নওগাঁশিরোনাম

দেড় যুগেও বিচার হয়নি আদিবাসী নেতা সরেন হত্যাকাণ্ডের

বরেন্দ্র বার্তা ডেস্ক: দিন, সপ্তাহ, মাস এরপর বছরের পর বছর পার, এখন দেড় যুগ। আজ ১৮ আগস্ট বহুল আলোচিত নওগাঁর আদিবাসী নেতা আলফ্রেড সরেনের ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯ বছর আগে সরেন ভূমিদস্যুদের হাতে নিহত হলেও এখনো ওই মামলার কোনো সুরাহা হয়নি। ওই মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আদিবাসীদের রয়েছে সংশয়। তাদের অভিযোগ জামিনে থাকা আসামিরা তাদের অব্যাহতভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়ায় ইতিমধ্যে অনেক আদিবাসী পরিবার ভীমপুর আদিবাসী পল্লী ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেছে।
অভিযোগ আছে বর্তমানে যে ক’টি পরিবার এখনো বসবাস করছে তারা ভূমিদস্যুদের ভয়ে জমিতে চাষাবাদ করতেও পারছে না। ফলে পরিবারগুলো চরম অভাব অনটন ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছে। পল্লী ছেড়ে মামলার সাক্ষীরা চলে যওয়ায় মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান আলফ্রেড সরেন হত্যা মামলার বাদী আলফ্রেডের প্রবাসী ছোট বোন রেবেকা সরেন।
সরজমিন নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার ভীমপুর আদিবাসী পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, আলফ্রেড হত্যা মামলার জামিনে থাকা আসামিদের অব্যাহত হুমকি ধমকিতে ২৪টি পরিবারের মধ্যে বর্তমানে নতুন ও পুরাতন মিলে সেখানে বসবাস করছে মাত্র ৮/৯টি পরিবার। বাকীরা প্রাণ বাঁচাতে অন্যত্র চলে গেছে। নিহত আলফ্রেড সরেনের বৃদ্ধ বাবা গায়না সরেনও মারা গেছেন। আলফ্রেড সরেনের স্ত্রী জোছনা সরেন এই পল্লীতে থাকেন না। আলফ্রেডের রেখে যাওয়া ৪ বছরের মেয়ে ঝর্ণা সরেন বড় হয়েছে। বিয়ে করে থাকছে ঢাকায়। চাকরি করছে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে। আলফ্রেড সরেন হত্যাকাণ্ডের এক বছরের মাথায় তার মা ঠাকুরানী সরেন মৃত্যুবরণ করেন।
প্রকাশ আছে ১৮ আগস্ট ২০০০ সালে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার ভীমপুর আদিবাসী পল্লীতে হাতেম-গদাই গংদের সন্ত্রাসীদের হামলায় আদিবাসী নেতা আলফ্রেড সরেন নৃসংশভাবে খুন হন। ওই ঘটনায় সন্ত্রাসীরা ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়ে আদিবাসী পল্লীর ১১টি পরিবারের বাড়িঘর ভাঙচুর লুটপাটসহ অগ্নিসংযোগ করে। ওই সময় তাদের হামলায় আদিবাসী নারী-শিশুসহ প্রায় ৩০ জন মারাত্মক আহত হয়। ওই সন্ত্রাসী ঘটনার পর নিরাপত্তার জন্য সেখানে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়। পরে তা গুটিয়ে নেওয়া হয়।
এ মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাড. মহসীন রেজা জানান, আলফ্রেড সরেন হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই কমল সরেন ছোট বোন রেবেকা সরেন বাদী হয়ে হত্যা ও জননিরাপত্তা আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় পুলিশ ৯১ জন আসামির নামে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। এর মধ্যে পুলিশ কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে। ওই সময় নওগাঁ দায়রা জজ আদালতে মামলার সাক্ষী গ্রহণ শুরু হয় এবং ৪১ জন সাক্ষীর মধ্যে সেই সময় ১৩ জনের সাক্ষী গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছিল। ৪ দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর জননিরাপত্তা আইন বাতিল করে।
ওই সময় পলাতক সীতেষ চন্দ্র ভট্টাচার্য ওরফে গদাই ও হাতেম আলীসহ ৬০ জনের অধিক আসামি জননিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন করলে জননিরাপত্তা আইনের সকল রিট হাইকোর্ট খারিজ করে দেয়। এর ফলে আসামিরা জামিনে বেড়িয়ে আসে। এরপর বাদিগণ অ্যাপিলেড ডিভিশনে মামলা দায়ের করেন। বর্তমানে আলফ্রেড সরেন হত্যা মামলাটি অ্যাপিলেড ডিভিশন শুনানি অন্তে পূর্ণাঙ্গ শুনানির জন্য হাইকোর্ট ডিভিশনে প্রেরণ করেছে। তিনি রিটগুলো দ্রুত শুনানি করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের উপদেষ্টা জয়নাল আবেদীন মুকুল বলেন, আদিবাসী নেতা আলফ্রেড সরেনকে হত্যার পর অগ্নিসংযোগ করে, নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতন করে। হত্যার পর জাতীয় আদিবাসী পরিষদের নেতৃত্বে জাতীয় নেতৃবৃন্দ নিয়ে ১৮/২০ হাজার লোকের সমন্বয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করে পরবর্তীতে সফল লড়াই করেছিলাম। তিনি আরো বলেন, সারা দেশে আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন হচ্ছে। সরকারের নিকট অবিলম্বে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করণ ও পৃথক স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠনসহ হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
নিহত আলফ্রেড সরেনের ছোট ভাই মহেশ্বর সরেন বলেন, আসামিরা এখনো আমাকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। ৬৩ বিঘা জমির মধ্যে ৩৩ বিঘা জমি তারা নিয়ে নিয়েছে। বাকী ৩০ বিঘা জমিরও ভূমি অফিসের যোগসাজসে চেক কেটে নিয়েছে। আমার ভাই হত্যার পর আদিবাসীরা অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করেছে বিচারের দাবিতে। হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
এতসব আশংকার মধ্যেও ১৮ আগস্ট পালিত হবে নিহত আদিবাসী নেতা আলফ্রেড সরেনের ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। জাতীয় আদিবাসী পরিষদ নওগাঁ জেলা শাখা সূত্রে জানা গেছে, ১৮ আগস্ট সকালে ভীমপুরে আলফ্রেড সরেনের সমাধীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানানো হবে। এছাড়াও থাকবে আরো কর্মসূচি। বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close