অর্থ ও বাণিজ্যনাগরিক মতামতমহানগরশিরোনাম

আলো ছড়াক রাজশাহীর রেশমে

রুহিনা ফেরদৌস

প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে চীনে রেশম রহস্যের সূত্রপাত। তথ্যমতে, খ্রিস্টপূর্ব চার থেকে তিন হাজার বছর আগে উত্তর চীনের শাংঝি প্রদেশে প্রথম রেশম গুটির দেখা মেলে। এছাড়া খ্রিস্টের জন্মের ২ হাজার ৭০০ বছর আগে এ অঞ্চলে সিল্কের তৈরি একটি স্কার্ফের হদিস পাওয়া যায়। তবে রেশম গুটি থেকে সুতা তৈরির কৌশল বের করে চীনারা যে সিল্ক তৈরি করেছিল, হাজার বছর ধরে তার উৎপাদন ও রফতানিতে নিজেদের একচ্ছত্র প্রভাব ধরে রাখতে সমর্থ হয় তারা। বলা যায়, বিশ্ববাজারে সে সময়ে সিল্কের একচ্ছত্র ও একমাত্র অধিপত্য ছিল তাদের দখলে। তাছাড়া চীনারা বিশ্বাস করত, ঈশ্বর কর্তৃক আশীর্বাদপ্রাপ্ত বলেই তাদের কাছে রেশম তৈরির রহস্য উন্মোচন হয়েছে। এমন ধারণা থেকেই অন্যদের কাছে রেশম তৈরির খুঁটিনাটি দীর্ঘদিন ধরে গোপন রাখে তারা। গোপন করার সময়টা নেহাত কম নয়। প্রায় দুই হাজার বছর! ৫৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইউরেশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে সিল্কের গুণগান। এ সময় দুজন ধর্মযাজক চীন থেকে গোপনে রেশম কীট কনস্ট্যান্টিনোপলে নিয়ে আসার পর রোমান সাম্রাজ্যে রেশম উৎপাদনের প্রচলন শুরু হয়। পশ্চিম ইউরোপে সিল্কের বিস্তার ক্রুসেডের মধ্য দিয়ে, বিশেষ করে ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলে। ১০০ বছরের ব্যবধানে ক্রমান্বয়ে ইতালি থেকে ফ্রান্স ও স্পেনেও বিস্তার লাভ করে রেশমের ব্যবহার। এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের হাত ধরে রেশমের উৎপাদন কৌশলেরও পরিবর্তন ঘটে। কে না জানে, ১৩ শতকের দিকে চীন ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলগুলোয় বাণিজ্যপথ হিসেবে ব্যবহূত রাস্তাটি পরিচিত হয়ে ওঠে সিল্ক রোড নামে। চীন থেকে একে একে মধ্যপাচ্য, ইউরোপে শুরু হয় সিল্ক উৎপাদন। ১৪ শতকের দিকে জাপানের লোকেরা রেশম তৈরির পদ্ধতিগুলো জেনে যায়। ১৬ শতকের দিকে বাণিজ্যিকভাবে সিল্কপণ্যের প্রসারের জন্য ইতালির সঙ্গে যুক্ত হয় ফ্রান্স। পরে ১৭৬০ সালে শিল্প বিপ্লব ও তুলা কাটার যন্ত্র আবিষ্কারের ফলে খানিকটা ম্লান হয়ে যায় রেশমের একচ্ছত্র আধিপত্য।
তবে ঠিক কত সালে বাংলায় রেশম চাষের সূত্রপাত, তার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ জানা না গেলেও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের বরাতে জানা যায়, ১৬-১৭ শতকের দিকে রেশম উৎপাদনে সমৃদ্ধ ছিল ভারতবর্ষ। ইতিহাসবিদদের মতে, হিমালয়ের পাদদেশ হয়ে গঙ্গা অববাহিকায় রেশম চাষের শুরু। কৃষিভিত্তিক পণ্য বলে রেশম চাষের চর্চা ছিল বাংলার গ্রামীণ গৃহস্থালিতে, যা সীমাবদ্ধ থাকত তিনটি পর্যায় পর্যন্ত। তুঁতগাছ থেকে রেশম চাষ, পরিণত রেশম গুটি থেকে সুতা তৈরি করে তা বিক্রি করা হতো স্থানীয় গ্রামের হাটে বা পার্শ্ববর্তী শহরে সুপরিচিত বয়নশিল্পীর কাছে। সুদক্ষ কারিগররা ওই সুতা দিয়ে বুনতেন রেশম কাপড়। মোগল আমলে অবিভক্ত বাংলা রেশম প্রাচুর্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছিল বেশ কয়েক বছর।
বাংলা যে কারণে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মনোযোগ আর্কষণ করে, তার মধ্যে অন্যতম ছিল রেশম। ১৮৩৫ সালের দিকে এ অঞ্চল থেকে ৪০০ টন সিল্ক কাঁচা রেশম রফতানি হতো বলে জানা যায়। সাড়ে তিন দশক ধরে ইউরোপের ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এ অঞ্চলে রেশম রফতানি বাণিজ্য প্রসার লাভ করে। ঔপনিবেশিক আমলে রাজশাহী ও বগুড়া অঞ্চলে ব্যাপক হারে রেশম চাষ শুরু হয়। ১৯০৫ সালে রেশম শিল্পের বিকাশের জন্য রাজশাহীর মীরগঞ্জ ও বগুড়ায় দুটি বড় রেশম বীজাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ সরকার রেশমের উৎপাদন বৃদ্ধি ও এ শিল্পকে তদারক করার জন্য আলাদা একটি বিভাগ চালু করে। ২০ বছরের মাথায় একটি ট্যারিফ বোর্ড গঠন করা হয়। রেশমকে ঘিরে এ অঞ্চলের রয়েছে দীর্ঘ আর উজ্জ্বল অতীত। