শিশু বার্তা

যেভাবে সাইবার অপরাধে জড়াচ্ছে শিশুরা

শিশু বার্তা ডেস্ক: সম্প্রতি রাজধানীর ধানমন্ডির একটি স্কুলের কয়েকজন ছাত্র গ্রুপ স্টাডির জন্য ফেসবুকে একটি পেজ খোলে। সেখানে স্কুলের একজন শিক্ষিকাকে নিয়ে আলোচনা হয় এবং তাকে ব্যঙ্গ করে একটি আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করে তারা। এ নিয়ে ওই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝামেলা হয়। এর জেরে ভিডিওর বিষয়টি ভুক্তভোগী শিক্ষিকার নজরে আসে এবং আইনি পদক্ষেপ নেন তিনি। পুলিশ ঘটনা তদন্ত করে ৩ শিক্ষার্থীকে আটক করে। তবে তাদের সবার বয়স ১৮ বছরের নিচে। মুচলেকা নিয়ে তাদের সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢাকার শ্যামপুরের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতের (ছদ্দনাম) সঙ্গে পরিচয় হয় রায়হান উদ্দিন আহমেদের। একপর্যায়ে পরিচয় ভালোবাসায় গড়ায়। তারা নিজেদের অন্তরঙ্গ ছবি দেওয়া-নেওয়াও শুরু করে। কিছুদিন পর তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরে।
এতে ক্ষুব্ধ রায়হান ফেসবুকে একটি ফেক আইডি খুলে জান্নাতকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে। নিজেদের কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি দেখিয়ে ভাইরাল করার হুমকি দিতে থাকে। একপর্যায়ে বিকাশের মাধ্যমে কিছু টাকাও আদায় করে রায়হান। কিছুদিন পর আবার রায়হান তার দুই বন্ধুকে দিয়ে একই কাজ করায়। এসময় ভুক্তভোগীর বড় বোনকেও ছবি দেখিয়ে হুমকি দেয় তারা। পরে বাধ্য হয়ে তারা বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রায়হানসহ তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে।
এভাবে প্রতিনিয়ত সাইবার অপরাধীদের শিকার হচ্ছে শিশু-কিশোররা। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা নিজেদের অজান্তেই কৌতুহলের বশে জড়িয়ে পড়ছে সাইবার অপরাধে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনে প্রায় ৪০০ শিশু-কিশোর সাইবার অপরাধের শিকার হয়। ভুক্তভোগীরা এ বিষয়ে পরিবারকে জানাতেও ভয় পায়।
সাইবার অপরাধ দমনে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় সব বয়সী শিশুরাই কমবেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। তবে তাদের অনেকেই নিজেকে সুরক্ষিত রেখে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে জানে না। অনলাইনে যৌন নির্যাতন বা যৌন শোষণ সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা নেই শিশুদের। ফলে অনেক সময় নিজের অজান্তেই কিছু ভুল হয়ে যায়। যেমন, অনলাইনে যৌনতা সম্পর্কিত বই পড়া, কাউকে ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া, আইডি হ্যাকিং করা, ভাইরাস ছড়ানো, ফাঁদে ফেলা, পর্নোগ্রাফি তৈরি করা ইত্যাদি। অনেক সময় পছন্দের বিষয় খুঁজতে গিয়ে নিষিদ্ধ সাইট সামনে চলে আসে। কৌতুহলবশত এসব নিষিদ্ধ সাইটে প্রবেশ করে শিশুরা। অনেকেই এগুলোতে আসক্ত হয়ে পড়ে।
তারা বলছেন, এছাড়া কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ও ট্যাব দিয়ে শিশুরা ইন্টারনেটে বিভিন্ন গেম খেলে থাকে। সেই সুযোগে শিশুদের টার্গেট করে সাইবার অপরাধীরা। সেখানে নানা প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে শিশুদের নির্যাতনও করা হচ্ছে।
সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোমলমতি শিশুরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক, জি-মেইল ইত্যাদি) মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক সেজে অ্যাকাউন্ট খুলছে। এতে শিশুরা সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। আবার অনেকে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এসব সাইবার অপরাধ থেকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে হলে বাংলাদেশে ‘অনলাইন চাইল্ড প্রোটেকশন প্ল্যান্ট’ গাইডলাইন চালু করা প্রয়োজন।
ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজমের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের উপ-কমিশনার মো. আলিমুজ্জামান বলেন, ‘সাইবার জগতে শিশু অপরাধীর চেয়ে শিশু ভুক্তভোগীর সংখ্যা বেশি। টেকনোলোজির অবাধ ব্যবহারের কারণে অনেক সময় শিশুরা নিজেদের ইচ্ছায় অথবা সঙ্গদোষ বা ইন্টারনেট আসক্তি থেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আমরা অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসছি। তবে অপরাধীর বয়স ১৮ বছরের নিচে হলে (শিশু) সেক্ষেত্রে নমনীয়তার সঙ্গে মামলাটি দেখা হয়। অনেক সময় শিশু অপরাধীদের ক্ষেত্রে মুচলেকা নিয়ে তাদের সতর্ক করে দেওয়া হয়।’
