নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

প্যানিক ডেথ

কোনো মহামারিতে মৃত্যুর এবং দ্রুতমৃত্যুর অন্তত ৫০ শতাংশই ঘটে ‘প্যানিক অ্যাটক’-এর কারণে।
বিষাক্ত সাপের কামড়েও ৫ শতাংশের বেশি মৃত্যু হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ছোবল খাওয়া মানুষ ভীতিবিহ্বলতা ও আতঙ্কের চোটে যখন মনে করতে থাকে যে তার আর বাঁচার সম্ভাবনা নেই, তখনই মস্তিষ্কে সেরোটনিন নামের নিউরোট্রান্সমিশন ক্ষমতার কেমিক্যালটির লেভেল একেবারে নিচে নেমে যায় এবং ভয়ার্ত ব্যক্তির মৃত্যুর সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। কেতাবি ভাষায় এই আতঙ্ককর অবস্থাগুলোকে আমরা অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার, প্যানিক ডিসঅর্ডার ইত্যাদি বলি। ইউরোপে ইনক্যুইজিশনের সময়ে উইচহান্টিং বা ডাকিনীদের পিটিয়ে পুড়িয়ে ফেলাও প্যানিকের ফল। সাম্প্রতিক ছেলেধরা সন্দেহে হত্যাকাণ্ডগুলোতেও প্যানিকের ক্রীড়নক হয়ে গিয়েছিল অনেক মানুষ।
সাম্প্রতিক ডেঙ্গুর প্যানিকও মৃত্যু বাড়িয়ে তুলছে—এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। সাম্প্রতিক অনেকগুলো চিকিৎসা-গবেষণার আলোকে ব্রিটেনের ‘নো প্যানিক’ নামের সংস্থাটি জানাচ্ছে যে প্যানিকে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর আশঙ্কা প্যানিকমুক্ত ব্যক্তির রোগ-সম্ভাবনার চেয়ে আট গুণ বেশি। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিও যদি ধরেই নেন তিনি আর বাঁচছেন না, তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত, তাঁর না বাঁচার সম্ভাবনা তখনই আট গুণ বেড়ে যাচ্ছে, তা বলা যায়। একই রকম প্যানিক দেখা গিয়েছিল আশির দশকের শুরুতে এইডস বিষয়ে। পত্রপত্রিকাসহ লোকমুখে গুজব প্রচার পেয়েছিল যে এইডস অনিরাময়যোগ্য এবং এতে মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে পড়বে। ইতিমধ্যে প্রমাণিত যে এইডসও সম্পূর্ণই নিরাময়যোগ্য। ডেঙ্গু তো আরও সহজে নিরাময়যোগ্য। ধরা যাক, সারা দেশে এক লাখ লোক আক্রান্ত। তার মধ্যে ২০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও প্যানিক না করলে বোঝা যাবে ৯৯ হাজার ৮০০ জন তো বেঁচে আছেন। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রোগ প্রতিরোধের ও প্রতিকারের জন্য খুবই প্রয়োজন।
মিডিয়াও প্যানিক তৈরি করতে পারে। পত্রিকার শিরোনাম দায়িত্বপূর্ণ না হলে প্যানিক বাড়ে। পত্রিকাগুলোর শিরোনাম যদি হয় ‘ডেঙ্গু মহামারির রূপ নিচ্ছে’, ‘অনিরাময়যোগ্য হয়ে পড়েছে’, ‘আশঙ্কা-আতঙ্কে মানুষ’ ইত্যাদি মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও ভীতি বহুগুণ বেশি বাড়বে। ‘বাজারে ওষুধ নেই’, ‘ওষুধ আসা অনিশ্চিত’ ইত্যাদি শিরোনামের শতভাগ সত্যতা