ছবি ঘরট্রাভেল ও ট্যুরিজম

৩২১ বছরের পুরনো সৎসঙ্গ সেবাশ্রম

নাটোর শহর থেকে ৫১ কিলোমিটার দূরে দুর্গম ও নির্জন এলাকা। লালপুর উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে ৮ নং দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গ্রাম। এখানেই ৩২ বিঘা জমির ওপর নির্মিত প্রায় ৩২১ বছরের পুরনো ফকির চাঁদ বৈষ্ণবের মন্দির ও সমাধি। গ্রামবাসীদের কেউ বলেন সাধুর আশ্রম, কেউবা বলেন গোঁসাই বাড়ি। কারও মতে এটি সাধুর বাড়ি। এখনও আশ্রমটি চালু আছে। কথিত আছে, একসময় এখানে দেশের যোগী সম্প্রদায়ের একটি কেন্দ্র ছিল।
আশ্রমের প্রবেশপথে রয়েছে ময়ূর, বাঘ ও বিভিন্ন প্রাণীর মূর্তি আর লতা-পাতার কারুকার্যখচিত সুবিশাল ফটক। সেটি পেরোলে বাঁ-দিকে পড়বে ছোট-বড় সমাধিস্থল। এখানে আছে প্রধান ছয় সাধুর সমাধি। মূল ভবনের পূর্ব ও দক্ষিণ দিক জুড়ে আশ্রম চত্বরে আছে ১৪০ জন ভক্ত সাধুর সমাধি। ডানদিকে সাধু বৈষ্ণবদের বিশ্রামাগার বহন করছে প্রাচীন ইতিহাস। এখানকার মূল ভবন প্রায় ৪১ ফুট উঁচু। বাঁ পাশে একটি দরজা ছাড়া কোনও জানালা নেই। মূল মন্দিরে শুধু প্রধান সেবাইত প্রবেশ করেন। তিনি হলেন শ্রী সদানন্দ সাধু। ভক্তদের দীক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি আশ্রমের সব দেখাশোনার দায়িত্ব তার।
শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাইয়ের সৎসঙ্গ সেবাশ্রম দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। সেখানে বেড়ানোর ফাঁকে দেখা যায় মানবতার ভাবদর্শন। নাটোর শহর থেকে প্রায় ৫৬ কিলোমিটার দূরে এই আশ্রমে যাওয়া যায় সবসময়। তবে সবশেষ এক কিলোমিটার রাস্তা মাটির। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব ভালো নয়। লালপুর বাজার থেকে দূরত্ব আট কিলোমিটার। দুড়দুড়িয়া বাজারে এসে জানতে চাইলে সবাই চিনিয়ে দেবে।
এটি বহন করছে গোঁসাইয়ের দেখানো মার্গ ও মানবতার স্মৃতি। প্রায় ৪৫ ফুট উচ্চতার নিপুণ নকশা খচিত প্রধান ফটকে লেখা আছে ‘স্থাপিত ১১০৪ বাংলা’, অর্থাৎ আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এটি নির্মিত। এখানে ৩২ বিঘা জায়গা জুড়ে রয়েছে ফলজ বৃক্ষ, পূজনীয় ফুলের গাছ ও শানবাঁধানো তিনটি সুবিশাল পুকুর।
সদানন্দ সাধুর তথ্য অনুযায়ী, তিন শতাধিক বছরের প্রাচীন আশ্রমটি ভক্তদের অর্থানুকূল্যে চলে। আশ্রমে আবাদি জমি ও পুকুরে মাছ রয়েছে। উত্তরে আছে ভক্তদের অন্নসেবার জন্য ভোগ ঘর। পেছনে বিশাল ইন্দিরা। এর পানি এখনও রান্নার কাজে ব্যবহার হয়। তৎকালীন পানি সংকট নিরসনের জন্য নির্মিত একটি কুয়া আছে। তবে এখন কুয়ার পানি কেউ ব্যবহার করে না। শ্রী সরুপানন্দ সাধু ও শ্রীমতি শুকী মাতা সহকারী সেবাইত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জানা যায়, ধ্যান-তপস্যার জন্য রামকৃষ্ণপুর গ্রামে একটি বটগাছের নিচে আসেন ফকির চাঁদ বৈষ্ণব। সেখান থেকেই বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার শুরু করেন তিনি। বৈষ্ণব হলো সনাতন ধর্মের একটি শাখা সম্প্রদায়। লোকমুখে শোনা যায়, নিঃসন্তান নারীরা এই বটগাছের নিচে বসে মিনতি করতেন। এ সময় গাছ থেকে ফল পড়লে তারা সন্তান লাভ করেন। এখনও এই প্রথা চালু আছে।
