সম্পাদকীয়-কলাম

বেগুনি ব্যবসা’ ও করপোরেট নারী দিবস

জোবাইদা নাসরীন

প্রতিবছরই আসে ৮ মার্চ। আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আসে অনেক উৎসাহ-উদ্দীপনার ওপর ভর করে। এই দিবসের প্রথম প্রহরেই শুরু হয় অনুষ্ঠান শহীদ মিনারে। জ্বালানো হয় প্রদীপ। এই যখন ৮ মার্চের চেনা চিত্র তখন আমার জেন্ডার অ্যান্ড সোসাইটি কোর্সে ছাত্রছাত্রীদের একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম ৮ মার্চ কেন নারী দিবস? এই দিনটির তাৎপর্য কী? খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থীই এর উত্তর দিতে পেরেছেন। কেউ কেউ বলেছে এই দিনটি নারীদের বেগুনি রঙের শাড়ি পরে ঘুরে বেড়ানোর দিন। দু’চারজন একটু রসিয়ে বলেছেন, মেয়েদের জন্য ৩৬৫ দিনের একটি দিন কিন্তু ছেলেদের জন্য বাকি ৩৬৪ দিন। কেউ বলেছেন, মেয়েদের উৎসবে আমি অবাক হয়ে গিয়েছি, ভেবেছিলাম এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা অন্তত জানে। পরে নিজে যখন চিন্তা করেছি, তখন বুঝেছি এর কারণ এখন আন্তর্জাতিক নারী দিবস অনেক বেশি আনন্দ, উচ্ছ্লতার দিন। শ্রমিকের প্রতিবাদের ইতিহাসকে স্মরণ করা আমাদের ভাবনা চিন্তায় এখন আর নেই। শুধু পুরুষ নয়, আমার নিশ্চিতভাবেই জানি যে সকল নারী এই দিনটিকে বেগুনি শাড়ি পরে উদযাপন করেন তাদের মধ্যে অনেক নারীই জানে না এই দিনটির তাৎপর্য এবং ইতিহাস। কেনইবা এই রং নারী দিবসের সঙ্গে গেঁথে আছে?

কেন এই রং? নারী দিবসের তাৎপর্যের ওপর পোস্টার বা প্রতীকের রং বেগুনি বেছে নেওয়া হয়েছে। বেগুনি রংটা নারীবাদীদের প্রতিবাদের এক ধরনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এ রং ভেনাসের, যা কিনা নারীরও প্রতীক। বেগুনি নির্দেশ করে সুবিচার ও মর্যাদা, যা দৃঢ়ভাবে নারীর সমতায়নে সংশ্লিষ্ট। অ্যালিস ওয়াকার রচিত দ্য কালার পারপল বইটি এর অনুপ্রেরণা। এই বইতে তিনি তুলে ধরেছেন নারীদের অধিকারের কথা। মনে করা হয়, সেখান থেকেই নারীবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে গেছে এই রংটা। তবে এখন এই রংটার সঙ্গে আন্দোলনের ইতিহাস নেই। আছে করপোরেট বাণিজ্য। নারী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন বুটিক হাউসগুলো ‘ছাড়’ দিয়ে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, পিছিয়ে নেই কসমেটিকস এবং বিভিন্ন প্রসাধনী বিক্রেতা হাউসগুলোও। কোথাও কোথাও চলে মেহেদি লাগানো উৎসবও। তবে এখন এটি হয়ে গেছে এমন যে ৮ মার্চ মানে বেগুনি রঙের শাড়ি বিক্রির ঢল, ৮ মার্চেকে কেন্দ্র করে চলে ব্যবসা, চলে নানা ধরনের প্রতিযোগিতা।

