অর্থ ও বাণিজ্যনাগরিক মতামত

আসছে গরিব মারার বাজেট

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সপক্ষে উচ্চারিত একটি অন্যতম যুক্তি ও স্লোগান ছিল -No taxation without representation।’ অর্থাৎ ‘প্রতিনিধিত্বশীলতা ব্যতিরেকে কোনো করারোপ নয়।’ ব্রিটিশ রাজত্বে থাকলে আমেরিকাবাসীদের ‘প্রতিনিধিত্বের’ কোনো সুযোগ নেই। তাই ব্রিটেনের রাজাকে কর দেওয়া বন্ধ করে আমেরিকাকে স্বাধীন করার মাধ্যমে ‘প্রতিনিধিত্বশীলতা’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তার পরই ‘প্রতিনিধিত্বশীল সরকার’ করারোপের নৈতিক অধিকারী হতে পারবে। শিগগিরই বাংলাদেশের সংসদে পরবর্তী অর্থবছরের বাজেট পেশ হবে। সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত বাজেট অনুযায়ী জনগণের ওপর করারোপ করা হবে।
কিন্তু এই সংসদ ‘প্রতিনিধিত্বশীল’ নয় এবং সে কারণে তার পক্ষে জনগণের ওপর করারোপের নৈতিক অধিকার নেই যদি সে প্রশ্ন তোলা হয় তা হলে তার বিরুদ্ধে কীই বা বলার থাকতে পারে? একটি দেশের জাতীয় বাজেট হলো পরবর্তী অর্থবছরের জন্য (জুলাই মাস থেকে পরবর্তী জুন মাস পর্যন্ত) রাষ্ট্রের (তথা সরকারের) আয় ও ব্যয়ের পরিকল্পিত হিসাবের আনুষ্ঠানিক বিবরণী।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচিত সংসদই কেবল জাতীয় বাজেট প্রণয়নের ক্ষমতা রাখে। সেই বাজেটকে ভিত্তি করে সরকার পরবর্তী অর্থবছরের জন্য কর, শুল্ক, লেভি ইত্যাদি ধার্য ও সংগ্রহ করার এবং নির্দিষ্ট খাতগুলোতে খরচের জন্য অর্থ বরাদ্দ করার আইনগত অধিকার লাভ করে। এ ক্ষেত্রে আজ একটি গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন হলো বর্তমান সংসদের অধিকাংশ সদস্যই জনগণের সম্মতি ও অনুমোদন ছাড়াই ‘নৈশকালীন ভোটে’ ‘সংসদ সদস্য(!)’ হয়েছেন।
এ কারণে এই সংসদের প্রতিনিধিত্বশীলতা গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ‘No taxation without representation’ -এর নীতি এ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলে অবস্থাটি তা হলে কী দাঁড়াবে? এবারের বাজেট পেশ করা হচ্ছে এমন এক সময়ে যখন কিনা দুটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা দেশের অর্থনীতির রুগ্নতাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।
সম্প্রতি কৃষকের ঘরে যে বোরো ধান উঠেছে, সেই ‘রক্তে বোনা ধান’ উৎপাদন করার জন্য কৃষককে যে খরচ বহন করতে হয়েছে, সেই ধানই তাকে মণপ্রতি কমপক্ষে ৩-৪শ টাকা কম দামে বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। কৃষক এবার ৫০ কোটি মণেরও বেশি পরিমাণ বোরো ধান উৎপাদন করেছে। এই হিসাব অনুসারে, এ বছর বোরো চাষির মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা, যা কিনা আমাদের চলতি বছরের মোট বাজেটের ৫ শতাংশের বেশি।
এটি শুধু এক বছরে এবং কেবল বোরো ফসল থেকে কৃষকের বঞ্চনার হিসাব। বছরজুড়ে নানা পন্থায় কৃষককে যে বিশাল পরিমাণ সম্পদ থেকে বঞ্চিত করা হয়, তা এই একটি হিসাব থেকেই অনুমান করা যায়। সেই বিপুল অর্থ পুনর্বণ্টিত (redistributed) হয়ে চলে যাবে দেশের মুষ্টিমেয় বিত্তবানদের হাতে। অপর ঘটনাটি হলো, রূপপুর পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রকাশ হয়ে পড়া একটি ব্যয়বিবরণী।
এই বিবরণীতে কর্মকর্তাদের বাসস্থানের জন্য একেকটি বালিশের পেছনে খরচ দেখানো হয়েছে ৬ হাজার টাকার ওপর। এটি একটি বিস্ময়কর পরিমাণ। দেশের একশ্রেণির মুষ্টিমেয় মানুষ যে কতটা উলঙ্গভাবে ও কী বিপুল পরিমাণে লুটপাট করে চলেছে, সে চিত্রটি এই একটি মাত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। দুটি ঘটনাকে একসঙ্গে করে লোকমুখে বলাবলি হচ্ছে যে, ‘শায়েস্তা খানের রাজত্বকালে ১ টাকায় ৪ মণ ধান পাওয়া যেত, আর এখন ‘উন্নয়নের’ ঠেলায় একটি বালিশের দামে ১২ মণ ধান পাওয়া যায়।’
