অর্থ ও বাণিজ্যনাগরিক মতামতমহানগরশিরোনাম

উত্তরবঙ্গে শিল্পোদ্যোগ: সেকাল ও একাল

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

ইতিহাসের সাক্ষ্য এই আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে অঞ্চল ও পরিবেশের উন্নয়ন প্রেক্ষাপট হয় নানা বিবর্তন ও পরিবর্তনের শিকার। বর্তমান বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ (বৃহত্তর পাবনা-বগুড়া-রাজশাহী-দিনাজপুর-রংপুর জেলা, যা প্রশাসনিকভাবে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ অন্তর্ভুক্ত) প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকে অর্থাৎ মৌর্য (খ্রি. পূর্ব ৩২২-১৮৭), গুপ্ত (৩২০-৫৫০ খ্রিস্টাব্দ), পাল (অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে পরবর্তী চার শতাব্দী), সেন (৯০৭-১২২৫) যুগ পেরিয়ে, মোগল ও কোম্পানি (১৫২৬-১৮৫৭) এমনকি ব্রিটিশ শাসনামলে (১৮৬০-১৯৪৭)ও ছিল শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বনামধন্য ও সুখ্যাত। পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী মহাস্থানগড় (বগুড়া শহরের উত্তরে) ছিল বৌদ্ধ আমলের জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রশাসন ও অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। নদীই ছিল এসব সুনাম ও সুখ্যাতির অন্যতম অবকাঠামোগত অবলম্বন। অথচ ব্রিটিশের শেষ পর্যায়ে ও পাকিস্তানী শাসনামালে এমনকি বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু (১৯৯৮) চালু হওয়া পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশেও পদ্মা-যমুনা-বহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিভাজিত উত্তরবঙ্গ ছিল দেশের মধ্য ও দক্ষিণ অংশ থেকে বাহ্যত ও বিচ্ছিন্ন। তদানীন্তন সরকারগুলোর প্রশাসনিক একদেশদর্শিতার কারণে উত্তরবঙ্গের শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়ে পড়ে নানা উপেক্ষার শিকার। সেখানকার ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা-বাণিজ্য শিল্প-কলকারখানার ঘটে অপমৃত্যু এবং বছরে নির্দিষ্ট সময়ে গণমানুষের কর্মহীনতায় ‘মঙ্গা’ নামক নিয়মিত দারিদ্র্য অভিশাপের শিকার। ব্রিটিশ আমলে ১৮৮৪ সালে রেলওয়ে যোগাযোগ প্রবর্তন ও ১৯১৫ সালে পদ্মার ওপর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণ আপত উত্তরবঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গ তথা কলকাতার সঙ্গে পণ্য পরিবহন ও গণযাতায়াতের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর উত্তরবঙ্গের উৎপাদিত শস্যসামগ্রী, কারখানায় তৈরি শিল্পসামগ্রী বিদেশে রফতানি ও ভারতবর্ষের বৃহৎ বাজারে প্রবেশের পথ রুদ্ধ হয়। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কেন্দ্র তথা পূর্ব অংশে সরবরাহের অবকাঠামোগত অসুবিধায় করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দেশের মধ্যকেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগ মুখ্যত মুখ থুবড়ে পড়ে। বিশাল পদ্মা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে পণ্য পরিবহনের সুযোগ রেলওয়ে সংযোগসহ স্টিমার সার্ভিসের ওপর থাকায় তা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় কার্যকর অবস্থায় পাওয়া যেত না। গোটা উত্তরবঙ্গ পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহবঞ্চিত থাকে। সে সময় বগুড়া ও রাজশাহীর নদীপথগুলো ফারাক্কার প্রভাবে অবহেলায় অগোচরে নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে। শিল্প বিকাশে নদীর ভূমিকা উত্তরবঙ্গের জন্য যা একসময় ছিল আশীর্বাদ, পর্যায়ক্রমে তা হয়ে দাঁড়ায় অভিশাপ।
বাংলাদেশের মানচিত্রকে যদি দারিদ্র্যের মাপকাঠিতে সাজানো হয়, তাহলে দেখা যাবে, দেশের মধ্যে দুটি রূপ। পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত অসম উন্নয়নের নিয়মে কোনো একটি অঞ্চলের উন্নয়ন অন্য অঞ্চলের অনুন্নতির কারণ হয়ে দাঁডায়। অর্থনীতির পরিভাষায় একে বলা হয় ‘আঞ্চলিক বৈষম্য’। বাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা, বাণিজ্যে, সহায়ক শিল্প ও অধিকতর মুনাফা লাভের নিশ্চয়তা আছে, পুঁজি ও শ্রমশক্তি সেদিকেই ধাবিত হয়; দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য যেমন ছিল। রুশ অর্থনীতিবিদ এসএম বারান ভাবান ১৯৬৪ সালে ঢাকায় এসে ছয় মাস তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের অনেক জেলা ঘুরেছিলেন। তার তীক্ষ পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা থেকে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বিকাশ ও বৈষম্যমের যে চিত্র বেরিয়ে এসেছিল, কালক্রমে সেই একই চিত্র বাংলাদেশের আঞ্চলিক বৈষ্যম্যের মধ্যে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় হতদরিদ্র ও গরিব মানুষের সংখ্যা বেশি। উত্তরাঞ্চলের জনপদে বাড়তে থাকে বেকারত্ব। ঢাকা, চট্টগ্রাম এসব অঞ্চল এখন কৃষি থেকে ঝুঁকে পড়ছে শিল্পের দিকে। