ছবি ঘরট্রাভেল ও ট্যুরিজমসাহিত্য ও সংস্কৃতি

মতিঝিল,হীরাঝিল,জিন্দানখানায় ঘষেটি বেগম

অর্ণব পাল সন্তু

ইতিহাসে কুচক্রী নারীর প্রতীক হিসেবে  ঠাঁই পেয়েছেন ঘষেটি বেগম নামে,যার প্রকৃত নাম মেহেরুন্নেসা বেগম।

আলিবর্দির বড় মেয়ে ঘসেটি বেগম ছিলেন নিঃসন্তান। সিরাজের ছোট ভাই এক্রামুদ্দৌলাকে দত্তক নিয়ে তিনি সন্তান স্নেহে পালন করতেন। অল্প বয়সে বসন্ত রোগে মৃত্যু হয় এক্রামুদ্দৌলার। মতিঝিল মসজিদ চত্বরেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। এক্রামুদ্দৌলার মৃত্যুর শোক সামলাতে না পেরে শোথরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ঘসেটি বেগমের স্বামী নওয়াজেস মহম্মদ খাঁ। মতিঝিল মসজিদ চত্বরে পাশাপাশি দুজনেরই সমাধি রয়েছে।

স্বামীর মৃত্যুর পর নিঃসন্তান ঘষেটি বেগম স্বামীর অগাধ সম্পদের মালিক হন। নবাব তথা প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের লোভে ঘষেটি বেগম চেয়েছিলেন সিরাজ নয়, মেজ বোন মায়মুনা বেগমের পুত্র শওকত জং হোক বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব। কারণ শওকত প্রায় সারা দিনই মদপান করতেন। আর চাটুকারদের কথামতো সিদ্ধান্ত নিতেন। তাই তার ওপর প্রভাব বিস্তার করা সহজ হতো ঘষেটি বেগমের জন্য। তবে আলীবর্দী খানের ইচ্ছায় তার মৃত্যুর পর সিরাজউদ্দৌলা মসনদে আরোহণ করলেও ঘষেটি বেগম তা মেনে নিতে পারেননি। ফলে সিরাজউদ্দৌলাকে মসনদ থেকে যে কোনো মূল্যে বিতাড়িত করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন ঘষেটি বেগম। এদিকে শওকত জং ক্রমান্বয়ে নবাবের অবাধ্য হতে থাকেন। দিলি্লর সম্রাট দ্বিতীয় আরওরঙ্গজেবের প্ররোচনায় শওকত জং একপর্যায়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন।

তৎকালীন দুই কোটি রুপি ! ঘুষের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি সম্রাট দ্বিতীয় আওরঙ্গজেবের কাজ থেকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব হওয়ার ফরমানও আদায় করে নেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলা তার বিশ্বস্ত ও সাহসী সেনানায়ক মহন লালের নেতৃত্বে একদল সৈন্য পাঠান পুর্নিয়া রাজ্যের রাজা শওকত জংকে শায়েস্তা করার জন্য। পলাশীর যুদ্ধের আট মাস আগে ১৬ অক্টোবর ১৭৫৬ সালে মহন লালের সৈন্যদের আক্রমণের মুখে শওকত জং মাতাল অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন এবং মৃত্যুবরণ করেন।

এ ঘটনা ঘষেটি বেগমকে আরও ক্ষেপিয়ে তোলে এবং প্রতিহিংসার আগুন আরও বাড়িয়ে দেয়। এমনি এক প্রেক্ষাপটে লর্ড ক্লাইভ আর মীর জাফরের সঙ্গে পলাশীর যুদ্ধে গোপন চক্রান্তে হাত মেলান ঘষেটি বেগম। প্রয়োজনে তিনি তার বিপুল সম্পদ খরচেরও প্রস্তাব করেন। আর এমনই আশা করছিলেন ক্লাইভ এবং মীর জাফর। কালের বিবর্তনে যুদ্ধ এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মীর জাফর ইংরেজদের হাতের পুতুল হয়ে ক্ষমতায় আরোহণ করেন। এতে ক্ষমতায় প্রভাব বিস্তারের যে স্বপ্ন ঘষেটি বেগম দেখেছিলেন, তা কার্যত অপূর্ণ থেকে যায় ইংরেজ আধিপত্যের কারণে। প্রতিশ্রুত অর্থ না দেওয়াসহ নানা কারণে একপর্যায়ে ঘষেটি বেগম দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন মীর জাফর এবং তার পুত্র মীর মিরনের সঙ্গে।

