সম্পাদকীয়-কলাম

এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়

বাকী বিল্লাহ

এই ছবিটা শহীদুল আলমের তোলা, ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের শেষ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে ছাত্রদের উপর চালানো ক্র্যাকডাউনের ঘটনার জান্তব প্রামাণ্য দলিল। ১৯৯৬ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রায় ৭০০ পুলিশ আর বিডিআর জওয়ান নৃশংসভাবে হামলা চালায় জগন্নাথ হলে। পরদিন ১লা ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমীতে মাসব্যাপী একুশে বইমেলার উদ্বোধন করতে আসবেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তখন সরকারবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। একই সাথে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে প্রণীত ছাত্রসমাজের ১০ দফা বাস্তবায়ন না করায় প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে প্রতিরোধ করার আহবান জানানো হয়। পরবর্তীতেও খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনা যিনিই প্রধানমন্ত্রী থাকুন না কেন—ছাত্রসমাজের দশ দফার সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী হিসেবে তাদের কাউকেই ক্যাম্পাসে স্বাগত জানানো হয়নি। আমার ছাত্র রাজনীতির জীবনে খালেদা এবং হাসিনা, এ দুই প্রধানমন্ত্রীর ক্যাম্পাসে আসার প্রতিবাদে কালো পতাকা হাতে মিছিলের স্মৃতি অটুট আছে। যাহোক, নব্বইয়ের দশ দফার কথা আজ আর কারো মনে নেই।

স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্রদের উপর অভূতপূর্ব বর্বর আক্রমণ ছিল ৩১ জানুয়ারির ঘটনা। ওদিন ছাত্রদের উপর অশ্রাব্য এবং চরম সাম্প্রদায়িক কটুক্তি করে তাদের বেদম প্রহার করা হয়, অনেকে আটক করা হয়। শর্টগান দিয়ে গুলি করে, বুট দিয়ে পিষ্ট করে, ডাইনিং রুম তছনছ করে ছাত্র-নিপীড়নের চূড়ান্ত উদাহরণ তৈরি করা হয়। তবে আজকে দাঁড়িয়ে যদি বলি, এ ধরণের নির্যাতন-নিপীড়ন এখন আর মোটেও অভূতপূর্ব নয়। এ ধরণের ঘটনা এখন আমরা নিয়মিত ঘটতে দেখি। ১৯৯৬ সালে শহীদুল আলম যে ছবিটি তুলেছিলেন, হুবহু প্রায় একইরকম ছবি আমরা ক’দিন আগেও দেখেছি। নিরাপদ সড়কের দাবিতে সর্বশেষ ছাত্র আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ২২ ছাত্রকে রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করে জামিন নামঞ্জুর করা হয়—সেদিনকার একটি ছবি ইতিহাসের এই নিদারুণ পূনরাবৃত্তি ঘটায়।

গত পরশুদিন জানতাম, গতকাল হাইকোর্টে শহীদুলের জামিনের শুনানি হবে। তবে শহীদুলের চেয়ে বেশি উদ্বেগ কাজ করছিল মিয়ানমারে আটক রয়টার্সের দুই সাংবাদিক ওয়া লোন ও কাই সোয়ে’র জন্য। কারণ বাংলাদেশে সত্য প্রকাশ যতটা কঠিন, সেই তুলনায় মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরো দূরহ। গত পরশুই ছিল ওয়া লোন ও কাই সোয়ে’র বিচারের রায়। রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা লংঘনের মামলার সেই রায়ে ওই দুই সাংবাদিককে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। কী রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা লংঘন করেছেন তারা? রাষ্ট্র এবং সেনাবাহিনী বেমালুম অস্বীকার করছিল, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের সাথে ঘটমান গণহত্যার কথা। বস্তুত রাষ্ট্র এবং সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদেই রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা শুদ্ধি অভিযান চলছিল। ওয়া লোন এবং কাই সোয়ে প্রামাণ্য তথ্য সহ তুলে ধরেন কীভাবে দশজন নিরীহ রোহিঙ্গা গ্রামবাসীকে সেনাবাহিনী কচুকাটা করার জন্য উগ্রবাদী বৌদ্ধদের হাতে তুলে দেয়। হত্যার আগের এবং পরের দুটো ছবিই প্রকাশ করেন তারা। ব্যাস! রাষ্ট্র যে সত্য গায়ের জোরে গোপন করে রাখছিল, সেই পথ বন্ধ হয়ে সত্য উন্মোচিত হয়ে পড়ে।