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় উত্স কৃষি খাত। সেখানে এ খাতে কাজের সুযোগ তো বাড়েইনি, বরং কমেছে। সেখানে মৌসুমের বেকারত্বের বেলায়ও অবস্থা একই। দেশে শিল্প খাতে গত পাঁচ বছরে ২৮ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কাজের সুযোগ বেড়েছে নির্মাণ শিল্পেও। নির্মাণ শিল্পের দ্রুত প্রসার লাভ করেছে ঢাকা, চিটাগং, নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি এলাকায়। অথচ উত্তরাঞ্চলে আবাসন খাতে ব্যাংক থেকে ঋণ দেয়ার প্রচলন ছিল না বললেই চলে। উত্তরাঞ্চলে বহুতলবিশিষ্ট বাড়ি তৈরি করতে গেলে নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যে পড়তে হয়। ২০০০-২১০ এই ১০ বছরে দেশে যেখানে গড়ে ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ হারে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে, সেখানে উত্তর জনপদে এ হারের গড় মাত্র ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। তাই এখন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলে আরো বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়াস চলছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়িয়ে বেসরকারি খাতে এ অঞ্চলে কাজের সুযোগ তৈরি হওয়া উচিত। খাদ্যশস্যের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত উত্তরাঞ্চলে গত পাঁচ বছর ধরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রতি বছর গড়ে শতকরা ৫ ভাগের বেশি হারে চাল উৎপাদন করে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কৃষি বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অঞ্চলের কৃষকরা তাদের চাষযোগ্য সীমিত জমিতে অত্যাধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির পাশাপাশি উচ্চফলনশীল নানা জাতের বীজ ব্যবহার করায় হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এ ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে অব্যহত থাকবে। সর্বাধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ও সারসহ বিভিন্ন উপকরণের যথাযথ ও সঠিক ব্যবহারের পাশাপাশি চাষাবাদের সুব্যবস্থাদির নিশ্চিতকরণ এবং উৎপাদিত ধানের সঠিক মূল্য কৃষকদের দিতে পারলে চাল উৎপাদন আরো অধিক হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। উত্তরবঙ্গে বর্তমানে শিল্প অঙ্গন নতুনভাবে আশার আলো সঞ্চার করছে। যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উত্তরবঙ্গ তথা দেশের অর্থনীতির চাকাকে করেছে বেগবান। উত্তরঞ্চলকে আরো এগিয়ে যেতে হলে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা ও কর্মছক তৈরি করা আবশ্যক। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সুষ্ঠু যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাবে উত্তরাঞ্চল সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা থেকে ছিল বঞ্চিত। উত্তরাঞ্চলের কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের সুষ্ঠুভাবে বাজারজাতকরণের অভাবে ন্যায্য মূল্য পেত না। এ অঞ্চলের মানুষের বিরাট আশা ছিল, বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু স্থাপনের পর এ অঞ্চলের জনগণের ভাগ্যেও পরিবর্তন হবে।
উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয় গত পাঁচ বছরে যেসব বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপিত হয়েছে, তার মোট ক্ষমতা মাত্র ৫৩১ মেগাওয়াট, যা দেশের মোট ক্ষমতার ১১ শতাংশ। ২০১০-১৮ সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ৯৪২৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তার মধ্যে উত্তরবঙ্গে মাত্র ১ হাজার ৫৭৫ মেগাওয়াট রয়েছে। আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়ছে দেশের ব্যংকিং সেবার ক্ষেত্রে। ব্যাংকিং খাতের মোট বিনিয়োগের প্রায় ৬৮ শতাংশ হচ্ছে ঢাকা বিভাগীয় শহরে। এরপর রয়েছে সিলেট, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের অবস্থান। উত্তরবঙ্গে বর্তমানে বিনিয়োগের পরিমাণ ৭ শতাংশ।
দেশের খাদ্যচাহিদার ৫০ শতাংশ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের ৭০ শতাংশ কাঁচামাল উত্তরাঞ্চল থেকে সরবরাহ করা হলেও এ অঞ্চলে এখনো বড় আকারে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। দেশের মোট শিল্পের মাত্র ১২ শতাংশ উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। সহজেই উত্তরাঞ্চলে আলুর চিপস ও ফ্রায়েড প্রক্রিয়াজাত শিল্প হতে পারে। আম, আনারস, কাঁঠাল থেকে ফলের রস, জ্যাম-জেলি, টিনজাত ফল আবার কলা থেকে ব্যানানা চিপস হতে পারে। এছাড়া গাজর, ফুলকপি, বেগুন, বাঁধাকপি, মটরশুঁটি— এগুলো প্রক্রিয়াকরণের কারখানা হতে পারে। এতে কৃষিপণ্যের বেশির ভাগ অর্থ মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে না গিয়ে কৃষকের হাতে যাওয়া উচিত। আর এ উপকারটুকু পেলেই ভাগ্য বদলে যাবে উত্তরাঞ্চলের মানুষের। রফতানিভিত্তিক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার অবকাশ রয়েছে উত্তরবঙ্গে। সিরাজগঞ্জ, উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুরের তাঁতের শাড়ি যাচ্ছে এখন আসামে। সৈয়দপুরে অবাঙালিদের ঘরে ঘরে গড়ে উঠেছে পোশাক তৈরির ছোট ছোট কারখানা। ঢাকার গার্মেন্ট থেকে ফেলে দেয়া ঝুট কাপড় কিনে নিয়ে সেখানে তৈরি হচ্ছে ছোট প্যান্ট (শর্টস), প্যান্ট, ট্রাউজার, জ্যাকেট ও টুপি। আর এগুলো বৈধভাবে রফতানি হচ্ছে ভুটানে। বগুড়ার ফাউন্ড্রি শিল্প থেকে তৈরি সেচ পাম্পের যন্ত্র ভারতের বাংলা রাজ্যে ভালোভাবে জায়গা করে নিয়েছে। ভারতের আসাম, মেঘালয়, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশী পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বুড়িমারী, বিরল, চিলাহাটি, হিলি স্থলবন্দরের অবকাঠামো একটু উন্নত হলে উত্তরাঞ্চল থেকে ভারতে রফতানি আরো বাড়বে।
