নাগরিক মতামতপাবনাশিরোনাম-২

রূপপুরের“গ্রীনসিটি”আবাসিক প্রকল্পে বালিশ দূর্নীতি- আমার কিছু প্রসঙ্গিক ভাবনা

আ. স. ম আব্দুর রহিম পাকন

রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্প, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি দেশকে উচ্চ পর্যায়ের সম্মান ও বিশ্বের কাছে সু-মর্যদায় প্রতিষ্ঠিত করে। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনসহ পাবনার রাজনীতিতে সক্রিয় থাকায় এবং পরবর্তীতে আর্ন্তজাতিক পরমাণু শক্তি এজেন্সীর  ভিয়েনাতে দীর্ঘ বত্রিশ বছর কর্মরত থাকার সুবাদে রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের শুরুর থেকে বর্তমান সময়ের কার্যক্রমের অনেক বিষয়ই কাছ থেকে পর্যবেক্ষনের সুযোগ হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, দেশ প্রেমিক, অদম্য সাহসী নেতৃত্ব ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প গ্রহনকরা সম্ভব নয় এবং বর্তমানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাই কেবল এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের যোগ্যতা রাখেন। পিতার মত দেশের প্রতি মমত্ববোধএ বং দেশকে উন্নত রাষ্ট্রের পরিনত করার প্রবল ইচ্ছা শক্তিতে বলিয়ান বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর যোগ্য নেতৃত্বের কারণেই রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প এখন আর স্বপ্ন নয় বরং দৃশ্যমান বাস্তবতা।
সরকারের অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরমাণু প্রকল্পের তুলনা করার কোন সুযোগ নাই, বরং এ ধরনের উচ্চ প্রযুক্তি ও স্পর্শকাতর মেগা প্রকল্প নিদির্ষ্ট কোন মন্ত্রণালয় বা সংস্থার একক প্রচেষ্টায় সুষ্ঠ ভাবে বাস্তবায়ন করা কোন ভাবে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন মন্ত্রাণালয় এবং সংস্থা সমূহের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় এবং জবাদিহিতামূলক সহযোগিতা। যতদুর জানি- রুপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মানের কার্যক্রম সে অনুসারে পরিচালিত হচ্ছে। প্রকল্পের কাজের সহায়তা করার জন্য সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা বিভিন্ন কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে, যাদের মধ্যে রেলওয়ে, পাউবো, বিউবো, গণপূর্ত উল্লেখযোগ্য। এ সমস্ত সরকারী সংস্থা সমূহ তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রকল্পের জন্য সহায়ক বিভিন্ন কার্যাদি সম্পাদন করে যাচ্ছে।