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় বাংলার রেশমপ্রধান অঞ্চলগুলো ভারত অংশে চলে যায়। মাত্র ১০ শতাংশ রেশম অঞ্চল এপার বাংলায়। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলায় যে অংশটা এপার বাংলার মধ্যে পড়ে, সেখানে তখন রেশম চাষে জড়িত ছিল প্রায় দুই হাজার মানুষ। কিন্তু পাকিস্তান সরকার খুব একটা নজর দিতে আগ্রহী ছিল না এ খাতে। সে সময় ব্যক্তি মালিকানায় কিছু উদ্যোক্তা রেশম শিল্পের হাল ধরতে এগিয়ে এলেও নিরুত্সাহিত হতে হয় তাদের। দেড় দশক ধরে চলতে থাকে এ অবস্থা। ১৯৬২ সাল নাগাদ তত্কালীন পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে রেশমের উন্নয়নে বেশকিছু উদ্যোগ হাতে নেয়। পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার অধীনে রংপুর, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, গাজীপুর, সিলেট ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে ১০টি রেশম বীজাগার স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে রাজশাহী সিল্ক ফ্যাক্টরি। ইস্ট পাকিস্তান স্মল অ্যান্ড কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের সরকারি সহায়তায় এটি তার কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠা করা হয় সিল্ক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআরআই) ও সিল্ক টেকনোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট (এসটিআই)। তবে প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকে কাগজে কলমে। রেশম উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত মানুষ এ উদ্যোগ থেকে খুব একটা উপকৃত হয় না। তাছাড়া রেশম উন্নয়নের জন্য নেয়া হয় না নতুন কোনো কার্যক্রম। ফলে পূর্ব বাংলায় রেশম উৎপাদনের সঙ্গে যে মানুষ জড়িত ছিল, তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। পরিস্থিতি বদলায় ১৯৭১ সালের পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। ১৯৭৪ সালে রেশম শিল্পকে সমৃদ্ধ করার জন্য বাংলার রেশমের রাজধানী রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ সিল্ক রিসার্চ ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (বিএসআরটিআই) বা রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সেরিকালচার বোর্ড প্রতিষ্ঠা হলে রাজশাহী সিল্ক ফ্যাক্টরি এ বোর্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রথম অবস্থায় কারখানাটিতে ১০০টি রিলিং মেশিন, ২৩টি শক্তিচালিত ও ১০টি হস্তচালিত তাঁত স্থাপন করে কার্যক্রম শুরু করা হয়। ১৯৭৪ থেকে ১৯৮০ সাল নাগাদ ১০০টি রিলিং মেশিনকে ২০০টিতে ও ২৩টি শক্তিচালিত তাঁতকে ৪৩টিতে উন্নীত করা হয়।
গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও আয়ের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে রেশম শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। আশির দশকের শেষ দিকে দেশে তিন হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে তুঁত চাষ হতো। ধারণা করা হয়, সে সময় রেশম খাত দেশের ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিল। তাছাড়া ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ রেশম বোর্ড গঠন, রাজশাহীতে প্রধান কার্যালয় স্থাপন, রেশম বোর্ডের সঙ্গে রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট যুক্তকরণ এবং রেশম শিল্পের অবকাঠামো ও নির্মিত কারখানাসহ সব স্থাপনা রেশম বোর্ডের অধীনে চলে আসাতে গতি পায় খাতটি। শুরুতে আটটি জেলার মধ্যে রেশম শিল্পের কার্যক্রম সীমিত থাকলেও পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে ৪০ জেলায় রেশম বোর্ডের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়। মূলত এ সময়টিই এ অঞ্চলে রেশম