অর্থ ও বাণিজ্যনাগরিক মতামতশিরোনাম-২

খেলাপীদের সুবিধা এবং টাইম ভ্যালু

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী দেশের ঋণ খেলাপীদের জন্য বিশেষ সুবিধা ঘোষনা করেছেন। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের ঘোষনা থেকে জানা যায়,খেলাপীরা যদি তাদের খেলাপী ঋণ পরিশোধ করেন তাদের ঋণের সুদের হার কমিয়ে দেয়া হবে। মন্ত্রী তার ঘোষনায় খেলাপী ঋণের সুদের হার নির্ধারন করে দিয়েছেন সাত শতাংশ হারে যদিও ২-৪-১৯ তারিখে বিভিন্ন গসমাধ্যমের সুত্রের খবর থেকে জানা যায , তা হবে ৯ শতাংশ। মন্ত্রী তার বক্তব্যে ষ্পষ্ট করে বলেছেন খেলাপীদের মধ্যে যারা ভালো তারাই এই সুবিধা ভোগ করতে পারবে। ঘোষিত ভালো খেলাপী কারা, বিষয়টি প্রশ্নবোধক , কারন খেলাপীরা আবার ভালো হয় কি করে। সকারের খেলাপী ঋণী ভালোমন্দ নির্ধারন করার বিষয়টি অনেকটা লাল মিয়া আর কালো মিয়ার গল্পের মতো। লাল মিয়া যদি এতই কালো হয় তাহলে আর কালা মিয়াকে দেখার দরকার নাই। খেলাপীদের মধ্যে মন্দ ভালো নির্ধারনের পর মন্দ খেলাপী ঋণীর স্বরুপটা কি ধরনের হতে পারে তা দেশের মানুষও অনুমান করতেও পারবে না। কারন খেলাপীদের মধ্যে ভালো মন্দ নির্ধারনের সুচক গুলো কি কি হবে ? যার মাধ্যমে ভালো মন্দ নির্ধারন করা যাবে তা গনমাধ্যমে প্রকাশ করা প্রয়োজন। যিনি খেলাপী হয়েছেন তিনি নিশ্চয়ই ভালো নন। কারন দেশের বড় অংকের ঋণ গ্রহিতাদেরকে ঋণ আদায়ের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে নানা সুবিধা দেয়া হয়। মেযাদোত্তীর্ণ ঋণকে পুন তফসিল করা হয় তারপরও যদি কেউ প্রদান করতে না পারলে তাতেও আবার পুন.পুন তফসিলের সুবিধা থাকে , এত সব সুবিধা পেয়েও যারা খেলাপী হয়েছেন তাদেরকে ভালো মন্দ যাচাইয়ের সুচক গুলো প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন। তবে সরকারে এ ধরনের সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের জন্য সুফল বয়ে আনবে না বরং এ রকম সিদ্ধান্তের জন্য খেলাপীর সংখ্যাই দিন দিন বাড়বে কিন্তু এই পদ্ধতিতে খেলাপী ঋনের পরিমান কমবে না। কারন সাত বা নয় শতাংশ সুদ সুবিধা পাওয়ার আশায় খেলাপী হওয়ার প্রবনতাটা বেড়েই যাবে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে জানা যায়, খেলাপীরা মে মাসের মধ্যে তাদের খেলাপী ঋণের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট প্রদান করলে বাকী ঋণ ১২ বছরের মধ্যে পরিশোধ করার সুযোগ পাবে। এই ভাবে ডাউন পেমেন্ট প্রদানকারী খেলাপী ঋণী পাবেন ৭ শতাংশ হারে সুদ সবিধা । ৭ শতাংশ হারের সুদ চক্রাকারে নির্ধারিত হবে না তা হবে সরল হারে। তবে গত ২ এপ্রিল ,২০১৯ অর্থমস্ত্রী এই সুদের হার ৯ শতাংশ করার কথা ঘোষনা দিয়েছেন এই ৯ শতাংশ সুদও আদায় করা হবে সরল হারে। এই খেলাপীরা ঋণ গ্রহন করেছেন ১০-১২ শতাংশ হারে এবং গৃহিত ঋণের সুদ চক্রবৃদ্ধি হারের নির্নয় পদ্ধতিতে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে কোটি কোটি টাকার ঋণ খেলাাপীরা বড় অংকের সুদের বিষয়টিতেই মওকুফের সুবিধা পেল। ২০১১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার তথ্যমতে জানা যায়,২০০৯ সালে দেশে মোট খেলাপী ঋণের পরিমান ছিল ২২,৪৮১ কোটি টাকা। ২০১১৮ সাল শেষে তার পরিমান এসে দাড়ায় ৯৯,৩৭০ কোটি টাকায়। ২০১৯ সালের এই কোয়াটার হিসাবে করলে খেলাপী ঋণের পরিমান লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। গত দশ বছরে খেলাপী ঋণের পরিমান বেড়েছে প্রায় পাচ গুণ। বছর ভিত্তিক খেলাপীর ঋণের টাকার হিসাবটি বিশ্লেষন করলে দেখা যায় , প্রতি বছরই খেলাপী ঋণীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি খেলাপী ঋণের পরিমানের গ্রাফ থেকে জানা যায় যে, ২০০৯ সালে দেশে মোট খেলাপী ঋণের পরিমান ছিল ২২,৪৮১ কোটি টাকা, ২০১২ সালে সেই ঋণ এসে দাড়ায় ৪২৭২৫ কোটি টাকায়, ২০১৫ সালে তা হয় ৫১,৩৭১ কোটি ২০১৮ সালের শেষে তা হয়ে গেলে ৯৯,৩৭০ কোটি টাকায়। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে খেলাপী থাকার পর ব্যাংক গুলো আদায় করতে পারছে না এ রকম খেলাপী রয়েছে যে ঋন তা অবলোপন করা হয়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবলোপন করা ঋণের পরিমান হলো ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত এবং প্রচারিত তথ্যানুযায়ী দেখা যায় , দেশে খেলাপী ঋণের পরিমান প্রায় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। সেই সাথে অবলোপন করা ঋণের পরিমান যোগ করলে খেলাপী ঋণের পরিমান দ্বি গুণ হওয়ার সম্ভাবনা। বর্তমানে সরকার যে পদ্ধতিতে খেলাপী ঋণ আদায় করতে যাচ্ছেন তাতে ফল কতটা ভাল হবে তা সবারই জানা । এই আদায়কৃত অর্থ অনর্থেই পরিণত হবে। খেলাপী হওয়া সমুদয় ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল ১০-১২ শতাংশ হারে এবং এই সুদ নিরুপিত বা সুদ হিসাব করা নিয়ম হলো চক্রবৃদ্ধি হারে। সরকার এই সুদের হার ৩ শতাংশ কমালেন সেই সাথে সুদ নির্নয় পদ্ধতিটা করেছে সরল হারে। তাই যোগ বিয়োগে সরকারের লাভটা না হয়ে ক্ষতির দিকেই ঝুকবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মে মাসের মধ্যে খেলাপী ঋণের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট করলে খেলাপীরা এই সুবিধা ভোগ করতে পারবে। সরকারের ঘোণিত সুবিধায় একজন খেলাপী তার ঋণ পরিশোধের সময় পাবেন ১২ বছর। দেশের মুল্যস্ফিতির হার ৬- ৭ শতাংশ। ১২ বছর পর এক লাখকোটি টাকা ঞরসব ঠধষঁব ড়ভ সবঃযড়ফ এ ঈধষপঁষধঃব করলে দেখা যাবে , এক লাখ কোটি টাকা মুল্যমান এসে দাড়াবে প্রায় ৪০-৩৫ হাজার কোটিতে , অপর দিকে সরল হারে ৯ বা ৭ শতাংশ হারে সুদ আদায়ে কতটা এই বিপুল পরিমান টাকার অবমুল্যায়ন স্থিতিশীল রাখতে পারবে তা দেখার বিষয়। কারন ঞরসব ঠধষঁব ড়ভ সবঃযড়ফ এ টাকার অবমুল্যায়ন পদ্ধতি হিসাব করা হয় চক্র বৃদ্ধি হারে সুতরাং সরল হারে আদায়কৃত সুদের টাকার অবমুল্যায়িত টাকার পরিমানের চাইতে কম হওয়াটাই স্বাভাবিক। সুতরাং এই ঘোষনায় মুলধন ঘাটতিই হবে। খেলাপী ঋণ যেমন অর্থহীন ঠিক তেমনিই আদায়কৃত খেলাপী ঋণও অর্থহীন হয়ে যাবে। খেলাপী ঋণ আদায়ের বিষয়টির ঘোষনার সাথে সাথে একটি ঘটনা মনে পড়ে গেলে। ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকের ঘটনা। অর্থনীতি বা টাকার মুল্যায়ন ও অবমুল্যায়ন সেই বিষয়টি সম্পর্কে সেই সময় আমার তেমন কোন ধারনা ছিল না। পাশের বাড়ির বৃদ্ধ দাদু তার টাংকের ভিতর ১৯৭২ সালের একটি ১০০ টাকার নোট পেলেন। ১৯৭২ সালে রেখেছিলেন হয়ত মনের ভুলে বা অন্যান্য কাগজপত্রের নীচে পড়ে থাকায় তা খরচ করা হয়নি। প্রায় এক যুগ পর দাদু টাকাটা পেলেন , ঐ সময়টায় দাদুর আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না , তাই টাকা পাওয়ায় তার মেয়ে মহা খুশী । কিন্তু দাদু খুশী হতে পারলেন না। কেন দাদু খুশী হলেন না তা ঐ সময় ভালো করে বুঝতে পারি নাই। টাকার নোট দুমড়ে মুচড়ে গেছে গ্রামের বাজারে দোকানীরা এই নোটটার বিনিময়ে ১০০ টাকা দিতে চাইল না , তারা দশ টাকা কম দিল। দাদু তার মেয়ের খুশী দেখে বললেন, পুরানো টাকা পেয়ে এত খুশী হওয়ার কিছু নাই, এই নোটটা যদি ১৯৭২ সালে কাজে লাগানো যেতো তাহলে বর্তমানের চেয়ে দশ গুণ বেশী উপকার হতো। বললেন , এই ১০০ টাকা দিয়ে ১৯৭২ সালে প্রায় দু কাঠা জমি কেনা যেতো আর বর্তমানে এই টাকা দিয়ে এক ছটাক জমি পাওয়া যাবে কিনা তাও বলা যাবে না। টাকার টাইম ভ্যালুটা সেদিন আমার মাথায় ঢুকেছিল না । গ্রামের একজন নিরক্ষর বৃদ্ধা সময়ের সাথে টাকার মান যেভাবে মুল্যায়ন করতে পেরেছিল তা আজ আমরা নির্নয় করি ঞরসব ঠধষঁব ড়ভ সবঃযড়ফ এ । একজন সময় স্বাক্ষীর কাছ থেকে শেখার বিষয়।
বাংলাদেশের হাতে গোনা কয়েকজন খেলাপীর কাছে দেশের বিশাল অংকের টাকা আজ পড়ে আছে যদিও এই খেলাপী ঋণের টাকা সরকার আদায় করতে পারে বর্তমানে নেয়া পদক্ষেপে তাহলে এই আদায়কৃত অর্থ অবমুল্যায়িত হয়ে তলানীতে ঠেকবে। এই আদায়কৃত অর্থ দিয়ে তেমন উপকার হবে না। রাষ্টের ব্যাংক গুলোর জবাড়ষারহম ষড়ধহ ভঁহফ এর পরিমান কমবে। খেলাপী ঋণ আদায়ের গৃহিত সুবিধা সমষ্টিক অর্থনীতির উন্নতি ঘটাবে না।
সরকারকে খেলাপী ঋণ আদায়ে কঠোর হওয়ার প্রয়োজন। অর্থ আইন গুলো ফৌজদারী দ-বিধির মত করা উচিত। খেলাপী ঋণ বিষয়ক বিষয়টি দেউলিয়াত্ব বিষয়টির মধ্যে না রেখে ফৌজদারী দ-বিধির ৩০২ ধারার মত মৃত্যুদন্ড হতে পারে সে রকম কিছু সংযোজন করা দরকার। সুযোগ দিলে অনেকেই ইচ্ছা করেই খেলাপী হবে। বিভিন্ন সময় নানা ধরনের সুযোগ পাওয়ায় খেলাপীর সংখ্যা বাড়ছে। তাই এই বিষয়ে আর সুযোগ দেয়াটা অনুচিত এবং ঠিক হবে না। সুতরাং রাষ্ট্রের মুলধন জনগনের সম্পদ আর তাই জনগনের সম্পদ হেফাজতকারীদের কঠোর হওয়া প্রয়োজন। খেলাপী ঋণ কমাতে সরকারের উচিত খেলাপী ঋণ আদায়ে ফৌজদারী দ-বিধির মত দ- বিধি চালু করা ।
লেখক: কলামিস্ট

Close