সম্পাদকীয়-কলাম

পহেলা বৈশাখ এবং বাংলা সংস্কৃতি

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

পহেলা বৈশাখের আগমনে বর্ণিল সাজে সাজতে শুরু করেছে বাংলার জনপদ। নব সাজে সাজার সরঞ্জাম বিক্রি করতে পণ্যে পসরা নিয়ে হাজির বিদেশী ব্যবসায়ীরাও। বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশের সকল উৎসব গুলোর চেয়ে সর্ববৃহৎ উৎসব। পহেলা বৈশাখের এই বাংলায় বসবাসরত সকল জাতি ধর্ম বর্ণের মানুষ নববর্ষ পালনের উৎসবে মিলিত হয়। এই উৎসবের উপাদানের মাঝে প্রোথিত আছে এই জনপদের মুল শেকড়।
নববর্ষ পালনের মধ্য দিয়ে প্রমান হয় এই বাংলা প্রাচীনকাল থেকেই একটি অসাম্প্রদায়িক জনপদ ছিল। প্রাচীনকালে এই জনপদের মানুষের আধ্যাত্বিক বিশ্বাসের একটি স্বকীয় সংস্কৃতির ধারা ছিল। তাদের নিজস্ব বিশ্বাসটি গড়ে উঠেছিল তাদের চিন্তা চেতনার মধ্য দিয়ে। আধ্যাত্বিক বিশ্বাসের পুরো
বিষয়টি গড়ে নির্ভরশীল ছিল এই জনপদের প্রকৃতিগত বিষয় গুলির উপর আর এই বিষয় গুলো মুলত ছিল এখানকার জলবায়ু , প্রকৃতির রুদ্ররোষ বা প্রকৃতির দান, শস্য উৎপাদন প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি , প্রাকৃতিক সম্পদসহ নানাবিধ উপাদান। প্রাচীন কালে পৃথিবীর সব জনপদই ছিল কৃষির উপর
নির্ভরশীল তাই প্রতিটি অঞ্চলের আধ্যাত্বিক প্রার্থনাটা প্রকৃতির নির্ভর করতো ।

মানুষের প্রার্থনাটা ছিল কৃষির উৎপাদন প্রাপ্তি এবং নিজেদেরকে নানা বিপদ থেকে রক্ষা করার উপর নির্ভর করে। কালের বির্বতনে কৃষিতে পরিবর্তন এসেছে , এই জনপদেও সংস্কৃতির কিছু কিছু বিষয়েএসেছে পরিবর্তন। তারপরও মুল সংস্কৃতি থেকে এই জনপদের মানুষ বিচ্যুত হয়নি । তাই দেখা যায়
ঘটা করে পহেলা বৈশাখ উদযাপন। অশুভ শক্তির বিনাশ শুভ শক্তির বিস্তার হোক এই বিশ্বাসটি এই জনপদের মানুষের মনে বিদমান অনাদীকাল থেকেই। তারই ধারায় পুরনো দুঃখ বেদনা , জরা, জীর্ণতা, দুর করে শুভ নতুনের আগমনের আশায় নববর্ষের প্রথম দিনটি মহাসমারোহে পালন করে আসছে জনপদের মানুষ।

বাংলা জনপদের মানুষ নববর্ষের প্রথম দিনটি সুখ এবং সমৃদ্ধির আশায় পালন করে থাকে। বর্ণিল মুখোশের পড়ে অশুভ শক্তির বিনাশ করার প্রচলনটি চালু ছিল এই জনপদে। তাই এখনো নববর্ষ উদযাপনে মুখোশ পড়াটা দেখা যায়। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মধ্য দিয়ে প্রমান হয় এই অঞ্চলের মানুষের
সংস্কৃতিতে রয়েছে একটি নিজস্ব ধারা। সংস্কৃতির এই নিজস্ব ধারাটি বাংলা জনপদের মানুষ অক্ষুন্ন রেখেছে। যদি এই জনপদ হাজার হাজার বছর ছিল বিদেশী শাসনাধীন। নদী বাহিত পলল ভুমি এই বাংলা, এখনকার ভুমি পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলের চেয়ে ছিল বেশী উর্বর। তাই শস্যপুর্ণা বাংলায় সুখ ,
সমৃদ্ধি এবং শান্তি ছিল পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলের চেয়ে বেশী। বাংলা জনপদের মানুষ ছিল সম্পদে পরিপুর্ণ। ইতিহাস বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, বাংলা জনপদটি বার বার বহিঃ শত্রুর আক্রমনের শিকার হয়। আর বহিঃশত্ররা সম্পদের লোভেই এই আক্রমন করে। বিদেশীরা শুধু এই জনপদটি আক্রমন করেই থেমে থাকেনি দখল করে নিজেদের শাসনও প্রতিষ্ঠা করেছিল।

