নাগরিক মতামত

বঙ্গদেশের নারী অভিবাসন

মতিউর রহমান মিঠু

মানব সমাজের ইতিহাস আর অভিবাসনের ইতিহাস একই সময়ের । অভিবাসন মানুষের জন্মগত অধিকার।মানুষ বহু যুগ থেকেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে পাড়ি জমিয়েছে নানা কারণে, বন্য,খরা,রাজনৈতিক,ধমীয়,কখনো বা কাজের সন্ধানে নিজের ভাগ্য পরির্বতনের আশায়।এটা মানুষের অধিকার,প্রত্যেক রাষ্ট্রের উচিত এমন অধিকার খর্ব না করা। মানুষ কখনো অবৈধ হতে পারে নাফলে অভিবাসন কখনো অবৈধ হতে পারে না। হতে পারে অনিরাপদ। সারা পৃথিবীতে যে শ্রম অভিবাস হয় এর একটা বড় অংশ বাংলাদেশের।

দেশ স্বধীন হবার পর মূলত অভিবাসন শুরুহলেও ১৯৭৬ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রম অভিবাসন শুরু হয়।৬ হাজার ৭৮ জন নিয়ে যে অভিবাসন শুরু হয়েছিল তা বর্তমানে ১০০ টিরও বেশি দেশে প্রায় ১ কোটি অভিবাসী নানা ধরনের কাজে নিয়োজিত। একটা সময় প্রচলিত ধারনা ছিল শ্রম অভিবাসন শুধু পুরুষদেরই হতে পারে। বাংলাদেশে নারী অভিবাসনকে একটা সময় পর্যন্ত খুব বাজে ভাবে দেখা হতো।সমাজে এমন ধারনাও প্রচলিত ছিল নারী অভিবাসন হয় মূলত অসামাজিক কাজের জন্য। বিভিন্ন সরকারি- বেসরকারি প্রচার-প্রচানার ফলে ঐ ধারনা কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছে।বাংলাদেশ থেকে প্রধানত তিন ধরনের নারী শ্রমিক অভিবসীত হয় দক্ষ নারী শ্রমিক, আধা দক্ষ, এবং অদক্ষ শ্রমিক।সরকার প্রথমদিকে অদক্ষ নারী শ্রমিক অভিবাসনে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই ২০০৩ সালে স্বল্প দক্ষ এবং আধা দক্ষ নারী শ্রমিকের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, পুনরায় নারী অভিবাসন শুরু হয়।

১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত যেখানে নারী অভিবাসনের হার ছিল শতকরা ১ ভাগ সেখানে ২০০৩ সালে নারী অভিবাসন বিষয়ে নীতিমালা পরিবর্তনের ফলে ২০০৯ সালে নারী অভিবাসনের হার হয় ৫ শতাংশ! খেয়াল করার বিষয় হলো যখনই সরকার অদক্ষ শ্রমিকের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল তখনই অভিবাসনের হার বেড়ে গেল!অর্থাৎ বঙ্গদেশ থেকে মূলত অদক্ষ শ্রম অভিবাসনের হারেই বেশি।২০১৩ সাল থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী দেশ হিসাবে বাংলাদেশ সারা পৃথিবীতে সপ্তম স্থান অধকারী হিসাবে অবস্থান করছে। অভিবাসী নারী শ্রমিকেরা পুরুষ অভিবাসীর তুলনায় অনেক কম হলেও নারী শ্রমিকেরা তাঁদের উপার্জনের প্রায় ৯০ ভাগ টাকা দেশে পাঠিয়ে দেন। অপরদিকে পুরুষ শ্রমিকেরা তাঁদের আয়ের ৫০ ভাগ টাকা দেশে পাঠান। এক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে রয়েছে অনেক বড় অবদান।প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ নারী শ্রমিক বিদেশে কর্মরত অবস্থায় আছে।শুধুমাত্র ২০১৭ সালে ১ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ জন নারী শ্রমিক বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন কাজের উদ্দেশ্যে। বিদেশে বাংলাদেশের নারীরা এখনও আধা-দক্ষ শ্রমিক হিসাবেই বেশি নিয়োজিত হচ্ছে। এর মধ্য গৃহশ্রমিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি নিয়োজিত। এ বাহিরে নারী শ্রমিকেরা পরিচ্ছন্নতা কর্মী,শিশু ও বয়স্কদের দেখা-শুনা করা,দোকানে বিক্রয় কর্মী, বিউটি পার্লারে কর্মী, গার্মেন্টস শ্রমিক এবং নাসিং পেশায় নিয়োজিত আছে।

বাংলাদেশ থেকে নারী শ্রমিকেরা সাধারনত সৌদি আরব, লেবানন, দুবাই, জর্ডান, কাতার, ওমান,মরিশাস,কুয়েত সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে অভিবাসীত হয়। নারী অভিবাসনের হার যত বৃব্ধি পাচ্ছে ,নির্যাতনের হার ততই বৃব্ধি পাচ্ছে। এ নির্যাতন আবার সব ক্ষেত্রে সমান নয়, গৃহশ্রমিক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই কোন না কোন ভাবে নিয়োগকর্তার দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়। বিশেষ করে সৌদিতে অবস্থানরত নারী শ্রমিকেরা নিয়োগকর্তার দ্বারা দৈহিক নির্যাতনের পাশাপাশি,যৌন হয়রানী,ঠিকমতো খেতে না দেওয়া, নির্দিষ্ট শ্রমঘন্টা না থাকা, সময়মতো বেতন ভাতা না দেওয়া, পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে না দেওয়া,পাসপোর্ট,ভিসা নিয়োগকর্তা কর্তৃক জব্দ রাখাসহ নানা ধরনের অভিযোগ আছে।অপরদিকে দক্ষ শ্রমিকের উপর নির্যাতনের হার অনেকাংশে কম, বিশেষ করে যারা,গার্মেন্টস কর্মী,নার্স বা গৃহকর্মী ছাড়া অন্য কোন পেশায় নিয়োজিত আছেন।