গেল শতকের শেষ ধাপে পদ্মার ওপর লালন শাহ্ সেতু ও যমুনায় বঙ্গবন্ধু সড়ক ও রেলসেতু চালু হওয়ায় উত্তরবঙ্গ আবার প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করে। যমুনা সেতু দিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ সম্প্রসারণ হওয়ায় বিগত এক দশকে উত্তরবঙ্গে কৃষি ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং নতুন মাত্রায় ও মেজাজে উত্তরবঙ্গে শিল্প সম্প্রসারণ সম্ভাবনার দ্বার উম্মোচন হয়েছে (‘খোরাকি অর্থনীতি থেকে উত্তরণের পথে উত্তরবঙ্গ’— হানিফ মাহমুদ, প্রথম আলো, ৩ ডিসেম্বর ২০০৯)।
বাংলাদেশের প্রাথমিক ও প্রামাণ্য ইতিহাস রচনা করতে হলে শুরু করতে হবে উত্তরবঙ্গ থেকে। উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র বগুড়া। রাজশাহী বিভাগেরও প্রাণকেন্দ্র বগুড়া। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁ, দিনাজপুর, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলাগুলোর কেন্দ্র বগুড়া। বগুড়ার কেন্দ্রীয় গুরুত্ব শুধু অবস্থানের জন্য নয়; রাজনৈতিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক অবদানের জন্যই। বগুড়া বাংলার প্রাচীনতম ও দীর্ঘকালীন রাজধানী। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম পবিত্র পীঠ মহাস্থানগড়। আর্য সাধুরা লক্ষ লক্ষ বছর সাধনা করে মহাস্থানের পবিত্রতার কথা জানতে পেরেছিলেন। আর্যরা শাস্ত্রীয় বিধান দিয়েছেন। বগুড়াকেই বলা হয় উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র ও গেটওয়ে। একসময় বগুড়া ছিল এতদঞ্চলের শিল্প রাজধানী। অনেকগুলো ভারী শিল্প-কারখানা ও প্রসিদ্ধ শিল্প পরিবার ছিল বগুড়ায়। বগুড়ার জামিল, ভাণ্ডারি, তাজমা ও খলিফা শিল্প পরিবার ছিল একসময়কার অন্যতম উদ্যোক্তা। বগুড়ার বিখ্যাত শিল্প পরিবার ভাণ্ডারি গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করে আটটি কারখানা। মুজিবুর রহমান ভাণ্ডারির প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে নামি প্রতিষ্ঠান বগুড়া কটন স্পিনিং কোম্পানি লিমিটেড, হাবিব ম্যাচ ফ্যাক্টরি, ভাণ্ডারি গ্লাস ওয়ার্কস, নর্থ বেঙ্গল ট্যানারি, লিথোগ্রাফিক প্রিন্টিং প্রেস ও ভাণ্ডারি অয়েল মিল। এছাড়া আরেক শিল্প পরিবার জামিল গ্রুপ বেশকিছু কারখানা প্রতিষ্ঠা করে। এর মধ্যে পাকিস্তান আমলের বিখ্যাত জামিল সোপ, জানে সাবা টয়লেট ওয়াশিং সোপ বিদেশে রফতানি হতো। এছাড়া তারা উৎপাদন করত পারফিউম, সুগন্ধি জর্দা। একই গ্রুপের ভার্জিনিয়া টোব্যাকো লিমিটেড স্বাধীনতার পর নানা কারণে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তাজমা গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর আমজাদ হোসেন তাজমা প্রয়াস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সিরামিকসহ তার শিল্প পরিবারকে গতিশীল রাখতে। ৬১৫ জন কর্মচারী নিয়ে ডক্টরস কেমিক্যাল ওয়ার্কস ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বগুড়ায়। ১৯৬৪ সালে শহরের ফুলবাড়ী এলাকায় সাড়ে ১৪ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয় বিসিক শিল্পনগরী। স্বাধীনতার পর পরই শেষ হয়ে যায় প্লটগুলো। আবাসিক ও চাষযোগ্য জমি এলাকায় শিল্প ইউনিট স্থাপন নিরুত্সাহিত করতে বগুড়া সদরের চারমাথা ছয়পুকুরিয়া এলাকায় ভারী শিল্পের জন্য ১৯৮০ সালে জমি অধিগ্রহণ করা হয়। প্রায় সাড়ে ১৫ একর জায়গায় ‘দ্বিতীয় শিল্পনগরী’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয়া হয় বিসিকের পক্ষ থেকে। ১৯৯৮ সালে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়। ২০০৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিসিকের পক্ষ থেকে উল্লিখিত জায়গায় দ্বিতীয় শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে একটি কমিটিও গঠন করা হয়। ওই কমিটির পক্ষ থেকে বগুড়ার শিল্পোদ্যোক্তাদের ব্যাপক চাহিদা, বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু চালু হওয়ার পর পাইপলাইনে গ্যাস প্রাপ্তির কারণে ভারী শিল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা হয় জায়গা। বর্তমানে বগুড়া জেলায় ১২০টি বড় শিল্প-কারখানা, ১৯টি মাঝারি শিল্প-কারখানা, ২ হাজার ৩৫১টি ক্ষুদ্র শিল্প ও ৭৪৫টি কৃষিভিত্তিক শিল্প রয়েছে। জেলার অর্থনীতি শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিনির্ভরশীল। দেশের শিল্প-বাণিজ্যের প্রসারে বগুড়ার বড় একটি সম্ভাবনা রয়েছে। প্রযুক্তিগত অনুন্নয়ন, মুক্ত বাণিজ্য, শুল্কমুক্ত না হওয়া, ভিনদেশী পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হওয়াই বগুড়ার শিল্প-বাণিজ্য প্রসারে বাধা বলে মনে করা হয়। স্বাধীনতার আগে দেশে-বিদেশে বগুড়ার ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান নামডাক ছড়ালেও বর্তমানে সেসবের প্রায় সবই বন্ধ ও ধ্বংসের পথে। সেখানে টিকে আছে কেবল হালকা প্রকৌশল শিল্প।
বলা বাহুল্য, বিদেশী পণ্যের প্রতি আকর্ষণ, শ্রমিক সংকট, আর্থিক সংকটসহ বেশকিছু সংকটে পড়ে এগুলোর সবই বন্ধ হয়ে যায়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমিতে এখন হাউজিংয়ের ব্যবসা চলছে। জাহেদ মেটাল ইন্ডাস্ট্রি দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ। সব মিলিয়ে ঐতিহ্যবাহী বা ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যে আর কখনো নতুন করে চালু করা সম্ভব হবে না, সেটা প্রায় নিশ্চিত। জামিল গ্রুপের নামে এখনো জামিলনগর টিকে আছে। সম্প্রতি এসব কোম্পানির জায়গায় বড় বড় ভবন তৈরি হচ্ছে। চলছে ফ্ল্যাট-ব্যবসা।
শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত বগুড়ায় পঞ্চাশের দশকে প্রতিষ্ঠিত ও সত্তরের দশকে ধীরে ধীরে ভারী শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সত্তরের দশকে জেলায় মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপনে ব্যাপক সাড়া পড়ে। ধোলাইখাল মডেলে ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের পাশাপাশি ফাউন্ড্রি ও মেটাল শিল্পের ব্যাপক বিকাশ হতে থাকে। বিসিক শিল্পনগরীতে প্লট না থাকায় উদ্যোক্তারা বাধ্য হয়েই এসব শিল্পের অনেক ইউনিট আবাসিক এলাকায় স্থাপন করতে শুরু করে। কোথাও আবার চাষাবাদের জমিতেও কলকারখানা স্থাপন করা হয়।
বর্তমানে সারা দেশে কৃষি যন্ত্রাংশের ৮০ ভাগের জোগানদাতা বগুড়ার ফাউন্ড্রি ও মেটাল শিল্প-মালিকরা। ভারী শিল্প বন্ধ হওয়ার পর মূলত হালকা প্রকৌশল শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা দেয়। হালকা প্রকৌশল শিল্প গড়ে উঠেছে প্রায় এক হাজার। এসব কারখানায় প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে টিউবওয়েল, শ্যালো ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, যানবাহনের ছোট পার্টস, কলকারখানার প্রয়োজনীয় পার্টসসহ কৃষির সব একদিকে প্রযুক্তিগত অনুন্নয়ন, ফার্নেস অয়েলের মূল্য বৃদ্ধি, মুক্ত বাণিজ্য, শুল্কমুক্ত না হওয়া, জায়গা সংকট, ভিনদেশী পণ্যের প্রতি আকর্ষণ বাড়ায় বগুড়ার এ-জাতীয় শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার সীমিতি হয়ে পড়েছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার কারণে গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোর উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না বগুড়ার পণ্য। এ কারণেই বহু আগেই দেশের নামকরা তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ, বগুড়া প্লাস্টিক কারখানা, অ্যালুমিনিয়াম কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
বর্তমানে বগুড়ায় হালকা প্রকৌশল শিল্পে উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রপাতি ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। বগুড়ায় তৈরি কৃষি যন্ত্রাংশই বগুড়ার শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে।
২০০৮ সালে ফ্রেঞ্চ গ্রামীণ গ্রুপ ডানোন বগুড়ায় গ্রামীণ ডানোনে যৌথ খাদ্য শিল্প প্রতিষ্ঠা করে। এখানে শক্তি দই উৎপাদন হয়। ডানোন বহুজাতিক খাদ্য উৎপাদন কোম্পানি। ফ্রাঞ্চের পুঁজিবাজারে কোম্পানিটি সিএসসি-৪০ ইনডেক্স তালিকাভুক্ত।
রেশম শিল্পের জন্য সুবিখ্যাত রাজশাহী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ (১৯৫৩) দেশের বরেণ্য কয়েকটি শিক্ষা ও উন্নয়নকেন্দ্র রাজশাহীতে রয়েছে। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং শাহমখদুম বিমানবন্দর রাজশাহীর অন্যতম আকর্ষণ। রেশম শিল্প ছাড়াও রাজশাহীর আম ও লিচু, আখ ও আলু, টমেটো ও তরমুজের জন্য বিখ্যাত রাজশাহী। বাংলাদেশ সেরিকালচার বোর্ড রাজশাহীতে অবস্থিত। বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের হেড অফিস রাজশাহী, বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি শাখাও আছে রাজশাহীতে। রাজশাহীতে ১৯৯৮ সালে গড়ে ওঠে টোটাল টুল রেন্টাল শিল্প কেন্দ্র। রাজশাহীতে গড়ে ওঠা রেশম শিল্পের ইতিহাস বেশ পুরনো। মোগল আমল থেকে এর বিকাশ। ১৮৯৭ সালে রাজশাহীতে রেশম স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৮৯ সালে রেশম শিল্প ব্যবসায়ী সমিতি গঠিত হয়। ১৯৮৯ সালে উষা সিল্ক ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলেন আলহাজ মনছুর ফারুক চৌধুরী। এটি ১৯৯৪ সালে উৎপাদনে যায় । রাজশাহী ম্যাংগো প্রডাক্ট লিমিটেড আরেকটি অন্যতম শিল্প উদ্যোগ।
রংপুর অঞ্চলকে তামাকের জন্য বিখ্যাত বলা হয়। এখানে উৎপাদিত তামাক দিয়ে সারা দেশের চাহিদা মেটানো হয়। রংপুরে প্রচুর পরিমাণ ধান-পাট-আলু ও আম (হাঁড়িভাঙ্গা) উৎপাদিত হয়। যা স্থানীয় বাজার তথা সারা দেশের বাজারে সমান হারে সমাদৃত। রংপুর জেলার কেল্লাবন্দ নামক স্থানে বিসিক শিল্পনগরী গড়ে উঠেছে। সেখানে বিভিন্ন ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে। যেমন— আরএফএল লি., প্রাইম সনিক গ্রুপ, মিল্ক ভিটা বাংলাদেশ, আরডি মিল্ক, বিভিন্ন কোল্ড স্টোরেজ। এছাড়া হারাগাছ নামক স্থানে বিড়ি (সিগারেট) তৈরির একাধিক কারখানা। রংপুর শহরের আলমনগর নামক স্থানে আছে আরকে ফ্যান কারখানা। বদরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর নামক স্থানে গড়ে উঠেছে— শ্যামপুর চিনিকল লিমিটেড, রংপুর ডিস্টিলারিজ অ্যান্ড কেমিক্যাল কোং লি.।
নওগাঁ জেলার অর্থনীতি কৃষিপ্রধান। এ জেলায় উৎপাদিত প্রধান ফসলগুলোর মধ্যে রয়েছে: ধান, পাট, গম, আখ, ভুট্টা, আলু, বেগুন, রসুন, তেলবীজ ও পেঁয়াজ। এছাড়া নানা ধরনের মৌসুমি ফল ও ফসল উৎপাদন হয় এ জেলায়। ধান উৎপাদনে নওগাঁ বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ জেলা। বাংলাদেশের জেলাগুলোর মধ্যে নওগাঁয়ই সর্বাধিক ধান প্রক্রিয়াকরণ কল রয়েছে।