বাংলায় বিদেশীরা তাদের নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা পাকা পোক্ত করতে তাদের সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছিল এখানকার সংস্কৃতিতে , কিন্তু এই বাংলার মানুষ নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি আস্থাশীল এবং বিশ্বাসী ছিল চীরকাল। তাই দেখা যায় , বাংলার মানুষ বিদেশী শাসন মেনে নিলেও বিদেশী সংস্কৃতিটা তারা মেনে নেয়নি। বাংলা জনপদের মানুষ নিজেদের সংস্কৃতি রক্ষায় রক্ষণশীল বরাবরই। তবে এই রক্ষশীলতার মধ্যেও কিছু বিশ্বাসের অনুপ্রবেশ
ঘটেছে এই অঞ্চলের মানুষের মনে, এই বিশ্বাসের আচারিক বিষয়ের নিয়মাবলী গুলোও কিন্তু পালন করে এখানকার মানুষ নিজস্ব সংস্কৃতির বলয়ে। এখানকার আদিবাসী মানুষ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস গুলো অক্ষুন্ন রেখেছে প্রাচীনকালের মতই । বাঙালীদের মাঝে রয়েছে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ। আর্য আগমন থেকে শুরু করে পাক শাসন পর্যন্ত বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতি বা ধর্মানুসারীদের শাসনাধীন থাকা বাংলায় নানা ধর্মের বিস্তার ঘটে। এ অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন ধর্ম পালন করায় ধর্মীয় কারণে এখানকার সংস্কৃতিতে কিছু কিছু নতুন বিষষয়ের সংযোজন হয়েছে । তবে বাংলা সংস্কৃতিটার
মুল উপাদানটা এই জনপদের মানুষ লালন করে এখনো নিজস্ব বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে। তাই বাংলার সংস্কৃতিটা অবিকৃত আছে। বর্তমান বাজার অর্থনীতির যুগে এসে সংস্কৃতির উপর ভিন্ন কায়দায় আক্রমন দেখা যায়। যা বিদেশী শাসকরা করতে পারেনি তাদের শাসনামলে ।

এই অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকে নানা ধর্ম প্রচারকের আগমন ঘটে। ধর্ম প্রচারকদের দেয়া সংস্কৃতির ধারা গুলো এই অঞ্চলের সংস্কৃতিকে ক্ষত করতে পারেনি। তাই এই অঞ্চলের ধর্ম পালনকরা মানুষের সাথে একই ধর্ম পালনকারীর অন্য অঞ্চলের মানুষের রয়েছে সাংস্কৃতিগত পার্থক্য। প্রাচীনকালের সিন্ধু উপত্যকার সনাতন ধর্ম পালনকারীদের ধমের্র বিস্তার ঘটে বাংলা জনপদে কয়েক হাজার বছর আগে। বাংলা জনপদের সনাতন ধর্ম পালনকারীদের সাথে উত্তর ভারত বা এই উপমহাদেশের অন্য অঞ্চলের সনাতন ধর্ম পালনকারীদের সাথে অনেক ভিন্নতা দেখা যায়। এখানকার সনাতন ধর্ম পালনকারীরা নিজস্ব সংস্কৃতি ধারায় ধর্ম পালন করে আসছে যুগযুগ ধরে।

সাতশ শতাব্দীর শেষ দিকে মুসলিম ধর্মের প্রচারকদের আগমন শুরু হয় এই জনপদে। বিন কাসিম , বখতিয়ার খলজিসহ নানা মুসলিম শাসক এদেশ আক্রমন করে , তাদের মধ্যে কেউ কেউ এদেশের শাসকও হয়। তাছাড়া ইসলাম ধর্মের সুফি সাধকরা ও ধর্ম প্রচারকরাও ধর্ম প্রচার করে এই দেশে । তবে এদেশের ইসলাম ধর্ম পালনকারীদের রীতিনীতিতেও রয়েছে এ অঞ্চলের সংস্কৃতির একটি নিজস্ব ধারা। যা পৃথিবীর অঞ্চলের ইসলাম ধর্ম পালনকারীদের মধ্যে নেই। ধর্মীয় রীতি নীতি সাংস্কৃতির একটি অন্যতম উপাদান । হাজার হাজার বছর আগে এই জনপদে বিভিন্ন ধর্মের বিস্তার হলেও তা এ অঞ্চলের সংস্কৃতির মুল ধারাটির ব্যতয় ঘটাতে পারেনি। বর্তমানে পুজিবাদী বাজার আগ্রাসনে এই জনপদের সংস্কৃতিকে বিকৃত ধারার প্রবাহিত করার জন্য চলছে নানা ধরনের কৌশল। আগামী নববর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ইউনিয়ন পর্যায়ের হাট বাজার থেকে শুরু করে খোদ রাজধানী শহর জুড়ে বসেছে নানা রকমের পণ্যের পসরা। সারা দেশের মানুষই উৎসবের মেজাজে মেতে উঠেছে। তবে এই মাতোয়ারা মাঝে একটি পাশ্চাৎ ঢং নিপুণ ভাবে অনুপ্রবেশ ঘটানো প্রক্রিয়া চলছে।