পরিণতিতে ঘষেটি বেগমকে বন্দী করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকার (বর্তমান পুরান ঢাকায়) জিঞ্জিরা প্রাসাদে। এখানে বন্দী থাকা সত্ত্বেও ঘষেটি বেগম নতুন চাল শুরু করেন মীর জাফর এবং মিরনের বিরুদ্ধে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এবং ভবিষ্যতে বিপদ হতে পারে ভেবে মিরন ঘষেটি বেগমকে বন্দী অবস্থায় নৌকাযোগে মুর্শিদাবাদে ফেরত পাঠানোর আদেশ দেন। নৌকা ঘষেটি বেগমকে নিয়ে জিঞ্জিরা প্রাসাদ ছেড়ে গেলেও মুর্শিদাবাদে পেঁৗছেনি কোনো দিন। পথেই নৌকাডুবিতে ঘষেটি বেগমের সলিল সমাধি ঘটে বলে ধারণা করা হয়। ফলে বলা যায়, বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার মাটিও ঠাঁই দেয়নি কুচক্রী ঘষেটি বেগমকে। সাড়ে তিন হাত মাটিও জোটেনি এই বিশ্বাসঘাতকিনীর কপালে। অঢেল ধন-সম্পদ তার কোনো কাজেই আসেনি।

জিঞ্জিরা প্রাসাদ

ঢাকার অদুরে পুরান ঢাকার কেরানীগঞ্জে জিঞ্জিরা প্রাসাদ একটি ঐতিহাসিক প্রসাদ। থানীয়রা জিনজিরা প্রাসাদ বলতে তেমন কিছু চেনেন না।

এই প্রাসাদের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার নাম। প্রাচীন জিঞ্জিরা প্রাসাদটি ‘নওঘড়া’ বলে কেরানীগঞ্জবাসীর কাছে চেনা। নওঘড়াটি ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। বহু স্মৃতিবিজড়িত এ প্রাসাদটি বেদখলে রয়েছে। বাংলাদেশের কোনো সরকার এর রক্ষণাবেক্ষণে উদ্যোগ নেয়নি।ঘসেটি বেগমের প্রাসাদে ফুচকা-মুড়ির কারখানা! পলাশীর যুদ্ধের পর জিঞ্জিরা গ্রামে সিরাজ-উদ-দৌলার মা আমেনা বেগম, সহধর্মিণী লুৎফা বেগম, (সন্তানসহ) ও খালা ঘসেটি বেগমকে বন্দি রাখা হয়। ওই সময় তাদের শিকল (জিঞ্জির) দিয়ে আটকে রাখার কারণেই ইউনিয়নটি ‘জিঞ্জিরা’ নামে পরিচিতি পায়। এই প্রাসাদটি পরে জিঞ্জিরা প্রাসাদ নামে পরিচিতি পায়। জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকে প্রাসাদটি দখল শুরু হয়। এর মূল ফটক থেকে ৫০ গজ দূরে আরেকটি প্রাসাদ রয়েছে। প্রাসাদ দুটির একটিতে গেলে মনে হবে, হয়তো এটি ফাঁসির মঞ্চ ছিল। আরেকটি হয়তো প্রমোদাগার বা নৃত্যশালা। আজ ওই প্রাসাদে রয়েছে ফুচকা তৈরির কারখানা ও ঝালমুড়ি বিক্রেতাদের আস্তানা।প্রাচীন জিঞ্জিরা প্রাসাদ নিয়ে যে ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে, সে স্থানটির আজ বিলুপ্তি ঘটছে।

মতিঝিল,হীরাঝিল,জিন্দানখানায় ঘষেটি বেগম
জিঞ্জিরা প্রাসাদ

আফগান কররান বংশের কররানিদের কেরানীগঞ্জে কিছুকাল অবস্থানেই কেরানীগঞ্জ নামকরণ ঘটে। তবে কেরানীগঞ্জের চেয়ে জিঞ্জিরা বেশি পরিচিতি লাভ করে ভারতসহ সারা বাংলায়। জিঞ্জিরা প্রাসাদটি নির্মাণ করেন নবাব ইব্রাহীম খান। জিঞ্জিরা প্রাসাদের সঙ্গে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার ইতিহাসের এক বিষাদ স্মৃতি জড়িত। একসময় ঘসেটি বেগম ও আমিনা বেগমের অঙ্গুলি সঞ্চালনে শত শত অনুচর আদেশ পালনের জন্য ব্যস্ত থাকত। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে উভয়ের কষ্টের দিন কাটে এ প্রাসাদে। সিরাজ-উদ-দৌলার মা, স্ত্রী ও শিশুকন্যা একসময় এই জিঞ্জিরা প্রাসাদে বন্দি ছিলেন। উমিচাঁদ, জগৎশেঠ ও রায় দুর্লভদের পরামর্শে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যাওয়ার ছল করে ঘসেটি বেগম, নবাব সিরাজের মা আমিনা বেগম, নওরাজিসের উত্তরাধিকারী একরামউদ্দৌলার শিশুপুত্র মুরাদউদ্দৌলা, নবাব বেগম এবং শিশুকন্যাকে জিঞ্জিরার প্রাসাদ থেকে বজরায় খরস্রোতা ধলেশ্বরীর বুকে ৭০ জন অনুচরসহ ডুবিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। হুসেন কুলি ও সরফরাজের বংশধররা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে দেওয়ানি ভার অর্পিত হওয়ার পরও বন্দিদশায় জিঞ্জিরার প্রাসাদেই অবস্থান করছিলেন। ১৭৬৭ সালে লর্ড ক্লাইভ তাদের মুক্ত করেন।

