জাতীয়পাবনাশিরোনাম

ঈশ্বরদীতে শেখ হাসিনার ট্রেনে হামলা: ৯ জনের ফাঁসি ২৫ জনের যাবজ্জীবন

শফিক আল কামাল,পাবনা প্রতিনিধি: দীর্ঘ ২৫ বছর পর পাবনার ঈশ্বরদীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার ট্রেন বহরে গুলিবর্ষণ ঘটনার মামলায় বুধবার (৩ জুলাই) রায় ঘোষনা করেছেন পাবনার স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-৩ আদালত।
মামলার ঘোষিত রায়ে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে ৯ জনের ফাঁসি, ২৫ জনের যাবজ্জীবন ও ১৩ জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করেছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক (ভারপ্রাপ্ত) মো. রোস্তম আলী। এছাড়াও যাবজ্জীবন সাজা প্রাপ্তদের ৩ লক্ষ টাকা এবং ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্তদের ১ লক্ষ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। বুধবার দুপুর ১২ টায় পাবনার অতিরিক্ত দায়রা ও জজ আদালত-৩ এজলাস থেকে এই রায় ঘোষণা করা হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন; জেলার ঈশ্বরদী পৌরসভার সাবেক মেয়র, পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি মোখলেছুর রহমান বাবলু, পাবনা জেলা বিএনপির মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক একেএম আকতারুজ্জামান, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু, পৌর যুবদলের সভাপতি মোস্তফা নুরে আলম শ্যামল, বিএনপি নেতা মাহবুবুর রহমান পলাশ, শামসুল আলম, শহিদুল ইসলাম অটল, রেজাউল করিম শাহীন ও আজিজুর রহমান শাহীন।
যাবজ্জীবনপ্রাপ্তরা হলেন; আমিনুল ইসলাম (পলাতক), আজাদ হোসেন ওরফে খোকন, ইসমাইল হোসেন জুয়েল, আলাউদ্দিন বিশ্বাস, শামসুর রহমান শিমু, আনিসুর রহমান সেকম (পলাতক), আক্কেল আলী, মো. রবি (পলাতক), মো. এনাম, আবুল কাশেম হালট (পলাতক), কালা বাবু (পলাতক), মামুন (পলাতক), মামুন ২(পলাতক), সেলিম, কল্লোল, তুহিন, শাহ আলম লিটন, আব্দুল্লাহ আল মামুন রিপন, লাইজু (পলাতক), আব্দুল জব্বার, পলাশ, হাকিম উদ্দিন টেনু, আলমগীর, আবুল কালাম (পলাতক) ও একেএম ফিরোজুল ইসলাম পায়েল।
এছাড়াও ১০ বছর করে সাজা প্রদান করা হয়েছে ঈশ্বরদী উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নেফাউর রহমান রাজু, ঈশ্বরদী পৌরসভার কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন জনি, বিএনপি নেতা রন রিয়াজী (পলাতক), আজমল হোসেন ডাবলু, মুক্তার হোসেন, হাফিজুর রহমান ওরফে মুকুল, হুমায়ুন কবির দুলাল, তুহিন বিন সিদ্দিকী, ফজলুর রহমান, চাঁদ আলী (পলাতক), এনামূল কবির, জামরুল (পলাতক) ও বরকত।
মামলার সরকার পক্ষের আইনজীবি পিপি আকতারুজ্জামান মুক্তা বলেন, ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দলীয় কর্মসূচীতে অংশ নিতে আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা খুলনা থেকে সৈয়দপুর যাবার পথিমথ্যে ঈশ্বরদী স্টেশনে যাত্রাবিরতি কালে বিএনপি’র নেতাকর্মিরা ট্রেনে ও তার কামরায় গুলিবর্ষণ করে। এ ঘটনায় ওই সময়ে জিআরপি পুলিশের ওসি নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে ৭ জনের নামে একটি মামলা দায়ের করেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুলিশ মামলাটি পুনঃতদন্ত করে তদন্ত শেষে নতুন করে ঈশ্বরদীর শীর্ষ স্থানীয় বিএনপি. যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মিসহ ৫২ জনকে এই মামলায় আসামী করা হয়। মামলাটি দায়ের হওয়ার পরের বছরে এই মামলায় পুলিশ কোন সাক্ষী না পেয়ে আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করে। কিন্তু আদাল ওই রিপোর্ট গ্রহণ না করে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তর করেন। পরে সিআইডি তদন্ত করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করে। মামলা নং এসটি ৪২/৯৭।