থাকার পরও নেতিবাচক শিরোনাম মিডিয়ায় না আসাই ভালো। সিটি করপোরেশনসহ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা–সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে আরও কার্যকর, সচেষ্ট ও দায়িত্বপূর্ণ রাখার জন্য বিভাগগুলোর দুর্বলতা ধরিয়ে দেওয়া অবশ্য মিডিয়ার দায়িত্বের অংশ। শিরোনামে বিভাগগুলোর সমালোচনা থাকতে পারে। পরামর্শও থাকতে পারে। অমর্ত্য সেন যেমনটি বলেছিলেন, মিডিয়া শক্তিশালী থাকলে দুর্ভিক্ষ হয় না। মিডিয়া ধরিয়ে দেয় ব্যবস্থাপনার গলদ কোথায় হচ্ছে। অমর্ত্য সেনের কথার সুরে বলা যায়, দায়িত্বপূর্ণ মিডিয়া থাকলে রোগ মহামারির রূপ নেয় না।
১২৪০ দশকের শুরুতে পোপ নবম গ্রেগরির দেওয়া একটি ফতোয়া নির্বিচার বিড়ালনিধনের কারণ হয়ে উঠেছিল। পোপ উসকে দিলেন যে শয়তান লুসিফার বিড়ালের রূপ নিয়ে বিড়াল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। জানালেন, বিড়াল ডাইনি, প্রেতিনী ও কুহকিনীদের বাহন। বিড়াল মানেই অমঙ্গল। যদিও দায়ী করা হয়েছিল শুধুই কালো বিড়ালকে, হুঁশ-বুদ্ধিহীন ও ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ অতশত কালো-সাদা মনে রাখেনি। যে যেখানে, যেভাবে পেরেছিল, বিড়াল মেরে সাফ করে ফেলেছিল। সঙ্গে ডাইনি-কুহকিনী সন্দেহে অনেক নারীকেও হত্যা করার মচ্ছব শুরু হয়েছিল। কেন বিড়ালকে ভিলেন বানানো হয়েছিল, সে এক ভিন্ন ইতিহাস, তা এই আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় নয়। প্রসঙ্গটি শুধু এ কথা বলার জন্য যে ভীতিজর্জরতা (ম্যাস হিস্টিরিয়া) মহামারির জন্ম দিতে পারে। বিড়াল বিষয়ে মধ্যযুগের জনগণের সীমাছাড়া ভীতিজর্জরতার কারণে প্লেগ যেমন মহামারির রূপ নিয়েছিল।
বিড়াল নেই, তাই ইঁদুর বাড়ল। ময়লা স্যাঁতসেঁতে প্রতিবেশ ইঁদুরের প্রিয়। এই পরিবেশে ইঁদুরের গায়ে উকুনের মতো একধরনের অণুজীবের জন্ম ও বিস্তার ঘটাল। একেকটি ইঁদুরের গায়ে লাখো কোটি জীবাণু। তারা দৌড়ায় দ্রুতগতিতে। মুখ দেয় সবকিছুতে। ইঁদুরের উপদ্রবে শুরু হলো একধরনের প্লেগ মহামারি। তাতে বিলীন হলো অন্তত ২০০ মিলিয়ন মানুষ।
ম্যাস হিস্টিরিয়ার মধ্যে সারা দেশের রোগের ও রোগীর মনস্তত্ত্বই ধরা পড়ে। মানুষ বিশ্বাস হারিয়েছে, আস্থা হারিয়েছে। রোগ নিরাময় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থাহীনতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রতি আস্থাহীনতা ইত্যাদি গণমনস্তত্ত্ব ডেঙ্গু বিষয়ে আরও বেশি দৃশ্যমান। এসব প্যানিক রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতার ফল। নেতিবাচক মনোভঙ্গি একধরনের মানসিক রোগ। এই রোগ বিপর্যয়কর সীমায় চলে গেছে। তার পেছনে কারণগুলো কী, তা বোঝা প্রয়োজন।

সম্পাদনা, পরিমার্জনা: অর্ণব পাল সন্তু

Close