মতিঝিল,হীরাঝিল,জিন্দানখানায় ঘষেটি বেগম
জিঞ্জিরা প্রাসাদ

মতিঝিল,হীরাঝিল

নবাব সিরাজুদ্দোউলার খালুজান নবাব নওয়াজিস মহম্মদ সে সময় ঢাকার শাসন কর্তা ছিল। তিনি তার ঘষেটি বেগমের বসবাসের জন্য অপূর্ব সুন্দর একটি ত্রিতল প্রাসাদ নির্মাণ করেন। অশ্বক্ষুরাকৃতি ঝিল দিয়ে প্রাসাদটি ঘেরা ছিল। নাম ছিল “সাংহী দালান”। সেই ঝিলে মোতির চাষ করা হতো।

একসময়ের জমজমাট আলোঝলমলে বিলাসবহুল প্রাসাদ হারিয়ে যায় কালের আবর্তে, যতটুকু বেচে থাকে তাও হয়ে পড়ে জৌলুসহীন। দীর্ঘদিন এভাবে থাকার পর অবশেষ ভারত সরকারের সুনজরে পড়ে মোতিঝিল সংলগ্ন এলাকা সংস্কার করে মোতিঝিল পার্ক তৈরি করা হয় ও পর্যটন এলাকা গড়ে তোলা হয়। ২০১৫ তে উন্মুক্ত করা হয় দর্শনার্থীদের জন্য।

মতিঝিল,হীরাঝিল,জিন্দানখানায় ঘষেটি বেগম
মতিঝিল

সাংহী দালানের প্রবেশপথের তোরণ জরাজীর্ণ ছিল। ইতিহাসবিদদের পরামর্শ নিয়ে সেই কালের স্থাপত্যের আঙ্গিকে নতুন তোরণ গড়া হয়েছে। মুঘল গার্ডেন, ল্যান্ডস্কেপ গার্ডেন তৈরির সময়েও ইতিহাসকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রায় সাত হেক্টর জমি নিয়ে তৈরি করা রয়েছে ফলের বাগান। সেখানে ৪৩টি প্রজাতির আমের গাছ ও বিভিন্ন ফলের গাছ রয়েছে। প্রজাপতি আকর্ষণ করবে এমন ফুল ও ফলের গাছ রয়েছে প্রজাপতি আকারের বাটারফ্লাই গার্ডেনে। প্রায় ২৫৫ একর জমির নিয়ে গড়ে ওঠা অশ্বক্ষুরাকৃতি ঝিল রেলিং দিয়ে ঘেরা হয়েছে। ওয়াচ টাওয়ার তৈরি হচ্ছে। লোকগান ও লোকনৃত্য পরিবেশনের জন্য খোলা আকাশের নিতে মুক্তমঞ্চ তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে ন’টি বিলাসবহুল কটেজ। ফুড কোর্টের পাশাপাশি থাকছে ক্যাফেটেরিয়াও।

মতিঝিল,হীরাঝিল,জিন্দানখানায় ঘষেটি বেগম
মতিঝিল মসজিদ

নবাব সিরাজ তার খালার প্রাসাদটি খুব পছন্দ করতো। সেই মোতাবেক সেও “হিরাঝিল” নামে পরবর্তীতে অপরুপ একটি প্রাসাদ গড়েছিল। “সাংহী দালান” সংলগ্নে ১৭৫০ খ্রীঃ একটি মসজিদও নির্মাণ করেছিল নওয়াজিস। মসজিদ টি “কালা” মসজিদ নামে বিখ্যাত। কথিত আছে, এই মসজিদে সিরাজদ্দৌলার দাদু আলিবর্দি খাঁ নিয়মিত নমাজ পড়তে আসতেন। দাদুর হাত ধরে ছোট্ট সিরাজও মতিঝিল মসজিদে আসতেন।

বরেন্দ্র বার্তা

Close