শিরোনাম-২স্বাস্থ্য বার্তা

নিরাপদ মাতৃত্ব

বিশ্ব নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস
নিরাপদ মাতৃত্ব: আমাদের করনীয়
গর্ভকালীন পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যসেবা
নিরাপদ প্রসব ব্যবস্থা ও এর জন্য পরিকল্পনা
প্রসব পরবর্তী সেবা
অদক্ষ দাইয়ের হাতে ৫৩ ভাগ প্রসব

বিশ্ব নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস আজ মঙ্গলবার (২৮ মে)। বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে।
দিবসটি উপলক্ষে সরকারিভাবে এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা নানা কর্মসূচি পালন করবে। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘মর্যাদা ও অধিকার, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসূতি সেবায় অঙ্গীকার’।
নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন।
সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক নারী স্বাস্থ্য দিবস হিসেবে ১৯৮৭ সাল থেকে ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’ পালন শুরু হলেও মাতৃ স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব ও এর কার্যকারিতা অনুধাবন করে ১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশে যথাযথভাবে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয়। দিবসটি অবস্ট্রেটিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) পালন করে আসছে।
নিরাপদ মাতৃত্ব: আমাদের করনীয়
মা‘দের বাঁচিয়ে রাখার জন্য কাজ করা মানবিক দাবি। সুস্থভাবে সন্তান জন্মদান তাদের মানবিক অধিকার। এটা সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার মধ্যেও পড়ে। আন্তর্জাতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এ ধরনের মাতৃমৃত্যুর ঘটনা প্রধান অন্তরায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইউএনএফপিএ পরিবেশিত তথ্যে জানা যায়, পপুলেশন ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্টস গোল যৌথভাবে একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের আয়োজন করে মাতৃমৃত্যুর হার ৭৫ ভাগ পর্যন্ত কমিয়ে আনার জন্য।
চায়না, কিউবা, মিশর, জ্যামাইকা, মালয়েশিয়া, মরক্কো, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, তিউনিশিয়া এক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। সারা বিশ্বে মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে ইউএনএফপিএ-এর পাশাপাশি ইউএনএইডস, ইউনিসেফ, ইউএনউমেন, হু, এবং বিশ্ব ব্যাংক একসাথে কাজ করে যাচ্ছে।
নবজাতক শিশু এবং মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে হলে যে বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে, তা হলো নারী-পুরুষের সমঅধিকার, শিক্ষার হার বৃদ্ধি করা এবং বাল্যবিবাহ রোধ করা। তাহলেই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নবজাতক ও মাতৃমৃত্যুহার কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
গর্ভকালীন পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যসেবা
গর্ভকালীন সময়ে একজন মাকে যে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয় তাই গর্ভকালীন সেবা । গর্ভধারণের সময় হতে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত সময়কালে মা ও শিশুর যত্নকে গর্ভকালীন যত্ন বা Antinatal Care বলে। এই গর্ভকালীন যত্নের লক্ষ্য হলো মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা এবং গর্ভজনিত কোনো জটিলতা দেখা দিলে তার প্রতিরোধ বা চিকিৎসা করা। এক কথায় মায়ের স্বাস্থ্যের কোনো অবনতি না করে সমাজকে একটি সুস্থ শিশু উপহার দেয়া।
একজন গর্ভবতী মায়ের গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ প্রসব এবং প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা গর্ভবতীর স্বামীসহ পরিবারের সকলের সমান দায়িত্ব ।
