নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

বঙ্গবন্ধু , স্বাধীনতা এবং আমরা

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন :স্বাধীনতার মাসেই জন্ম নিয়ে ছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি তাঁর জন্ম মাসেই হাজার বছরের পরাধীন বাংলার স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন। তার সেদিনের ঘোষনায় সারা বাংলার মানুষ সশস্ত্র হয়ে উঠেছিল। সেদিনের বঙ্গবন্ধুর দৃপ্ত ঘোষনায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ দেশের স্বাধীনতার জন্য উদ্ধুদ্ধ হয়ে পড়ে ( তবে কিছু সংখ্যক রাজাকার বাদে) । তাই আজও যখন লাউন্ড স্পিকারে বেজে উঠে “ যদি রাত পোহালে শুনা যেতো বঙ্গবন্ধু মরে নাই , যদি রাজ পথে আবার মিছিল হতো বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই, মুক্তি চাই , তবে বিশ্ব পেতো এক মহান নেতা , আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা” এই গানের কলি গুলো শুনে আজও বাঙালীর চিত্ত চঞ্চল হয়ে উঠে ।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে যে অবস্থা বিদ্যমান , এই অবস্থার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে কি চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু? জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মেখ মুজিবুর রহমান বেচে ছিলেন পঞ্চান্ন বছর , তিনি তার পুরো জীবনটাতেই বাঙালী জাতির মুক্তির লক্ষে কাজ করে গেছেন। বাঙালীরা তাকে বাঙালী জাতির পিতা হিসাবে অভিহিত করেছে। কারন বাঙালীর অধিকার আদায়ের বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর ন্যায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের আগে কোন বাঙালী নেতাই জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করে নাই। বাঙালীর মুক্তির জন্য তিনি হাসি মুখে প্রান দিতে পারতেন এবং শেষ পর্যন্ত তাই করে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর আগে এদেশে বহু নেতা জন্ম নিয়েছে এদেশে তারাও বঙ্গবন্ধুর মত নানা উপাধীতে ভুষিত হয়েছেন কেউ শের কেউ মজুলুমসহ বিভিন্ন বিশেষ্যণে, তবে তাদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তারা এ দেশের মেহনতি মানুষের নিরেট মুক্তির লক্ষে কোন কার্যক্রম বা সংগ্রাম করে নাই। এদেশের কিছু সুশীল আছেন তারা নানা ভাবে অনেক নেতাকেই বঙ্গবন্ধুর সামান্তরাল করতে চান এমনকি তাদের আলোচনায় দেখা যায় দেশের প্রথম সামরিক শাসককেও কেউ বঙ্গবন্ধুর সাথে তুলনা করেন যা অনেকটা ধৃষ্টতার শামিল। আজকে কেন দেশের এই শ্রেনীর সুশীলরা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এ রকম বিরুপ সমালোচনা করতে পারছে কারা এই সমালোচনার পথকে তৈরী করে দিয়েছে সেই প্রশ্নের উত্তর খুজতে শুধু মাত্র স্বাধীনতা বিরোধীদের দায়ী করাটা যুক্তিযুক্ত হবে না, এরজন্য দায়ী বঙ্গবন্ধুর আর্দশের রাজনীতিতে গা ঢাকা দিয়ে থাকা মুশতাকীয় আর্দশিকরা প্রেতআতœারা। তাই প্রশ্ন জাগে ৭১ এর চেতনাধারীরা কতটা মুজিব আর্দশ চর্চা করছে।
বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দুরদর্শিতা দিয়ে এদেশের অতীত আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট বিচার করেছিলেন। রাজতন্ত্র , বৃটিশ এবং পাকিস্তান আমলে এদেশের সাধারন মানুষ নানা ভাবে সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারী কতৃক নিঃগৃহিত হতো । এই নিষ্পেষনের দিকটা তিনি উপলব্ধি করতে পারতেন। এর জন্য স্বাধীন বাংলাদেশে যেন কোন বাঙালী সরকারী কর্মকতাা কর্মচারী দ্বারা এদেশের সাধারন মানুষ নিষ্পেষিত বা নিঃগৃহিত না হয় তার জন্য তিনি দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