উৎপাদনের স্বর্ণযুগ হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশের রেশমরাজ্য হিসেবে পরিচিত রাজশাহীতে স্বাধীনতা-পরবর্তী যে মানুষটির হাত ধরে রেশম শিল্পের পুনর্যাত্রা, তিনি সপুরা সিল্কের কর্ণধার মোহাম্মদ সদর আলী। ১৯৭৮ সালে ২৮ বছর বয়সে মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি আর সঙ্গে একজন লোক নিয়ে তিনি শুরু করেন রেশম ব্যবসা। সপুরা সিল্কের হাত ধরে এ অঞ্চলে নতুনভাবে রেশমের চর্চা শুরু। তবে এক মালিকানাধীন এ ব্যবসার শুরুর ইতিহাসটাও কিন্তু চমত্কার। চাঁপাইনবাবগঞ্জে জন্ম মোহাম্মদ সদর আলী ছেলেবেলায় দাদির মুখে গল্প শুনেছিলেন তার পূর্বপুরুষের রেশম চাষের উজ্জ্বল ইতিহাসের। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের দোকানে ঘুরে ঘুরে ব্যবসায়ীদের বোঝাতে হয়েছে রেশমের উপকারিতা সম্পর্কে। তার সে উদ্যোগের হাত ধরে সপুরা সিল্ক পার করেছে প্রায় চার দশকের এক দীর্ঘ যাত্রা।
রেশম উৎপাদন একটি জটিল প্রক্রিয়া হলেও আমাদের দেশের আবহাওয়া, জলবায়ু ও আর্থসামাজিক অবস্থা রেশম চাষের জন্য উপযোগী। রেশম গুটি কিংবা রেশম মথের শুঁয়াপোকার একমাত্র খাদ্য বলতে তুঁত পাতা। পাতা, ফল ও কাঠের বৈশিষ্ট্য অনুসারে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তিন ধরনের তুঁত চাষ হয়। সাদা, কালো ও লাল তুঁত। এর মধ্যে সাদা তুঁত রেশম পোকার বিশেষ পছন্দের। রেশম কীট ডিম থেকে জন্মায়। এরপর গুটিতে রূপান্তরিত হওয়ার পর্যায় শেষে মথ হিসেবে আবির্ভূত হয়। গুটিবদ্ধ অবস্থায় রেশম পিউপা বা কীটগুলোকে মেরে ফেলে সেগুলোকে সিদ্ধ করে সুতা ছাড়ানো হয় এবং পরে তা গোটানো হয়। তবে রেশম চাষের জন্য জুতসই আবহাওয়া যেমন জরুরি, তেমনি রেশম গুটি পালন থেকে শুরু করে সুতা তৈরির প্রক্রিয়া পরিশ্রমসাপেক্ষ। বিশেষ করে মৌসুমের শেষে যখন রেশম পোকা প্রচুর পরিমাণ তুঁত পাতা খেতে শুরু করে, তখন তাদের পালনের জন্য পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়। যারা সিল্ক তৈরি করেন, তাদের কাছে কিন্তু রেশমের ভিন্ন ধরনের নাম প্রচলিত রয়েছে। রেশম গুটি থেকে শুরু করে সুতা উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপের ওপর ভিত্তি করে এ নামকরণ। যেমন রেশম গুটি পালনকারীকে বলা হয় বোসনি, রেশমগুটিকে পোলু, গুটির সুপ্তাবস্থাকে চোঞ্চ বা বিজন গুটি, ১ হাজার ২৮০টি রেশম গুটিকে কাহন ইত্যাদি। বছরে চারবার প্রজনন হয় রেশমের। এ সময়গুলো হচ্ছে অগ্রহায়ণ, ভাদ্র, জ্যৈষ্ঠ ও চৈত্র। এ অঞ্চলের যেকোনো আবহাওয়া ও তাপমাত্রায় রেশম কীট পালন করা গেলেও ২১০-২৯০ তাপমাত্রা ও ৯০ শতাংশ বায়ুর আর্দ্রতা রেশম চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। তবে চারপাশে বৈশ্বিক উষ্ণতা আর জলবায়ু পরিবর্তনের যে প্রভাব, তা থেকে রেহাই পাচ্ছে না রেশম শিল্পও। নেতিবাচক পরিস্থিতির মুখে পড়ছে রেশম চাষ। এর উৎপাদনের জন্য যে আবহাওয়া প্রয়োজন, কয়েক বছর ধরে তা বিরাজ করছে না বাংলাদেশে। অতিরিক্ত গরম কিংবা খুব ঠাণ্ডায় ব্যাঘাত হয় রেশমের, ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের রেশম ব্যবসা। তবে রেশম শিল্পের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি করেছে আমাদের অব্যবস্থাপনা আর অমনোযোগ। এ কারণে শেষ পর্যন্ত রেশম শিল্পের অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার যেমন ঘাটতি ছিল, তেমনি অসাধু ব্যবসায়ী ও তাদের প্রতিনিধিদের চক্রান্তে ধ্বংসের মুখে পড়ে এ শিল্প। ১৯৮৮ সালে সরকার কর্তৃক রেশম সুতা আমদানির সিদ্ধান্তও আমাদের রেশম শিল্পের নেতিবাচক পরিণতির জন্য দায়ী। সে সময় দেশে বছরে রেশম সুতার উৎপাদন ছিল ৪৫০ টন। অথচ ওই সময় চীন থেকে যে রেশম সুতা আমদানি করা হতো, তার দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় বড় ধরনের লোকসানে পড়েন স্থানীয় সুতা উৎপাদকরা। ক্রমেই বন্ধ হতে থাকে রেশম চাষ ও সুতা উৎপাদন। স্থানীয় রেশমচাষীরা