দীর্ঘ দিন বিদেশে থাকা বেশ কিছু নারী শ্রমিকের উপর ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) একটি স্টাডি রিপোর্ট করে। এতে দেখা যায় প্রতি ৩ জনে ২ জন নারী অভিবাসী কর্মী নিয়োগকর্তা দ্বারা কোন না কোনভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে।এতে আরো দেখা যায় যারা গৃহশ্রমিক হিসাবে কাজ করেন তাঁরা বেশি মাত্রায় শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। গৃহকর্মে অন্তরীন থাকার কারনে নির্যাতনের অনেক ঘটনা প্রকাশিত হয় না। এসব নিরুপায় নারী শ্রমিকেরা বাধ্য হয়ে সকল অন্যায় নিরবে সহ্য করতে বাধ্য হয়।এদের জন্মই যেন নির্যাতন সহ্য করবার জন্য! দেশে অবস্থানকালে দারিদ্রের কষাঘাত, স্বামীর নির্যাতনে তালাকপ্রাপ্ত হওয়া, দেশে কর্মসংস্থান না থাকার ফলে ভাগ্যান্বেষনে বিদেশে পাড়ি দিতে গিয়েও নানা ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হয়। জেলায় জেলায় অভিবাসন সংক্রান্ত অফিস না থাকার কারণেএকদিকে যেমন তারা পেশা নির্বাচন করতে পারছে না, আবার যে দেশে যেতে চায় সেই দেশের আবহাওয়া, খাদ্যাভাস,আইন-কানুন সম্পর্কে কোন ধারনা ছাড়াই তারা বিদেশ গমন করছে। উন্নত বিশ্বের গৃহস্থলীর কাজেও যে প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে এ সম্পর্কে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের কোন ধারনায় নেই ফলে বিদেশ যাবার পর প্রথম বিড়ম্বনায় পড়ে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ভাষা না জানা নিয়ে , নির্যাতনের শুরুও হয় এখান থেকে। বাংলাদেশে যে সকল টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার আছে সেগুলোতে না আছে ঐরকম প্রযুক্তি, না আছে খাদ্যাভাস পরিবর্তনের ব্যবস্থা, যেন তেন ভাবে প্রশিক্ষণ শেষ করতে পারলেই যেন তাদের দায়িত্ব শেষ! আবার বিদেশে কর্মরত অবস্থায় কোন ধরনের সমস্যায় পড়লে এজেন্সি, লেবার উইং এবং দূতাবাসগুলো তেমন সহযোগিতাও করে না।

সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার রানীপুরা গ্রামের নার্গিস নামের একজন নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে দূতাবাসে গিয়ে কোন সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেন।তার মতে বিপদের সময় এজেন্সি ও দূতাবাসগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে না পারার কারনে নির্যাতনের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। শুধু কি বিদেশে? দেশে ফিরে আসার পরও একজন নারী শ্রমিককে সমাজের প্রতিকুল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এরমধ্যে যারা প্রতারিত বা অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসে তাদের জন্য আপেক্ষা করে উপহাস,বিদ্রুপ,নেতিবাচক নানা ধরনের মন্তব্য। এধরনের নেতিবাচক সামাজিক অবস্থা শুধু যে অভিবাসী নারীর উপরেই প্রভাব ফেলছে তা নয় ,তার সংসার,পরিবার,সামাজ এমনকি রাষ্ট্রের উপর এর প্রভাব প্রবল। আশার কথা হচ্ছে এতো কিছুর পরও নারী অভিবাসন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের তথ্য মতে ২০১৮ সালে জানুয়ারী থেকে আগষ্ট পর্যন্ত মোট ৫০৭৬ জন শ্রমিক বিদেশে গমন করেছে। এর মধ্য ৩৭২ জন নারী যা মোট অভিবাসনের ৭.৩২ ভাগ । একই সময়ে গতবছর এই হার ছিল ৫.১ শতাংশ।একই সাথে পুরুষ অভিবাসনের হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে সমানতালে।প্রবাসী শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধকরা এবং বিদেশে কর্মরত অবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। প্রতিটি প্রবাসী শ্রমিকের ডাটাবেজ তৈরী করে তথ্য সংরক্ষন করতে হবে। কোন দেশে কতগুলো শ্রমিক অবস্থান করছে জাতীয়ভাবে তার তথ্য সংরক্ষন করতে হবে। ফ্রি ভিসা বা চাকুরির নামে বিদেশে পাচারকৃত ভিকটিমকে দেশে ফেরত আনা,আইনগত ব্যবস্থা,নিরাপত্তা,চিকিৎসা, মনো-সামাজিক পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরন ও অর্থসহায়তার ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই করতে হবে। পাশাপাশি প্রতারনাকারীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মানবপাচারকারী এবং এজেন্সিগুলোকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পারে অনিরাপদ অভিবাসন রুখে দিতে।

লেখকঃ উন্নয়ন কর্মী
মোবাঃ ০১৭১৯৪০৩৭৪৭

Close