অর্থ ও বাণিজ্যনাগরিক মতামতশিরোনাম-২

চাতাল: ঢেঁকি বেয়ে যখন তা শিল্প হলো

গৌতম কুমার রায়

বাংলাদেশটা ভাটি এলাকার দেশ। এখানে জলের সঙ্গে পলিবাহিত হয়ে উর্বরতা সৃষ্টি হয়। যে পলির উর্বরতায় উৎপাদন হতো ফল ও ফসল। আবার জীবনের প্রয়োজনে মিষ্টি জল, জলপথে সহজ চলাচলের জন্য মানুষ নদীতীরবর্তী এলাকাকে বসবাসের জন্য বিবেচনা করত। গঙ্গা-ভাগীরথী, গঙ্গা-করতোয়া, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা-মেঘনা অববাহিকায় তাই মানুষের বসতি স্থাপন শুরু হয় সেই আদি সময় হতে। এ অববাহিকার মানুষ সুপেয় জল, জলের মাছ এবং জলে উৎপাদিত ফল ও ফসলে জীবন ধারণ করত বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে।
বর্ষার জলে বন্যা, শীতে শুষ্কতার অঞ্চল হিসেবে পরিচিত দেশের একসময়ে মঙ্গা এলাকা নামে খ্যাত উত্তরাঞ্চলে এলাকা হিসেবে অভাবি জনপদের নাম কুড়িগ্রাম, নওগাঁ, জয়পুরহাট, লালমনিরহাট, রংপুর, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া জেলার নাম ছিল। তবে এখন সেই মঙ্গার নামটা বর্তমান সরকারের বদৌলতে ঘুচেছে। বর্ষা মৌসুমে এখানে জনপদ জলে ডুবে থাকত। পলির আস্তর পড়ে এখানকার মাটি উর্বর হতো। তবে এখানে একফসলি ধান উৎপাদন হতো বেশ। বছরের অর্ধেকটা সময় এখানে মানুষ খেতে পারলেও আর অর্ধেকটা সময় তারা থাকত অভাবি। ধান উৎপাদনে দেশের, বিশেষ করে দিনাজপুর জেলা পারস্যের গোলাপ নামে পরিচিত হয়েছিল অনেক আগেই। সহজে শ্রমের ব্যবহারের কারণে এখানকার মানুষ অনেক আগেই নিজের প্রয়োজনে ধান ও তা থেকে চাল তৈরির চেষ্টা রপ্ত করতে অনেকটা বাধ্য হয়েছিল। কাজের ক্ষেত্র খুঁজতে গিয়ে এ এলাকার মানুষ শ্রমবাজার খুঁজতে গিয়ে দেখে, চালের বাজার দেশের অনেক স্থানে থাকলেও তা ছিল প্রয়োজনের চেয়ে কম। উত্তরবঙ্গের মানুষ, বিশেষ করে নারীরা চাল তৈরি করে নিজেদের এলাকার মানুষের এবং বাড়তি চাল দেশের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের চাহিদার জোগান দিতে উদ্বুদ্ধ হতে লাগল। সে সময় দেশের কোনো চালবাজারে বিক্রেতা-ক্রেতা-ভোক্তার আধিক্য ছিল না। অভাবি মানুষ নিজেদের জমিতে উৎপাদিত ধান শুকিয়ে তা ঢেঁকিতে ভেঙে নিজেরা খেত এবং অন্যত্র তা বিক্রি করত। সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে তখন রেল যোগাযোগের দিকে ঝুঁকত। সে চিন্তায় উত্তরবঙ্গের মানুষ পূর্ববঙ্গের বাজার পেতে কুষ্টিয়া জেলার পোড়াদহ নামের বাজারটি খুঁজে পেয়েছিল। শিলিগুড়ি, সীমান্ত নামের রেলে চেপে তারা রাত জেগে পোড়াদহে এসে চাল বিক্রি করে আবার ফিরে যেত নিজ ঠিকানায়। এক একদিন গড়িয়ে এভাবে গড়ে ওঠে কুষ্টিয়া জেলায় পোড়াদহ চালের বাজার। আর যা-ই হোক, দেশের সব এলাকায় চালের বাজার তৈরি করতে গিয়ে ঢেঁকিতে ধান ভাঙার যে প্রচলন, তাতে উত্তরবঙ্গের মানুষের অবদান সর্বাগ্রে।
একটা সময় ছিল, ছেলেমেয়ের বিয়েতে, বিশেষ করে মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে ছেলের সচ্ছলতার বিষয়টি দেখা হতো, সোম বছর বা সারা বছর ছেলেরা ঘরের ধানে খায় কিনা। তাহলে মনে করা হতো, অন্তত মেয়েটা দুটো মোটা ভাত আর মোটা কাপড়ে টিকে থাকতে পারবে। তবেই আত্মীয়তা করা হতো।