পাবনা জেলায়ই হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালন শাহ্ সেতু, ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন-পদ্মা ও যমুনার তীরে অবস্থিত পাবনা শিল্প, বিশেষ করে কৃষি ও কুটির শিল্প (তাঁতে বোনা কিংবা কুষ্টিয়ায় মোহনী মিলের সুতা ব্যবহার করে) বস্ত্র শিল্প গড়ে ওঠে। পাবনা একই সঙ্গে আখ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত। এখানেই এশিয়ার মধ্যে বৃহত্তম এগ্রিকালচার রিসার্চ সেন্টার ও সুগারকেন গবেষণা কেন্দ্র (বাংলাদেশে একমাত্র ও এশিয়ার মধ্যে বৃহত্তম)। পাবনায়ই জন্ম হয় দেশের বৃহত্তম ওষুধ প্রস্তুত শিল্প পরিবার স্কয়ারের। দেশের বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা, বেসরকারি খাতের উজ্জ্বল নক্ষত্র, অধ্যবসায়ী, স্বচ্ছতার সঙ্গে ন্যয়নীতিনির্ভর ব্যবসায়ী, স্বনির্মিত মানুষ স্যামসন এইচ চৌধুরীর ৮৬ বছর বয়সের (জন্ম ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২৫-মৃত্যু ৫ জানুয়ারি ২০১২) মধ্যে ১৯৫২-২০১২ অর্থাৎ ৬০ বছরই হলো তার সফল ও কর্মচঞ্চল দেশের উত্তরাঞ্চলে শিল্পোদ্যোক্তার জীবন। ফরিদপুরের একটি খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণকারী স্যামসন এইচ চৌধুরী ভারতে পড়াশোনা করে, ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীতে যোগ দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পাবনায় ফেরেন ১৯৫২ সালে। মেডিকেল অফিসার পিতা ইয়াকুব এইচ চৌধুরী ও মাতা লতিকা চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ সন্তান ছিলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। পিতার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েই দেশের রাজধানী ঢাকা থেকে ১৬০ কিলোমিটার দূরে পাবনার আতাইকুলা গ্রামে ১৯৫২ সালে ছোট একটি ওষুধের দোকান চালু করা দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু করেন। পিতার মৃত্যুর পর স্যামসন চার ভাই ও এক বোনের সংসারের হাল ধরেন। স্যামসন চৌধুরী তার মৃত্যুকালে রেখে যান স্ত্রী আনিতা চৌধুরী, তিন পুত্র স্যামুয়েল এইচ চৌধুরী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা তপন চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শিল্প সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব অঞ্জন চৌধুরী ও কন্যা তলা পাত্র।
১৯৫৮ সালে আর তিন বন্ধু মিলে তারা চারজন Square নামে পাবনার শালগারিয়ায় একটি ওষুধ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। ১২ জন শ্রমিক, কাঁচা-পাকা ভবনে ফ্যাক্টরি, কয়েকটি মেশিন ও স্বল্প পুঁজি অথচ আকাশ সমান স্বপ্ন ও উদ্যম নিয়ে স্কয়ারের যাত্রা হয়। স্যামসন দেখেন, ম্যালেরিয়া রোগীদের ভারতে উৎপাদিত কুইনাইন চড়া দামে কিনতে হয়। অথচ এ কুইনাইন তৈরির কাঁচামাল উপাদান তত্কালীন ঈশ্বরদী জেলার দর্শনার কেরু অ্যান্ড কোম্পানির চিনিকলে পাওয়া যায়। দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে এবং নিজস্ব লাগসই প্রযুক্তি দিয়ে সেরা গুণগত মান বজায় রেখে তৈরি করা সম্ভব সুলভ মূল্যের ওষুধ। উৎপাদনে স্কয়ারের যে স্বপ্নযাত্রা, সেই Square Group এখন বাংলাদেশের সেরা শিল্প পরিবার, যাদের টার্নওভার বর্তমানে ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এ গ্রুপ এখন ফার্মাসিউটিক্যাল, টেক্সটাইল, রেডিমেড গার্মেন্ট, টয়লেট্রিজ, ইলেকট্রনিক, খাদ্য শিল্প প্রভৃতিতে সক্রিয় ও সাফল্যজনকভাবে বিদ্যমান। তিনি স্কয়ারে একটি দক্ষ চৌকস কর্মিবাহিনী ও বিশ্বমানের পেশাদার ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছিলেন। সব সহকর্মীর সঙ্গে ছিল তার পিতৃসুলভ আচরণ, প্রগাঢ় প্রশাসনিক ঔদার্য এবং রসাত্মক ও অন্তরঙ্গ আলাপচারিতার রসে টইটম্বুর। তার প্রতিষ্ঠিত শিল্প পরিবারে প্রতিযোগীদের সঙ্গেও তার ছিল প্রগাঢ় সুসম্পর্ক। তার ব্যাংকাররা তাকে সবচেয়ে নিয়মিত বিশ্বস্ত গ্রাহক, সঞ্চয়কারী ও ঋণগ্রহীতা হিসেবে পেয়েছিল। সরকারি পোষক ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররাও বেসরকারি খাতের এ মহীরূহ ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে সবসময় সম্মান, সমীহ ও সহযোগিতা লাভ করেছে।
তার মূলমন্ত্র ছিল Quality, Quality, Quality everywhere স্কয়ারসামগ্রী, তা সে ওষুধ হোক আর ব্যসন হোক, হাসপাতালের সেবা হোক, সর্বক্ষেত্রে তিনি গুণগত মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে যথেষ্ট যত্নবান ছিলেন। স্কয়ার গ্রুপ যখন দেশে ইনসুলিন তৈরির উদ্যোগ নেয়, তখন দেখা গেছে, কত সচেতনতা, কত সতর্কতা অবলম্বনের পক্ষপাতী ছিলেন তিনি। নৈতিকতা, ব্যবসায়িক সততা তাকে দেশের সেরা শিল্প পরিবার গড়ে তোলায় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ২০০৭-০৮ সালে তার স্বনামধন্য পুত্র তপন চৌধুরী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। সে সময় স্কয়ার গ্রুপ সরকারের একটি বড় ধরনের নির্মাণ ও সরবরাহের কাজ পায়, সব নিয়মকানুন পদ্ধতি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই। তিনি নিজে প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়ে দেন, যেহেতু তার পুত্র সরকারে আছেন, তাই নীতিগতভাবে তার কোম্পানি এ সরবরাহের কাজটি নিতে চান না।