প্রশ্ন হলোÑ সংসদে যে বাজেট পেশ হতে যাচ্ছে তা কি একদিকে দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষের ওপর এরূপ কুৎসিত ও ক্রমবর্ধমান শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্য এবং অন্যদিকে মুষ্টিমেয় ব্যক্তি ও পরিবারের বেপরোয়া লুটপাটের দৃশ্যপট ‘বদল করার’ পদক্ষেপ নেবে? নাকি তা এই পরিস্থিতিকেই ‘বহাল রাখার’ গতানুগতিক পথেই অগ্রসর হবে? ‘কেউ খাবে আর কেউ খাবে না’র মতো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বাস্তবতা বিরাজ করত পাকিস্তান আমলে। সেই ‘বাস্তবতা’ বদল করার স্বপ্ন নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম।
প্রশ্ন হলো, এই বাজেট কি সেই ‘দিনবদলের স্বপ্ন’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রচিত হবে? নতুন অর্থমন্ত্রী তার নানা বক্তব্য দ্বারা বেশ পরিষ্কারভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন না, তা হবে না। ‘ধনী আরও ধনী, গরিব আরও গরিব’ হওয়ার এবং বৈষম্য বৃদ্ধির যে প্রক্রিয়া গত সাড়ে চার দশক ধরে চলছে সেটিকেই তিনি আরও ‘দক্ষতার সঙ্গে’ কার্যকর করবেন। বর্তমানে অর্থনীতিতে যে ‘বৈষম্য বৃদ্ধির’ ধারা চলছে তা বন্ধ করতে হলে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও অংশের মানুষের মধ্যে সম্পদ পুনর্বণ্টনের বর্তমান ধারাটি আমূলে উল্টিয়ে দিতে হবে।
বর্তমানে বাজেটের মাধ্যমে ‘গরিব থেকে ধনী’ অভিমুখী সম্পদ পুনর্বণ্টন ঘটে থাকে। সাড়ে চার দশক ধরে সে রকমই হচ্ছে। বাজেট সেই ধারাতেই রচিত হয়। এই প্রক্রিয়া বদলে দিয়ে ‘ধনী থেকে গরিব’ অভিমুখী সম্পদ পুনর্বণ্টন ঘটাতে হলে বাজেটের মৌলিক দর্শন ও চরিত্রের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সম্পদ পুনর্বণ্টনের ক্ষেত্রে ‘গরিব-অভিমুখিনতার’ পথ গ্রহণ করতে হবে।
এ পথই ছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের পথ। কিন্তু এযাবৎকালের সরকারগুলো লুটেরা ধনিকের স্বার্থের রক্ষক হওয়ায় তারা উল্টো পথে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। বাজেটের শ্রেণি অভিমুখিনতার এই বিষয়টি নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য না করলেও ক্ষমতাসীনদের মুখে বাজেটের সাইজ নিয়ে হৈচৈয়ের কোনো শেষ নেই। এবারও ইতোমধ্যে সে রকমটিই করা শুরু হয়ে গেছে। অথচ ‘বাজেট-সাইজের’ বিষয়টি বাজেটের চরিত্রের নির্ধারক কোনো বিষয় নয়। এ কথা ঠিক যে, সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা দুনিয়ার নব-উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি-দর্শন অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের সরাসরি অবদান ও অংশগ্রহণকে নাকচ করে থাকে। বলা হয়ে থাকে, ‘অর্থনৈতিক কাজ পরিচালনা করা সরকারের কাজ নয়’ (Govt. has no business to do business)।
শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রযন্ত্রকে বড় করার ঘোরতর বিরোধিতা করা হয়ে থাকে। বলা হয়, ‘সেই সরকারই শ্রেষ্ঠ, যেটি সবচেয়ে ছোট’ (That govt. is best, which is the smallest)। রাষ্ট্রের ভূমিকাকে নাটকীয়ভাবে খর্ব করে অর্থনীতি ও সমাজের চালিকাশক্তি হিসেবে ‘ব্যক্তি খাত’ ও ‘বাজারের শক্তি’র একচ্ছত্র আধিপত্যের নীতি ও কর্মপন্থা হাজির করা হয়ে থাকে।