ষাটের দশকের কথা। একবার পদ্মায় বড় বন্যা হলো। নদীভাঙনে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চিলমারী চরের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীতে বিলীন হলে এখানকার মানুষ ন্যূনতম বাঁচার প্রয়োজনে শ্রম বিকিতে শহরমুখী হতে লাগল। সারা দিন কাজ করে তারা পোড়াদহে চাল কিনতে যেত। পঞ্চাশের দশক থেকে কুষ্টিয়ায় পিএডিসির (বর্তমান বিএডিসি) হাট নামে এক ধানের হাট বসত। এ হাটে ধানের সহজলভ্যতা থাকায় নদীভাঙন এসব মানুষ এ হাট থেকে ধান কিনে উত্তরবঙ্গের চাল বিক্রেতাদের কাছ থেকে উত্সাহিত হয়ে তখন জেলার কবুরহাট, খাজানগর, পোড়াদহে চাল তৈরি করে বিক্রি করতে লাগল। দিনে দিনে এ এলাকায় চাঁদপুর, ভৈরব, মানিকগঞ্জ, মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, কুমিল্লা, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, ফরিদপুর এলাকার নদীভাঙন, অভাবী মানুষ বসতি তৈরি করে খাজানগর চালের মোকাম এলাকায়।
দিনে দিনে শহরে মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। যত মানুষ বাড়ে, তত বাড়ে চালের চাহিদা। বাজারে চালের জোগান দিতে ঢেঁকিনির্ভরতা থেকে চাতালে ধান শুকানোর জন্য অভ্যস্ত হতে থাকে। ব্যবহার বাড়তে থাকে চাতালের। চালের ভোক্তার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চালের বাজারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সে কারণে সাপ্তাহিক বাজার থেকে হাতের কাছে চালের দোকান এসে বসে।
দিন গিয়ে দিন এসে ঢেঁকি বিকল হয়ে প্রচলন আসে হাস্কিং মিলের। এ মিলে চাতালের ব্যাপক ব্যবহার হতে থাকে। এ মিলে দেশের স্থানীয় ধনীক শ্রেণী, বড় বড় ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে লাগলেন। দেশের আনাচে কানাচে হাস্কিং মিল তৈরি হলো। চাতাল তখন মানুষের খুব কাছে পৌঁছে গেল, যে কারণে দেশে এখন প্রায় ৪০০টি হাস্কিং মিল আছে বলে জানা যায়। যদিও এ মিল মালিকরা এখন এ মিলের ডিজিটাল সংস্করণ হিসেবে অটো রাইস মিলের দিকে ঝুঁকছে। অনেকে হাস্কিং মিলের ব্যবসা থেকে নিজেকে গুটিয়েও নিয়েছে। অটো মিলে চাতালের তেমন ব্যবহার নেই বললেই চলে। ধান থেকে চালের যে কারবার, তা ঘরে ঘরে ঢেঁকি থেকে হাস্কিং মিল এবং তা থেকে অটো রাইস মিলে এসে ঠেকেছে। কাঠের ঢেঁকির ধানকল আজ অটো মিলে রূপান্তর হতে গিয়ে মিলে পরিণত হয়েছে।
চালের মোকাম কুষ্টিয়া
কুষ্টিয়া চালের মোকাম বলতে খাজানগরের নাম বোঝালেও এ মোকামকে ঘিরে রয়েছে আরো কয়েকটি এলাকার চাতাল ও মিল। তার মধ্যে বটতৈল, কদমতলা, কবুরহাট, দোস্তপাড়া, খাজানগর, সন্তোষপুর, বল্লভপুর ও বড় আঁইলচাড়া। এর মধ্যে কবুরহাট ও খাজানগর চাতাল বিশেষভাবে পরিচিত।
কবুরহাট: স্থানীয়দের মতে, এ জায়গায় প্রথমে চিলমারীর অভাবি মানুষ এলে তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া হয়। এ এলাকার নাম মূলত কবিরহাট। এ এলাকায় একটি খরস্রোতা নদী ছিল। তবে তার নাম কেউ বলতে পারেন না। নদীতীরে ছিল বটবৃক্ষ। এ বড় বটগাছের তলে নির্দিষ্ট দিনে কবিদের মেলা বসত। বড় বড় নৌকায় চেপে জমিদাররা এখান থেকে তাদের মনোবিলাসের জন্য কবি সংগ্রহ করতেন। এই এক-দেড়শ বছর আগের কবিরহাট এখন হয়েছে কবুরহাট। গরিব লোকের শ্রমের সাধনায় কবুরহাটে চাল বিকিকিনির থেকে চাতালের জন্ম হয়। সৃষ্টি হয় ধান-চালের পসরা। আবার ১৯৭৫ সালে ঢেঁকিকে বিদায় দিয়ে স্থানীয় তৈয়ব আলী ও মুনসুর আলী বিশ্বাস হাস্কিং মিল দিয়ে চাতালের জন্ম দিলেন এখানে।
