নাগরিক মতামত

নারী ও দিবস

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন :প্রতি বছরই সারা বিশ্ব জুড়ে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা ও উৎসবের আমেজে পালিত হয় আর্ন্তজাতিক নারী দিবস । এবছরও তার ব্যতয় ঘটেনি। এ বছরও আর্ন্তজাতিক নারী দিবস নানা আয়োজনে জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক ভাবে পালিত হলো। দিবসটি পালনের গুরুত্ব এবং উৎপত্তির বিষয়াদি নিয়ে তাত্ত্বিক বিশ্লেষন দিবস পালনের প্রাক্কালে এবং পালিত দিনে সুধীজনরা ব্যাখ্যা করেছেন। তাই ব্যুৎপত্তি দিকটি নিয়ে তেমন ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না ।

আমরা জানি ১৯১১ সালের ৮ মার্চ থেকে এই দিবসটি আর্ন্তজাতিক ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। কেন নারী দিবস পালন করতে হবে সেই দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় , নারীরা যে অধিকারটি আদায়ের লক্ষে আন্দোলন করে দিবসটির সুচনা করেছিল তা স্মরন করে রাখার জন্যই আজকের দিনে নারী দিবস উদযাপন। তবে যে অবস্থার পরির্বতনে নারীর সংগ্রাম করেছিল সেই অবস্থার তেমন একটা পরির্বতন হয় নাই। আমরা জানি ,১৮৫৭ সালে মজুরী বৈষম্য . কর্মঘন্টা ও কাজের মানবিক পরিবেশ সৃষ্টির দাবীতে আমেরিকার নিউইর্য়কের সুতাকলেরর নারী শ্রমিকরা রাাস্তায় বিক্ষোভ করতে নেমেছিল। নারীদের ঐ দিনের মিছিলে শাসক দলের লেঠেল বাহিনী হামলা চালায় । ওই দিন শোষকের লেঠেল বাহিনীর হামলায় বহু নারী শ্রমিক আহত হয়েছিল। তখন থেকে নারীরা নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়ে উঠে। সে দিনের নিয়ইর্য়ক শহরের আন্দালনের খবর সারা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে তার সুত্র ধরে একে একে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংগঠিত হয় নানা ধরনের নারী আন্দোলন যা ছিল তাদের অধিকার আদয়ের সংগ্রাম। ১৮৫৭ সাল থেকে গড়ে উঠা নারীদের বিভিন্ন দেশে সংগঠিত হওয়া ছোট বড় সব আন্দোলন এক মোহনায় মিশে যায়। তখনই সিদ্ধান্ত সেয়া হয় ৮ মার্চকে আর্ন্তজাতিক নারী দিবস হিসাবে পালন করার।

