারো অধিকার নেই। ক্ষোদ প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরও সেটা পারেনা। আমরা সচেতন নাটোরবাসী এটা প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের কাছে জবাব চাইবো কেন তারা বিকৃতি করছে। সেই সাথে দক্ষ কারিগর দিয়ে রানী ভবানীর রাজপ্রাসাদ মুল সংস্কারের জোর দাবী জানাচ্ছি।
বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন বলেন, ঐতিহ্যবাহী নকশা পরিবর্তন করার কারো অধিকার নেই। সংস্কারের নামে যদি এটা করা হয়, তাহলে কাজ বন্ধ করে দেয়া হবে। তাছাড়া কেউ অভিযোগ করলে বিষয়টি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হবে। / বরেন্দ্র বার্তা/মাহবুব হোসেন

Close