সেই যুক্তিতে বাজেটের সাইজ যথাসম্ভব ছোট হওয়ারই কথা। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তাদের পক্ষে ‘ছোট বাজেট’ করা সম্ভব হয় না। কারণ ধনিক-তোষণ নীতি অনুসরণের ফলে সমাজে বৈষম্য, শোষণ, শ্রেণি-দ্বন্দ্ব ও অর্থনৈতিক-সামাজিক নৈরাজ্য অবধারিতভাবে প্রসারিত হয়। তা দমন করার জন্য সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন শোষক শ্রেণি তাদের দমন-পীড়ন আরও বাড়াতে বাধ্য হয়। এ কাজটি রাষ্ট্রযন্ত্রকে কাজে লাগিয়েই তাদের করতে হয়। শোষিত জনগণের বিরুদ্ধে দমনমূলক তৎপরতা বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে আরও বড় করতে হয়।
রাষ্ট্রকে ছোট করার বদলে রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করা তাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এজন্য তাদের রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও জনকল্যাণমুখী কাজ সংকুচিত করে তার দমন-পীড়নমূলক কাজ বাড়াতে হয়। এসব কারণে তাদের পক্ষে বাজেটের সাইজ কমিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যে বাজেট পেশ করেছিলেন তার পরিমাণ ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা।
আর এবারের বাজেটের পরিমাণ ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ ১৯৭২-৭৩ সালের বাজেটের তুলনায় তা প্রায় ৬০০ গুণ বেশি হতে যাচ্ছে। এ কথা ঠিক যে, গত সাড়ে চার দশকে এ দেশে কিছু লোকের সম্পদের পরিমাণ কয়েক হাজার গুণেরও বেশি বেড়েছে। কিন্তু এই বিত্তবান ১ শতাংশ মানুষের অকল্পনীয় সম্পদ-স্ফীতি ঘটলেও অবশিষ্ট ৯৯ শতাংশ দেশবাসীর আয়-উপার্জন (প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা) বৃদ্ধির পরিমাণ নিতান্তই সামান্য। এই ৯৯ শতাংশের প্রাপ্তি ‘চুইয়ে পড়া ছিটেফোঁটা’র চেয়ে বেশি কিছু নয়।
তাজউদ্দীন সাহেবের বাজেটের সঙ্গে গত সাড়ে চার দশকের অর্থমন্ত্রীদের পেশকৃত বাজেটের তফাতটি শুধু পরিমাণগতভাবে ৬০০ গুণ এদিক-ওদিক হওয়ার বিষয়ই শুধু নয়। এই দুই বাজেটের দর্শনগত ভিত্তি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। ত্রুটি-দুর্বলতা সত্ত্বেও তাজউদ্দীন সাহেবের বাজেট ছিল সমাজতন্ত্রমুখী। মুক্তিযুদ্ধের ধারার। আর বর্তমান অর্থমন্ত্রীর বাজেট হতে যাচ্ছে সমাজতন্ত্র অভিমুখীর বদলে পুঁজিবাদের নয়া-উদারবাদী ধারার।
এই ধারা হলো মুক্তিযুদ্ধের পরিপন্থী ধারা। অথচ এই ধারায়ই বাজেট রচিত হয়ে চলেছে গত সাড়ে ৪ দশক ধরে। বিদ্রোহ যদি করতে হয় তা হলে তা করা উচিত বাজেটের এই মুক্তিযুদ্ধের পরিপন্থী ধারার বিরুদ্ধে। বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির দিকে এবার একটু নজর দেওয়া যাক। সে ক্ষেত্রেও গতানুগতিকভাবে একই গণবিরোধী ধারা চলছে। দেশে বছর বছর বাজেট প্রণয়নের কাজটি মূলত ‘অ্যাকাউন্টেন্সির’ দৃষ্টিকোণ থেকেই করা হয়ে থাকে। নতুন কোনো দর্শন, নীতি, প্রেক্ষিত ইত্যাদির ভিত্তিতে সার্বিকভাবে গোটা বাজেট রচনা করা হয় না।
আর্থ-সামাজিক দিকদর্শনের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর ধরে একই ধারা অব্যাহত রাখা হচ্ছে বলে বাজেটের পুরনো ভিত্তি ও কাঠামো বদলানোর প্রয়োজন হয় না। পুরনো বাজেটের এখানে একটু পরিমাণ বাড়িয়ে, ওখানে একটু কমিয়ে, পুরনো কিছু বাদ দিয়ে, নতুন কিছু যোগ করে, জমা-খরচের হিসাব মিলিয়ে দিতে পারলেই বাজেট প্রণয়নের কাজ ‘সফল’ হয়েছে বলে গণ্য করা হয়। অনেকটা কম্পিউটারে ‘কাট অ্যান্ড পেস্ট’ করে নতুন লেখা তৈরির মতো ব্যাপার। দক্ষ আমলাদের হাতেই মূলত গোটা কাজটি সম্পাদিত হয়। এ রকমই চলছে সাড়ে চার দশক ধরে।
অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। আমরা স্বাধীন দেশে সমাজতন্ত্র অভিমুখী পথ অনুসরণ করব এটিই ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার। দীর্ঘদিনের গণসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জাতি এই পথ বেছে নিয়েছিল। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান এই পাঁচটি মৌলিক চাহিদা পূরণ করা এবং সক্ষম সব মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করাটি যে সমাজের এবং সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রের দায়িত্বÑ সেই চল্লিশ-পঞ্চাশের দশক থেকে এই দাবি ব্যাপকভাবে উত্থাপিত ও উচ্চারিত হয়েছিল।
’৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ব্যাংক-বীমা ও বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণের দাবি। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, পরিকল্পিত অর্থনীতি, সমবায়, ভূমি সংস্কার ইত্যাদি দাবিও ক্রমান্বয়ে গণদাবি হিসেবে সংযুক্ত হয়েছিল। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তি ঐতিহাসিক ১১ দফাতেও এসব কর্মসূচি ও দাবি স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ ছিল। ’৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের ইশতেহারেও সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যসহ এসব কর্মসূচির কথা ছিল। গণসংগ্রামের এই ধারাবাহিকতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করেই রচিত হয়েছিল আমাদের সংবিধান।
এসব বিষয়ে কী লেখা আছে সেই সংবিধানে? সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ‘যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে… প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিলÑ জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।’ প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হইবে… এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠাÑ যেখানে … রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি প্রসঙ্গে ১০ম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত, ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’
সম্পদের মালিকানা সম্পর্কে সংবিধানের ১৩তম অনুচ্ছেদে মালিকানা তথা ‘জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রীয়’ মালিকানাকে প্রাধান্য দিয়ে সমবায়ী মালিকানাকে তার পর এবং ব্যক্তিমালিকানাকে আইনের দ্বারা সীমাবদ্ধকৃত অবশিষ্টাংশ সম্পদ (residual) হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। সংবিধান থেকে এ ধরনের আরও অসংখ্য দ্ব্যর্থহীন বিধানের উদ্ধৃতি দিয়ে স্পষ্টভাবে দেখানো যায়, কোনো ধরনের অর্থনৈতিক নীতি ও লক্ষ্য অনুসরণের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল। কিন্তু সাড়ে চার দশক ধরে ক্ষমতাসীনরা সেই দিকনির্দেশনা লঙ্ঘন করে উল্টো ধারায় দেশ চালাচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশিত পথ থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণেই ক্রমাগতভাবে এখন গরিবের এবং গরিবের সৃষ্ট সম্পদ ধনীর পকেটে চলে যাচ্ছে। এখনো ‘রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি’ অব্যাহত আছে। যদি মুক্তিযুদ্ধের পথ অনুসরণ করা হতো এবং সেই ধারায় বছর-বছর বাজেট রচিত হতো তা হলে এমনটি হতে পারত না। সেটি করা হলে ধনী কর্তৃক লুটে নেওয়া সম্পদ গরিবের মঝে পুনর্বণ্টনের প্রক্রিয়া অগ্রসর হতো।
তাই বাজেটের মৌলিক নীতি-আদর্শ-দর্শনগত ভিত্তিকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে আনাটি জনগণের সামনে এখন মুখ্য কর্তব্য। সে কর্তব্য সম্পাদন করার মধ্য দিয়েই ‘গরিব মারার বাজেটের’ যুগের অবসান ঘটানো সম্ভব। বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close