নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

ফ্যাসিবাদ নিয়ে কিছু কথা

শামছুজ্জামান সেলিম

ইদানিং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটি ঘন ঘন উচ্চারিত হতে শোনা যায়। বিশেষ করে রাজনীতির বাম মহলের চীনাপন্থি বলে পরিচিত মহলে ফ্যাসিবাদ শব্দটি ব্যাবহৃত হয় যত্রতত্র। ‘ফ্যাসিবাদ’ রাজনীতি বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু এবং এই শব্দটি গুরুত্ব সহকারে সংজ্ঞায়িত হয়েছে গত শতাব্দির ত্রিশের দশকে।
বিংশ শতাব্দির ত্রিশের দশকের শুরুতে হিটলারের ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল(নাৎসি)’ জার্মানিতে ব্যাপক ভোটে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় এসেই হিটলার নজির বিহিন দমন পীড়ন শুরু করেন বিরোধীদের ওপর, বিশেষ করে কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রীদের ওপর। ইউরোপে বিরোধী রাজনৈতিক দল সমুহের ওপর এ জাতীয় দমন পীড়নের নজির অতীতে কখনো দেখা যায় নি। আধুনিক গণতন্ত্রের পিতৃভুমি পশ্চিম ইউরোপে ‘রাষ্ট্র’ বিরোধী রাজনীতিকদের নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করে হত্যা করতে পারে তা আগে কেউ ভাবতে পারে নি-তাও আবার সমাজতন্ত্রের নামে। সে সময় জার্মানীর কমিউনিস্ট পার্টি খুবই শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ছিল। জার্মান কমিউনিস্ট পার্টি এবং সোসালডেমোক্র্যাট পার্টি জোট গঠন করলে সহজেই ক্ষমতায় যেতে পারতো। কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে অনৈক্যের কারণে সমাজে যে অস্থিরতার সৃস্টি হয় তার সুযোগ নিয়ে হিটলার ক্ষমতায় আসতে পেরেছিল।
হিটলার এবং তার নাৎসি পার্টি কোন্ ধরণের, কোন্ চরিত্রের এবং কোন আদর্শের দল তা নিয়ে ঐ সময়ে বেশ বিভ্রান্তি সৃস্টি হয়েছিল কমিউনিস্টদের মধ্যে। ১৯৩৫ সালের ২ আগস্ট মস্কোতে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সপ্তম বিশ্ব কংগ্রেস শুরু হয়। এই কংগ্রেসে বুলগেরিয়ার কমিউনিস্ট নেতা জর্জি দিমিত্রভ রির্পোট উত্থাপন করেন। এই রিপোর্টে প্রথম ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা নির্দিষ্ট করা হয়।
দিমিত্রভ তার রিপের্টে বলেন,‘সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল, সবচেয়ে জাতিদাম্ভিক এবং লগ্নী পুঁজির সবচেয়ে সা¤্রাজ্যবাদী প্রতিভুর প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্ব হলো’ ফ্যাসিবাদ। এই রিপোর্টে দিমিত্রভ আরো বলেন,‘ফ্যাসিবাদের ক্ষমতা লাভ এক বুর্জোয়া সরকার থেকে অপর এক সরকারের মামুলী উত্তরণ নয়, এ হলো বুর্জোয়াদের শ্রেণি কর্তৃত্বের একটি রাষ্ট্রীয় রূপ, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের যায়গায় অন্য এক রাষ্ট্রীয় রূপের প্রকাশ্য সন্ত্রাসমূলক এক নায়কত্বের প্রতিষ্ঠা’।
১৯৩৫ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তজার্তিকের সপ্তম কংগ্রেসের রিপোর্টে জর্জি দিমিত্রভ ফ্যাসিবাদের উদ্ভব, তার চরিত্র, তার ক্ষমতা লাভের বাস্তব কারণ এবং ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করার জন্য করনীয সমুহ সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আগ্রহী পাঠক ইচ্ছে করলে এই রিপোর্ট পড়ে নিতে পারেন। আমি শুধু জনগণের ওপর ফ্যাসিবাদের প্রভাবের উৎস কী সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করে শেষ করতে চাই। দিমিত্রভ তাঁর রেপোর্টে উল্লেখ করেছেন, ‘ফ্যাসিবাদ জনগণকে আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এই কারণে যে, জনগণের সব চেয়ে জরুরী প্রয়োজন ও দাবিগুলির কাছে সে মহাবাগাড়ম্বে আবেদন করে। ফ্যাসিবাদ শুধু জনগণের মধ্যে গভীরভাবে বদ্ধমূল সংস্কারগুলিকেই উস্কিয়ে দেয় না, উপরন্তু তাদের অপেক্ষাকৃত উন্নততর অনুভুতি গুলি, যেমন তাদের ন্যায় বিচারের চেতনাকে, এমনকি কখনো কখনো তাদের বিপ্লবী ঐতিহ্যকেও কাজে লাগায়….নিজেদের “সমাজতন্ত্রী” বলেও পরিচয় দেয় এবং তাদের ক্ষমতা দখলকে বিপ্লব বলে বর্ণণা করে’।
আমাদের দেশের রাজনীতিতে ‘ফ্যাসিবাদের’ ধারণাকে ব্যাবহার করার সময় নিশ্চয়ই তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত এবং চরিত্রকে বিবেচনায় নেয়া হবে বলে আশা করতে পারি।

Close