তিনি ষ্পষ্ট ভাবে বুঝাতে চেয়েছেন এ দেশের মালিক এদেশের জনগন ,তাই যারা সরকারী চাকুরী করেন তারা যেন এদেশের সাধারন মেহনতি মানুষকে মালিকের মত সম্মান করেন এই কথাটা তিনি তার একটি বক্তৃতায় দ্ব্যার্থহীন ভাবে বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার বকতৃতায় বলেছিলেন, তোমারে ডাক্তার বনাইছে কেডা, ইঞ্জিনিয়ার বানাইছে কেডা, শিক্ষিত করেছে কে এই প্রশ্ন করলে উত্তর দিবা বাবা মা । বঙ্গবন্ধু এই বিষয়টিও ষ্পষ্ট করে বলে গেছেন আসলে বাবা মার অর্থে এদেশে কেহ শিক্ষিত হয় নাই। এদেশের সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলে জনগনের ট্যাক্স এর টাকায় । তাই তিনি শিক্ষিতদের উদ্যেশে তিনি বলেছিলেন জনগনের অর্থে আজ তারা শিক্ষিত। বাংলাদেশে যারা শিক্ষিত হয়েছে তাদের শিক্ষত করার পেছনে জনগনের অর্থ ব্যায় হয়েছে তাই তাদের জনগনের জন্য কাজ করাটা নৈতিক দায়িত্ব। হাজার হাজার বছর ধরে এদেশকে যারা শাসন করতেন তারা নিজেদের শাসক ভাবতেন আর জনগনকে প্রজা । বঙ্গবন্ধু এটা বোঝাতে চেয়েছেন যে, শাসক যে জনগনের কর্মচারী তা ষ্পষ্ট ভাবে বঙ্গবন্ধুর দেয়া বক্তৃতায় ফুটে উঠেছে।