তিনি বলেন, ‘সাইবার অপরাধ থেকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে হলে প্রথমেই পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে। শিশুরা ইন্টারনেটে বসে কোন সাইটে যাচ্ছে, কী করছে— সে বিষয়ে পরিবারকে নজরদারি করতে হবে।’
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) শিশুদের বিরুদ্ধে অনলাইনে যৌন হয়রানির বিষয়ে একটি জরিপ চালায়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৮ থেকে ১৮ বছরের শিশুদের শতকরা ৩৫ দশমিক ৭ জনের নিজস্ব মোবাইল ফোন রয়েছে। এদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৯ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ১৮-এর মধ্যে। ২৫ দশমিক ২ শতাংশ শিশুর বয়স ১১ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। ৭ দশমিক ৯ শতাংশ শিশুর বয়স ৮ থেকে ১০-এর মধ্যে। জরিপে দেখা গেছে, ছেলেশিশুদের ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং মেয়েশিশুদের ১৬ দশমিক ৯ শতাংশের নিজস্ব মোবাইল ফোন রয়েছে। ছেলেশিশুদের ৬২ শতাংশ এবং মেয়েশিশুদের ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ছেলেশিশুদের ৫২ শতাংশ এবং মেয়েশিশুদের ১৫ শতাংশের নিজস্ব ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আসক নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজ বলেন, ‘অনলাইনে শিশু নির্যানতন বন্ধে সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সবাইকে জানাতে হবে। এবিষয়ে সরকারের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। সাইবার অপরাধের বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। এতে শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ সাইটগুলো চিহ্নিত করে নিজেদের সুরক্ষার কৌশলগুলো জানতে পারবে।’
তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে সরকার অনেকগুলো পর্নোসাইট বন্ধ করেছে। তবে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের এমন পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। ইন্টারনেট প্রোভাইডারাও সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। তাছাড়া, শিশুরা যাতে সাইবার অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে সে বিষয়ে পরিবারকে খেয়াল রাখতে হবে।’
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের মে পর্যন্ত সারাদেশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৬ কোটি ৮ লাখ ২৯ হাজার। মোবাইল ফোন ও একই সময় পর্যন্ত ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৪৫ হাজার ছাড়িয়েছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৭০ ভাগই ঝুঁকিতে আছে। ব্যবহারকারীদের মধ্যে ২০ ভাগ কোনও না কোনোভাবে সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত। আর মাত্র ১০ ভাগ ব্যবহারকারী সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন।
পুলিশের ক্রাইম ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (সিডিএমএস) পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মোট ৩ হাজার ৬৫৯টি মামলা দায়ের হয়। এসব অপরাধের ৪ ভাগের একভাগই হয়েছে ঢাকায়।
শিশুদের সাইবার অপরাধ থেকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে বাংলাদেশে কোনও ‘গাইডলাইন’ নেই উল্লেখ করে সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ তানভির হাসান জোহা বলেন, ‘সাইবার অপরাধের শিশুদের জড়িয়ে পড়ার সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই দেখা যায়। তবে আমাদের দেশে শিশু সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনও গাইডলাইন নেই।’
তিনি বলেন, “সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে ‘অনলাইন চাইল্ড প্রোটেকশন প্ল্যান্ট’ তৈরি করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের চাইল্ড প্রোটেকশন প্ল্যান্টে যেসব মডেল ব্যবহার করছে চাইলে সেগুলো অনুকরণ করে বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কাজ করা সম্ভব।’বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close