গর্ভধারণের পরপরই একজন গর্ভবতী মহিলার গর্ভকালীন যত্নের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হবে অথবা ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। প্রথম ভিজিটের পর একজন গর্ভবতীকে সাধারণত ২৮ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতিমাসে একবার, ৩৬ সপ্তাহ পর্যন্ত ১৫ দিনে একবার এবং সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে একবার এই গর্ভকালীন যত্নের জন্য ডাক্তারের কাছে যেতে হয়।
৫ থেকে ৮ মাসের মধ্যে ২টি টিটি টিকা নিতে হয় ।
বেশি পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার ও প্রচুর পরিমাণ পানি পান করতে হবে ।
গর্ভকালীন সময় ভারি কোনো কাজ করা যাবে না ।
হাসিখুশি থাকতে হবে এবং দিনে ১ থেকে ২ ঘন্টা বিশ্রাম ও রাতে অন্তত ৮ ঘন্টা ঘুমাতে হবে ।
যেকোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা ক্লিনিকে ডেলিভারি করানো নিরাপদ । যদি তা সম্ভব না হয়, তবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রী দ্বারা ডেলিভারি করাতে হবে ।
তবে গর্ভকালীন সময়ে কোনো ধরনের জটিলতা দেখা দিলে অতি দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।
গর্ভবতী মায়ের খাবার
এ সময় মা ও গর্ভের শিশু দু’জনের সুস্থতার জন্য একটু বেশি পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া প্রয়োজন । বিশেষ করে শিশু বেড়ে ওঠার জন্য আমিষ জাতীয় খাবার যেমন- মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, দুধ বেশি করে খেতে হবে । এ ছাড়া সবুজ ও রঙিন শাকসবজি, তরকারি ও ফল ছাড়াও যেসব খাবারে আয়রন বেশি আছে যেমন কাঁচাকলা, পালং শাক, কচু, কচুশাক, কলিজা ইত্যাদি বেশি বেশি খেতে হবে । আর বেশি পরিমাণে পানি (দিনে ৮/১০ গ্লাস) খেতে হবে এবং রান্নায় আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করতে হবে ।
অনেকেরই ধারণা মা বেশি খেলে পেটের বাচ্চা বড় হয়ে যাবে এবং স্বাভাবিক প্রসব হবে না । অনেকে গর্ভবতী মাকে বিশেষ কিছু খাবার খেতে নিষেধ করে । যেমন- দুধ, মাংস কিছু কিছু মাছ ইত্যাদি । এগুলো খাওয়া তো নিষেধ নয়ই, বরং মা বেশি খেলে মায়ের ও বাচ্চার স্বাস্থ্য ভালো থাকবে । মা প্রসবের ধকল সহ্য করার মতো শক্তি পাবেন এবং মায়ের বুকে বেশি দুধ তৈরি হবে ।
এ সময় স্বাভাবিক কাজকর্ম করা শরীরের জন্য ভালো । কিন্তু কিছু কিছু ভারি কাজ যেমন: কাপড় ধোয়া, পানি ভর্তি কলস কাঁখে নেয়া, ভারি বালতি বা হাঁড়ি তোলা উচিত নয় । এ সময় প্রতিদিন গোসল করা, দাঁত মাজা, চুল আঁচড়ানো, পরিষ্কার কাপড় পরা উচিত । এতে শরীর ও মন ভালো থাকে ।
গর্ভাবস্থায় কমপক্ষে ৪ বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা চেকআপের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হবে মা ও গর্ভস্থ শিশুর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গর্ভবতী মাকে গর্ভকালীন সময়ে কমপক্ষে ৪ বার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চেকআপের জন্য যাওয়ার সুপারিশ করেছে, এর মাধ্যমে ৬টি সেবা নিশ্চিত করা হয় । তবে মনে রাখা দরকার যে, গর্ভবতী মায়ের অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ৪ বার এর বেশি চেকআপে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে ।
বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা/চেকআপের সময়সূচি
১মঃ ৪র্থ মাসের মধ্যে (১৬ সপ্তাহ)
২য়ঃ ৬ষ্ঠ মাসে (২৪ সপ্তাহ)
৩য়ঃ ৮ম মাসে (৩২ সপ্তাহ)
৪র্থঃ ৯ম মাসে (৩৬ সপ্তাহ)
গর্ভকালীন সেবা/চেকআপে যা যা করা হয়
1)গর্ভকালীন ইতিহাস নেয়া হয়
2) শারীরিক পরীক্ষা করা
3) স্রাব পরীক্ষা
4) চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা
5) প্রতিরোধক বাবস্থাপনা
6) মাকে পরামর্শ প্রদান করা
7) স্বাস্থ্য শিক্ষা
গর্ভকালীন ইতিহাস গ্রহণ বর্তমান গর্ভাবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ কী না জানতে মায়ের সাধারণ তথ্য নেয়া হয়, যেমনঃ
নাম ও বয়স, ঠিকানা, স্বামীর নাম ও পেশা ।
বর্তমান গর্ভের তথ্যঃ শেষ মাসিকের তারিখ, বর্তমানে কোনো সমস্যা ।
