নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

ইসলামের দৃষ্টিতে সরকারের দায়িত্ব

‘হে ঈমানদারগণ, আল্লাহপাক তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তাদের (যথার্থ) মালিকের কাছে সোপর্দ করে দেবে; আর যখন মানুষের মাঝে তাদের (কোনো) ব্যাপারে বিচার-ফায়সালা করো, তখন তা ন্যায় ও ইনসাফের  ভিত্তিতে করো।’ (সূরা আল নিসা-আয়াত-৫৮)
শাসক এবং শাসিতের ব্যাপারে ইসলামের কী শিক্ষা, এ বিষয়টি যারা আলোচনা ও অনুধাবন করতে চান, উদ্ধৃত আয়াতটি তাদের কাছে অতীব প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বলে গৃহীত হবে। যেহেতু এখানে আমানত এবং সর্বাবস্থায় ন্যায় ও ইনসাফ রক্ষার কথা বলা হয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই সরকারি অফিস ও তদস্থলে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মাচারীদের কথাও বিশেষভাবে এসে যায়। ‘আমানাহ’ (বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্ব পালন) এবং ‘আদল’ (ন্যায়বিচার) ঈমানদারদের জন্য অবশ্যমান্য দু’টি অপরিহার্য গুণ ও বৈশিষ্ট্য। সায়্যিদানা হজরত আনাস রা: বলেন, ‘রাসূল সা: কখনোই এমন কোনো খুতবা দিতেন না, যেখানে এই কথাগুলো না থাকত যে, যার মধ্যে আমানাহ নেই, তার মধ্যে ঈমান নেই এবং যে ব্যক্তি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তার মধ্যে কোনো ধর্ম নেই।’ (মুসনাদে আহমদ হাদিস : ১১৯৩৫)
আর এসব গুণ সেই ব্যক্তির জন্য আরো বিশেষভাবে আবশ্যক, যে ব্যক্তি এমন পদে সমাসীন, যার ক্রিয়াকর্মের প্রভাব বহু-মানুষের ওপর এসে পড়ে। আলেম-উলামা এ আয়াতটির ব্যাখ্যাসূত্রে এ জন্যই বলেন, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ও কর্তৃত্বপূর্ণ পদই একটি আমানত বা বিশ্বস্ততা; যে পদ কেবল যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তিদেরই দেয়া উচিত। আরো বিশেষভাবে বলা যায়, যখন কোনো মুসলমান বিচার-মীমাংসা করার মতো দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়, তাকে অবশ্যই পূর্ণ-সততা ও ইনসাফের সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর এ নির্দেশ যে কত বেশি গুরুত্বপূর্ণ, রাসূল সা:-এর জীবনাদর্শ এবং তাঁর অসংখ্য হাদিস থেকে সেটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কর্তৃপক্ষের আনুকূল্য অথবা বন্ধুত্ব কিংবা অন্য-কোনো যোগযোগের কারণে অযোগ্য ও অনুপযুক্ত ব্যক্তিকে যদি দায়িত্বপূর্ণ পদে সমাসীন করা হয়, তা হলে তার ওপর আল্লাহ তায়ালার অভিসম্পাত বর্ধিত হতে থাকে। তার ফরজ ও নফল (Mandatory or Voluntary) কোনো ইবাদতই আল্লাহপাকের কাছে গৃহীত হবে না। (জামাইয়ুল ফাওয়াইদ)
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুধাবন করতে পারি। এক. কোনো কর্তৃত্বপূর্ণ পদে কাউকে নিয়োগের আগে তার যোগ্যতা ও নৈতিকতার-বিচার একটি ধর্মীয় কর্তব্য; কারণ ইসলাম কখনোই ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো বিভাজন অনুমোদন করে না। দুই. পদ বা দায়িত্বগ্রহণ কারো কোনো অধিকার নয়, এটা আল্লাহপাক কর্তৃক প্রদত্ত একটি আমানত, যা আল্লাহপাকের নির্দেশানুযায়ী সবার জন্য পরিপূর্ণ ইনসাফের সাথে পালন করতে হবে। তিন. সর্বাধিক যোগ্য ও উত্তম ব্যক্তিকে বেছে নিতে হবে, কারণ এরই মধ্যে নিহিত রয়েছে সমাজের কল্যাণ।
