সাহিত্য ও সংস্কৃতি

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী: পিন-হোল ক্যামেরা

সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি

লারা চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলো। চারিদিকে প্রচুর গরম পড়ছে। বেলকুনি দিয়ে মাঠ দেখা যাচ্ছে তা রোদ পড়ে খা খা করছে। মাটি ফেটে গেছে।
জানালার সামসেটে বসে একটা কাক কা কা করে ডেকেই চলেছে। লারা আজ বাবার কাছে আর ক্লিওন স্যারের কাছে ভিষন বকা খেয়েছে তাই তার মন খারাপ।
লেখাপড়াই একদম মন নেই লারার।তার চিন্তা একটায় যদি মানুষের মগজ থেকে নিউরোন কপি করা যেতো।দুপুরে শুয়ে চোখ বন্ধ করে ভাবছিলো মানুষের মগজের দশ হাজার সাতশ’বার কোটি সাতাত্তর লক্ষ্য চৌত্রিশ হাজার পাঁচশ ছেচল্লিশটা নিউরন কবি করা কি মানুষ দ্বারা সম্ভব!
যদি সম্ভব হত তাহলে লারা পদার্থ পরিক্ষার সময় ক্লিওন স্যারের কিছু নিউরোন কপি করে পরিক্ষা দিতো। তবে ক্লাসে সে হাইস্ট মার্ক পেতো বাড়িতে বকা খেতে হত না।
মাঝে মাঝে বাবার উপর আর ক্লিওন স্যারের উপর খুব রাগ হয়। মনে হয় তারা কখনো ইস্টুডেন্ট ছিলো না। কখনো কম নম্বার পাইনি।
এমনিতে ক্লাসে সব থেকে কম নম্বার পেয়েছে তার উপরে আর দুদিন বাদে তাকে বিজ্ঞান প্রজেক্ট জমা দিতে হবে।
বাবাকে যদি এখন বিজ্ঞান প্রজেক্টের কথা বলতে যায় তবে নির্ঘাত আবার বকা খাবে। আর বিজ্ঞান প্রজেক্ট জমা দিতে না পারলে ক্লিওন স্যারের কাছে বকা খাবে।
লারা ভিষন ভাবে চিন্তাই পড়ে গেলো কি করা যায় এখন!অনেক ভেবে চিন্তে বুঝল না মানুষ দ্বারা মানুষের নিউরোন কপি করতে পারবে না এটা কোনো এলিয়েনের কাজ। আর যদিও পারে তবে সেটা লারা পারবে না। বড় কোনো বিজ্ঞানী অনেক পরিক্ষা নিরীক্ষা করে করতে পারে। মাঝে মাঝে যখন বাবার প্রতি লারার রাগ হয় তখন তার বাড়ি থেকে চলে যেতে মন চাই। যেখানে পদার্থ, রসায়ন বিষয়গুলো নেই।যেখানে ক্লিওন স্যারের মত রগচটা স্যার নেই। কি আর করার এমন কোনো জায়গা লারা এখনো খুজে পাইনি।
কিন্তু এখন বিজ্ঞান প্রজেক্ট বানাতে হবে হাতে আর মাত্র দুদিন সময় আছে। ক্লাসের সবার বিজ্ঞান প্রজেক্ট বানানো হয়ে গেছে। শুধু লারা বাকি অাছে।
শুয়ে শুয়ে ভাবছে কি বানানো যায় একা একা কম সময়ের মধ্যে।
হঠাৎ করে মনে হলো পিন-হোল ক্যামেরা বানালে কেমন হয়!অনেকে তো দাম দিয়ে ক্যামেরা কিনতে পারে না। আর দামি কোনো লেন্স ছাড়াও ক্যামেরা হতে পারে এটা সবাই জানেও না। আর পিন-হোল ক্যামেরা এমনি ক্যামেরা। যে ভাবা সেই কাজ শুরু। লাফ দিয়ে উঠে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসে লারা।
