নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

বিস্মৃত শিবনারায়ন দাশ

অর্ণব পাল সন্তু

স্বভাব আঁকিয়ে শিবনারায়ন দাশ,সাথে ছাত্রনেতা্ও। জাতীয় পতাকার ইতিহাস নিয়ে জানতে আজ বিরক্ত হন তিনি। শিব নারায়ন দাশ অভিমান নিয়ে নিভৃতে আছেন। হুমায়ন আজাদ সঠিক কথাটি বলেছেন , “বাঙালী জীবিত প্রতিভাকে লাশে পরিণত করে, আর মৃত প্রতিভার কবরে আগরবাতি জ্বালে”।

কে এই শিবনারায়ন দাশ?

১৯৭০ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা হলের ৪০১ নং (উত্তর) কক্ষে তিনি একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্নে পতাকার ডিজাইন করেন। এক রাতের ভেতর। সেই রাতেই নিউমার্কেট এলাকার বলাকা বিল্ডিংয়ের ৩ তলার ছাত্রলীগ অফিসের পাশে নিউ পাক ফ্যাশন টেইলার্সের টেইলার্স মাস্টার খালেক মোহাম্মদী পতাকার নকশা বুঝে কাজ শুরু করেন। একটি লাল সবুজের পতকার জন্ম হয়। তার নাম শিব নারায়ন দাশ, কতজন শুনেছি তার নাম? এটি বিশাল প্রশ্ন।
সেই পতকাটি পটূয়া কামরুল হাসান দ্বারা পরিমার্জন হয়েছে, কিন্তু এতে শিবনারায়ন দাসের নামটি কিভাবে যেন হারিয়ে গেলো। নীচের লেখাটি আরেকটি উত্তাল সময়ের। শিব নারায়ন দাস এসেছিলেন সেই উত্তাল শাহবাগে।

শিবনারায়ণ দাশের জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিক্রমপুরের টঙ্গীবাড়ি থানায়। কুমিল্লা জেলা স্বুলের ছাত্র হলেও ১৯৬২ সালে পরীক্ষা দিতে পরেননি। কলেজিয়েট স্কুল থেকে পরের বছর এসএসসি পাস করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি ও বিএ পাস করেন। ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এম এ ডিগ্রি নেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ৩৫ আসামির মধ্যে ১৭তম আসামি ছিলেন তিনি। তিনি একজন স্বভাব আঁকিয়ে ছাত্রনেতা ছিলেন। একাত্তরের ছাত্র অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন কুমিল্লা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৭০ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা হলের ৪০১ নং (উত্তর) কক্ষে রাত ১১টার পর পুরো পতাকার ডিজাইন সম্পন্ন করেন। এ পতাকাই পরবর্তীতে ১৯৭১-এর ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় উত্তোলিত হয়। শিবনারায়ণ দাশের বাবার নাম সতীশ চন্দ্র দাশ। তিনি কুমিল্লাতে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা করতেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাক হানাদাররা শিবনারায়ণ দাসকে খুঁজে না পেয়ে তাকে ধরে নিয়ে হত্যা করে। আজো পিতার লাশটি খুঁজে পাননি হতভাগ্য শিবু দা। শিবনারায়ণ দাশের স্ত্রীর নাম গীতশ্রী চৌধুরী এবং এক সন্তান অর্ণব আদিত্য দাশ। তিনি প্রথম ভাষাসৈনিক ও অবিভক্ত পাকিস্তানের সংসদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রস্তাবকারী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের হাত ধরে রাজনীতিতে আসেন। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে অংশ নিয়ে কারাবরণ করেন।

১৯৭০ সালের ৭ জুন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত ছাত্রদের এক সামরিক কুচকাওয়াজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অংশগ্রহণের কথা ছিল। এ লক্ষ্যে ছাত্রদের নিয়ে একটি জয়বাংলা বাহিনী গঠন করা হয়। ছাত্রনেতারা এ বাহিনীর একটি পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭০ সালের ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের (তৎকালীন ইকবাল হল) ১১৬নং কক্ষে ছাত্রলীগ নেতা আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ, কাজী আরেফ আহমদ, মার্শাল মনিরুল ইসলাম পতাকার পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠকে বসেন। এ বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা স্বপন কুমার চৌধুরী, জগন্নাথ কলেজের ছাত্রলীগ নেতা নজরুল ইসলাম, কুমিল্লা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা শিবনারায়ণ দাশ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক হাসানুল হক ইনু ও ছাত্রনেতা ইউসুফ সালাউদ্দিন। সভায় কাজী আরেফের প্রাথমিক প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে সবার আলোচনার শেষে সবুজ জমিনের ওপর লাল সূর্যের মাঝে সোনালি হলুদ রঙের বাংলার মানচিত্র খচিত পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। এরপর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলের ১১৬নং কক্ষে রাত ১১টার পর শিবনারায়ণ দাশ পুরো পতাকা ডিজাইন সম্পন্ন করেন। সেই রাতেই নিউমার্কেট এলাকার বলাকা বিল্ডিংয়ের ৩ তলার ছাত্রলীগ অফিসের পাশে নিউ পাক ফ্যাশন টেইলার্সের টেইলার্স মাস্টার খালেক মোহাম্মদী পতাকার নকশা বুঝে কাজ শুরু করেন। তারা ভোরের মধ্যেই কয়েকটি পতাকা তৈরি করে দেন।