আলোচিত প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে আমরা এখন বহুল প্রচারিত রাষ্ট্রীয়ব্যবস্থা গণতন্ত্র এবং ইসলামের মধ্যে কী পার্থক্য, সেটা পর্যবেক্ষণ করতে পারি। গণতন্ত্র একটি সংবিধান বা গঠনতন্ত্রের বিধি অনুযায়ী সরকার পরিচালনার জন্য লোক মনোনীত করে। কিন্তু ইসলাম এ মনোনয়নের ফলাফলকেই অধিক গুরুত্বসহকারে দেখে। গণতন্ত্রে মনোনয়ন-প্রক্রিয়ায় সাংবিধানিক গঠনতন্ত্রের অপরিসীম শক্তি; কিন্তু সময় ও পরিস্থিতির কারণে এ গঠনতন্ত্রের বদল ঘটতে পারে। দু’টি নেতৃস্থানীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সরকারপ্রধান ও আইনপ্রণেতা সংসদ সদস্য নির্বাচনের প্রক্রিয়া সেখানে সম্পূর্ণ আলাদা এবং তাদের যে সিস্টেম অর্থাৎ রীতি ও পদ্ধতি, সেটা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্ন তা হলোÑ এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কী ধরনের শাসক ও জনপ্রতিনিধি জনগণের জন্য নির্বাচিত হয়ে আসে, এ প্রশ্নের জবাবে গণতন্ত্র নীরব ও নিরুত্তর; সে চায় শুধু নির্বাচিত সরকার, সে সরকার যতই অযোগ্য, অথর্ব ও দুর্নীতিগ্রস্ত হোক। কিন্তু ইসলাম আরো অনেক বেশি অগ্রসর হয়ে যা চায়, সেটা হলোÑ সৎ ও যোগ্য ন্যায়নিষ্ঠ সরকার।
নির্বাচন যত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষই হোক, কী লাভ, যদি দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ নির্বাচিত হয়ে আসে? গণতন্ত্রে এই প্রশ্নেরও কোনো যথোচিত জবাব নেই। জেমস ম্যাডিসনের মতো প্রথমকালীন মার্কিন নেতারা দাবি করেছিলেন, ‘জনগণের মধ্যে এই গুণ ও বুদ্ধিমত্তার অভাব হবে না, যাতে তারা উৎকৃষ্ট প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বকে নির্বাচিত করতে পারে।’ কিন্তু বিগত দুই শতাধিক বছরের ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, ম্যাডিসনদের এই ধারণা ছিল খুবই বাজে ও খুবই অসার। বিগত মার্কিন প্রেসিডেন্টদের তালিকার প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করলেই এটা প্রতীয়মান হয় যে, তারা ছিলেন ‘প্রজ্ঞার অধিকারী’ এ ধারণা কতই না অসার ও হাস্যোদ্দীপক!
গণতন্ত্র যদি স্বেচ্ছাচার ডেকে আনে, নির্বাচিত মানুষগুলো যদি নৃশংস হয়ে ওঠে, তা হলে এই গণতন্ত্র, এই নির্বাচন মানবসমাজের জন্য কী লাভ? গত শতাব্দীর প্রতি একবার দৃষ্টিপাত করাই যথেষ্ট। আণবিক বোমাÑ যে একবার ব্যবহৃত হলো, সেটা কোনো দুর্জন একনায়কের দ্বারা নয়; ব্যবহৃত হলো সুবিখ্যাত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কর্ণধার দ্বারা। ইউরোপীয় শক্তিগুলো দু’টি বিশ্বযুদ্ধে পরস্পরের বিরুদ্ধে যে নৃশংস লড়াইয়ে অবতীর্ণ হলো, সেই দুষ্কর্মও সাধিত হয়েছিল বেশির ভাগই গণতান্ত্রিক সরকারের হঠকারিতায়। বেশি দিন আগের কথা নয়, আমরা দেখলাম বসনিয়া ও কসোভোতে কী-বীভৎস নারকীয় ঘটনাই না ঘটল! অথচ সার্ব-নেতাও ছিল একজন নির্বাচিত ব্যক্তি। কাশ্মিরে যে ভারতীয় নৃশংসতা অব্যাহত, তার মাত্রাও কোনো অংশে কম ভয়াবহ নয়; কিন্তু তা যথাসম্ভব আড়ালে রাখা হয়েছে। আর গণতান্ত্রিক বিশ্ব তো এই ভেবেই যথেষ্ট পুলকিত যে, যা-ই ঘটুক না কেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। আমাদের বারবার মনে পড়ে ইসরাইলের কথা, যে ইসরাইল তার চোরাই ও জবরদখলকৃত ভূমির ওপর দেশ প্রতিষ্ঠা করছে; আর সেই দেশের স্থায়িত্বের জন্য প্রকৃত মালিকদের ওপর অব্যাহতভাবে নিগ্রহ-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। হাস্যকরই বটে, মধ্যপ্রাচ্যে এই ইসরাইলই একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ। খুবই উত্তম, কিন্তু এ থেকে সরকারব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্রের কী পরিচয় ফুটে ওঠে?