চালের মোকামের এক দস্তি নাম খাজানগর: কবুরহাটের যখন রমরমা মনুষ্যবসতি, তখনো খাজানগর পতিত জমি বলে দাবি কবুরহাটের স্থানীয় জনৈক মোহসীন নামে এক সমাজসচেতন ব্যাক্তির। তবে এ কথা সত্য, ১৯৪৯ সালে দেশে বড় এক বন্যার কবলে পড়ে কুমিল্লা, ফরিদপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালীর বানভাসি মানুষের আগমন ঘটে এখানে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চিলমারীর মানুষ এখানে আসে ১৯৫৪ সালে। তখন পদ্মার তীব্র ভাঙনে বাস্তুহারা মানুষ কাজের খোঁজে এখানে আশ্রয় নিতে থাকে। এই চিলমারীতে ফরিদপুরের মোহন মিয়ার জমিদারি ছিল। তিনি ফরিদপুরের অভাবি মানুষকে ভাত-কাজের সংস্থান করতে এ সময়ে ফরিদপুর থেকে চিলমারীতে পাঠিয়ে দেন।
কবিরহাটের পতিত জমি খাজানগর হতে গিয়ে আছে এক চমকপ্রদ কাহিনী। ভারতের আজমীঢ় শরিফের বিখ্যাত ইসলামী আধ্যাত্মিক গুরু খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির দরবারে যাতায়াত করতেন দেশের বিখ্যাত লাঠিয়াল সম্রাট ওস্তাদ সিরাজুল হক চৌধুরী ও খাজানগরের বসতি অনেক মুরিদান। পতিত জায়গার জনবসতি এলাকার নাম নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে ১৯৫৪ সালে এই মুরিদেরাই সর্বসম্মতিক্রমে এ এলাকার নাম দেন খাজানগর।
এখানকার মানুষ প্রথমে এ এলাকায় কৃষিকাজ শুরু করেন ১৯৬৫ সালে। এ এলাকার ওপর দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিখ্যাত গঙ্গা-কপোতাক্ষ বা জিকে সেচ খাল প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। সেচ খালের কাজ দিয়ে জীবিকা সংগ্রহ করে খাবারের প্রয়োজনে প্রথমে ঢেঁকি ছাঁটা চাল উৎপাদন করে নিজেরা নিজেদের এবং পরে এলাকার সবার, তারপর আশপাশ এলাকার মানুষের খাবার জোগান দিতে গিয়ে চালের উৎপাদনে আসে। এভাবে জেলার মানুষের চালের জোগান আসতে থাকে এ খাজানগর থেকে।
১৯৭৬ সালের কথা। এলাকার নেতৃত্বদানকারী ব্যবসায়ী দাদা রমিজ উদ্দিন প্রধান ও আরো কয়েকজন মিলে খাজানগরে স্থাপন করেন প্রথম হাস্কিং মিল ‘খাজানগর রাইস মিল’। এ রমিজ উদ্দিনের সঙ্গে আরো ছিলেন আলী বক্স প্রধান, আক্কাস মেম্বর, হাজি আব্দুস সালাম প্রমুখ।
দেশে মিনিকেট ধান থেকে চালের যাত্রা: নব্বইয়ের দশকের সময় ভারত থেকে এ দেশে মিনিকেট ধান ও চাল আমদানি শুরু হয়। এ সময়ে খাজানগরের মিলাররা ভারত থেকে মিনিকেট ধানের বীজ সংগ্রহ করে তা দেশের, বিশেষ করে যশোর, বেনাপোল, ঝিনাইদহ এমন আরো কিছু এলাকার কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করতেন। তখন মেহেরপুর সীমান্তের দুই পাড়ের কৃষকরা এ ধান রোপণ করতেন। আমাদের কৃষকরা এখান থেকে মিনিকেট ধান উৎপাদন করার পদ্ধতি জেনে দেশে তা রোপণ শুরু করে। এরপর উত্তরবঙ্গের কৃষকদের একই সহযোগিতা দিয়ে ওই এলাকায় মিনিকেট ধান উৎপাদন শুরু করা হয়। এ কুষ্টিয়ার খাজানগর নামে পরিচিত চালের মোকামের নাম এখন বিশ্বজুড়ে। এ মিলগুলো থেকে উৎপাদিত চাল দেশের মোট চালের চাহিদার ২১ শতাংশ জোগান দিয়ে আসছে।