নারীদের আন্দোলনের প্রায় দেড়শ বছরের অধিক সময় পরে এসে যদি প্রশ্ন করা হয় , নারীরা কি এখন সুতাকল গুলোতে মানবিক পরিবেশে কাজ করতে পারছে? সুতাকল ও পোশাক কারখানায় নারী শ্রমিকদের বৈষম্য কি কমেছে ? সুক্ষভাবে বিষয় গুলো বিচেনায় নিলে দেখা যায়, নারীর অবস্থার অবস্থান এখনো সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। পৃথিবীতে সব কিছুর পরির্বতন হয়েছে তবে নারীর সমাধিকারের বিষয় গুলোর তেমন কোন বৈপ্লবিক পরির্বতন ঘটেনি। সারা বিশ্বের নারীরা সমষ্টিক অর্থনীতির ইতিবাচক উন্নয়নে বিরাট অবদান রাখছে, তারপরও পৃথিবীর বিভিন্না দেশে রয়েছে নারীদের প্রতি নানা ধরনের বৈষম্য। বাংলাদেশের রপ্তানীর ক্ষেত্রে যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় , তার সিংহ ভাগ আসে পোশাক শিল্প থেকে । পোশাক শিল্পের উৎপাদনের সব উপকরন বিদেশ থেকে আমদানী করা হয় আর এই শিল্পের অন্যতম দেশীয় উপাদন হলো এই দেশের শ্রম সম্পদ । পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের শ্রম সম্পদের ৯০ শতাংশের যোগানদার হলো এদেশের নারী শ্রমিকেরা। বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের গোড়াপত্তন এবং দ্রুত বিকাশের বিষয়টি আমলে নিলে দেখা যায়, এদেশের নারীর শ্রম সস্তা এবং সহজ লভ্য। তাই এই বিরাট সুযোগটা কাজে লাগানোর উদ্যেশ্যে বিদেশীরা পোশাক শিল্প গড়ে তোলার বিষয়ে দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের সহায়তা করেন। বাংলাদেশে নারীর শ্রম সস্তা হওয়ার জন্য এদেশে পোশাক শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিদেশ থেকে যে রেমিটেন্স আয় করে তার বিরাট একটা অংশ পোশাক শিল্প এর উপর নির্ভরশীল। বিশ্ব অর্থনীতির সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনা করলে দেখা যাবে বর্তমানে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার পার্শ্ববর্তী ভারত পাকিস্তানের চেয়ে বেশী। নারী শ্রমিকদের শ্রম এবং ঘামের বিনিময়ে বিকশিত হয়েছে পোশাক শিল্প আর বেড়েছে প্রবৃদ্ধি কিন্তু এই বিকশিত অর্থনীতির ধারায় পোশাক শিল্পের সাথে জড়িত নারীদের আয়ের কি পরির্বতন ঘটেছে ? দফায় দফায় সরকারী কর্মীদের বেতন বেড়েছে , কখনো দ্বিগুন, কখনো দেড় গুনো , কখনো যোগ হয়েছে মহার্ঘ ভাতা । কিন্তু সেই অনুপাতে পোশাক শিল্পে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের বেতন ভাতার পরির্বতন হয়নি। বর্তমানে সরকারী বিভাগের নিয়োজিত সর্ব নিন্ম স্তরের একজন কর্মীর যে বেতন পান, তার অর্ধেকেরও কম মজুরী পায় পোশাক শিল্পে নিয়োজিত একজন প্রাথমিক পর্যায়ের নারী শ্রমিক। পোশাক শিল্পের সর্ব নিন্মস্তর আর সরকারী বিভাগের সর্বনিন্ম স্তরের বেতন বৈষম্য মারাত্বক। এই বিশাল ব্যাবধানের বেতন মজুরী এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা না পেয়েও , কর্মস্থলের প্রতিকুল পরিবেশ নিয়ে আজও বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা কাজ করে যাচ্ছে। তাছাড়া পোশাক শিল্পে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের কর্মঘন্টা নিয়েও রয়েেেছ নানা প্রশ্ন, নিয়মানুযায়ী একজন শ্রমিকের দৈনিক কর্ম ঘন্টা হওয়ার কথা আট ঘন্টা। এই বিষয়টি পোশাক শিল্পের বেলায় অনেক ক্ষেত্রেই মানা হয় না। ১৮৫৭ সালে নিউইউর্য়কে নারী শ্রমিকদের দাবী গুলি আজও বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে , তা পুরণ হয়নি এখনো।
প্রায় সোয়া এক শতাব্দীর অধিক সময় হতে চলল নারী দিবস পালন করার । প্রতিটি বছর নারী দিবসের একটি করে প্রতিপাদ্য বিষয় ঘোষনা করা হয় , যার অর্ন্তনিহিত ভাবধারা হলো , সমাজে নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা। সমাধিকার বলতে মুলত নারীকে পুরুষের সমান ভাবা।

পৃথিবীতে এমন একটা সময় ছিল পুরষেরা নারীকে পণ্যের মত ব্যবহার করতো আর নারীদেরকে এ ধরনের পণ্য বানানোর হাত থেকে রক্ষা করতে নারীরাই অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছে । গত এক শতাব্দি ধরে নারীরা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেচে থাকার জন্য নানা ধরনের আন্দোলন সংগ্রাম করলেও নারী এখনো পণ্য হিসাবেই ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। পণ্যের গুণগত মান কতটা ভালো তা পণ্য ভেদে নানা সুচকের মাধ্যমে যাচাই করে পণ্যকে ভালো হিসাবে ঘোষনা দেয়া হয়। বর্তমানে অনেক পদে নারীকে পদায়ন করতে পণ্যের গুনগত মান যাচাইয়ের মত কিছু সুচক নির্ধারন করে নারীর গুণ মেপে সেই পদে নিয়োগ দেয়া হয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার অনুষ্ঠান উপস্থাপক এবং সংবাদ পাঠকদের দিকে লক্ষ করলে বিষয়টি বুঝা যায়। দেখা যায় একজন নারী উচ্চারন বাচন ভঙ্গি খুব ভালো কিন্তু দৈহিক সুন্দর্য ভালো না তাহলে আর ঐ নারীকে এ পদে নিয়োগ দেয়া হয় না। এখনো নারীর দৈহিক সৌর্ন্দয্যকে বিভিন্ন মাধ্যমে নানা ভাবে উপস্থাপন করে নিজেদের প্রসার বাড়ায়। তাছাড়া বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে নারীকে নানা ভাবে প্রদর্শন করা হয়। বিশ্ব জুড়ে নারীকে পণ্যের মত ব্যবহারের আরেকটি উদাহরন হলো বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় রাজতন্ত্রের আমলের কথা মনে করিয়ে দেয়। রাজতন্ত্রের আমলে নারী তার দৈহিক সুন্দর্য্যর বদৌলতে রাজাকে নিয়ন্ত্রন করতো , ঐ সুন্দরী নারী দাসী হলেও দৈহিক অবয়বে রানী হয়ে যেত। আজও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নারীর দৈহিক সুর্ন্দয্যটাকে মুখ্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়। নারীর গুন ও মেধার যাচ্ইায়ের ক্ষেত্রে এখনোও নারীর দৈহিক অবয়বটাকে প্রধান্য দেয়ার অর্থ হলো নারীকে পণ্যর সাথে তুলনা করার শামিল।