বহির্জগতের কথা থাক, আপন জন্মস্থানেই গণতন্ত্রের যে রেকর্ড তা আদৌ ঈর্ষার যোগ্য নয়, প্রলুব্ধ হওয়ার মতো নয়। এটা কোনো গোপন বিষয় নয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি আসলে কিছু করপোরেশন ও ধনাঢ্য ব্যক্তির হাতে বন্দী। কারখানায় তৈরি দ্রব্যাদির মতো বানানো জনমত নিয়ে ‘জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার’ বা গণতন্ত্র নামক অট্টালিকার একটি বহির্ভাগ তৈরি করা হয়। ফলাফল দাঁড়ায় : ধনাঢ্যতম দেশে অকথ্য দারিদ্র্যের এক জঘন্য দৃশ্যরূপ। একটি দেশ, যেখানে এত অধিক খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়, যা-নিয়ে কী করা হবে সেটা রীতিমতো ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, সেই দেশে হাজার হাজার মানুষকে অনাহারে থাকতে হয়, অথবা খাদ্য সংগ্রহ করতে হয় পরিত্যক্ত আবর্জনা থেকে এবং আরো বড় কথা হলো এ নিয়ে সরকারি ব্যবস্থা ও পদ্ধতির যে কিছু করণীয় আছে, সে সম্পর্কে কেউ কোনোরূপ চিন্তাই করে না। বস্তুতপক্ষেই এ নিয়ে কারো এতটুকু মাথাব্যথা নেই, জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত শাসকদেরও নেই। অন্য দিকে ইসলামী খিলাফতের আদর্শগত অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত; যে কারণে খলিফা হজরত উমার রা: গভীর উদ্বেগ নিয়ে বলেন : ‘যদি ফোরাতের নদীকূলে একটি কুকুরও পিপাসার্ত হয়ে মারা যায়, আমি আল্লাহর কাছে কী জবাব দেবো।’
বিশ্ববিস্তৃত জনপ্রিয়তা নিয়ে গণতন্ত্র তার প্রতি আগ্রহী ও উৎসুক জনগণকে সুবিচার, সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু কার্যত বাস্তব ক্ষেত্রে তার কোনো নিদর্শনই নেই। গণতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল এই মহান উদ্দেশ্য নিয়ে যে, এই পথে ও পদ্ধতিতে স্বেচ্ছাচারী শাসকদের অত্যাচার-নির্যাতনের অবসান ঘটবে। কিন্তু অন্য যেকোনো সামাজিক সংস্কার-আন্দোলনের ক্ষেত্রে যা হয়, মহান সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্কহীন ও ঐশী দিকনির্দেশনা থেকে মুক্ত বিচ্যুত এই গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেও তাই-ই ঘটল; কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো আর সম্ভব হলো না। বিশ্বের এখন প্রয়োজন ইসলামকে জানা এবং ইসলামের কাছে ফিরে আসা। কিন্তু তার আগে বিশ্বের আজ শত কোটি মুসলমানের প্রয়োজন বিষয়টি সঠিকভাবে উপলব্ধি করা। দুর্ভাগ্যবশত, গণতন্ত্রের মৌখিক আশ্বাসে আজ আমরা এতটাই মগ্ন ও মুগ্ধ যে, নির্বাচনী-পন্থাকেই আমরা জরুরি মনে করছি, যা সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ সরকার প্রতিষ্ঠার আবশ্যকতা থেকে আমাদের দৃষ্টিকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। আমাদের এই ভুল ও বিভ্রম আমরা যত শিগগির অনুধাবন করব, ততই মঙ্গল।
অনুবাদ : অধ্যাপক আবু জাফর

সুত্র: নয়াদিগন্ত

Close