মহানগরশিরোনাম

উত্তরাঞ্চলের আদিবাসীদের সংস্কৃতি রক্ষায় কাজ করছে বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি

নিজস্ব প্রতিনিধি : বাংলাদেশে ঋতু বৈচিত্রের মতই বৈচিত্রময় এদেশের মানুষ ও তাদের সংস্কৃতি। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাঙ্গালী, কিন্তু তাদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃতাত্বিক জাতি রয়েছে অনেকগুলো। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এর ২০১০ এর গেজেট মতে নৃত্বাত্তিক জাতিসত্তার সংখ্যা ৫০ টি। এর মধ্যে রাজশাহী অঞ্চলে ১৮টি ক্ষুদ্র নৃতাত্বিক জাতির বসবাস রয়েছে। এসব জাতির মানুষ যুগ যুগ ধরে মূলধারার মানুষের সাথে পাশাপাশি বাস করছে এদেশে। তাদের বর্ণময়, বর্নাঢ্য সংস্কৃতি সমৃদ্ধ করেছে এদেশের সংস্কৃতিকে। বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতির বিকাশে এই জাতিসত্তার সংস্কৃতির অবদান রয়েছে। সুতরাং সরকারীভাবে প্রতিষ্ঠিত এই একাডেমির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যলেঞ্জ হলো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা। বিশেষ করে বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে যেসব সাংস্কৃতিক উপাদান সেগুলোকে চর্চা ও সংরক্ষণ করা। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের সাথে মূলধারার মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্র নির্মাণ করা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সুরক্ষায় সার্বিক সহযোগিতা ও উৎসাহ প্রদান এবং বিষয়ভিত্তিক নানাবিধ গবেষনা, প্রকাশনা, প্রদর্শনী ও প্রচারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও প্রসারে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে এই একাডেমি।

বাংলাদেশের নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস বিষয়ে গবেষণা এবং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশের লক্ষ্যে ‘রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি ২০০৩ সাল থেকে কার্যক্রম শুরু করে। রাজশাহী বিভাগ বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে নির্মিত ‘রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে মোল্লাপাড়া নামক স্থানে মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। একাডেমির চারিপাশে বেশ কয়েকটি আদিবাসী পাড়াও রয়েছে।
তাছাড়া বিভাগীয় একাডেমি হওয়ার কারণে একাডেমির বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সেমিনার, মেলা ও উৎসবে রাজশাহী বিভাগের মোট ৮ টি জেলা থেকেই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ থাকে।

‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন’- ২০১০-এর প্রেক্ষিতে রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় কমিশনারের সভাপতিত্বে গঠিত ১০ সদস্যের একটি নির্বাহী পরিষদের মাধ্যমে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে একাডেমির সার্বিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ও অতরিক্তি সচবি, ও একাডমেরি সভাপতি জনাব মোঃ নূর-উর-রহমান এর অসাধারণ দুরদৃষ্টসিম্পন্ন দিকনির্দেশনা ও নজরদারী এবং একাডেমির পরিচালক ও উপসচবি মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিনের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং স্টাফদের সহযোগিতায় একাডেমিটি ইতোমধ্যে দেশের মধ্যে অভূতপূর্ব সুনাম ও সফলতা অর্জন করেছে। ২০১৮-১৯ র্অথবছরে একাডমেটি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিশেষ স্বীকৃতি অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে।

একাডেমির পরিচলক মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন বলেন, এ একাডেমি গঠনের লক্ষ হচ্ছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সচেতন সমৃদ্ধি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং অভিলক্ষ হচ্ছে ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তার কৃষ্টি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমকালীন শিল্প ও সাহিত্য সংরক্ষণ এবং গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের বিকাশ সাধন ও সচেতনতা বৃদ্ধি। অত্র একাডেমির মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কৃতি নারীদরে সম্মাননা প্রদান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হস্থশিল্প ও সংস্কৃতি মেলা আয়োজন করা হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, নাটক, ও বাদ্যযন্ত্র বিষয়ে নিয়মিত
প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণকে জাতীয় সংস্কৃতির মূল শ্রোতধারার সহিত সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও উৎসব উদযাপন এবং স্থানীয় শিল্পীদের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহনের ব্যবস্থা গ্রহণ, তাদের ইতিহাস, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তথা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, বাদ্য, কারুশিল্প, ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান রীতিনীতি, প্রথা, সংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ।

গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, ঐতিহ্যবাহী উৎসব, অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং আন্তঃ জেলা সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচী গ্রহণ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বিষয়ক গবেষণামূলক গ্রন্থ ও প্রকাশনাসমুহ সংগ্রহপূর্বক একটি মূল্যবান লাইব্রেরী ও বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদশে র্শীষক ফটোগ্যালারী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়াও শিক্ষা সহায়তা ভাতা প্রদানসহ সাংস্কৃতিক ও নাট্য সংগঠনসমুহকে আর্থিক অনুদান এবং কৃতি ও বরেণ্য শিল্পীদের সম্মানি ও সম্মাননা প্রদান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লুপ্তপ্রায় সাংস্কৃতিক উপাদান সংগ্রহ করে যাদুঘর স্থাপন ও সংরক্ষণ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা, সমাজ ও সংস্কৃতির উপর সেমিনার, গ্রন্থ ও সাময়িকী প্রকাশ অব্যাহত রয়েছে। নিজস্ব সংগীতের অডিও এ্যালবাম এবং প্রামাণ্য চিত্রধারণ ও প্রচার এবং প্রসার করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি। তিনি আরো বলেন আগামী বছর
বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষে বছর ব্যাপি নানা কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামীতে সরকারের সহযোগিতা ও স্থানীয় উদ্যোগে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সকলকে সাথে নিয়ে তাঁদের জীবনমান উন্নয়নসহ র্আথসামাজিক ক্ষেত্রে সুদীর্ঘ অবদান তৈরিতে কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণার্থীদের আবাসিক ভাবে থাকার জন্য প্রশিক্ষণ কাম ডরমেটরী তৈরী, একাডেমির বিদ্যমান অডিটরিয়ামের সংস্কার ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রনের ব্যবস্থা করা পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়াও ক্ষুদ্র নৃতাত্বিক জাতি গোষ্ঠীর বিপদকালীন সময়ে সহযোগিতা করার লক্ষে একাডেমির জন্য ১টি মাইক্রোবাস ক্রয়, আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মান, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিল্পীদের প্রতিভা অন্বেষণ বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় আগ্রহের প্রেক্ষিতে সিধু কানু ও বিরশা মুন্ডার মনুমেন্ট নির্মান করার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে বলে জানান পরিচালক মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন।

বরেন্দ্র বার্তা/ ফকবা/ নাসি

Close