এখানে লেন্সের বদলে থাকে পিন দিয়ে করা খুব ছোট একটা ফুটো।ক্যামেরার লেন্সের কাজ অালোকে ফোকাশ করা।খুব ছোট ফুটো এই কাজ করতে পারে কারন আলো সরল রেখায় চলে। বস্তুর কোনো এক বিন্দু থেকে আসা রেখাগুলোর প্রায় সবগুলো ক্যামেরার দেয়ালে বাধা পায়,শুধু একটি ছাড়া সেটা ক্ষুদ্র ফুটোর মধ্যে দিয়ে যায়।এভাবে বস্তুর একটি বিন্দু থেকে একটি করে রেখাই শুধু আসে বলে বস্তুর বিম্ব তৈরী হতে পারে, যেমন তৈরী হতে পারে লেন্সের দ্বারা।
একটা কার্ডবোর্ডের বাক্সকে কালো কাগজ দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে ঢেকে নিতে হবে যেন এর ভেতর কোনো আলো ঢুকতে না পারে।বড় একটা জুতার বাক্স হলেই চমৎকার হয়।বাক্সের একদিকে লম্বায় ৩ ইন্চি পাশে দুই ইন্চি পরিমাণ জায়গার বোর্ড কেটে নিয়ে তাতে মোম ঘষা কাগজ লাগিয়ে দিতে হবে। এটা হলো ক্যামেরার পর্দা যার ওপর বিম্বটি ফুটবে।পর্দার বিপরীতে বাক্সের যে তল তাতে পর্দা বরাবর ছোট পরিষ্কার একটা ফুটো করতে হবে খুব সরু পিন দিয়ে। ফুটো যত ছোট হবে ততই ভালো।ফুটো বড় হলে ফোকাস করার কাজটা ভালো হবে না।বোর্ডের ফুটো করতে অসুবিধা হলে বোর্ডের ওপর গোল একটা ছিদ্র কেটে তার ওপর একটা চকমকি কাগজ আঠা দিয়ে এঁটে দিতে হবে।তারপর কাগজের ওপর অনায়াসে ফুটোটা করা চলে।
লারার পিন-হোল ক্যামেরা তৈরি।
এখন ছবি দেখতে হলে কালো কাপড়ে ক্যামেরাকে ঢেকে শুধু ফুটোওয়ালা তলাটা বাইরে থাকবে। তারপর কাপড়ের তলায় ঢুকে যার ছবি নিবে তার দিকে তাক করতে হবে।জিনিসটা উলটো বিম্ব পর্দায় দেখতে পাওয়া যাবে।
সূর্যালোকে ছবি তুলতে চাইলে তার দিকে তাক করে ফুটোটা খুলে দিয়ে কয়েক সেকেন্ডে এক্সপোজ করতে হবে।ফুটো থেকে ফিল্মের দূরত্ব বাড়িয়ে যেকোনো দূরত্বে বস্তুর ছবি তোলা যাবে।
লারা খুব ভালো লাগছে। তাহলে সে নিজেই একটা বিজ্ঞান প্রজেক্ট বানাতে পারল।এবার আর ক্লিওন স্যারের কাছে বকা খেতে হবে না।
মনে মনে বলল এবার বিজ্ঞান প্রজেক্টে আমি প্রথম হবো।
দুদিন পেরিয়ে গেলো
লারা তার বিজ্ঞান প্রজেক্ট স্কুলে জমা দিলো। লারা যেটা ভেবেছিলো ঠিক তাই হলো সব প্রজেক্টের মধ্যে লারার বানানো পিন-হোল ক্যামেরা প্রথম হলো।
এবার লারার মনে হলো নিউরোন কপি না করেও অনেক কিছু করা যায়। তাই সে নিউরোন কপি করার চিন্তা ছেড়ে দিয়ে লেখা পড়াই মন দিলো।
#সমাপ্ত

Close