স্বাস্থ্য বার্তা

অবসাদগ্রস্ত মানুষকে যেসব কথা কখনই বলবেন না

মানসিক অবসাদ নিয়ে আমাদের সমাজে এখনো তেমন সচেতনতা তৈরি হয়নি। কেউ মানসিক ডাক্তারের কাছে যায় জানলেই তাকে এক কথায় পাগল বলে দেয়ার প্রবণতার কারণে অবসাদগ্রস্ততা, বিপর্যস্ততা এবং মানসিক রোগ নিয়ে আজো মানুষ মন খুলে কথা বলতে চায় না।
তবে আশার কথা, সময়ের সাথে সাথে মানসিক অবসাদগ্রস্ততা, বিপর্যস্ততা এবং মানসিক রোগকে গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। লুকিয়ে না রেখে বরং সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলা এবং সাহায্য বা চিকিৎসা নেয়া যে অতি গুরুত্বপূর্ণ তা-ও মানুষ বুঝতে শুরু করেছে।
কাছের মানুস সমস্যার গুরুত্ব না বুঝে যা তা মন্তব্য করে বসলে তাতে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের মাঝে আরও গুটিয়ে যায়, যা তার মানসিক অবস্থাকে আরো সঙ্গীন করে তোলে। তাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষের সাথে কথা বলার সময় একটু সচেতন হতে হবে।
জেনে নিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজন ব্যক্তিকে যে কথাগুলো কখনই বলা উচিত নয়:
১. তুমি এতো সফল, এতো ধনী, তারপরও তোমার আবার মন খারাপ কেন?
সফল, ধনী ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবন বাইরে থেকে একদম নিখুঁত মনে হলেও তাদেরও কিছু না কিছু মানসিক বিপর্যস্ততা থাকতে পারে। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোনো মানসিক রোগীর বিপর্যস্ত অবস্থাকে ছোট করে তার বাকি জীবনটুকু কত দারুণ তা উল্লেখ না করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানসিক যন্ত্রণা অর্থ, বিত্ত, ক্ষমতার কারণে কাউকে ছাড় দেয় না।
২. তুমি আসলে শুধু অন্যের চোখে পড়তে চাইছো।
মনে রাখতে হবে, অন্যের চোখে পড়ার জন্য কেউ মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে চায় না। সাইকোপ্যাথ বা নার্সিসিস্ট জাতীয় কিছু মানসিক রোগে আক্রান্তরা রোগগুলোর বৈশিষ্ট্যের কারণেই নিজের অসুস্থতাকে অন্যের চোখে পড়ার জন্য ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডিপ্রেশন বা অন্যান্য মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি প্রাণপণ চেষ্টা নিজেকে লুকিয়ে-গুটিয়ে রাখতে। এর মাঝে যখন সে সাহস করে কারো সাথে তার সমস্যা শেয়ার করে, এবং উত্তরেএই মন্তব্য শোনে, তখন তা তার জন্য হয়ে ওঠে মারাত্বক ক্ষতিকর।
৩. কিন্তু তোমাকে মোটেই অসুস্থ মনে হচ্ছে না…
মানসিক রোগের লক্ষণ সবসময় বাহ্যিকভাবে নাও দেখা দিতে পারে। স্বাভাবিক জীবনযাপন করা একজন হয়তো গভীরভাবে মানসিক অবসাদগ্রস্ত। কিন্তু সে নিজেকে ভালো দেখানোর মাধ্যমেই কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পায়। আপনার অবিবেচনাপ্রসূত মন্তব্য তাকে স্বস্তির একমাত্র উপায় সম্পর্কেও দ্বিধাগ্রস্ত করে তুলবে।
৪. আমি কি যথেষ্ট নই?
কখনই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কাউকে প্রশ্ন করবেন না, আমি কি তোমার জন্য যথেষ্ট নই? আপনার যর্থাথতা বিচার করার মতো মানসিক অবস্থায় তিনি না-ও থাকতে পারেন, কিন্তু আপনার প্রশ্ন তাকে নিজের কাছেই অপরাধী করে তুলতে পারে, যা তাকে আরও অবসাদগ্রস্ত করে তুলবে।
৫. হাসিখুশি থাকো।
যারা টিকে থাকায় বিশ্বাস করে তাদের জন্য হাসিখুশি থাকার অভ্যাসটা স্বাভাবিকভাবেই আসে। তবে সবার জন্য এটা সহজ না-ও হতে পারে। বিশেষ করে যখন কেউ বিষণ্ণতায় ভোগে, পৃথিবীকে সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে হাসিখুশি থাকাটা তার পক্ষে বেশ কঠিন। আর তা নিয়ে তাকে যত বেশী জোর করবেন ততই হিতে বিপরীত হবে।
৬. তোমার জন্য আমার দুঃখ হয়…
একজন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তি সাহায্য আশা করছেন মানে তিনি নিজের অবস্থার উন্নতির জন্য লড়াই করছেন। তার প্রতি করুণা প্রকাশ করা মানে তার লড়াইকে অসম্মান জানানো। একইসঙ্গে তার লড়াইয়ের ইচ্ছাটাকেও দমিয়ে দিতে পারে আপনার অবিবেচনাপ্রসূত এসব মন্তব্য।
৭. এমন অবস্থায় পড়লে কীভাবে?
মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তিকে তার নাজুক অবস্থার কারণের কথা মনে করিয়ে দেয়া, তাকে শাস্তি দেয়ার মতোই। তাই তিনি নিজে থেকে না বললে তার অতীতের কথা জোর করে জানতে চাইবেন না।
৮. সামলে ওঠো, ইতিবাচক হও।
সামলে ওঠা এবং ইতিবাচক হওয়ার উপদেশ দেয়া যত সহজ, বাস্তবে তা হয়ে ওঠা ততটা সহজ নয়, কারণ জীবনের অনেক কিছুই ইতিবাচক নয়। আর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষ সবসময় আবেগতাড়িত থাকে বলে সবসময় ইতিবাচক চিন্তা করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।
৯. বের হয়ে আসো…
অনেক সময় সবচেয়ে কাছের মানুষটির কষ্টের কারণগুলো বুঝতে না পারলে আমরা নিজেরাই অধৈর্য হয়ে উঠি। তাদের জোর করে বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার পরামর্শ দেই। এটা কখনই করবেন না। কেউ ইচ্ছা করে মানসিক সমস্যায় ভোগে না যে আপনি জোর করলেই অবস্থার উন্নতি হবে। তাকে সাহায্য করুন, উৎসাহ দিন, প্রয়োজনবোধে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলুন।
১০. আমিও একই অবস্থার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি…
কখনও কখনও আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্যদের অবস্থার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে চাই। তবে এটা সবসময় জরুরি নয়, সবসময় এটা উপকারেও আসে না। কারণ ভুক্তভোগীর মনে হতে পারে আপনি তুলনা করার চেষ্টা করছেন।বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close