শিরোনামসম্পাদকীয়-কলাম

সম্পদের জাকাতের ন্যায় সমান গুরুত্বপূর্ণ ফসলের জাকাত ‘উশর’

উশর আরবি শব্দ যা আশারা থেকে এসেছে। আশারা অর্থ ১০, আর উশর অর্থ এক দশমাংশ one tenth বা দশ ভাগের একভাগ। সাধারণত জমিতে উৎপাদিত ফসলের জাকাতকে উশর বলা হয়।
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় মুসলমানদের আবাদকৃত জমিতে উৎপাদিত ফসলের এক দশমাংশ জাকাত হিসেবে প্রদান করাকে উশর বলা হয়। মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভূমি হতে উৎপাদিত ফসলের জাকাত হিসেবে জমির প্রকারভেদে এক-দশমাংশ অথবা ৫% ফসল শরিয়তের নির্ধারিত খাত সমূহে আদায় করায় উশর।

উশরি ভূমির প্রকার-
এক. এমন সব জমি যাতে নদীনালা, খালবিল অথবা বৃষ্টির পানিতে সিক্ত হয়ে ফসল উৎপাদিত হয়। এগুলোর জন্য উশর ১০%। দুই. এমন সব জমি যাতে কৃষককে সেচের ব্যবস্থা করতে হয়। কৃত্তিম উপায়ে মেশিনের সাহায্যে, কুপ খনন করে সেচ দিতে হয়। এগুলোর জাকাতের পরিমাণ হলো নিসফে উশর বা বিশভাগের এক ভাগ বা ৫%।

উশর আদায়ের বিধান বা নিসাব-
ইমাম শাফেয়ী (র) এর মতে, ভূমি থেকে উৎপন্ন এমন সব ফসলের উপর যাকাত দেয়া ওয়াজিব যেগুলো মানুষ চাষাবাদ করে, খেয়ে জীবন ধারণ করে এবং সংরক্ষণ করে। (ফিকহুল সুন্নাহ-২৫০/১)

ইমাম আহমদ (র) এর মতে, মানুষ জমিতে চাষাবাদ করে উৎপাদন করে এমন সকল শস্য বা ফলের উপর জাকাত ফরজ। তবে শর্ত হলো এগুলো এমন হওয়া চায় যা শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। যদি শুকিয়ে সংরক্ষণ করে না যায় যেমন, আপেল, নাশপাতি, কুল ইত্যাদি এবং সবজি যেমন, শসা, খিরা, তরমুজ, গাজর ইত্যাদির উপর জাকাত ওয়াজিব হবে না। (ফিকহুল সুন্নাহ-২৫০/২)

ইমাম আবু হানিফা (র) এর মতে, ভূমি থেকে উৎপন্ন এমন সব ফসলের উপর জাকাত ওয়াজিব। এক্ষেত্রে শাক সবজি বা অন্য কোনো ফসলের মধ্যে পার্থক্য নেই। তবে শর্ত হলো, ভূমি ব্যবহারের উদ্দেশ্যে চাষাবাদ করতে হবে। তিনি বলেন, ফল হয় না শুধু লাকড়ি হয় এমন গাছ ও তৃণলতার উপর জাকাত ওয়াজিব হয় না। (ফিকহুল সুন্নাহ-২৫০/১)

উশরের নিসাব-
ইমাম মালেক, শাফেয়ী, আহমেদ, সুফিয়ান সাওরীর মতে ৫ ওয়াসাক। ইমাম আবু হানিফার মতে কম হউক বেশি হউও জাকাত দিতে হবে।

উশর প্রদানের খাত সমূহ-
উশর ফসলের জাকাত। সুতরাং জাকাত প্রদানের আটটি খাতেই প্রদান করা যেতে পারে।
জাকাত বণ্টনের খাতের ব্যপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “জাকাত হচ্ছে ফকির, মিসকিন, জাকাত ব্যবস্থাপনায় রত কর্মচারী, যাদের মন (দ্বীনের প্রতি) অনুরাগী করা প্র্যজন,গোলামির থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে, ঋণগ্রস্ত, যারা আল্লাহর পথে (সংগ্রাম রত) আছে এবং যারা মুসাফির তাদের জন্যে। এটি আল্লাহ্‌র নির্ধারিত ফরজ।” (সূরা তাওবা-৬০)
আল্লাহ তায়ালা জাকাত প্রদানের মোট আটটি খাত উল্লেখ করেছেন।
১. ফকিরঃ ফকির বলতে এমন দরিদ্র লোকদের বোঝানো হয়েছে যাদের সামান্য অর্থ সম্পদ আছে। তারা তাদের মৌলিক চাহিদা পুরন করতে সক্ষম নয় এবং তারা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নয়।
২. মিসকিনঃ যারা নিঃস্ব ও অসহায়। তাদের সম্পদ বলতে কিছু নেই। ( people who are destitute and extremly needy.)
৩. জাকাতের কর্মচারীঃ সরকারের পকশ থেকে নিয়োগকৃত জাকাত আদায় ও তৎসংশ্লিষ্ট কাজের কর্মচারী। এদের বেতন ভাতা জাকাতের অর্থ থেকে প্রদান করা হবে।
৪. মনতুষ্টির জন্যঃ অমুসলিমদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে মহানবী (স.) জাকাতের অর্থ ব্যয় করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে ইসলামি রাষ্ট্র সুসংহত ও শক্তিশালী হলে এ খাতে ব্যয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে নও মুসলিমদের পুনর্বাসনে ব্যয় করা যেতে পারে।
৫. দাসমুক্তিঃ যদি কোনো দাস মনিবের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয় যে, নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায়ে সে মুক্তি পাবে। তাহলে এমন দাসকে জাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে।
৬. ঋণমুক্তিঃ প্রকৃতার্থে ঋনী ব্যাক্তি যে ঋণ পরিশোধ করার ক্ষমতা রাখে না। জাকাতের অর্থ সহায়তা দিয়ে সে ঋণ থেকে মুক্তি পেতে পারে ।
৭. ফি সাবিলিল্লাহঃ আল্লাহ্‌র রাস্তায় জিহাদের কাজে জাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে। আল্লাহ্‌র রাহে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে আন্দোলনের সামগ্রী ক্রয়ে ও এ সংক্রান্ত কাজেও জাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে।
৮. মুসাফিরঃ পথচারী বা মুসাফির সফরে এসে নিঃস্ব হয়ে পড়লে জাকাতের অর্থ থেকে সহায়তা নিতে পারবে। যদিও তনি ধনী ব্যক্তি হন। তাছাড়াও পথচারীদের কল্যাণে জাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে।
সুতরাং, বুঝা যায় যে সম্পদের জাকাত ও সাদকাতুল ফিতরের ন্যয় উশর ও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যা সকল মুসলমানের আদায় করা উচিৎ।
– নাদিম সিনা

Close