এইজনপদের প্রধান উৎসব পহেলা বৈশাখকে ঘিরে চলে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র। ইসলাম ধর্ম পালনকারীদেরকে এই উৎসব থেকে বিরত রাখার জন্য একটি গোষ্ঠি উঠে পড়ে লেগেছে অনেক দিন ধরে , অন্য দিকে পাশ্চাৎ ঢং অনুপ্রবেশে কৌশল, এই দুই প্রক্রিয়া মিলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন তথা ,এই জনপদের সংস্কৃতি ধারা গুলি ক্রমেই জগাখিচুড়ীতে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। পহেলা বৈশাখের মহাধুমধামে পালনের বিষয়টি হয়ে গেছে একটি ভোগের উৎসবে। এই উৎসব পালনের মাধ্যমে বাঙালীয়ানার বিষয়টি ক্রমে পাকা পোক্ত হওয়ার কথা তা কিন্তু হচ্ছে না। তাছাড়া নববর্ষ পালনের মাধ্যমে এই জনপদের মুল সংস্কৃতির ধারা গুলি সর্ম্পকে নতুন প্রজন্মকে জ্ঞাত করাটাও এই উৎসবের মুখ্য বিষয় । এখন যদি এই বিষয়টি জগাখিচুড়ীতে পরিণত হয় তাহলে আগামী প্রজন্ম কি শিখবে? নববর্ষ মহা সমারোহে পালন করা হলেও, আমাদের চারিপাশে যে বাংলার ভাষার অনুশীলন হচ্ছে না সেদিকে কিন্তু কারো খেয়াল নেই। ১৪ এপ্রিল এবং ২১ ফেব্রুয়ারী আসলেই কে কত বড় বাঙালি তা প্রমানে সবাই ব্যস্ত। চারিদিকে বিদেশী সংস্কৃতি যে ভাবে ঘিরে ফেলছে তাতে বাঙালিয়ানা শেষতক এই দুই মধ্যেই আর্বতিত হবে।

গত ১৪ এপ্রিল রাজশাহী মহানগরীর নিউ মার্কেট এলাকায় দাড়িয়ে আছি। এক রিক্সা আরোহী নারী এনআরবিসি ব্যাংক রাজশাহী শাখার খোজ  করছেন। আমার কাছে জানতে চাইলেন এই ব্যাংকটি কোথায় । আমি রিক্সা চালককে বললাম ওটা তো চেম্বার ভবন থেকে একটু সামনে , রিক্সাচালক প্রতি উত্তরে বলল ওখানে তো দেখি নাই, আমি তাদের সাথে গেলাম এবং দেখিয়ে দিলাম। রিক্সা চালক এবং আরোহী নারী একটু থতমত খেয়ে গেলেন । আরোহীনি বললেন এখানে তো এসেছি কিন্তু আমি ইংরেজি পড়তে পারি না তাই চিনি নাই। রিক্সা চালকও বলল ওটা ইংরেজিতে লেখা তাই আমি বুঝতে
পারি নাই। অথচ স্বাধীনতার পুর্বে এদেশের কোন প্রতিষ্ঠানের সাইন বোর্ড বাংলা ভিন্ন অন্য ভাষায় লেখা হতো না। আজ ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত এবং দুই লাখ মা বোনের সম্ভ্রম হারিয়ে যে স্বাধীন বাংলা জনপদটি আমরা পেয়েছি তা চলছে বিদেশী ভাষার সাইন বোর্ড দিয়ে। আর আমরা পহেলা বৈশাখ এবং একুশে ফেব্রুয়ারী এলেই সাদা পাঞ্জাবী আর শাড়ী পড়ে উৎসবে মেতে উঠি । বাংলা নববর্ষে ভোগবাদী উৎসবে পরিণত হয়েছে। ফলে মুল সংস্কৃতির ধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ছে। বাংলার মুল সংস্কৃতির আবহটা ধরে রাখতে হবে। সব কিছুই বাংলা অনুশীলন করা প্রয়োজন। তাই  একদিনের বাঙালী না হয়ে সবাইকে সারা বছরের বাঙালী হতে হবে। তাহলেই মহাধুমধামে নববর্ষ পালনটি সার্থক ও সফল হবে।

লেখক: কলামিস্ট

Close