দেশের নবীন শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য তিনি ছিলেন রোল মডেল। অত্যন্ত স্বচ্ছতা, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে তিলে তিলে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক বিশাল শিল্প সাম্রাজ্য। জীবনে শত বাধাবিপত্তি ও পরিপার্শ্বের প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করেও লক্ষ্য অর্জনে তার অধ্যবসায় ও প্রয়াস-প্রচেষ্টার সাফল্য ছিল অন্যকে উদ্বুদ্ধ ও প্রেরণাদায়ক। তিনি তার পিতৃসুলভ আচরণে বহুজনের হূদয় জয় করেছেন, সান্নিধ্য লাভ করেছেন। আমার মনে আছে আমার বিনিয়োগ বোর্ডের দিনগুলো থেকে তার সাহচর্য লাভের কথা। বিনিয়োগ বোর্ডে পরিচালক, অর্থ বিভাগে ব্যাংকিং অনুবিভাগে অতিরিক্ত সচিব, প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য ও সর্বশেষ রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে আমার রেগুলেটরের ভূমিকা পালনকালে তার সঙ্গে নানা কারণে ও উপায়ে আমার সাক্ষাৎ ঘটেছে। এনবিআরে চেয়ারম্যান থাকার সময় আমি সবসময় তার কাছ থেকে মূল্যবান পরামর্শ পেয়ে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ হয়েছি। তিনি পিতার মতো মুরব্বিতুল্য, সহপাঠী বন্ধুর মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আমার অফিসে এসে শিল্প, বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক ক্ষেত্র সম্পর্কে গভীর তত্ত্ব ও তথ্য বিনিময় করতেন। কেন জানি ৮০-ঊর্ধ্ব বয়স্ক ব্যক্তি কি স্নেহের টানে সে সময় প্রায়ই আসতেন এনবিআরে এবং আমার খাসকামরায় বসে বসে দেশের শিল্পজগতের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করতেন, পরামর্শ দিতেন। শুল্কায়নের ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম বিষয়াদি কীভাবে কী কী দেখা দরকার, তা আমাকে তালিম দিতেন। ভারত থেকে আমার জন্য সে দেশের বিশাল শুল্ক অমানিবাস, এইচএস কোড কোষগ্রন্থ এনে উপহার দিয়েছিলেন। তার প্রস্তাব ও প্রার্থনাগুলো গভীর অভিনিবেশসহকারে স্টাডি করেছি এবং তার কাজ করতে গিয়ে নিজেরা অনেক কিছু শিখেছি। স্বীকার করতে কার্পণ্য নেই যে, তার কাছ থেকে আমি করদাতাবান্ধব, শিল্প উদ্যোক্তাবান্ধব, রাজস্ব নীতিনির্ধারণে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ও সুশীল মনোভঙ্গি অবলম্বনের অনুপ্রেরণা পেয়েছি। বিশেষ করে ধনাত্মক মনোভঙ্গি অর্জনের ক্ষেত্রে অনুশীলনের অনুপ্রেরণা পেয়েছি। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পরও তার স্কয়ার ভবনের অফিসে তিনি আমাকে বারবার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বিষয়ভিত্তিক আলাপ-আলোচনার জন্য। মেট্রোপলিটন চেম্বারের অনেক কমিটির সভায়ও তিনি আমাকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
জনাব চৌধুরী ছিলেন সৃজনশীল ও সারল্যের প্রতীক, সর্বক্ষেত্রে নৈতিকতা ও সেরা গুণগত মান বজায় রাখার পক্ষপাতী। কর্মক্ষেত্রে একটা অনুপ্রেরণা ও অনুসরণযোগ্য পরিবেশ সৃজনে সবার সঙ্গে প্রশাসক নয়, বন্ধুর মতো আচরণে নিষ্ঠা-সহানুভূতিপ্রবণ নিয়োগদাতা, দক্ষ ব্যবস্থাপকের মতো কর্মে উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী নিয়োগকর্তা ছিলেন তিনি। তিনি অন্যদের উদ্বুদ্ধ করতেন চাকরিতে নিয়োজিত না হয়ে নিয়োগকর্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে। এপ্রিল ২০১০ সালে তাকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় নৈতিকতা ও সেবা পদ্ধতি প্রক্রিয়া অবলম্বনের ওপর স্মারক বক্তৃতা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। সেখানে তিনি উদ্যোক্তাদের নৈতিক বল অর্জনের উপায় ও প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন। তার ব্যাংকাররা বলতেন, জনাব চৌধুরীর মতো এমন নিয়মনিষ্ঠ, নিয়মিত, সচেতন ও সজাগ কাস্টমার আর কোনোদিন পাননি বা পাবেন না।
জনাব চৌধুরী ২০০৪-০৭ সাল পর্যন্ত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পক্ষেত্রের মানুষের নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে স্পর্শকাতরতা থাকলেও জনাব চৌধুরীর টিআইবির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনে আলোকোজ্জ্বল এক আভা ছড়ান চারদিকে। তিনি সত্য কথা ও রূঢ় বাস্তবতার কথা দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা শীর্ষ ক্ষমতাধর ব্যক্তির সামনেও বলতে দ্বিধা করতেন না। তার প্রতিষ্ঠানে সব সহকর্মী সময়মতো বেতন, বোনাস ও প্রণোদনা পেয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানে কোনোদিন ধর্মঘট বা কর্মবিরতির মতো ঘটনা ঘটেনি। তিনি সহকর্মীদের সঙ্গে আহার করতেন অফিস কিংবা এমনকি উৎপাদন ফ্যাক্টরিতেও।
স্যামসন এইচ চৌধুরীর শিল্প সাফল্য ও তার সততা, দক্ষতা ও ন্যায়নীতিনির্ভরতার অন্তর্লীন ভাবনা ও ভাবদর্শনের যে বৈশিষ্ট্যগুলো তার জীবনী বিশ্লেষকরা তুলে ধরেছেন, তা শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে রইবে। ১. সৃজনশীলতা (Creativity), ২. সেরা পদ্ধতি প্রয়োগ (Good Practices of Ethics), ৩. আনুভূমিক ও ঊর্ধ্বমুখী বিশ্বস্ততা ও আনুগত্য (Vertical Integration), ৪. জানার আগ্রহ (Keen to Learn), ৫. অনাড়ম্বর জীবনযাপন (Simplicity), ৬. ভালো নিয়োগ কর্তৃপক্ষ (Good employer), ৭. উন্নত মান বজায় রাখা (Maintaining Best Quality), ৮. সরাসরি বা স্পষ্টীকরণ (Straight Forward), ৯. বন্ধুসুলভ মানসিকতা (Friendly), ১০. সততা (Honesty), ১১. বদান্যতা (Philanthropist), ১২. দেশের জন্য কাজ (Worker for the country) ও ১৩. সামাজিক দায়বদ্ধতা (Corporate social Responsibility)।