আর্ন্তজাতিক নারী দিবস আসলেই চলে নানা ধরনের বক্তৃতা মিছিল এবং সেমিনার কিন্তু এই কার্যক্রম গুলোর বদৌলতে পুরুষের মনস্তাত্বিক পরির্বতন কতটুকু ঘটেছে ? তেমন পরির্বতন আসলে দেখা যায় না । পরির্বতন না হওয়ার পেছনে যে বিষয়টি কাজ করে তাহলো সম্পদ। পৃথিবীর মোট সম্পদের কত ভাগের মালিকানা রয়েছে নারীদের। সারা বিশ্বের অর্ধেক মানুষ হলো নারী কিন্তু সারা পৃথিবীর অর্ধেক সম্পদ নারীর মালিকানায় নেই। সমাজ নিয়ন্ত্রন করে সম্পদের মালিকরা, সুতরাং যেখানে নারীর সম্পদের মালিকানা নাই তাই সমাজের নিয়ম নীতি নারী পক্ষে তৈরী করতে নারীরা পারে না এখনো। অপরদিকে পুরুষ তার মালিকানা অক্ষুন্ন রাখতে নারীকে নানা ভাবে অবদমন করে রাখে। বর্তমানে দেখা যায় কিছু কিছু নারী সম্পদসহ নিয়ম কানুন ও শাসন নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতার অধিকারী। বর্তমানে এই ক্ষমতাধর নারীরা , তাদের প্রাপ্ত এই মালিকানা এবং সম্পদ পুুরুষতান্ত্রিকতার সুত্র ধরেই। তাই ক্ষমতার অধিকারী হয়েও নারীরা সমাজে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার নিয়ম গুলোর অন্তরায় সমুহের কোন পরিবর্তন করতে পারছে না। ১৯৪৮সালে মানববাধিকার সনদ তৈরী করে জাতিসংঘ । বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্র মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষর করেছে। মানবাধিকার সনদানুযায়ী প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার থাকার কথা কিন্তু বাস্তবে তা কতটা রয়েছে তা দেখার বিষয়। উত্তরাধিকার সুত্রে সম্পদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের অধিকার সমান নাই। তাই দেখা যায় সমাজে নারীরা পর নির্ভরশীল। নারীর এই পরনির্ভশীলতার কারনে নারীর নানা ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়। একজন মা নারীর সম্পদ তার কন্যা পুত্রের অর্ধেক পায়। নারীর উত্তরাধিকার সুত্রে সম্পদ পাওযার নিয়মটা নির্ভর করে তার ধর্ম পালনের উপর। সুতরাং মানবাধিকার সনদে কি আছে তা তখন দেখা হয় না। অথচ এই রাষ্ট্রই মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষর করে অঙ্গিকার করেছে যে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রত্যেক মানুষের সমান অধিকার দেয় হবে। নারীর উত্তরাধিকার সুত্রে সম্পদ প্রাপ্তির বিষটিতে সারা বিশ্বের দেশে দেশে মানবাধিকার সনদের সাথে বৈপিরত্য যে প্রকট তা লক্ষ্য করা যায়।
সময়ের সাথে অনেক নিয়ম কানুনের পরির্বতন হয়েছে । অবকাঠামোগত উন্নতিও হয়েছে ব্যাপক তবে সমাজে বিদ্যমান নারীর প্রতি যে নিয়মকানুন ছিল তার তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি।
নারীকে সকল ক্ষেত্রে সমান অধিকার দিতে হলে সমাজের কিছু নিয়মকানুনের পরির্বতন ঘটাতে হবে। নারী দিবস পালন করলেই চলবে না তার সাথে সাথে সম্পদের অধিকার পাওয়ার বিষয়টি নারীও যেন পুরুষের সমান পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন : লেখক,কলামিস্ট

Close