নাগরিক মতামত

আজও রাষ্টীয় স্বীকৃতি মেলেনি রাজশাহীতে নির্মিত দেশের প্রথম শহীদ মিনারের

পারভেজ আহমেদ পাপেল

২১ শে ফেব্রুয়ারী মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এইদিনে ভাষার দাবীতে রক্তে রজ্ঞিত হয়েছিল রাজপথ। একুশ কিন্তু শুধুমাত্র স্বজন হারানোর বেদনায় সিক্ত একটি দিন নয়। তা আমাদের স্বতন্ত্র জাতি গঠনের অনুপ্রেরণায় বিপ্লবী চেতনার বহ্নিশিখাও। অন্যায় ও অপশক্তির কাছে বাঙ্গালী জাতি কখনও মাথা নত করেনি। বাহান্নভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বই এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তাই প্রমাণ করে। বাঙ্গালী জাতির রক্তে রয়েছে প্রতিরোধের আগুন। অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে বুকের রক্ত ঢেলে দিতেও এই জাতি কখনও দ্বিধা বোধ করেনা। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে সারাদেশ ছিল উত্তাল। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এইঘোষণার পরপরই ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহীতেও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা এরপ্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন।

ঢাকার কর্মসূচীর সাথে মিল রেখে রাজশাহীতেও দেয়া হয়েছিল বিভিন্ন কর্মসূচী। রাজশাহী কলেজ ছিল এই আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। আররাজশাহীতে সে সময় ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন বিখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব মমতাজউদ্দিন আহমদ, যুদ্ধপরাধ ট্রাইব্রুনালের চীফ প্রসিকিউটার গোলাম আরিফ টিপু, মোহাসিনপ্রমাণিক, ডাক্তার এস এম গাফ্ফার, সাঈদ উদ্দিন আহমদ প্রমূখ। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকায় ভাষার দাবীতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন তখন তুঙ্গে ।রাজশাহীতেও আন্দোলন চলছে। ২১ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় রাজশাহীতে খবর পৌচ্ছে যে ঢাকায় ছাত্রদের উপর গুলি হয়েছে। অনেক ছাত্র আহত ও নিহত হয়েছেন। এই খবর আসার পরপরই কয়েকশ ছাত্র জনতা রাজশাহী কলেজ মুসলিম হোস্টেলে জমায়েত হন। তারা এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান। এসময় রাজশাহী কলেজের মুসলিম হোস্টেলের একটি কক্ষে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেইসভা থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে শহীদদের স্মরণে হোস্টেল প্রাঙ্গণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরী করা হবে। সিদ্ধান্ত অনুসারে উপস্থিত ছাত্ররা এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ শুরু করেদেন।

রাজশাহী কলেজ মুসলিম হোস্টেলের এফ ব্লকের সামনে এই স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করাহয়। ছাত্ররা আশ পাশ থেকে ইট বালু সংগ্রহ করে এই স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করেন। স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ শেষে একটি কাগজে লেখা হয় ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই’। স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের সময় চারদিক থেকে পুলিশ ঘিরে রেখেছিল। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারী পুলিশ এইস্মৃতিস্তম্ভটি ভেঙ্গে ফেলেন। এই স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণের সময় সেসময় নাট্যকার মমতাজউদ্দিন, মোহাসিন প্রমাণিক, এস এম গাফফার, গোলাম আরিফ টিপু, ড. আব্দুল লতিফ,সাঈদ উদ্দিন আহমদ, হাবিবুর রহমান, আব্দুর রাজ্জাক খান চৌধুরী, এ্যাড. আব্দর রাজ্জাক(স্কুল ছাত্র), মোশারফ হোসেন আখুজ্ঞি (স্কুল ছাত্র) সহ অনেকেই প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িতছিলেন। এই সকল ভাষা সৈনিকদের সাথে কথা বলে জানা যায় ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারী রাজশাহীতে নির্মিত এই স্মৃতিস্তম্ভটি দেশের প্রথম শহীদ মিনার। কারণ ঢাকার কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারটি নির্মাণ হয় ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী। সেই হিসাবে রাজশাহী কলেজ মুসলিম হোস্টেলে নির্মিত হয় দেশের প্রথম শহীদ মিনার। কিন্তু আজও এই শহীদমিনারটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি।

২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে প্রথম এই শহীদ মিনারটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবী জানায়‘চেতনায় একুশ’ নামের সংগঠনটি। তারা ভাষা সৈনিকদের নিয়ে সে সময় রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের সাথে সাক্ষাৎ করে এই জায়গাটি সংরক্ষণের পাশাপাশি এখানে একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণের দাবী জানান। সে বছরই প্রথম ২১ শে ফেব্রুয়ারীতে এখানে পুষ্পস্তবক অর্পন করে ‘চেতনায় একুশ’ সহ রাজশাহীর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। পরবর্তীতে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ও রাজশাহী কলেজ প্রশাসন যৌথভাবে এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে দেন। রাজশাহীর ভাষা সৈনিকসহ রাজশাহী বাসীর দাবী অবিলম্বে বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবী জানান।

Close