২০০৬ সালে Square Group আইসিএবির ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে সেরা হিসাব প্রতিবেদনের জন্য পুরস্কৃত হন। তার গ্রুপ ২০০৭ সালে লাভ করে ‘Best Business Award’। সবকিছু ছাপিয়ে তিনি ছিলেন দেশের সেরা ও সুদীর্ঘতম সময়ের করদাতা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ২০০৮ সালে তাকে এ সম্মাননা দিয়ে নিজেরাই বরং সম্মানিত বোধ করেছে। পাবনা শহরের জুবিলি ট্যাংক রোডে একাধিক ওষুধ শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে। পাবনা প্রতিশ্রুতি নামে মাঝারি পর্যায়ে শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে। ১৯৭৫ সালে গড়ে ওঠে ইউনিভার্সাল ফার্মাসিউটিক্যাল।
চলনবিলের উল্লেখযোগ্য অংশ সিরাজগঞ্জে হওয়ায় এ বিলকে কেন্দ্র করে মত্স্য ও কৃষিজাত শিল্প সিরাজগঞ্জের অন্যতম শিল্প উদ্যোগ। সিরাজগঞ্জ বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থান। সে কারণে সেতু চালু হওয়ার পর সিরাজগঞ্জে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ও চিকিত্সা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সেবাধর্মী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে উঠেছে। একসময় একটি অবহেলিত রেলস্টেশন ও যমুনা তীরবর্তী মফস্বল শহর সিরাজগঞ্জের মর্যাদা এখন শিল্পনগরী হওয়ার জন্য উন্মুখ। রবীন্দ্রনাথের শাহজাদপুরের কুঠিবাড়ী ও তত্সংলগ্ন এলাকায় কৃষি ও দুগ্ধশিল্প (বাঘাবাড়ী গো-প্রজনন ও চাষকেন্দ্র) গড়ে উঠেছে।
পঞ্চগড় বাংলাদেশের সর্বোত্তরের প্রান্তের জেলা হলেও এ জেলায় প্রথম বৃহৎ শিল্পের প্রসার ঘটে ১৯৬৯ সালে পঞ্চগড় সুগার মিলস লি. প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। পরবর্তীতে এ জেলায় কৃষিভিত্তিক অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: পঞ্চগড় সুগার মিলস লি. (১৯৬৯), জেমকন লিমিটেড (১৯৯৩), জেম জুট লিমিটেড (২০০৩) ও মার্শাল ডিস্টিলারি (১৯৯৬)। ইদানীং পঞ্চগড় জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুনভাবে যোগ হয়েছে চা চাষ। বাংলাদেশে সমতল ভূমিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কেবল এ জেলায়ই চা চাষ হচ্ছে। এরই মধ্যে চা চাষ জেলার কৃষিতে একটি বড় জায়গা করে নিয়েছে। ফলে জেলার প্রায় আনাচে কানাচেই চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ ঘন সবুজে ঘেরা অসংখ্য সব চা বাগান। সমতল ভূমিতে চা চাষের এ ব্যবসায় যে প্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে, সেসব প্রতিষ্ঠান হলো— ১. আগা টি এস্টেট, করতোয়া চা বাগান, কাজী অ্যান্ড কাজী চা বাগান, গ্রিন কেয়ার চা বাগান, ডাহুক চা বাগান, ময়নাগুড়ি চা বাগান, তেঁতুলিয়া রোড, পঞ্চগড় চা কোম্পানি, কাজী ফার্মস লি, স্যালিলেন টি এস্টেট, এমএমটি এস্টেট, আরডিআরএস চা বাগান, গ্রিন গোল্ড চা বাগান লি., হক টি এস্টেট, নাহিদটি এস্টেট, আরিব টি এস্টেট, জেসমিন টি এস্টেট, কুসুম টি এস্টেট, জেড অ্যান্ড জেল টি এস্টেট, এছাড়া স্মল হোল্ডিং ও স্মল গোয়ার্সের আওতায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে শুরু হয়েছে ব্যাপক চা চাষ।
দিনাজপুর একটি কৃষিসমৃদ্ধ জেলা। কাটারিভোগ, কালিজিরা চাল, চিড়া, আম ও লিচুর জন্য এ জেলা বিশেষভাবে পরিচিত। সেজন্য এ জেলায় যেসব শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে, তার অধিকাংশই কৃষিভিত্তিক। মূলত চাল, লিচু ও কৃষি উপাদান দিনাজপুরের শিল্পোদ্যোগ। এছাড়া ধান চাষনির্ভর এ জেলা দেশের সিংহভাগ চালের জোগান দেয়। এজন্য দিনাজপুরকে দেশের শস্যভাণ্ডার বলা হয়। ধান এ জেলার প্রধান কৃষিপণ্য হওয়ায় এ জেলায় শিল্প ও কল-কারখানা বলতে প্রায় দুই হাজারের মতো চালকল আছে, যার মধ্যে ১০০টির মতো অটোমেটিক ও সেমি-অটোমেটিক চালকল, বাকিগুলো চাতালনির্ভর (হাস্কিং) চালকল। এ জেলায়ই বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি, বড়পুকুরিয়া বিদ্যুেকন্দ্র জেলার শিল্প পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে। দিনাজপুর জেলায় বড় শিল্প-কারাখানার মধ্যে সেতাবগঞ্জ সুগার মিলস লি. ও দিনাজপুর টেক্সটাইল মিলস লি. অন্যতম।
সিরাজগঞ্জ শহরকে একসময় কলকাতা ও নারায়ণগঞ্জের সমতুল্য পাট ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা হতো। বর্তমানে এটি পাট ব্যবসার একটি প্রধান কেন্দ্র। এখানকার পাটকলগুলো তদানীন্তন বাংলা প্রদেশের প্রথম দিককার পাটকলের মধ্যে পড়ে।
নীলফামারী একটি কৃষিপ্রধান জেলা। এ জেলার ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এখানকার প্রধান শিল্প বয়ন, চাল, বাঁশ-বেত প্রভৃতি। দারোয়ানি বস্ত্রকল এ জেলার সর্ববৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া রয়েছে উত্তরা ইপিজেড ও সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরীর মতো শিল্প পার্ক।
কুড়িগ্রাম জেলার জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উত্স কৃষি ৭০.৪১%, অকৃষি শ্রমিক ৪.৭৪%, শিল্প ০.৫১%, ব্যবসা ৯.৪৫%, পরিবহন ও যোগাযোগ ২.০২%, নির্মাণ ০.৭৭%, ধর্মীয় সেবা ০.১৫%, চাকরি ৪.৯৮%, রেন্ট অ্যান্ড রেমিট্যান্স ০.২১% ও অন্যান্য ৬.৭৬%। লালমনিরহাট জেলার জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উত্স কৃষি ৭২.৭৮%, অকৃষি শ্রমিক ৩.৪৬%, শিল্প ০.৫%, ব্যবসা ১০.৪৯%, পরিবহন ও যোগাযোগ ২.৩৮%, নির্মাণ ০.৬৯%, ধর্মীয় সেবা ০.১৯%, চাকরি ৪.৪৫%, রেন্ট অ্যান্ড রেমিট্যান্স ০.২% ও অন্যান্য ৪.৮৬%। ঠাকুরগাঁও জেলার জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উত্স কৃষি ৭৬.৭৪%, অকৃষি শ্রমিক ২.৮৪%, শিল্প ০.৩৬%, ব্যবসা ৯.০৫%, পরিবহন ও যোগাযোগ ২.৩৪%, চাকরি ৩.৯১%, নির্মাণ ০.৭৬%, ধর্মীয় সেবা ০.১১%, রেন্ট অ্যান্ড রেমিট্যান্স ০.১৭% ও অন্যান্য ৩.৭২%। গাইবান্ধা জেলার জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উত্স ক্ষুদ্র শিল্প ১ হাজার ৬২১টি, মাঝারি শিল্প দুটি ও বৃহৎ শিল্প একটি।