পূর্ববর্তী প্রসব সংক্রান্ত ইতিহাসঃ সন্তান সংখ্যা, প্রসব তারিখ, প্রসবের স্থান, প্রসব হতে কত সময় লেগেছিল, কাকে দিয়ে প্রসব করানো হয়েছিল, উচ্চ রক্তচাপ ছিল/আছে কি-না, অজ্ঞান/খিঁচুনি হয়েছিল কি-না, কোনো চিকিৎসা সেবা পেয়েছিল কি-না, প্রসবের ধরণ (স্বাভাবিক/সিজারিয়ান সেকশন), প্রসবোত্তর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছিল কি-না ইত্যাদি ।
বর্তমানে কোনো জটিলতা আছে কি-না, যেমনঃ
যমজ গর্ভ
গর্ভস্থ শিশু ও প্ল্যাসেন্টা (গর্ভফুল) এর অবস্থান
উচ্চ রক্তচাপ
ডায়াবেটিস
জন্ডিস
হৃদরোগ
ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা আছে কি-না –
বয়স – ১৮ এর কম অথবা ৩৫ বছর এর বেশি
মায়ের উচ্চতা ৪ ফুট ১০ ইঞ্চির কম হলে
প্রথম গর্ভ বা ৪ এর অধিক সন্তান
পূর্ববর্তী প্রসবে–প্রসবপূর্ব রক্তক্ষরণ, প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ অথবা জরায়ুতে গর্ভফুল আটকে থাকার ইতিহাস
দীর্ঘায়িত/বাধাপ্রাপ্ত প্রসবের ইতিহাস
সময়ের পূর্বে পানি ভেঙে যাওয়া
গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু/নবজাতকের মৃত্যুর ইতিহাস
রক্তস্বল্পতা
যৌনবাহিত রোগ
সাধারণ শারীরিক পরীক্ষা –
গর্ভবতী মায়ের ওজন বাড়ছে কি-না
রক্তচাপ কত, হাত-পা ফোলা আছে কি-না
রক্তস্বল্পতা আছে কি-না
পেট পরীক্ষার মাধ্যমে জরায়ুর উচ্চতা, বাচ্চার অবস্থান ও বাচ্চার হৃদস্পন্দন ঠিক আছে কি-না জানা
রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা –
রক্তস্বল্পতা, রক্তের গ্রুপ ও প্রস্রাব পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়
গর্ভকালীন সেবার প্রয়োজনীয়তা
ডাক্তার বা স্বাস্থ্য সেবাদান কর্মী সঠিকভাবে বলে দিতে পারবেন যে গর্ভধারণ হয়েছে কিনা।
সেবাদানকারী সন্তানের বয়স সঠিকভাবে নির্ণয় করে সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ বলে দিতে পারবেন। এতে সন্তান নির্দিষ্ট সময়ের আগে বা পরে জন্ম হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।
গর্ভবতীর কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে ডাক্তার এ সময়ে চিকিৎসা দিতে পারবেন।
সময়মত টিকা নেয়া যাবে।
সেবা দানকারী বা ডাক্তার গর্ভবতীকে সঠিক ও সুষম খাবারের তালিকা দিতে পারবেন। যাতে একটি সুস্থ সন্তান জন্ম লাভ করে।
সেবাদানকারী বা ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার স্থান নির্বাচন করা যায়। এজন্য কত টাকা লাগতে পারে, যাতায়াত, রক্তের প্রয়োজনীয়তা, হাসপাতালের অবস্থানের সময়কাল ইত্যাদি বিষয়ে উপদেশ ও পরামর্শ পাওয়া যায়।
পুরো গর্ভাবস্থায় যদি কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সমস্যা দেখা দেয়, তা প্রথম থেকেই নির্ণয় করে সঠিক সময়ে সঠিক সেবা নেয়া যায়।
কিভাবে বুঝবেন গর্ভের সন্তান সুস্থ আছে
গর্ভধারণের ১৮-২০ সপ্তাহ পর হতে একজন মা, বাচ্চার নড়াচড়া বুঝতে পারেন। পেটে বাচ্চার নড়াচড়া বাচ্চার সুস্থতা সম্বন্ধে ধারণা দিয়ে থাকে। একটি সুস্থ বাচ্চা স্বাভাবিক পরিমাণ নড়াচড়া করে থাকে। এই নড়াচড়ার সংখ্যা হলো ১২ ঘন্টায় ১০ বার। আপনি ১২ ঘন্টায় ১০ বার নড়াচড়া পেয়ে থাকলে আপনার বাচ্চা সুস্থ আছে মনে করতে পারবেন। আপনি যদি ১২ ঘন্টায় ১০ বার না পেয়ে ৬-৮ বার নড়াচড়া পেয়ে থাকেন, তবে অবশ্যই আপনার ডাক্তারের সাথে দেখা করবেন।
জরুরি প্রসূতি সেবা
জরুরি প্রসূতি সেবা হলো জরুরি ভিত্তিতে প্রদানযোগ্য জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা ব্যবস্থা বা সেবা যার মাধ্যমে প্রসবজনিত জটিলতার (Obstetric Complications) কারণে মহিলাদের মৃত্যু ও অসুস্থতা থেকে রক্ষা করা যায়।
নিরাপদ প্রসব ব্যবস্থা ও এর জন্য পরিকল্পনা
প্রসব একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, কিন্তু মনে রাখতে হবে, যে কোনো মুহূর্তে জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। যদি অদক্ষ এবং অপরিচ্ছন্নভাবে প্রসব করানো হয় তবে মা ও শিশু উভয়ের প্রসবকালীন সংক্রমণ এবং শিশুর টিটেনাস হতে পারে। সবকিছু স্বাভাবিক হলেও এসময়ে যত্নের প্রয়োজন রয়েছে।
প্রসবের সময়ে যত্ন নেয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে –
সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া।