আ. স. ম আব্দুর রহিম পাকন

বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অধীন গণপূর্ত বিভাগ- সরকারের যাবতীয় পূর্ত কার্যাদি বাস্তবায়ন করে থাকে। সারা দেশে সরকারী পূর্ত অবকাঠামো নির্মাণের জন্য এই প্রতিষ্ঠানের রয়েছে শক্তিশালী অবকাঠামো এবং লোকবল। রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের দেশী বিদেশী বিশেষজ্ঞ এবং কর্মকর্তাগণের আবাসনের জন্য প্রকল্পের সাইট অফিস চত্বরে উনিশটি বহুতল ভবন নির্মাণকার্য সম্পাদনের জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্বাবধায়নে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং গণপূর্ত বিভাগের মধ্যে এক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। উক্ত স্মারক মোতাবেক ডিপোজিটেড ওয়ার্কের আওতায় গণপূর্ত বিভাগ গ্রীনসিটি আবাসিক প্রকল্পের নির্মাণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এখানে ভবন নির্মাণএবং সু-সজ্জিত করনের যাবতীয় কার্যক্রম গণপূর্ত বিভাগ সরকারের ক্রয় সহ প্রযোজ্য নীতিমালা অনুসরনের মাধ্যমে সম্পন্ন করবেন-এটাই বিধান। গণপূর্ত বিভাগ তাদের কার্যক্রম বাস্তবায়ন কালীন সময়ে গত মে মাসে গ্রীনসিটি চত্বরে তৈরীকৃত ফ্লাটসমুহের সুসজ্জিত করন কার্যক্রমের আওতায় ব্যবহার্য সামগ্রীর ক্রয়ের দূনীতির বিষয়টি দেশের প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায়তা গোটা দেশে ব্যাপক ভাবে সারা ফেলে। গ্রীনসিটি আবাসন পল্লীর জন্য ক্রয়কৃত টিভি, ফ্রিজ, চা তৈরীর কেট্লি, আয়রন, বালিশ ইত্যাদির মূল্য নির্ধারন এবং ফ্লাটে উঠানোর খরচের বহর দেখে চারিদিক থেকে সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় উঠে। দেশবাসী বুঝতে পারে এ ধরনের ক্রয়কার্যের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজের মাধ্যমে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতির মাধ্যমে সরকারী তহবিলের তছরুপ করা হয়েছে।
পেপার পত্রিকা থেকে জানা যায়, অনিয়ম ও দূর্নীতির বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসায় তিনি বিষয়টিকে তদন্তের নির্দেশ দেন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত বিভাগ পৃথক পৃথক দুইটি কমিটি গঠন করা হয় । দুই কমিটির রির্পোটে অনিয়ম ও দূর্নীতির বিষয়টি প্রমাণিত হয় এবং উক্ত রির্পোটের ভিত্তিতে গত ২৫/০৭/২০১৯ খ্রিঃ তারিখে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মাননীয় মন্ত্রী শ,ম রেজাউল করিম সাংবাদিক সম্মেলন করে দূর্নীতি এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাগনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহনের কথা দেশবাসীকে অবহিত করেন, এরমধ্যে গণপূর্ত বিভাগে বেশ কিছু কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং অন্য একাংশের বিরুদ্ধে শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে বলে জানান, এছাড়াও তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে তাদের মন্ত্রণালয়ের অধীন চারজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের সুপারিশ সম্বলিতপত্র প্রেরনের কথা জানান। সমস্যার শুরু মূলতএখান থেকেই।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবরে জানাযায় যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কর্মকর্তাগণের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বাপকশ) কর্তৃক নিয়োজিত রুপপুর এনপিপি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি), উপ-প্রকল্প পরিচালক, প্রকল্পে কর্মরত দুইজন উপ সহকারী প্রকৌশলী। বর্ণিত চারজন কর্মকর্তাই আমার কমবেশী পরিচিত । মাননীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী মিডিয়ার সামনে যে ভাবে বিষয়টি উল্লেখ করলেন তাতে আমার মনে হয়েছে, উক্ত চারকর্মকর্তারাও এ ধরনের অনিয়ম ও দূর্নীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত, বাস্তবে যা হওয়ার কোন সুযোগ নাই । সেক্ষেত্রে আমার ধরণা মাননীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে বাপশক-এর স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক সর্ম্পকে যথাযথ ভাবে অবহিত নয় এবং তদন্ত কমিটির রির্পোট খানি সঠিকভাবে অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রকল্প নিয়োজিত যে চারজন কর্মকর্তার নাম বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে যতদুর শুনেছি তাদের মধ্যে দুইজন উপ সহকারী প্রকৌশলী কর্তৃপক্ষের নির্দেশে চুড়ান্তকৃত ফ্লাটের ইনভেনটরী তালিকা পর্যবেক্ষন করে রাশিয়ান প্রতিষ্ঠানকে মালামালসহ ফ্লাট গুলি বুঝিয়ে দেয়ার দায়িত্ব পালন করেছেন, যার সঙ্গে মালামালের ক্রয় বা মূল্য নির্ধারন প্রক্রিয়া, মান নিশ্চিত করণ বা ফ্লাটে উঠানো ব্যয় ইত্যাদি কোন বিষয়ই যুক্ত থাকার কথা নয়, অপরদিকে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বা উপ-প্রকল্প পরিচালকের বিষয়ে তিনি পত্র প্রদানের মাধ্যমে কি বোঝাতে চেয়েছেন তাও আমাদের কাছে বোধগম্য নয়, এরমধ্যে অবশ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর এরুপ পত্র প্রদানসহ বক্তব্যের জন্য প্রতিবাদলিপি প্রেরণ করেছেন এবং সংবাদ মাধ্যমে তার দেয়া বক্তব্য প্রত্যহারের দাবী জানিয়েছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের জেষ্ঠ্য বিজ্ঞানীরা সংবাদ সম্মেলন করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
পরিশেষে রূপপুর এনপিপি প্রকল্পের সহায়ক কার্যাদির সঙ্গে জড়িত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা, বিভাগ সমূহ নিজ নিজ অবস্থান থেকে দূর্নীতি বা অনিয়মের বিষয়ে সর্বোচ্চ সজাগ থাকতেহ বে, কারণ প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাগণকে মনে রাখতে হবে রূপপুর এমন একটি প্রকল্প যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে আর্ন্তজাতিক বিভিন্ন সংস্থা । প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এ ধরনের ঘটনা শুধু প্রকল্প নয় দেশের ইমেজকে ক্ষুন্ন করবে। বালিশ দূর্নীতির বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় দূর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহন করতে গিয়ে যা করছেন তাতে প্রকল্পের কাজের স্বাভাবিক গতি অনেকখানি ব্যাহত হবে। প্রকল্প বিরোধী দেশী-বিদেশী শক্তিকে প্রশ্রয় দেয়া হবে, যা এতদ্ব অঞ্চলের জনগণের কাছে কোন ভাবেই কাম্য নয়।
দেশকে আলোকিত করতে রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প কোন চক্রান্তকারী ষড়যন্ত্র ও বিভ্রান্তী মূলক প্রচার করতে না পারে সেদিকে সবাইকে লক্ষ রাখতে হবে। আমি সুনাগরিক হিসাবে দেশবাসীর কাছে বিনয়ী প্রত্যাশা জানাই আপনারা সোচ্চার হোন এবং ঐক্যবদ্ধ থাকুন কোনভাবেই যেন অভ্যন্তরিণ ও বৈদেশিক ক্ষেত্রে দেশের ভাবমূর্তি পদদলিত না হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কণ্যা প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার নেতৃত্রে ভিষণ ২০৪১ বাস্তবায়নএবং এদেশে স্বপ্নের সোপান গড়তে রূপপুর পরমাণুবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প সকল চড়াই উৎরাই পেরিয়ে সার্থক ও সফলতার সাথে এগিয়ে যাবে নিরন্তর প্রত্যাশা থাকল।

লেখক: সাবেক কর্মকর্তা, আর্ন্তজাতিক পরমাণু শক্তি এজেন্সী  অষ্ট্রিয়া,ভিয়েনা

Close