নাগরিক মতামত

বিশ্বায়নের গ্রাসে ১লা ফাগুন

পারভেজ আহমেদ পাপেল

ফেব্রুয়ারী মাসটি বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনে একটি স্মরণীয় মাস। এই মাসেই ১৯৫২ সালেভাষার জন্য জীবন দিতে হয়েছে বাঙ্গালীকে, বিশ্বের ইতিহাসে যা বিরল ঘটনা।

২১ শেফেব্রুয়ারী আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে বিশ্বেরদরবারে। কিন্তু বাঙ্গালীর সেই গৌরবের মাসটি হাত ছাড়া হতে চলেছে কর্পোরেটসাংস্কৃতির আগ্রাসনে।১ লা ফাল্গুন বসন্ত ঋতুর প্রথম দিন। ঋতুরাজ বসন্ত তার স্বরুপে হাজির হয় আমাদেরমাঝে। উদার্ত আহবান করে পলাশের আগুন ঝড়া রক্ত লাল ভালোবাসার মধ্য দিয়ে তাকে বরণকরার। ফাল্গুনের সেই আগুন ঝড়া পলাশ কি আমাদের শুধুই ভালোবাসতে শেখায় না অন্যায়-শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভিত গড়ে দেয়? হঠাৎ করেই বাঙ্গালীর সেইচিরায়িত ভালবাসায় ছন্দপতন ঘটেছে।

ভ্যালিন্টাইনস ডে’র নামে ভালবাসার জন্য একটিদিন ঘোষণা করে ভালবাসার নামে শুরু হয়েছে কর্পোরেট বাণিজ্য। যা পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার একটি কৌশল মাত্র।বাংলাদেশে নব্বই এর দশকে তথাকথিত একটি পত্রিকার সম্পাদক তার পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর জন্য যুব সমাজকে ব্যবহারের চেষ্টা করেন। বাঙ্গালী আবেগ প্রবণ জাতি।শফিক রহমান তার পত্রিকায় বাঙ্গালীর এই আবেগকে সস্তা ভালবাসায় পরিণত করার চেষ্টা করেন। আমরা দেখেছি যুব সমাজকে আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন পুরষ্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে তাদের নিকট সস্তা প্রেমের লেখা আহবান করা হয়। যা কর্পোরেট ব্যবসারএকটি অংশ মাত্র।

এক্ষেত্রে আমাদের যুব সমাজ আবারও তার গৌরবময় ঐতিহ্য ধরে রেখে শফিক রহমানের মুখোশ জাতির সামনে খুলে দিয়েছে। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি পত্রিকাটির সম্পাদক দেশের অর্থ লুট করে বিদেশে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেছেন। একই ভাবেবর্তমানে মিডিয়াগুলো ফেব্রুয়ারী মাস আসলেই আমরা ভ্যালিন্টাইনস ডে নিয়ে যতটা মাতামাতি করতে দেখি ঠিক ততটাই নিরব থাকতে দেখি ১ লা ফাল্গুনকে নিয়ে।

একজন বাঙ্গালী হিসেবে কোন দিনটি আমাদের কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ ১ লা ফাল্গুন অর্থাৎ ১৩ ফেব্রুয়ারী না ২ রা ফাল্গুন অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারী?

শুরুতেই বলেছিলামযে ফাল্গুনের আগুন ঝড়া পলাশ আমাদের প্রতিবাদী ভালোবাসার প্রতীক।নতুন প্রজন্মের যুব সমাজের কাছে ফাল্গুনের প্রতিবাদী ভালোবাসা ম্লান হতে চলেছে ভ্যালিন্টাইনস সংস্কৃতির কাছে। এক সময় কিন্তু বাঙ্গালী নারী-পুরুষেরা হাতে হাতরেখে হলুদ শাড়ী ও পাঞ্জাবীতে ফাল্গুনকে বরণ করেছে আবার হাত ধরাধরি করেই প্রতিবাদ করেছে অন্যায়-শোষণ-লুন্ঠনের বিরুদ্ধে। নগ্ন পায়ে শহীদ মিনারের সামনে দাড়িয়ে শপথ গ্রহন করেছে দেশ মাতৃকার বিরুদ্ধে যে কোন ষড়যন্ত্র রুখে দেবার।এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা প্রকাশের জন্য প্রয়োজন হয়নি কোন মুঠোফোন বা অন্তরজালেরবা এসএমএস এর।

হাঁ সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রযুক্তির উন্নয়ন যেমন ঘটেছেতেমনী নিঃস্বার্থ প্রতিবাদী ভালবাসা রুপ নিয়েছে স্বার্থের বেড়া জালে ঘেরা কর্পোরেট ভালবাসায়। ভালবাসার জন্য একটি নির্দিষ্ট দিনকে সামনে রেখে পুজিবাদীসমাজ ব্যবস্থা তার বাণিজ্যের পরিধীকে বিস্তৃত করেছে। মিডিয়া গুলোতে ভালবাসার প্রথমদিনের স্মৃতির কথা বলে সুড়সুড়ি জাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আর আমাদের যুবসমাজ যারা অতীতে সকল অন্যায় এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিল তাদের ভূল পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

১৯৫২-৯০ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় বাঙ্গালী জাতির নানা অন্দোলনের এর অভিজ্ঞতা রয়েছে।১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী স্বৈারাচার এরশাদ সরকারের পেটোয়া বাহিনীর হাতে ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল জাফর-জয়নাল-কাঞ্চন-দিপালীসাহার রক্তে। তারা কিন্তুএদেশের স্বাধীনতা সর্বোভৌমত্ব রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করেছিল। তারা প্রমাণ করেছিল ফাল্গুন যেমন ভালবাসতে শেখায় তেমনি শেখায় অন্যায় এর বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে।বাঙ্গালীর অতীত ঐতিহ্য প্রেমিকার জন্য প্রেমিক, বান্ধবীর জন্য বন্ধু, ভাইয়ের জন্য বোন, ও বোনের জন্য ভাইয়ের অপেক্ষা এক সাথে ভালবাসার পথগড়া আবার হাতে হাতরেখে প্রতিবাদের ঝড় তোলা।আজকের নব প্রজন্মকে নতুন করে ভেবে দেখতে হবে যে, আমরা বাঙ্গালীর ঐতিহ্য ১ লাফাল্গুনকে বেছে নেব না কর্পোরেট ভালবাসার ভ্যালিন্টাইনস ডের জোয়ারে নিজেদের ভাসিয়ে দেব………………..?

Close