এই মামলার চার্জশীট ভূক্ত আসামীদের মধ্যে গত ৩০ জুন আদালতে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের ৩০ জন নেতাকর্মি আদালতে হাজির হলে বিজ্ঞ বিচারক তাদের জামিন না মঞ্জুর করে জেল হাজতে প্রেরণ করেন। মঙ্গলবার (২ জুলাই) এই মামলার আরও দুই আসামী ঈশ্বরদী পৌরসভার সাবেক মেয়র, পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি মোখলেছুর রহমান ওরফে বাবলু এবং বিএনপি নেতা আব্দুল হাকিম টেনু আদালতে আত্মসমর্পন করে। অন্যদিকে পুলিশ ওইদিন রাতেই এই মামলার আরেকজনকে গ্রেপ্তার করে। এই মামলায় এ পর্যন্ত ৩৩ জন আসামী জেল হাজতে রয়েছে। পলাতক রয়েছে ১৪ জন এবং মারা গেছে ৫ জন।
এই মামলায় আদালতে গত সোমবার রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন পাবনার পিপি অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান মুক্তা ও অ্যাডভোকেট গোলাম হাসনাইন। আসামি পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম গেদা ও অ্যাডভোকেট সনৎ কুমার সরকার। পলাতক আসামিদের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট এ কে এম শামসুল হুদা। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পিপি অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান মুক্তা বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় ঘোষনা করা হলো।
মামলায় রায় ঘোষনার পর বিজ্ঞ বিচারক আদালতে উপস্থিত আসামীদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং যারা পলাতক রয়েছেন, তাদের গ্রেপ্তারের পর থেকে রায়ের কার্যকরিতা শুরু হবে।
মামলায় রায়ের খবর ঈশ্বরদীতে পৌছালে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের উল্লাস করতে দেখা যায়। ঈশ্বরদী পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী মালিথার নেতৃত্বে ঈশ্বরদী শহরে আনন্দ মিছিল হয়। মিছিল শেষে পথসভায় আওয়ামী নেতারা বলেন – এই রায়ের মাধ্যমে ঈশ্বরদীতে সন্ত্রাস মুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে গেল। এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো সন্ত্রাসী এবং সন্ত্রাসীদের আশ্রয়দান কারীরা যত শক্তিশালী হউক না কেন কেউই আইনের উর্ধ্বে নয়। পাবনা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় থেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা একটি মিছিল বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক পদক্ষিণ করে।
এছাড়াও রায়ের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করে সেক্টর কমান্ডারস্ ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ’৭১ পাবনা জেলা শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আ. স. ম. আব্দুর রহিম পাকনের নেতুত্বে একটি র‌্যালি শহরের প্রধান আব্দুল হামিদ সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা জর্জ কার্যালয়ে শেষ হয় এবং জেলা এ্যাডভোকেট বার সমিতির সামনে আলোচনা সভায় অংশ নেন।
রায়ের পর ঈশ্বরদী বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়ীতে শোকের ছায়া নেমে আসে। সাজাপাপ্ত পলাশের স্ত্রী শেফালী খাতুন বলেন- এই রায় আমরা আশা করি নাই। আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব। এদিকে রায়ে উচ্চতর আদালতে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন আসামি পক্ষের আইনজীবি ও জেলা বিএনপির সহ সভাপতি মাসুদ খন্দকার। বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close