যতটুকু সম্ভব মা ও শিশুর কম আঘাতের মাধ্যমে প্রসব সম্পন্ন করা।
যে কোনো ধরনের জটিলতাকে মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকা।
শিশুর যত্ন নেয়া, যেমন: শ্বাস-প্রশ্বাস সঞ্চালনে সহায়তা, নাড়ির যত্ন, চোখের যত্ন ইত্যাদি আর এসবই শিশুর সংক্রমণ রোধ ও সুস্থতার জন্য প্রয়োজন।
মা ও শিশুর জীবনের ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ প্রসব ব্যবস্থা এবং পরিকল্পনা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিবারের সদস্যদের প্রসবকালীন সময়ে করণীয়, প্রসূতি ও নবজাতকের তাৎক্ষণিক যত্ন ও জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পূর্বপ্রস্তুতি থাকা জরুরি ।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা ক্লিনিকে প্রসব করানোই নিরাপদ। এখানে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সেবাদানকারীরা থাকেন এবং যেকোনো জরুরি অবস্থা মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থাকে, তাই আগে থেকে কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, ক্লিনিকে বা হাসপাতালে প্রসব করাবে তা ঠিক করে রাখতে হবে।
জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাবার জন্য যানবাহনের বাবস্থা রাখতে হবে।
২/৩ জন রক্তদাতা ঠিক করে রাখতে হবে।
গর্ভাধারণের শুরু থেকেই টাকা-পয়সা জমিয়ে রাখতে হবে।
যদি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা ক্লিনিকে প্রসব করানো সম্ভব না হয়, তবে সেক্ষেত্রে বাড়িতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ধাত্রী বা স্বাস্থ্যকর্মীকে দিয়ে প্রসব করাতে হবে। এজন্য তার সাথে আগে থেকেই যোগাযোগ করে রাখতে হবে ।
বাড়িতে প্রসব হলে প্রসব সরঞ্জাম যেমন, পরিষ্কার সুই -সূতা, সাবান, শুকনা সূতি কাপড় /তোয়ালে, ব্যান্ডেজ , ক্লিপ সংগ্রহ করে রাখতে হবে। প্রসবের জায়গা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে।
প্রসবকালীন সময়ে যে কোনো জাতিলতা দেখা দিলে গর্ভবতীকে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।
প্রসব পরবর্তী সেবা
প্রসবের পর মা ও শিশুর নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা, উপযুক্ত উপদেশ এবং ব্যবস্থাপনা দেয়াকে প্রসব পরবর্তী সেবা বলে। প্রসবের পরে একজন প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে। কারণ, প্রসবের পর মায়ের জরায়ু ও অন্যান্য প্রজনন অঙ্গ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে সাধারণত ৬ সপ্তাহ সময় লাগে। এই সময়কালকে পিউরপেরিয়াম (Pureperium) বলে। পিউরপেরিয়াম সময়ে মায়ের প্রসবোত্তর স্বাস্থ্যসেবা দেয়া প্রয়োজন।
প্রসূতিকালীন সময়ের সংক্রমণ প্রতিরোধ করা।
মায়ের সুস্থ স্বাস্থ্য বজায় রাখা।
শিশু মায়ের স্তন্যপান করছে কি না তা পরীক্ষা করা।
পরিবার পরিকল্পনার উপদেশ দেয়া।
মা ও পরিবারকে শিশুর যত্নের উপদেশ দেয়া।
শিশুকে টিকাদানের পরামর্শ দেয়া।
প্রসব পরবর্তী সেবার সময়সূচি।
প্রসব পরবর্তী সময়ের বিপদ চিহ্ন
জ্বর
উচ্চ রক্তচাপ
বুকে ব্যথা ও শ্বাস কষ্ট
যোনিপথে পেসাব পায়খানা আসা
পেটে ব্যথা
দুর্গন্ধ যুক্ত স্রাব।
যোনিপথে কিছু নেমে আসা।
অদক্ষ দাইয়ের হাতে ৫৩ ভাগ প্রসব
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩১ লাখ মা সন্তান প্রসব করেন। এর মধ্যে ৪৭ শতাংশ হয় হাসপাতাল-ক্লিনিকে আর ৫৩ শতাংশ বাসাবাড়িতে। অর্থাৎ বাসাবাড়িতে অদক্ষ দাইয়ের হাতে হচ্ছে ১৬ লাখ ৪৩ হাজার প্রসব। ফলে দেশে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রতি লাখে ১৭২ মায়ের মৃত্যু হয়। সেই হিসাবে প্রতিবছর মারা যাচ্ছেন সাড়ে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার প্রসূতি মা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে এমনটাই উঠে এসেছে।