জীবিকার প্রয়োজনেই পেশা বদল করতে বাধ্য হন। কমতে থাকে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, বাড়তে থাকে আমদানি করা রেশম সুতার দাম। সুতার দাম বৃদ্ধির এ সরব প্রক্রিয়ার রেশ ও স্থানীয় উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত না হওয়ায় একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। তাই রেশম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্দেশ্যে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ রেশম বোর্ড গঠন করা হলেও দেশের রেশম শিল্পের উন্নয়ন ও অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয়নি। তথ্যমতে, দুই দশকের ব্যবধানে দেশে রেশম সুতার উৎপাদন কমেছে ৯৩ শতাংশ।
রেশম শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের অনেকেই মনে করেন, সদিচ্ছা থাকলেও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে। যেমন বৈজ্ঞানিকভাবে রেশম চাষকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সময় ও আবহাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে ডিম তৈরি করা বা এতে যারা কাজ করে, তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাসহ রুট লেবেল থেকে রেশম চাষের সঙ্গে জড়িতদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে এ ঝুঁকি থেকে বের হতে পারবে রেশম ব্যবসা। রেশম চাষে ব্যবসায় ঝুঁকির পাশাপাশি অনেক বেশি মূলধনের প্রয়োজন হয়। তাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ব্যবসায়ীদের অনেকেই ঝুঁকি নিতে চান না। বাংলাদেশ সিল্ক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, রেশমরাজ্য হিসেবে পরিচিত রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ভোলাহাট। যশোর, কুষ্টিয়া, নাটোর, পাবনাও রেশম চাষের জন্য উপযোগী। তাছাড়া বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর ও ঠাকুরগাঁও সুবিধাজনক তুঁত চাষের জন্য। সবকিছু মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি উদ্যোগ আর নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ফিরিয়ে আনতে পারে রেশমের সুসময়।
দেশে রেশম সুতার চাহিদা বছরে ৩০০ টন থাকলেও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উৎপাদন হয় মাত্র ৪০ টন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে রাজশাহী ও ঠাকুরগাঁওয়ের রেশম কারখানা দুটি চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর আগে ২০০২ সালে এ কারখানা দুটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ২০০৭ সালে বেসরকারীকরণের উদ্দেশে প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের কাছে ন্যস্ত করা হলেও তা ফলপ্রসূ হয় না। ফলে ২০১৩ সালে কমিশনের কাছ থেকে ফেরত নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। রেশম শিল্পের বিকাশে সরকারের পক্ষ থেকে রেশম শিল্পের পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে পার্বত্য এলাকায় ২৬ কোটি ও রংপুরে ২৫ কোটি টাকার প্রকল্পের পাশাপাশি রয়েছে রেশম চাষের জন্য চারাঞ্চল ও খাস জমি শনাক্তের প্রকল্পও (বণিক বার্তা, ২৩ জানুয়ারি ২০১৬)।
বিশ্ববাজারে আজো রেশমের চাহিদা অপরিসীম। তাই আমরা যদি এ শিল্পের পুনর্বিকাশে সফল হই, তাহলে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি হবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া রেশম কারখানাগুলোকে চালু করা, রেশম চাষের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি, রেশমচাষীদের বিনা সুদে ঋণ প্রদান ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে রেশম শিল্পের সুদিন ফেরানো সম্ভব। সর্বোপরি সরকারি পর্যায় থেকে এ শিল্পের পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতাই রেশমে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারে। বরেন্দ্র বার্তা/অপস
লেখক: সাংবাদিক

Close