বগুড়াবাঘাশিরোনাম

অদম্য যারা

বরেন্দ্র বার্তা ডেস্ক : ২০১৭ সালে আড়ানী মনোমোহীনি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করে রকি। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল সে।
রকির নেই আঙুল, দুই হাতের কেবল কবজি আছে মেহেদি হাসান রকির। এই দুই হাত দিয়ে কলম ধরে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় বসেছে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার মেধাবী এ শিক্ষার্থী।
পুরোনাম মেহেদি হাসান রকি সে উপজেলার আড়ানী পৌরসভার গোচর গ্রামের আকছেদ আলীর ছেলে। আড়ানী ডিগ্রি কলেজ থেকে আড়ানী আলহাজ এরশাদ আলী ডিগ্রি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।কেন্দ্রের ৩০২ নম্বর কক্ষে পরীক্ষা দিচ্ছে মেধাবী এ শিক্ষার্থী। বিধি অনুযায়ী বর্ধিত সময় পাচ্ছে রকি।
চলমান পরীক্ষা শেষে রকি জানায়, ভালো পরীক্ষা হয়েছে তার। ভালো ফলাফল করে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হতে চায় সে। নিজ হাতে পরিবারের হালও ধরতে চায় রকি।
রকির বাবা আকছেদ আলী বলেন, রকি আমার বড় ছেলে। শারীরিক প্রতিবন্ধিতা নিয়ে জন্ম নেয় সে। কিন্তু এ প্রতিবন্ধিতা রকিকে দমাতে পারেনি। নিজের সব কাজ সে একাই করতে পারে। খেলাধুলা সাইকেল চালানো, সবই কিছু একাই করতে পারে রকি।
আকছেদ আলী আরও বলেন, পৈতৃক দুই বিঘা জমিই সম্বল আমার। এ জমির আয় দিয়েই দুই ছেলের পড়াখেলা ও সংসারের খরচ জোগান দেই। অনেক কষ্টে তাদের পড়ালেখা চালিয়ে নিচ্ছি।
অন্যদিকে বাবার কোলে চড়ে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে কেন্দ্রে গেলেন নাইছ আকতার। সোমবার সকালে বাবা নজরুল ইসলাম মেয়েকে কোলে করে নিয়ে যান বগুড়ার ধুনট সরকারি ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে। সেই কেন্দ্রের ১২১ নম্বর কক্ষের বেঞ্চে মেয়েকে বসিয়ে দেন বাবা। পরে পরীক্ষা শেষে আবার তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান।
নাইছ আকতারের পা আছে, কিন্তু হেঁটে চলার শক্তি নেই। জন্ম থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধী নাইছ আকতার। কিন্তু তার রয়েছে অদম্য শিক্ষাশক্তি। হেঁটে চলার শক্তি না থাকায় পরীক্ষাকেন্দ্রে আসতে হয়েছে বাবার কোলে চড়ে। সহপাঠীদের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। তার দিকেই ছিল কেন্দ্রের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি। অচল ডান হাত রেখে বাঁ হাতে দ্রুতগতিতে লিখে সবাইকে তাক লাগিয়েছে বিশ্বহরিগাছা-বহালগাছা বহুমুখী মহাবিদ্যালয়ের এই এইচএসসি পরীক্ষার্থী।
ধুনট উপজেলার বহালগাছা গ্রামের নজরুল ইসলাম একজন প্রান্তিক কৃষক। তার স্ত্রী আকতার জাহান গৃহিণী। এই দম্পতির ঘরেই ২০০১ সালে জন্ম নেয় এক কন্যাশিশু। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়েটি। নজরুল ইসলাম ও আকতার জাহান দম্পতির এই কন্যাশিশু নিজের পায়ে ভর করে দাঁড়াতে পারে না। শক্তি না থাকায় ডান হাতটি অচল তার।
বিশ্বহরিগাছা-বহালগাছা বহুমুখী মহাবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রঞ্জন কুমার চক্রবর্তী বলেন, প্রতিবন্ধী হলেও মা-বাবার কোলে চেপে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে নাইছ আকতার। লেখাপড়ার প্রতি অদম্য আগ্রহ থাকায় তাকে বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। সে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করবে।
সোমবার বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নাইছ আকতার জানায়, বাবা-মায়ের কোলে চড়ে একসময় রাস্তায় বের হলে মানুষ আড় চোখে তাকিয়ে থাকতো। লেখাপড়া করার কারণে মানুষ এখন ভালোবাসে। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সমাজের সবার ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করে নিজেকে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত করতে চাই।
নাইছ আকতারের বাবা নজরুল ইসলাম বলেন, মেয়ে প্রতিবন্ধী হলেও মেধাবী। লেখাপড়ার প্রতি তার প্রবল আগ্রহের কারণে সব কষ্ট দূর হয়েছে। ভালো ফলাফল নিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে পারলে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ হবে। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় অনেক চিকিৎসা করেও নাইছকে সুস্থ করা সম্ভব হয়নি।
ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজিয়া সুলতানা বলেন, এইচএসসি পরীক্ষায় বাবার কোলে চেপে পরীক্ষা কেন্দ্রে আসে নাইছ আকতার। পা থাকলেও হাঁটতে পারে না। সমাজসেবা অধিদফতরের প্রত্যয়ন অনুযায়ী পরীক্ষায় তাকে প্রতিবন্ধী কোটায় ৩০ মিনিট অতিরিক্ত সময় দেয়া হয়েছে।বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close