নাগরিক মতামত

তামাকের আগ্রাসন থেকে শিশুদের বাঁচানো জরুরি

আমজাদ হোসেন শিমুল

– পৃথিবীতে বিভিন্ন ক্ষতিকর পণ্যের মধ্যে তামাক অন্যতম। এই ক্ষতিকর পণ্যটির আগ্রাসন থেকে কোমলমতি শিশুরাও রক্ষা পাচ্ছে না। শিশুদের মাধ্যমে তামাকপণ্য উৎপাদন, বিক্রয়, বিপণন এমনকি তামাকপণ্য সেবনেও এই কোমলমতি শিশুদের টার্গেট করা হচ্ছে। রীতিমত চমকে দেয়ার বিষয় হলো- বাংলাদেশে অধিকাংশ শিশুই পরোক্ষভাবে ধূমপানের শিকার। ফলে শিশুরা তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শিশুদের দ্বারা তামাক কারখানায় কাজ করিয়ে তাদের সম্ভাবনাময় স্বর্ণালী জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। তামাকের আগ্রাসন থেকে শিশুদের রক্ষার বিষয়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে ধারা সংযুক্ত থাকলেও আসলে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। শিশু- কিশোরদের দ্বারা বিক্রি করানো হচ্ছে তামাকপণ্য। শিশুদের ওপর তামাকপণ্যের এমন আগ্রাসন চলতে থাকলে দেশের উজ্জ¦ল ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত প্রজন্ম তৈরিতে  বিঘ্ন ঘটবে।
বাংলাদেশে তামাক কোম্পানীগুলো স্কুল শিক্ষার্থীদের ধূমপানে আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন ধরনের কূটকৌশলে কাজ করছে। তারা স্কুলের পাশে বিভিন্ন ধরনের দোকানে তামাকপণ্য ঢুকিয়ে দিয়ে তা কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের ধূমপানে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। এমনকি তারা তাদের কৌশলী চেষ্টায় সফলও হয়েছে। ‘বিগ ট্যোবাকো টাইনি টার্গেট’ নামে এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজশাহী বিভাগের ৮৩ শতাংশ স্কুল ও খেলার মাঠের ১০০ মিটারের মধ্যে সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্য বিক্রি হয়। এসব স্কুলের পাশে ক্ষুদ্র মুদির দোকান রয়েছে ৭৭ শতাংশ, রাস্তার পাশে তামাকের দোকান ১২ শতাংশ। এই ৭৭ শতাংশ ক্ষুদ্র মুদির দোকানে তামাকপণ্যও বিক্রি করা হয়। মুদির দোকানগুলোতে শিশুদের জন্য হরেক রকমের মুখরোচক খাবারের পসরা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আর সেই খাবারের পাশেই সাজিয়ে রাখা হয়েছে তামাক নিয়ন্ত্রন আইন লঙ্ঘন তামাকের অবৈধ বিজ্ঞাপনের (বক্স) পসরা। পাসেই সুন্দর প্যাকেটে মোড়ানো তামাকপণ্য। এভাবে তামাকপণ্য, সুন্দর শো-কেসে তামাকপণ্যের বিজ্ঞাপন দেখতে দেখতে তামাক সেবনে শিশুরা আস্তে আস্তে আকৃষ্ট হয়। এটি নিঃসন্দেহে তামাক কোম্পানীর একটি কৌশল। এমন কৌশল বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী, কেউ পাবলিক প্লেস বা পাবলিক পরিবহনে ধূমপান করলে আইনে ৩০০ টাকা  জরিমানা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনটি কার্যকরে কোনো উদ্যোগ নেই। যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের লাখ লাখ শিশু পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। সম্প্রতি ঢাকায় শিশুরা যে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার তার ওপর একটি গবেষণাকর্ম পরিচালিত হয়েছে। গবেষণাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্ক, ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গ এবং লিডস সিটি কাউন্সিলের জনস্বাস্থ্য বিভাগ যৌথভাবে সম্পন্ন করেছে। গবেষণাটির ফলাফলে বলা হয়েছে, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ও এর আশপাশের ১১-১৩ বছরের ৯৫ শতাংশ শিশুর শরীরে ক্ষতিকর নিকোটিন রয়েছে। আর এর কারণ পরোক্ষ ধূমপান। এ গবেষণায় যে শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তাদের বসবাস মিরপুর ও সাভার এলাকায়। সবাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। এই গবেষণা কর্মটির ফলাফলের কথা চিন্তা করতেই লোম শিহরে যায়। কেননা- ঢাকা ছোট্ট একটি এলাকজুড়ে পরিচালিত গবেষণার ফলাফলে ৯৫ শতাংশ শিশুর শরীরে তামাকপণ্যের ক্ষতিকর নিকোটিনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে। দেশের পাবলিক প্লেসগুলোতে যেভাবে দেদারছে
ধূমপান করা হয় আমার বিশ্বাস, এমন গবেষণা যদি পুরোদেশে করা হয় ফলাফল এমনই হবে। তার মানে দেশের ৯০-৯৫ শতাংশ শিশুর শরীরে পরোক্ষ ধূমপানের কারণে এই ক্ষতিকর নিকোটিনের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে।

ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনটি ২০০৫ সালে (সংশোধিত ২০১৩) প্রণীত হয়েছে। তখন থেকে যদি এই আইনটি বাস্তবায়নে সরকার বা প্রশাসন কাজ করতো তাহলে বাংলাদেশের শিশুদের এতো বড় ধরনের সর্বনাশ হতো না। তাই এখনি প্রশাসন কিংবা জনগণ উভয়কেই পাবলিক প্লেসে ধূমপানের বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। পরোক্ষ ধূমপানের ফলে কোমলমতি শিশুদেরর রক্ষায় পাবলিক প্লেসে ধূমপান বন্ধে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
শুধু এ রিপোর্ট নয়, কিছু দিন আগে যুক্তরাজ্যের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেটে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ‘বিশ্বব্যাপী ৪০ শতাংশ শিশু পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। সেখানে বাংলাদেশের শিশুদের অবস্থান ছিল শীর্যে। ইউনিসেফের মতে, বাংলাদেশে ৫ বছরের কম বয়সী ৭২ লাখ শিশু অপুষ্টির শিকার। প্রতিদিন যে পরিমাণ অর্থ ধূমপানের মাধ্যমে ধোঁয়া হয়ে উড়ে যায় তা বন্ধ হলে প্রতিদিন ৭২ লাখ শিশুকে ১ গ্লাস করে দুধ দেয়া সম্ভব।

বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কিছু জেলায় তামাকের চাষ হয়। বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের সিলেট, বরিশাল উত্তরাঞ্চলের রংপুর, লালমনিরহাট,
গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জে তামাকের চাষ হয়। যার কারণে এসব জেলায় হাজার হাজার বিড়ি, জর্দ্দা ও গুল ফ্যাক্টরি রয়েছে। সেখানকার
দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারগুলোর শিশুদের সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করেই টিকে আছে এসব ফ্যাক্টরি। স্থানীয় অধিবাসীদের হিসাবে, প্রতিটি বিড়ি
কারখানার ৬০-৬৫ ভাগ শ্রমিকই বয়সে শিশু। সম্প্রতি লালমনিরহাট জেলায় সরিজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ২১ হাজার বিড়ি শ্রমিকের মধ্যে ১৫ হাজারই শিশু, যাদের বয়স ৪ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। উল্লেখ্য যে, ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬’ অনুযায়ী, ১৪ বছরের আগে কোন শিশুকে কর্মে নিয়োগ দেয়া অবৈধ।

৪-১৪ বছরের এই শিশুরা মায়ের কোলে থাকাকালীন থেকেই কারখানার অভ্যন্তরে অবস্থান করে। সবকিছু ভাল করে বুঝতে শেখার আগেই শিশুদের
কোমল হাতে খেলনার পরিবর্তে তামাকের গুরা আর বিড়ির খোসা উঠে আসে। এতো ছোট্ট বয়সে এই বিষের (তামাক) কারখানায় কাজ করলে  কতদিন টিকবে তারা? তাই কারখানার মালিকদের এ বিষয়ে একটু ভাবা দরকার। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এভাবে নিঃশেষ করে দিতে তাদের একটুকুও কি বিবেকে বাধে না? কাজেই কোমলমতি লাখ লাখ এসব শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের একটু নজর দেয়া জরুরি। সরকার শ্রম আইন ও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন করলে এসব শিশু রক্ষা পাবে
তামাক নামক বিষ কারখানা থেকে।

ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনের ৬ (ক) এর (১) নং উপ-ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ আছে ‘অনধিক ১৮ বছর বয়সের কোনো ব্যক্তির
নিকট তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় করিবেন না অথবা উক্ত ব্যক্তিকে তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য বিপণন বা বিতরণ কাজে নিয়োজিত
করিবেন না বা করাইবেন না।’ কেউ এই ধারার বিধান লঙ্ঘন করলে তার – অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদ-ের বিধান রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি
রাজশাহীতে ‘এ্যাসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট- এসিডি’ পরিচালিত এক বেসলাইন সার্ভের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মহানগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে অপ্রাপ্ত বয়স্ক (১৮ বছরের নিচে) শিশুদের দিয়ে তামাকপণ্য বিক্রয় করানো হচ্ছে। যেই হাত দিয়ে এসব শিশুদের স্কুলে গিয়ে লেখার কথা সেই হাত দিয়ে তারা মরণ নেশায় আসক্তদের কাছে তামাকপণ্য বিক্রি করছে। এভাবে এসব শিশুতামাক বিক্রেতা তামাকপণ্য বিক্রি করতে করতে তারাও এমন মরণ নেশায় আকৃষ্ট হচ্ছে।

শুধু রাজশাহীতেই নয়; আমার ধারণা- এই চিত্র সারাদেশের। কিন্তু প্রশাসন তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের এই ধারা বাস্তবায়নে শিশুদের দ্বারা যাতে তামাকপণ্য বিক্রি না করানো হয় সেজন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেন না। তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিকট অনুরোধ থাকবে, খুদে এসব তামাক বিক্রেতার অভিভাবকদের ধরুন, তাদেরকে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় নিয়ে আসুন। আজকের শিশুই আগামী দিনের দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। কাজেই এই শিশুদের সঠিকভাব লালন-পালন এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমার, আপনার, সবার (অভিভাবক ও সরকার)। কোমলমতি শিশুরা চায় কোনো ধরনের বাধা-বিপত্তি ছাড়াই বেড়ে উঠতে। কিন্তু অনেক শিশুকেই পারিপার্শ্বিকতা তথা অর্থনৈতিক দৈন্যদশার কারণে মৃত্যুর বিপণন তামাকজাত দ্রব্যের সঙ্গে (তামাক কোম্পানি ও তামাক বিক্রির) সংশ্লিষ্ট হতে হয়েছে। কিন্তু এই শিশুদের অভিভাবক ও তারা নিজেরাও (শিশুরা) ইচ্ছা করলেই নিশ্চিত মৃত্যুর গ্যারান্টিযুক্ত এই তামাকপণ্য বিপণন, বিতরণ কিংবা উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট না হয়ে অন্য কোনো পেশায় নিয়োজিত হতে পারতো। অথবা একটু কষ্ট করে হলেও নিজেদেরকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে দেশ গড়ার কাজে নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করতে পারতো। কিন্তু তারা তা করেনি। দেশের প্রশাসন যন্ত্র চাইলেই তামাক উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট শিশু শ্রমিকদের অন্য পেশায় ফিরিয়ে দিয়ে তাদেরকে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন। কেননা, তাদেরকে তামাকের ভয়াবহ আগ্রাসন থেকে আগে বাঁচাতে হবে। তাই আমাদের প্রত্যাশা- ভবিষ্যৎ দেশ গড়ার এই কারিগররা তামাকের আগ্রাসন থেকে রক্ষা পেয়ে দেশ ও জাতি গঠনের কাজে নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করতে পারবে।
লেখক : সাংবাদিক ও সাবেক শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও
সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Close