তাঁতি পরিবারে জন্ম নেওয়া ফকির চাঁদ বৈষ্ণব ছিলেন অবিবাহিত। তার বাবার নাম নবকৃষ্ণ, মা দশমতি। সেই সময় সহযোগী পরাণ চাঁদকে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তিতে যেতেন তিনি। কিন্তু তারা বিভিন্নভাবে মানুষের নিগ্রহের শিকার হতেন। এ কারণে আর ভিক্ষাবৃত্তিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ফকির চাঁদ। এমন সময় গ্রামে দেখা দেয় কলেরা। এতে মানুষের প্রাণহানি হতে লাগলো। তখন গ্রামের মানুষ তার কাছে গেলে তিনি অভয় দেন। এরপর কলেরা বন্ধ হয়ে যায়। এতে সন্তুষ্ট হয়ে স্থানীয় জমিদার মদনমোহন আশ্রম তৈরিতে জমি অনুদান দেন তাকে। তার বৈষ্ণব তত্ত্বের সুবাদে তৈরি হয় হাজার হাজার ভক্ত। এখনও তাদের সমাগম দেখা যায় প্রতিদিন।
কথিত আছে, ১২৭৪ খ্রিষ্টাব্দে এখানে ভক্তসঙ্গ করতে করতে অদৃশ্য হয়ে যান ফকির চাঁদ বৈষ্নব। মন্দিরে প্রবেশ করে ঐশ্বরিকভাবে স্বর্গ লাভ করেন তিনি। তার শবদেহ দেখা যায়নি। এই সাধুর পরিধেয় খড়ম ও বস্ত্রাদি সংরক্ষণ করে সমাধিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছিল। গম্বুজ আকৃতির সমাধিটির উপরিভাগ গ্রিল দিয়ে ঘেরা রয়েছে। ঘরের দেয়াল ও দরজায় বিভিন্ন প্রাণী, গাছ, লতা-পাতাখচিত কারুকার্য শোভা পাচ্ছে। ভেতরে রয়েছে ঝাড়বাতি ও দেব-দেবীর মূর্তি। সাধু ফকির চাঁদ বৈষ্ণবের মৃত্যুর পর নওপাড়ার জমিদার তারকেস্বর বাবু সাধুর স্মরণে সমাধি পাকা করে দেন। এছাড়া ভক্তদের সুবিধার্থে ২০ বিঘা জমি ও শানবাঁধানো বিশাল দুটি পুকুর দান করেন। আশ্রম চত্বরে দালানকোঠা নির্মাণেও হাত বাড়িয়ে দেন তিনি।
আশ্রমের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় কর্মকার জানান, প্রতি বছর আশ্রমে দোল পূর্ণিমা, গঙ্গা স্নান ও নবান্ন উৎসবে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার ভক্ত ও সাধক সমবেত হন। এসব আয়োজনে শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাইয়ের আবির্ভাব, তার জীবন চরিত্রের ওপর আলোচনা, গীতা পাঠ অনুষ্ঠান ও সুধী সমাবেশ হয়। আশ্রমের সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে প্রতিদিনের খরচ চালানো হয়। সাধুদের আহারের জোগাড় আশ্রমই করে থাকে। এক্ষেত্রে আশ্রমের পুকুর-জমি থেকে আয় ও ভক্তদের দানই ভরসা।
প্রধান তিন উৎসবের যেকোনও একটির সময় আশ্রমে এসে সকালে স্নান করে নতুন সাদা কাপড় পরে ভাবের দীক্ষা নিতে হয় বৈষ্ণব ধর্মের ভক্তদের। প্রধান সেবায়েত ভাব মন্দিরে তাকে ভাবদীক্ষা দেন। ভক্ত তার নিজের পছন্দের যেকোনও সাধুর কাছ থেকেও দীক্ষা নিতে পারেন। এছাড়া রয়েছে ‘ইষ্টবীথি’র সুযোগ। এটি হচ্ছে, রোজ এক টাকা বা সাধ্যমতো যেকোনও পরিমাণ টাকা জমা করা। এভাবে বছরান্তে জমানো অর্থ দিয়ে তিনি সাধুসেবা করতে পারেন।
অতিথিশালায় যতদিন খুশি থাকা যায়। নিয়ম অনুযায়ী এখানে নিরামিষ খেতে হবে। নিত্যদিন সকালে ফকির চাঁদের মঠে প্রধান সেবায়েত ফুল দেওয়ার পর সাধুরা খালিপেটে ফল-মূল, দুধ, মিষ্টান্ন খেয়ে থাকেন। দুপুরে ভাত, ডাল, সবজি আর রাতে সকালের মতো খাবার বেছে নেন তারা।

Close