নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যায় কেমন হওয়া জরুরী: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

মোঃ নূরুন্নবী ইসলাম

যে মানুষটির শরীরে পোষাক নাই তার স্বাভাবিক চিন্তা হবে পোষাক কেনার সামর্থ্য অর্জন করা,যে মানুষটির খাবার নাই তার প্রথম লক্ষ্য হবে খাবারের সংস্থান করা। অর্থনীতির ভাষায় যাকে আমরা বলতে পারি সীমিত সম্পদের মধ্য থেকে অসীম চাহিদার অতি গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা গুলো মিটানো। যে সুতি কাপড় সামর্থ্য অর্জন করেনি এবং চেষ্টাও করেনা তার জামদানির চিন্তা করা বা যে একবেলা খেতে পারেনা তার তিন বেলা বিরিয়ানির স্বপ্ন শুধুই স্বপ্নই হতে পারে সম্ভাবনা হতে পারেনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা নিয়ে আমাদের নানা কথা থাকতে পারে তবে সময়ের চাহিদায় বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় কেমন হওয়া উচিত?
১৮ বছর বয়সের শক্তি,সাহস এবং সম্ভাবনা নিয়ে কারোই কোন সন্দেহ নাই। আর তাই কবি,সাহিত্যিক,বুদ্ধিজীবীসহ সকল সচেতন মহল এই সময়কে কাজে লাগানোর প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন একই সাথে গ্রন্থগত বিদ্যা থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাবহারিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরীর দাবী সকলের। কিন্তু জাতির সবচেয়ে ক্ষতির বিষয় হচ্ছে এই ১৮ বয়সের মূল্যবান সময়কে কাজে না লাগিয়ে ,না লাগার পরিবেশ তৈরী করে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক কাঠামোসহ সার্বিক উন্নয়ন কাঠামোকে দুর্বল করে ফেলছি। বাংলাদেশে বিশ্বদ্যিালয়ের ছাত্র-ছাত্রীর স্বাভাবিক বয়স তুলনা করলে ১৮ বয়সের সামান্য আগে বা পরে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হয় কিন্তু এই সম্ভাবনাময় সময়কে বিশ্ববিদ্যালয় সাফল্যের শক্তিতে পরিণত করতে পারছে না যার নেতিবচক প্রভাব পরিবার,সমাজরাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে দেখতে পাই। সকল শিক্ষার্থীর মেধা,সৃজনশীলতা ও আগ্রহ থাকা স্বত্তেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপক্ষে৮০% শিক্ষার্থী কোন না কোনভাবে ঝরে পড়ে। একটি হিসাবের দিকে তাকালে বিষয়টির ভয়ংকর সত্যতা ফুটে উঠবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ জন শিক্ষার্থীর উপর অনু সন্ধান চালালে দেখা যায় ৬০% শিক্ষার্থী পরীক্ষার পূর্ব ব্যাতিত সিলেবাস বা সিলেবাসের বাইরে তেমন কোন পড়াশুনাই করেনা । এরা অনেক বেশী বিনোদনমুখী এবং অপ্রয়োজনীয় কাজে তাদের জীবনের প্রয়োজনীয় সময়কে নষ্ট করে।
১০% ছাত্র-ছাত্রীপরীক্ষার ১ বা ২ মাস আগে থেকে সিলেবাসের পড়াশুনা করে। এবং সারা বছরের বাকী সময় গুলো কাজে লাগার মত তেমন কিছুই করেনা।
১৫% ছাত্র-ছাত্রী ২ বা ৩ মাস আগে থেকে সিলেবাসের উপর পড়াশুনা করে।যদিও এক্ষেত্রে শুধু তাদের ফলাফল ভালো করার ইচ্ছাই প্রধান।
আর বাকী ১৫% ছাত্র-ছাত্রী প্রায় সারাবছর স্যারদের কাছে ভালো হবার জন্য ,ভালো ফলাফল করার জন্য বা শিক্ষক হবার করার জন্য সিলেবাস অনুযায়ী পড়াশুনা করে।