নারীর রং ফর্সাকারী ক্রিমের স্পন্সরশিপে চলে নারী দিবসের নানা অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে হাজির হন সমাজের প্রতিষ্ঠিত, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত শহুরে নারীরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৮ মার্চ পালিত হয় দাতা সংস্থাগুলোর পয়সায়। হয় রংবেরঙের র‌্যালি। সেমিনার, আলোচনা অনুষ্ঠান। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেও ইদানীংকালে বড়সড় করে পালন করা হয় এই দিনটিকে। এদিনে টকশোগুলোতে নানা ‘সফল’ নারীদের জীবনগাথা ওঠে আসে, কিন্তু শ্রমিক নারীর জীবন সংগ্রাম এদিনে কোনোভাবেই মিডিয়া কভারেজে আসে না। যারা এই ইতিহাসের নির্মাতা, সেই শ্রমিক নারীদের বেশিরভাগই থাকে না এই দিবসকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজনে। তাদের দূরে রেখেই পালন করা হয় তাদের হাতেই তৈরি হওয়া ইতিহাসের এই দিনটি। যার কারণে এই দিবসের আদর্শগত মালিকানা থেকেই ছিটকে পড়ছে। এখন নারী দিবস করপোরেট ব্যবসার হাতে, নানা রকম স্পন্সরশিপ বাক্সে।  আর উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত নারীদের সেমিনার আর টকশোর দিন। কিন্তু এই নারী দিবস সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে, জানাতে হবে।

কী সেই ইতিহাস? কেন এই ৮ মার্চ? কেন এই দিনটি ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ? পৌরষদীপ্ত ইতিহাস নির্মাণের সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে কীভাবে নারীরা এই ইতিহাসকে ধরে রাখার জন্য এই দিনটির স্বীকৃতি আদায় করলো? ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে একটি সুচ কারখানার মহিলা শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে মানবেতর জীবন ও ১২ ঘণ্টা কর্মদিবসের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। তাদের ওপর নেমে আসে পুলিশি নির্যাতন। ১৮৬০ সালে ওই কারখানার মহিলা শ্রমিকেরা ‘মহিলা শ্রমিক ইউনিয়ন’ গঠন করেন আর সাংগঠনিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯০৮ সালে ১৫ হাজার নারী কর্মঘণ্টা, ভালো বেতন ও ভোট দেওয়ার অধিকারের দাবি নিয়ে নিউ ইয়র্ক সিটিতে মিছিল করেন। তারপর ১৯১০ সালের ৮ মার্চ কোপেনহেগেন শহরে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে জার্মানির মহিলা নেত্রী কারা জেটকিন ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ ঘোষণা করেছিলেন। ১৯১১ সালে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ৮ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ পালন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘ দিনটি নারী দিবস হিসেবে পালন করছে। তখন থেকেই বিভিন্ন দেশে নারীর সংগ্রামের ইতিহাসকে স্মরণ করে দিবসটি পালন শুরু হয়। এই বছর ‘সময় এখন নারীর: উন্নয়নে তারা বদলে যাচ্ছে গ্রাম শহরের কর্মজীবনের ধারা’- এই স্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় উদযাপন শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের।

বারো ঘণ্টা কর্মদিবসের বিরুদ্ধে নারীর আন্দোলনের স্বীকৃতি হিসেবে ৮ মার্চকে স্মরণ করা হলেও এই দিবসে স্মরণ করা হয় না সেই শ্রমিক নারীদের। আর তাই তো নারী দিবসকে কেন্দ্র করে নেওয়া বিভিন্ন আয়োজনের বাইরে থাকেন এই নারীরা। আমাদের দেশে শ্রমিক নারীদের বেশিরভাগেই কাজ করে ১২ ঘণ্টার বেশি। বিশেষ করে যারা পূর্ণকালীন গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করে, বাসাবাড়িতে তাদের শ্রমের হিসেব কখনও করা হয় না। অনেক নারীই আসবেন ৮ মার্চ বিভিন্ন সেমিনারে বক্তব্য দিতে, কিন্তু তাদের অনেকের বাড়িতেই গৃহশ্রমিকদের শ্রমের কোনও হিসেব নেই, যে রকম হিসাব নেই দিন চুক্তিতে হিসাব হওয়া নারী শ্রমিকের। যে কারণে তারা পায় না ঘণ্টা ভিত্তিতে কাজের মজুরি কিংবা শ্রমিক হিসেবে স্বাস্থ্যসেবার। ৮ মার্চ এই সকল নারী শ্রমিকদের কোনও দাবি দাওয়া হাজির করায় না।

যে নারীর ন্যায্য শ্রম এবং মজুরির দাবিতে সৃষ্টি হয়েছিল ৮ মার্চের, সেই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি এখনও অনেক দূরের বিষয়। ৮ মার্চ হোক সেই নারী শ্রমিকদের জয়গান এবং দাবির প্রতি সমর্থন এবং আদায়ের দিন।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Close