২৩ মার্চ ১৯৭১।

এ দিন পাকিস্তান রাষ্ট্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়া হয়। এ দিন পূর্ব বাংলার কোথাও পাকিস্তানের পতাকা ওড়েনি। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্রলীগ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের কবর ও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উত্থান অনিবার্য করে তোলে। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চের লাহোর প্রস্তাবের স্মরণে পাকিস্তানের জাতীয় দিবস ‘পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবস’ প্রত্যাখ্যান করে ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ স্বাধীন কেন্দ্রীয় বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পূর্ব বাংলায় জাতীয়ভাবে ‘প্রতিরোধ দিবস’ পালন করে। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্রলীগের তত্ত্বাবধানে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যে গঠিত ‘জয় বাংলা বাহিনী’ এদিন পল্টন ময়দানে লাখো জনতার উপস্থিতিতে পূর্ণ সামরিক কায়দায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে।

হাসানুল হক ইনু পিস্তল দিয়ে ফায়ার করে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন এবং কামরুল আনাম খান খসরু রাইফেল উঁচিয়ে গান স্যালুট প্রদান করেন। ‘জয় বাংলা বাহিনী’র নারী ও পুরুষ কন্টিনজেন্টের সদস্যরা রাইফেল নিয়ে মার্চপাস্ট করে পতাকার প্রতি সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানান। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতা আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী ও শাজাহান সিরাজ মার্চপাস্টে অভিবাদন গ্রহণ করেন। এ সময় মাইকে জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ বেজে ওঠে। এরপর ‘জয় বাংলা বাহিনী’ রাজপথে সামরিক কায়দায় মার্চপাস্ট করে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর’ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যায়। সেখানে বঙ্গবন্ধুর হাতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তুলে দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু পতাকাটি নিজ বাসভবনে উত্তোলন করেন। এদিন কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্ট, প্রেসিডেন্ট হাউস, মার্কিন কনস্যুলেট ছাড়া ঢাকায় হাইকোর্ট, সচিবালয়, বিচারপতিদের বাসভবন, বিদেশি ক‚টনৈতিক মিশনসহ সরকারি-বেসরকারি সব ভবন ও স্থাপনার শীর্ষে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে তৈরি ও বিতরণ করা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। একইভাবে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে পূর্ব বাংলার সব জেলা, মহকুমা, থানায় সর্বত্র স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে এ দিন ঢাকা টেলিভিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টেলিভিশন সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় যাতে করে টেলিভিশনে পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শন করতে না হয়। রেডিওতে বারবার জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ বাজানো হয়। এ দিন সব বাংলা দৈনিকে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম প্রদত্ত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার নকশা ছাপানো হয় যা দেখে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে পতাকা তৈরি ও উত্তোলন করে।

১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে সারা বাংলায় পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে শিবনারায়ণ দাশের ডিজাইন করা পতাকা উত্তোলিত হয়। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার শিবনারায়ণ দাশের ডিজাইনকৃত পতাকার মাঝে মানচিত্রটি বাদ দিয়ে পতাকার মাপ, রং ও তার ব্যাখ্যা সংবলিত একটি প্রতিবেদন দিতে বলে পটুয়া কামরুল হাসানকে। কামরুল হাসান দ্বারা পরিমার্জিত রূপটিই বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।

জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছেন শিবনারায়ণ দাশ। অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস গত ৪৪ বছরেও জাতীয় পতাকার ডিজাইনার হিসেবে তো নয়ই, এমনকি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। অভিমানী শিবুদা কখনো রাষ্ট্রের কাছে সার্টিফিকেট ভিক্ষে চাননি। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি? প্রশ্ন আছে শুধু নেই উত্তর।

Close