নাটোর জেলার প্রধান উৎপাদিত ফসল হলো ধান। এছাড়া এখানে গম, ভুট্টা, আখ, পান ইত্যাদি উৎপাদন হয়। এখানকার বিলুপ্তপ্রায় ফসল নীল, বোনা আমন ও আউশ ধান। এখানে বেশ কয়েকটি ভারী শিল্প রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুটি চিনিকল, একটি ডিস্টিলারি ও একটি ফলের রসের কারখানা। দেশের ১৬টি চিনিকলের মধ্যে দুটি এ জেলায় অবস্থিত। এছাড়া মূলত এ জেলায় উৎপাদিত আখের ওপর নির্ভর করে পার্শ্ববর্তী রাজশাহী ও পাবনা জেলায় গড়ে উঠেছে আরো দুটি চিনিকল। বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রাণ কোম্পানির বেশির ভাগ কাঁচামাল (আম, লিচু, বাদাম, মুগ ডাল, পোলাওয়ের চাল ইত্যাদি) নাটোর জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসে। সম্প্রতি এখানে আপেল কুল, বাউ কুল, থাই কুলের ব্যাপক চাষ হচ্ছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ বাংলাদেশের একটি বৃহৎ খাদ্যসামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। রংপুরে ১৯৮১ সালে রংপুর ফাউন্ড্রি লিমিটেডের (আরএফএল) পথচলা শুরু। গ্রুপটি প্রতিষ্ঠা করেন বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা আমজাদ খান চৌধুরী ( ১৯৩৯-২০১৬)। তিনি দেশের অন্যতম বৃহত্তম শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ১৯৩৯ সালের ১০ নভেম্বর উত্তরবঙ্গের নাটোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আলী কাশেম খান চৌধুরী ও মায়ের নাম আমাতুর রহমান। তিনি ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউট থেকে তার শিক্ষাজীবন শুরু করেন। পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি ও অস্ট্রেলিয়ান স্টাফ কলেজ থেকে স্নাতক লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে তত্কালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। মেজর জেনারেল হিসেবে আমজাদ খান চৌধুরী ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে যান। ১৯৮১ সালে তিনি রংপুরে টিউবওয়েল তৈরির কারখানা হিসেবে রংপুর ফাউন্ড্রি লিমিটেড (আরএফএল) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৫ সালে গড়ে তোলেন এগ্রিকালচারাল মার্কেটিং কোম্পানি, যার ব্র্যান্ড নাম প্রাণ। আমজাদ খান চৌধুরী মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসসি), ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংগঠনের সভাপতি, পরিচালকসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব), বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশন (বাপা), আন্ডারপ্রিভিলেজড চিলড্রেনস এডুকেশন প্রোগ্রাম (ইউসেপ) প্রভৃতি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
ক্ষুদ্র পরিসরে যাত্রা করেও আজ প্রাণ-আরএফএল গ্রুপে ২৫টিরও বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে পাবলিক লিমিটেড দুটি কোম্পানি। এগ্রিকালচারাল মার্কেটিং কোম্পানি লিমিটেড ও রংপুর ফাউন্ড্রি লিমিটেড (আরএফএল)। এছাড়া প্রাণ এগ্রো বিজনেস লিমিটেড, প্রাণ ডেইরি লিমিটেড, প্রাণ এক্সপোর্টার্স লিমিটেড, আরএফএল প্লাস্টিকস লিমিটেডসহ ২৫টির বেশি কোম্পানি রয়েছে।
খাদ্য ও প্লাস্টিক— এ দুই খাতে সর্বাধিক বহুমুখী পণ্য উৎপাদন হয়। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্লাস্টিক খাতে আছে দেড় হাজার পণ্য। খাদ্যসামগ্রী উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির প্রডাক্ট লাইনে রয়েছে ৫০০টিরও বেশি পণ্য। দেশজুড়ে বিস্তৃত ১০টি অত্যাধুনিক কারখানায় এসব পণ্য উৎপাদন হয়। প্রাণ-আরএফএলের কারখানাগুলোয় কাজ করছে প্রায় ৮৫ হাজারের বেশি নারী-পুরুষ। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ওপর নির্ভরশীল আরো ৭৪ হাজারের বেশি পরিবারের জীবন ও জীবিকা। সব মিলিয়ে সাত লখেরও অধিক জনগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ওপর নির্ভরশীল। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ৮৮টিরও বেশি দেশে নিয়মিত রফতানি হচ্ছে এ গ্রুপের পণ্য। কৃষিজাত পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা পালন করে চলেছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী ও রফতানিকারক এ প্রতিষ্ঠান, যার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার সর্বশেষ ২০১০-১১ অর্থবছরসহ টানা ১০বার শ্রেষ্ঠ জাতীয় রফতানি ট্রফি প্রদান করেছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপকে। জাতীয় রফতানি বৃদ্ধি ও মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় রফতানি খাতে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক শ্রেষ্ঠ জাতীয় রফতানি ট্রফি (স্বর্ণ) পেয়েছে প্রাণ এক্সপোর্টার্স লিমিটেড। একই অর্থবছরে প্রাণ এগ্রো লিমিটেড শ্রেষ্ঠ জাতীয় রফতানি ট্রফি (রৌপ্য) পদকও পেয়েছে। এছাড়া ২০১২-১৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ মূল্য সংযোজন কর পরিশোধকারী হিসেবে আরএফএলকে সম্মাননা দেয়া হয়। বরেন্দ্র বার্তা/অপস
লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

Close