আর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, অপ্রশিক্ষিত দাইয়ের হাতে সন্তান প্রসব, অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে ও অপুষ্টিজনিত কারণে মাতৃমৃত্যুর হার কমছে না। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে এখনো নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত হয়নি। নিরাপদ হয়ে ওঠেনি প্রসূতিসেবা। মাতৃমৃত্যু হার কমাতে হলে প্রসূতিরা যাতে সঠিক প্রসবসেবা পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। দেশে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। এ ছাড়া জনসচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ২৮ মে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস পালন করা হচ্ছে।
আজ মঙ্গলবার নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস। এ উপলক্ষে দেশের সব সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জেলা-উপজেলা হাসপাতাল, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে র‌্যালি, আলোচনাসভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে আজ দুপুরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, দেশের প্রায় ১৬ শতাংশ মা প্রসবকালীন জটিলতায় কোনো সেবা পান না। একই চিত্র প্রসবপরবর্তী সেবার ক্ষেত্রেও। এর মধ্যে অপুষ্টিজনিত মাতৃমৃত্যুর ২০ ভাগই ঘটে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও রক্তস্বল্পতার কারণে। যার অন্যতম কারণ আবার কিশোরী মাতৃত্ব। এদিকে সংস্থাটির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো দেশে ১৫ শতাংশের বেশি সিজার হবে না। অথচ আমাদের দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এ হার কয়েকগুণ বেশি।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের বুলেটিনে বলা হয়েছে, দেশের সরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান ডেলিভারির হার ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ। আর বেসরকারি হাসপাতালে এ হার ৭৩ শতাংশ এবং এনজিও ক্লিনিকে ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ বেসরকারি হাসপাতাল ও এনজিও ক্লিনিকে গড়ে ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ শিশু সিজারের মাধ্যমে জন্ম নিচ্ছে। অধিক অর্থের লোভে বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় বেশি সিজার করানো হচ্ছে। আর অপ্রয়োজনীয় সিজারে ক্ষতি হচ্ছে প্রসূতি মায়েদের ভবিষ্যৎ। এটিও নিরাপদ মাতৃত্বের ক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয় বলে জানান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে আমাদের দেশে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২১ জন। আমাদের এসডিজি অর্জন করতে হলে মাতৃমৃত্যর হার প্রতি লাখে ৭০ জন এবং শিশুমৃত্যুর হার ১২-তে নামিয়ে আনতে হবে।
এ কারণে সরকার মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, বাড়িতে অদক্ষ প্রসব সহায়তাকারীরা প্রসূতি মায়ের বিপদ চিহ্নগুলো শনাক্ত করতে না পারায় এবং সময়মতো হাসপাতালে রেফার না করায় মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কাক্সিক্ষত পর্যায়ে কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে হলে বাড়াতে হবে হাসপাতালে প্রসবের হার। মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গাইনি বিভাগের অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম বলেন, ‘মাতৃমৃত্যুর হার না কমার জন্য দায়ী অদক্ষ দাইয়ের হাতে প্রসব। দেশে এখনো বেশির ভাগ প্রসব হচ্ছে বাসাবাড়িতে দাইদের হাতে। কিন্তু দাইরা সব প্রসব হ্যান্ডেল করতে পারে না। মায়ের যেসব ঝুঁকি থাকে, তারা সেটা জানে না। সব দাই আবার প্রশিক্ষিতও নয়। ফলে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত হচ্ছে না।’ অবস্ট্রেটিক্যাল অ্যান্ড গাইনিকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সদ্যবিদায়ী এ মহাসচিব বলেন, ‘নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে হলে হাসপাতালে প্রসবের হার বাড়াতে হবে। মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে। তা না হলে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না।’

সম্পাদনা: অর্ণব পাল সন্তু

Close