শিরোনামসম্পাদকীয়-কলামস্বাস্থ্য বার্তা

চালচিত্র: সংক্রামক-অসংক্রামক-নিয়ামক

এহসানুল আমিন ইমন

একটা সময় ছিল যখন অসুখ বলতেই যক্ষা, কলেরা বা ওলাওঠা, উদারাময় বা ডায়রিয়া, হাপানি বা এজমা রোগকে বোঝানো হতো। এসব রোগের প্রাদূর্ভাব এতটাই ছিল যে, সেসময়ের বাংলা চলচ্চিত্রেও এর প্রভাব লক্ষনীয়। বাংলা সাহিত্যের অমর কথাসাহিত্যিক বিভূতি ভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের কিংবদন্তী উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সত্যজিৎ রায়ের প্রথম চলচ্চিত্র পথের পাচালী থেকে শুরু করে অশনী সংকেত-সব খানেই ওলাওঠার প্রভাব চোখে পড়ার মতো। পরবর্তীতে সেই জায়গাটি দখল করে নেয় যক্ষা। যক্ষাকে রাজরোগ বলা হত। যক্ষা হলে রক্ষা নাই-এই কথাটি ব্যাপক প্রচারেও ছিল। উত্তম-সুচিত্রা জুটির চলচ্চিত্রে এর প্রভাব লক্ষণীয়। কোন ছবিতে যক্ষাতে উত্তমের আক্রান্ত হওয়া বা কোন ছবিতে সূচিত্রার-এটি অনেক চলচ্চিত্রেই ঘটেছে। সেসময়ের সর্বাধিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্র দেবদাস এ এমনটাই দেখা যায়। দুই বাংলাতেই সিনেমাটি সমান জনপ্রিয়। ছবিটির পরিনতি হয় মুখ্য চরিত্রের যক্ষা বা ক্ষয়রোগের মাধ্যমে জীবনাবসান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও রাজরোগ’র প্রভাব লক্ষণীয়। ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ এমনই একটি সিনেমা যেখানে বুলবুল আহমেদ এই ‘রাজ রোগ’ এ আত্রান্ত হয়। ৫০ এর দশক থেকে ৮০এর দশকে নির্মিত এমন অসংখ্য চলচ্চিত্রে এ ধরনের সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হবার দৃশ্য খুবই গুরুত্বের সাথে চিত্রায়িত হয়েছে। কিন্তু ৯০ দশকে এসে সেটি কমে গিয়ে ক্যান্সার, হৃদরোগের মতো অসংক্রামক রোগ স্থান করে নিয়েছে। এর কারন, মূলত: এ সময়ে বাংলাদেশসহ এই উপমহাদেশে সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে ঈর্ষনীয় কাজের ইতিবাচত ফল প্রাপ্তিতে সংক্রামক ব্যধি হয়েছে নিয়ন্ত্রিত, বিপরীতে অসংক্রামক ব্যাধির বিস্তৃতি লাভ। অসংক্রামক ব্যাধির মধ্যে বিশেষত: কর্কট বা ক্যান্সার, হৃদরোগ বা হার্ট এটাক, উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস বা মধূ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। আর উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস’র সংক্রামন অধিক হবার কারনে অন্য বিষয়গুলোও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেনা। মেডিকের সায়েন্সে উচ্চ রক্তচাপের প্রকৃত কারন আজও অজানা। অসংক্রামক রোগ কোন নির্দিষ্ট জীবানু দ্বারা সৃষ্ট নয় এবং আক্রান্ত মানুষ পশু বা পোকা মাকড় হতে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সুস্থ মানুষের দেহে প্রবেশ করেও সৃষ্টি করেনা।
অসংক্রামক রোগের প্রভাব ভয়াবহ আকারে বেড়ে চলেছে। আমাদের দেশের উন্নয়নের সাথেও এর সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিশেষত: উচ্চরক্তচাপের কারনে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে চলেছে আবার ডায়াবেটিসের ফলে মানুষ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। দুই ই আমাদের সার্বিক উন্নয়নের অন্তরায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে শতকরা ২৭.৩ ভাগ মৃত্যুর কারন এই সকল অসংক্রামক রোগ সমূহ। এর মধ্যে বড় একটি অংশ অর্থাৎ শতকরা ১২.৫ ভাগ মৃত্যু হয় বিভিন্ন প্রকার হৃদরোগ এবং শতকরা ৬.২ ভাগ ডায়াবেটিসের কারনে। আর অনিয়ন্ত্রিত হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপের কারনে হৃদরোগের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষ জানেনা যে তারা উচ্চ রক্তচাপে ভূগছেন। কেননা তাদের অনেকেই কোনদিনই রক্তচাপ মাপেননি। আমাদের দেশের শতকরা ১৭জন উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা যায় এদেশের পঁচিশ বছর বা তার বেশি বয়সের প্রাপ্তবয়সীদের মধ্যে প্রতি পাঁচ জনের একজন উচ্চ রক্তচাপে ভূগছেন। এদের মধ্যে অর্ধেক মানুষ সচেতন নয়। তারা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহন করেন না। ফলে বাংলাদেশে প্রতিবছর ২লক্ষ ৭৭ হাজার ৯৪২ জন মানুষ হৃদরোগে মৃত্যুবরণ করেন। একটি সুপরিকল্পিত উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচী হৃদরোগে ক্রমবর্দ্ধমান মুত্যুর হার কমাতে পারে ।