হাস্কিং মিল ও চালের চাতালের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মধ্যম ও নিম্নমধ্যম শ্রেণীর মানুষের রুটি-রুজির বিষয়টি। দেশের বিপুলসংখ্যক হতদরিদ্র মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি আজ জড়িয়েছে হাস্কিং মিলের চাল উৎপাদনের প্রয়োজনে। দিনবদলে হাস্কিং বদলে যাচ্ছে। আসছে অটো রাইস মিল। অটো রাইস মিলের দাপটে মানুষ শ্রম হারাচ্ছে। আবার বিলুপ্ত হচ্ছে ঢেঁকি শিল্পের। ঘরে ঘরে এখন আর ঢেঁকি পাড়ের শব্দ যেমন শোনা যায় না। আবার মেয়েদের গানের সুরে সুর মিলিয়ে চাল কোটার সংস্কৃতিও মিলে যাচ্ছে দিন দিন। এ মানুষের খাদ্যই বিআর ২৮ ও বিআর ২৯ ধানের মোটা চাল।
ধান-চাল-চাতাল-হাস্কিং মিল— এ বিষয়গুলো এখন আর কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশে একসময় নওগাঁ, জয়পুরহাট, বগুড়া, দিনাজপুরে চালের মোকামের কাজ সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন স্থানীয়ভাবে চাহিদার ওপর ভিত্তি করে চালের জোগান আসে স্থানীয় পর্যায়েই।
চাতালের শ্রমিকদের মধ্যে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের সংখ্যা নিতান্তই কম নয়। তবে এখানে নারীরা পরিশ্রম বেশি করে কম মজুরি পান। আবার তারা পুরুষ শ্রমিক, কখনো কখনো মালিকের দ্বারা নির্যাতিত হন। এমনও দেখা গেছে, নারী শ্রমিকের অনেকে মালিকের রক্ষিতা হিসেবে রয়ে গেছেন। নিগ্রহের প্রতিবাদ করলে সামাজিক দুর্নামের দায়সহ নির্যাতনের ধরন পাল্টে প্রতিশোধ নেয়া হয়। তাই এখানে অনেক শ্রমিক নির্যাতন নীরবে সহ্য করে থাকেন। চাতালে শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকি থাকলেও তা মোকাবেলা করার জন্য সহায়তার ব্যবস্থা নেই। বীমা কিংবা কল্যাণ তহবিলের বা আপত্সময়ের জন্য তাদের আহারের ব্যবস্থা নেই এতটুকুও। এ বিষয়ে কথা হলো কুষ্টিয়া খাজানগর জেলা চালকল মালিক সমিতির সেক্রেটারি জয়নাল আবেদিনের সঙ্গে। তিনি বললেন, চাতাল বা চাতালসংশ্লিষ্ট হাস্কিং মিলের এখন খুবই দুরবস্থা। অনেক মিল এখন বন্ধ। যে জন্য অনেক শ্রমিক বেকার। বিশেষ করে পুঁজি হারিয়ে মিল মালিকেরা নিঃস্ব হয়ে গেছেন। মিলের চড়া সুদে নেয়া ব্যাংকঋণ মওকুফ করে চাতাল চালুর আগ্রহ তৈরি করা দরকার। মালিক-শ্রমিকদের কারিগরি শিক্ষার জন্য প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়া দরকার। চালকলের জন্য নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আবশ্যক। মিল মালিকদের স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি। কেননা তার কথায়, ‘আমরা খাদ্যের নিশ্চয়তা দিই। শ্রমিকদের কাজ দিই। আমরা স্থানীয় ও দেশীয় অর্থনীতিকে সচল রাখি। শ্রমিকের পারিবারিক থেকে সামাজিক উন্নয়নে আমরা পথ তৈরি করে দিই। দেশীয় ধানের জাত রক্ষায় গবেষণা প্লট তৈরি করা দরকার।’ তিনি আরো জানালেন, কুষ্টিয়ার আবহাওয়া, মাটি, পানির গুণাগুণ বেশ ভালো। সেজন্য এখানকার উৎপাদিত ধান ও চাল বেশ স্বাস্থ্যসম্মত ও স্বাদের হয়ে থাকে। এখানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিরাপত্তা দেয়ার জন্য এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা জরুরি।
বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুর রশিদ জানালেন, দেশে এখন হাস্কিং মিল এক আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে। তিনি ২০০৪ সালে প্রথম খাজানগরে অটো মিল স্থাপন করেন, যা এখন এক ক্যাম্পাসে চার ইউনিটে সম্প্রসারণ হয়েছে। দেশে বর্তমানে ৩১টি অটো রাইস মিল রয়েছে। হাস্কিং মিলে শ্রমিক দরকার হয় ৫০ জন। তার মধ্যে পুরুষ ও নারী শ্রমিকের অনুপাত ৩৫: ১৫। আবার তার অটো মিলে শ্রমিক কাজ করেন ৮০০ জন। এখানে পুরুষ ও নারী শ্রমিকের অনুপাত ৬৫০: ১৫০। দেশে প্রতিদিন চাল চাহিদার ৭০ হাজার টনের মধ্যে খাজানগর জোগান দেয় ১৫ হাজার টন, যে কারণে এখানকার গুরুত্ব একটু বেশি।
চাতাল শিল্পে শ্রমিকদের মানবাধিকার নিশ্চিত হয় না। বছর বছর কাজ করেও তারা পুঁজিহীন। এ মিলে মালিকরা শুধু তদারকির অভাবের সুযোগে নিজেরা বাজারকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করে অতিমুনাফার দিকে ঝুঁকে থাকেন বলে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। যে জন্য চালের বাজারে অস্থিরতা এলে তাতে প্রকারান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবসময় ভোক্তারাই। এখানে এখন পুঁজির জোগান দেয় স্থানীয় ধনিক শ্রেণী, এনজিও, চড়া সুদের মুনাফাখোররা। অথচ অটো মিলের আগমনে চাতাল শিল্পের কেউ কেউ শিল্পপতিতে পরিণত হলো। এখানে অনেক ব্যাংক ঢুকল। ঋণ এল, তবে তা চড়া সুদেই।

ঢেঁকি, ধান ও চাতাল— এ তিনে বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাস। ছেলেমেয়ের বিয়েতে হলুদ শাড়িতে রঙ-বেরঙে সেজে ঢেঁকির পাড়ে ধাপুরধুপুর হলুদ কুঁটে দেয়ানেয়ার ক্ষেত্রে থাকে আনুষ্ঠানিকতা। আজ তা অপ্রচলিত হতে চললেও বাঙালির প্রবাদ কথায় রয়ে গেছে, ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে।’ কথাটা এখনো করিত্কর্মা মানুষের জন্য উত্সাহ জোগায়। যারা ঢেঁকিতে ধান ভেঙে জীবিকা নির্বাহ করত, এখন তারা অনেকেই তাদের পৈতৃক এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে, তারা এখন অনেকে ভিক্ষা করে দিন অতিবাহিত করছে। শুধু কি তাই, শরীরী পরিশ্রমের সহজতার কারণে এখন আমাদের গড় আয়ু যেমন কমছে, আবার নানাবিধ অসুখ শরীরে বাসা বাঁধার কারণে জীবনে ঝুঁকি বেড়েছে অনেক। কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সদরপুর গ্রামের আমোদ আলী (৬০) ও লাল বানু (৪৫) জানান, এ বয়সে এসে পিঠা খাওয়ার জন্য ঢেঁকিতে গুঁড়ো কোটার সমস্যায় শখের পিঠা ইচ্ছে করলেই খেতে পারছি না। ঢেঁকিতে ধান ভানার কারণে যে তুষ পাওয়া যেত, তা জ্বালানির কাজে ব্যবহার হতো। কুষ্টিয়ার গ্রামাঞ্চল থেকে গ্রামীণ জনপদের ঢেঁকি শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে।
তার পরও দেশী ধান গেছে। গেছে দেশী কল ঢেঁকিও। অহরহ মানুষের খাবার জোগাড় করতে গিয়ে হিমশিম উৎপাদন। প্রযুক্তি দিয়ে ধান চাষ, ধান থেকে চাল তৈরি। এতসবের পর প্রযুক্তির সর্বশেষ সংযোজন অটো রাইস মিল। অর্থাৎ ঢেঁকি হলো ধান, চাল, চাতালের পর হয়েছে শিল্পের শিল্পিত এক অঙ্গন। বরেন্দ্র বার্তা/অপস
লেখক: গবেষক ও পরিবেশ ব্যক্তিত্ব

Close