তিনি তার বক্তৃতায় বলে গেছেন , সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীরা যে বেতন পান তার অর্থ যোগানদার হলো এদেশের জনগন। তিনি নিজে যে গাড়ী চড়েন তাও জনগনের টাকায় এটা ষ্পষ্ট ভাবে বলতে তিনি দ্বিধা করেননি। এদেশের সমস্ত রাজকোষের মালিক জনগন। তিনি ষ্পষ্ট ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন জনগনের ট্যাক্সের টাকায় রাজকোষপুর্ণ হয় আর সেখান থেকেই কর্মটারীদের বেতন দেয়া হয়। সুতরাং কোন অফিস আদালতে মেহনতি মানুষ গেলে তাকে অবজ্ঞা করা চলবে না তার সাথে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে। ১৯৭২-১৯৭৫ এই সময় কালে সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যে জবাবদিহিতাটার জায়গাটা ছিলতা ১৯৭৫ সালের পর ইউর্টান হয়ে যায়। সামরিক আমলার হাতে চলে যায় শাসন যন্ত্রের ষ্টিয়ারিং। সমস্ত সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারী হয়ে উঠেন বিশাল ক্ষমতার অধিকারী। জনগন মালিক দেশের মালিক অথচ জনগনকেই সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্যার বলে সম্বোধন করতে হয় আজকের বাংলাদেশে। তার কারন কি ? বঙ্গবন্ধুর আর্দশ আজও এদেশে বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৭২-১৭৯৫ যে মুশতাকীয় বিশ্বাসঘাতকেরা শাসন যন্ত্রের চারপাশে ঘোর ঘোর করতো তাদের প্রেতাত্মারা বর্তমানেও সক্রিয়। ১৯৭৫ সালে মুশতাকীয় ও আর্ন্তজাতিক ভাবে যারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল এমন আর্ন্তজাতিক গোষ্ঠির সহায়তায় সামরিক আমলাদের নির্দেশনায় এদেশের কিছু বিপথগামী সেনা সদস্যর হাতে জাতির জনক নিহত হন। সেই মোশতাকীয় আর্দশিকরা কি আজ নেই।
যারা এক সময় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটুক্তি করতো , বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিরোধিতা করতো এবং মহান মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের লড়াই হিসাবে আখ্যা দিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে , আজ আওযামী লীগের ক্ষমতার আমলে তাদেরকেই দেখা যায় বঙ্গবন্ধুর আর্দশিক প্লাটফরম গড়ে তুলতে। এ ধরনের অনৈতিক ব্যাক্তি কতৃক যখন মুজিব আর্দশ অনুশীলন হয় তা লোক দেখানো বললে অযৌক্তিক হবে না। এ ধরনের কিছু প্রদর্শনবাদীর অনুপ্রবেশ ঘটেছে ৭১ এর চেতনায় যার ফল সুদুর ভবিষ্যতে ভালো হবে না। এরা জামাতি মুশতাকীয় কায়দায় এদের অনুপ্রবেশ বঙ্গবন্ধুর আর্দশের প্লাটফরমে। আজকে এরা মুক্তিযুদ্ধের আর্দশে আসার পেছনে মুল উদ্যেশ্য হলো নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা, এরা সিপিবিকে গালি দেয় কিন্তু এই নাদানরা জানে না ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট হত্যা কান্ডের পর সিপিবির বর্তমান সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম প্রতিবাদ করেছিলন। সারা দেশে ছাত্র ইউনিয়ন ও সিপিবি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছিল। মুশতাকীয় প্রেতাত্মারা যে ভাবে বঙ্গবন্ধুর আর্দশের চারপাশে ঘোর ঘোর করছে এর জন্য ভয় হয়। বর্তমানের আওয়ামী লীগের নেতাদের উচিত এই মোশতাকীয় প্রেতাত্মাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। অনেকেই দেখি মুক্তিযুদ্ধের আর্দশের কথা বলেন, আবার দেখা যায় তারাই এই মুশতাকীয় প্রেতাত্মাদের সমর্থন যোগান। এদের সমর্থন দেয়ার অর্থ অনেকটা গাছে চড়ে গাছ কাটার মতো। ১৯৭৫ সালের পট পরির্বতন কোন শক্তিই করতে পারতো না যদি বঙ্গবন্ধুর সরকারে মুশতাক না থাকতো। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় যারা বঙ্গবন্ধুর আর্দশের বিরুদ্ধাচারন করতো তারা কি করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক হয়। আর এদেরকে যখন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্লাটফরমে দেখা যায় তখনই বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত আর্দশের কান্ডারী নানা শংকায় ভুগেন। এদের কারনে প্রকৃত মুজিব আর্দশিকরা নিশ্চুপ হয়ে থাকে।
বঙ্গবন্ধুর আর্দশিক সংগঠন সমুহের কারা সদস্য হতে পারবে তার একটি নিয়ম করা প্রয়োজন যেমন প্রয়োজন রাজাকারের তালিকার। ১৯৭১-১৯৯০ সাল পর্যন্ত যারা মুজিব আর্দশকে বিদ্রুপ করতো তাদেরকে কোন ভাবেই বঙ্গবন্ধুর আর্দশিক কোন প্লাটফরমের সদস্য করা উচিত না, কারন এরা রাজাকারদের চাইতেও নিকৃষ্ঠ। এই গোষ্ঠিটারই পরোক্ষ ইন্ধনেই এদেশে রাজাকার জামায়তের উত্থান ঘটেছে।
এদেশে যারা ৭১ এর চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর আর্দশ লালন করেন তাদের উচিত ১৯৭১-১৯৯০ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আর্দশের বিরুদ্ধাচারনকারীদের বঙ্গবন্ধুর আর্দশের প্লাটফরম থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করা।
আজকে যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসাবে নিজেকে দাবী করেন তারা এই বিষয়টি একটু ভেবে দেখবেন। ১৯৭৫ সালে যে ভুলের কারনে ভয়াবহ বিপর্য ঘটেছিল তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় সেদিকে সবারই লক্ষ রাখা দরকার।
বঙ্গবন্ধুর আর্দশ পুণাঙ্গ বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত সোনার বাংলা গড়া সম্ভব না।

লেখক: কলামিস্ট

Close