উচ্চরক্তচাপ,হৃদরোগের মতো অসংক্রামক রোগের জন্য মুলত: আমোদের ত্রুটিপূর্ণ খাদ্যাভাস, তামাক গ্রহণ, অপর্যাপ্ত শারিরিক পরিশ্রম তথা জীবন চারন প্রক্রিয়া দায়ী। অনেকে মনে করেন, গ্রামের মানুষ এ ধরনের অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা নেই কেননা তারা কায়িক শ্রম বেশি করেন এবং শাকসবজী ফলমুল বেশি খান এবং তাদের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের প্রবনতাও কম।কিন্তু বাস্তবে কথাটির সত্যতা কমই মিলে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ডায়াবেটিস আক্রান্তের হার শহরে শতকরা ১০ জন আর গ্রামে ৭ জন। আমাদের গ্রামের মানুষের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার কম নয়। বিশেষত:ধোয়াবিহীন (জর্দ্দা, গুল, সাদাপাতা) তামাকের ব্যবহারের হার শহরের চেয়ে গ্রামেই বেশি। গ্রামের মানুষের লবন গ্রহণের পরিমান বেশি, তারা অতিরিক্ত লবন খান। যেখানে দিনে একজন মানুষের ৫ গ্রাম লবনের প্রয়োজন সেখানে গ্রামের মানুষ তাদের সাধারন খাবারের সাথে আলগা লবন গ্রহণ করে থাকে। অন্যদিকে শহরের মানুষের মধ্যে ধোয়াযুক্ত তামাক গ্রহণ, কায়িক শ্রম না করা, প্রক্রিয়াজাত খাবার মধ্যে দিয়ে অতিরিক্ত লবন গ্রহণ, সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার রেড মিট (গরু, মহিষ, খাসির মাংশ), চামরাসহ হাস মুরগীর মাংশ, আইসক্রীম, মাখন, পামওয়েল, বাটার ওয়েলও ট্রান্স ফ্যাট তথা পোড়া তেলে ভাজা খাবার বেশিগ্রহণ করে থাকে, যা এধরনের অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভার বাড়াতে সাহায্য করছে।
গ্লোবাল এডাল্ট টোবাকো সার্ভে-গ্যাটস এর তথ্য অনুসারে, আমাদের দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮লক্ষ প্রাপ্তবয়সী মানুষ তামাক সেবন করেন। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটিপ্রাপ্তবয়সী জর্দ্দা এবং ১.৫ কোটি প্রাপ্তবয়সী সিগারেট পান করেন। বাংলাদেশের আইনে পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান আইনত নিষিদ্ধ ও দন্ডনীয় অপরাধ হলেও আইন প্রয়োগের অপর্যাপ্ততার কারনে তা অনেকক্ষেত্রেই মানা হচ্ছেনা। তবে আশার কথা, প্রাপ্তবয়সীদের মধ্যে প্রায় শতকরা প্রায় ৮৯ জন বিশ্বাস করে যে ধূমপানের কারনে স্ট্রোক, শতকরা প্রায় ৯০ জন বিশ্বাস করে যেধূমপানের ফলে হার্ট এটাক এবং ৯৫ জন বিশ্বাস করে যে এর ফলে লাং ক্যান্সার হয়। ঠিক একইভাবে শতকরা ৮২ জন বিশ্বাস করে যে, ধোয়াবিহীন তামাক ব্যবহারে স্ট্রোক হয়, শতকরা প্রায় ৮৩ জন বিশ্বাস করেএর ফলে হার্ট এটাক এবং ৯১ জন বিশ্বাস করে যে এর ফলে ওরাল (মুখের) ক্যান্সার হয়।
নাগরিক জীবনের মতো গ্রামীন সংস্কৃতিতে ঢ়ুকে গেছে ফাস্ট ফুড কালচার। সম্পৃক্ত চর্বি, অতিরিক্ত চিনি এবং লবনের ব্যবহারে তৈরী ফাস্ট ফুড-জাংক ফুডে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সস্পৃক্ত চর্বি ও ট্রান্স ফ্যাট ব্যবহার হচ্ছে বিস্কুট, চানাচুর, চিপসসহ বিভিন্ন খাবারে।আচার, সস, সুটকি মাছে অতিরিক্ত লবন ব্যবহারের কারনে এই খাবারগুলো আমাদের স্বাস্থ্য ঝুকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমারা প্রাচ্যোর দেশগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে তাদের খাবার গ্রহণকরেছি কিন্তু তাদের কায়িক পরিশ্রমের বিষয়টি আমরা গ্রহণ করিনি। জাপান সহ বিভিন্ন দেশে বাই সাইকেল জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত বাহন হলেও আমরা বাই সাইকেল ছেড়ে যান্ত্রিক যানবাহনে ঝুঁকেছি। আমাদের নগর জীবনের রাস্তায় যান্ত্রিক যানবাহনের চাপে বাই-সাইকেল চালানোর পরিবেশ নেই। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলার মাঠের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নাহয়ে আজ তা কংক্রিটের বিল্ডিং এর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। শিশুরা এখন ভিডিও গেম- ইনডোর গেমে আসক্ত হয়ে পরছে। শৈশব থেকে শিশুদের শারিরিক কসরৎ এর বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা যেমন প্রয়োজন তেমনি সড়ক-মহাসড়কে সাইকেলের জন্য পৃথক লেন, অবকাঠামো গুলো স্বাস্থ্য সম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো থাকা জরুরী। একজন প্রাপ্ত বয়সী মানুষেকে সপ্তাহে ১২০ মিনিট হাটতে হবে, কিস্তু নগর জীবনে হাটার প্রর্যাপ্ত যায়গা নেই।
বাংলাদেশ তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব:) আব্দুল মালিক হাইপারটেনশন সংক্রান্ত একটি আলোচনায় বলেছিলেন, উচ্চ রক্তচাপ মানবদেহে নিরব ঘাতক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ অধিকাংশ হার্ট এটাক এর কারন হিসেবে দেখা যায়। আমাদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতার অভাবে এই অসংক্রামক ব্যধিটি ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। আঠার বছর বয়সের সকলের উচিৎ নিয়মিত রক্তচাপ মাপানো। বর্তমান সরকার টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে তথা সবার জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে অসংক্রামক ব্যধি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ, নন কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল (এনসিডিসি) এ দেশীয় বেসরকারী স্বাস্থ্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এর সমন্বয়ে সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিয়ানী বাজার, গোলাপগঞ্জ, বিশ্বনাথ ও ফেঞ্চুগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনসিডি কর্নার থেকে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সেবা নিশ্চিত করার কাজ শুরু করেছে। এই কর্মসূচীর আওতায় এলাকার প্রাপ্ত বয়স্ক সকল নাগরিকের জন্য রক্তচাপ মাপা, উচ্চ রক্তচাপ রোগীদের সরকার নির্দ্ধারিত দীর্ঘমেয়াদী চিকিসাসেবা প্রদান, নিয়মিত ফলোআপ, বিনামূল্যে ঔষধ প্রদান, কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ রোগী সনাক্ত করা ও তাদের চিকিৎসাসেবার জন্য এনসিডি কর্নারে প্রেরণ, জীবনযাত্রার মান পরিবর্তনের জন্য কাউন্সেলিং করা, কমিউনিটি গ্রুপ ও কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপ’র মাধ্যমে নাগরিক সচেতনতা নিশ্চিত করার কাজ করছে। সরকারের এই উদ্যোগটি যদি সফল হয় তাহলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
আবার পুরোনো প্রসঙ্গে আসি। কযেকমাস আগে মুক্তি পেয়েছে দেবী চলচ্চিত্রটি। এই চলচ্চিত্রটির একটি গরুত্বপূর্ণ চরিত্র মিসির আলী, যিনি প্যারা সাইকোলজি নিয়ে কাজ করেন। চলচ্চিত্রটিতে মিশির আলীকে একাধিকবার ধূমপান করতে দেখা যায়। অভিনেত্রী জয়া আহসাস প্রযোজিত এই ছবিটিতে মিশির আলীকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন তার সমস্ত সৃজণশীলতা ধূমপানের মধ্যই সীমাবদ্ধ। সরকারী অনুদানে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি দেশের প্রচলিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘনের একটি বড় উদাহরণ। অথচ মাত্র কিছুদিন আগে আমাদের দেশের জননন্দিত কথাসাহিত্যিক, মিসির আলীর শ্রষ্টা হুমাযূন আহমেদকে অসংক্রামক ব্যধি কর্কট রোগে ভূগে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়েছে।অসংক্রামক রোগে বিদায় নিয়েছেন অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদি, চিত্র নায়ক মান্না, জসিমকে। আমরা নিশ্চয় এমন ঘটনার পূনরাবৃত্তি চাইনা।
———————————
লেখক: সম্পাদক, বরেন্দ্র বার্তা। উন্নয়ন কর্মী (প্রজেক্ট মনিটরিং অফিসার, হাইপারটেনশন কন্ট্রোল প্রোগ্রাম, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ)

Close