গতকাল শহীদুল আলমের জামিনের শুনানিতে হাইকোর্টের একজন বিচারপতি বিব্রত হওয়ায় শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। এ ঘটনাটির দারুণ প্রতিকী গুরুত্ব রয়েছে আমার কাছে। শহীদুল সত্য প্রকাশ করেছিলেন, এবং একটি অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সত্য সবসময়ই বিব্রতকর। মিয়ানমার রাষ্ট্র সম্প্রতি গণতন্ত্রের লেবাস পরেছে বটে, কিন্তু গোটা বিশ্বের মানুষ জানে-ওখানে পরোক্ষ সেনাশাষন চলছে। সঙ্গত কারণে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বা মানবাধিকার পরিস্থিতি তথৈবচ। সেই তুলনায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখনো ভাল। তবে এক ব্যক্তির লৌহ দৃঢ় শাসন, বিচার বিভাগসহ সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ক্রমাগত নিয়ন্ত্রণ এবং ধস বাংলাদেশকে এক অন্তহীন লুটপাটের বৃত্তে, অগণতান্ত্রিকতার আরো গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত করছে—শহীদুল উচ্চারণ করেছিলেন সেই সত্য। আজ একমাস ধরে তিনি কারারুদ্ধ।

গতকাল সন্ধ্যায় দৃক গ্যালারীতে ‘এ স্ট্রাগল ফর ডেমোক্রেসি’ শিরোনামে শহীদুল আলমের আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আলোচনা শুরুর আগে গান গেয়ে শোনান শিল্পী রেবেকা নীলা, কৃষ্ণকলি ইসলাম ও বিথী ঘোষ। তারা গাইছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’।  গানটি শুনতে শুনতেও আমার চোখে শহীদুলের ছবি নয়, বরং ওয়া লোন ও কাই সোয়ে’র মুখ ভেসে উঠছিল। ‘আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে,. দুঃখবিপদ-তুচ্ছ-করা কঠিন কাজে’—এই লাইনটা শোনার সময় রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ওয়া লোনে’র বলা কথাগুলো মনে পড়ছিল। তিনি বলেছেন—তারা কোনও অন্যায় করেননি, এবং সত্য প্রকাশ থেকে কখনোই পিছপা হবেন না তারা। সবচেয়ে বড় আশার কথা হল, দীর্ঘদিন পর এই প্রথম মিয়ানমারের মিডিয়া এবং সিভিল সোসাইটি এই প্রহসনের বিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। মাত্র কিছুদিন আগেও প্রবল এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী ডামাডোলে পর্যদুস্ত হয়েছিলেন তারা। প্রবাসী মং জার্নি বা এরকম ব্যতিক্রমী দু’একজন ছাড়া বর্মী লেখক-শিল্পী বা বুদ্ধিজীবীদের রোহিঙ্গা গণহত্যা প্রসংগে মুখ খুলতে দেখিনি আমরা। তবে আমি বিশ্বাস করি, এই পরিস্থিতি বদলাবে। খোদ মিয়ানমারে গণহত্যাকারী সেনাবাহিনী ও তার পৃষ্ঠপোষক অং-সান-সুকী একদিন ধিকৃত হবে। মানুষ বীর হিসেবে বরণ করে নেবে ওয়া লোন এবং কাই সোয়েকে।

বাংলাদেশকেও এই অন্ধকার যাত্রার পথ থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন নিরন্তর সত্য বলে যাওয়া, সত্য নামক কঠিনের সাথেই ভালবাসার সম্বন্ধ গড়ে তোলা। কঠিন সত্যের সেই পথে আমাদের কাণ্ডারী শহীদুল আলম।

Close