প্রত্যেক গ্রুপে ০-৮ ভাগ ব্যতিক্রম আছে যারা সিলেবাসের পড়াশুনার সাথে বাইরের সৃজনশীল কাজে নিজেকে জড়িত রাখে, সৃজনশীলচিন্তা এবং কাজ করার চেষ্টা করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানসৃষ্টি, বিতরন এবং সমাজের কাজে লা গানোর কথা থাকলেও আমাদের জ্ঞান তৈরী করাও হয়না আবার কাজের মূল্যবোধও তৈরী করা হয় না যার ফলে সমাজে সম্ভাবনাগুলো কমে আসছে। যে বয়সে আমাদের উদ্যোমী আর পরিশ্রমী হবার কথা সে সময়টা আমরা বিশেষ কোন কাজেই লাগাতে পারছিনা। আমরা যতেষ্ঠ আগ্রহ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শুরু করি এবং যতেষ্ঠ হতাশা নিয়ে বের হই। সম্মান পর্যায়ের শিক্ষার্থী গন সমাজের সবচেয়ে বেশী কাজে লাগতে পারে কিন্তু সেই শক্তি কাজে না লাগানোর ফলে আমাদের সমাজে সম্ভবনাময়খাত নষ্ট হচ্ছে; নষ্ট হচ্ছে দেশের মূল্যবান সম্পদ। বাজেট সহজ ও গভীর বিশ্লেষণে একটি বিনিয়োগ। একটি বাজেটে উৎপাদনশীল সম্ভাবনয়খাত গুলোতে জোর দিতে হবে এবং তার দীর্ঘ মেয়াদী মুনাফা বা সেবা যেন সাধারণে পায় তার ব্যাবস্থা থাকতে হবে আর একটি বাজেটকে যুগোপযুগি সম্ভাবনাময় করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের কাজে লাগানোর কোন বিকল্প নেই। আর তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পদ্ধতিতে কিছু বিশেষ পরিবর্তন অবশ্যই আনতে হবে এবং হবেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ব্যাবস্থা গুলো পরিবর্তন হলে জাতির ইতিবাচক পরবির্তন হবে সে সমন্ধে আমার কিছু সুপারিশ আছে।
সুপারিশ ১: বাস্তব অবস্থায় এটা মানতেই হবে আমরা জীবনের সম্ভাবনাময় সময়গুলো প্রয়োজনের চাইতে অপ্রয়োজনেই বেশী ব্যায় করি আর তাই এ সময়কে কাজে লাগানোর জন্য সবার জন্য বাধ্যতামূলক ৩-৪ মাস শ্রমের ব্যাবস্থা করতে হবে। বিষয় ভিত্তিক কাজ থাকলে সেগুলোতা না থাকলে যে কোন কাজে।
সুপারিশ ২:
বিশ্ববিদ্যালয়কে ইংরেজি মাধ্যমে করার চেষ্টা না করে সম্পূর্ণ বাংলায় করতে হবে। ইংরেজিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় কিছু দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরী করতে হবে যাতে করে তারা সকল দরকারী বই গুলো সহজ অনুবাদ করে আমাদের সরবরাহ করতে পারে।
সুপারিশ ৩: বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে তাদের অধিকার নিশ্চিতে প্রতি ৪ বা ৬ মাসে আলোচনা সমালোচনার মাধ্যমে প্রশাসনকে দ্বায়বদ্ধ রাখার ব্যাবস্থা করতেহবে।
সুপারিশ ৪: শিক্ষকদেরও রাজনীতি সংশ্লিষ্টতা বন্ধ করার পাশাপাশি প্রশ্নপত্র এবং ফলাফল তৈরীতে তাদের প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ বন্ধ করতে হবে। এতে করে শিক্ষক নিয়োগের বা শিক্ষাদানের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সুপারিশ ৫:
শিক্ষার্থীর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত চিন্তার ও প্রতিভার বিষয়টি বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয় নির্ধারণ করাতে হবে।
একদিনে বাংলাদেশের সব কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব নয় কিন্তু সম্ভাবনাময় এই বয়সের শক্তি এবং সাহস কাজে লাগিয়ে আমরা খুব দ্রুত আমাদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবো বলে আমার বিশ্বাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কাঠামোতে এই স্বল্প মেয়াদী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো খুব দ্রুত নিশ্চিত করবে সমাজের দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন।

 

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,কুষ্টিয়া

Close