জাতীয়শিরোনাম

যেভাবে রোহিঙ্গাদের নেতা হয়ে উঠলেন মুহিবুল্লাহ

বরেন্দ্র বার্তা ডেস্ক: রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে দ্বিতীয়বারের মতো ব্যর্থ হয়েছে সরকার। তারা পাঁচ দফা দাবিনামা দিয়েছে দেশে ফেরত যেতে। এরপর গত রবিবার স্থানীয় প্রশাসনের কোন অনুমতি ছাড়াই কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সমাবেশ করে রীতিমতো হুমকি দিয়েছে, জোর করে ফেরত পাঠানোর পরিণাম ভালো হবে না। অভিযোগ উঠেছে, এই বিশাল সমাবেশ আয়োজনের পেছনে অর্থায়ন করেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়দার অর্থ যোগানদাতা পাকিস্তান ভিত্তিক সংস্থা আল খিদমত ফাউন্ডেশন!
এই রোহিঙ্গা সমাবেশের নেপথ্যের এবং প্রকাশ্যের কারিগর মুহিবুল্লাহ নামের একজন। যিনি আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান। এই সেই মুহিবুল্লাহ, যিনি মাসখানেক আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করে নালিশ জানিয়ে এসেছেন। ধর্মীয় কারণে নির্যাতনের শিকার বিশ্বের ১৭টি দেশের ২৭ জন প্রতিনিধির মধ্যে মুহিবুল্লাহদের সঙ্গী ছিলেন বাংলাদেশের প্রিয়া সাহা। যিনি ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে উদ্ভট তথ্য প্রদান করে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেন।
সবার প্রশ্ন- কে এই মুহিবুল্লাহ? কীভাবে তিনি হঠাৎ ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার এত বড় নেতা হয়ে গেলেন?
জানা যায়, গত আগস্টের প্রথম সপ্তাহে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হঠাৎ করেই খবর আসে ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসের দিনক্ষণ ঠিক করেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। বিদেশি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মিয়ানমার থেকে প্রকাশ করা এই খবরে শুধু উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় নয়, কক্সবাজার শহরে থাকা বিদেশি এনজিওগুলোর মধ্যেও তোলপাড় সৃষ্টি হয়। কারণ, তখন পর্যন্ত কক্সবাজারে অবস্থান করা কেউই এই দিনক্ষণের কথা জানতেন না। কারণ, মিয়ানমার থেকেই পুরোপুরি এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
বার্তা সংস্থার খবর প্রকাশের পরপরই তৎপর হয়ে ওঠে এনজিওগুলো। যোগাযোগ শুরু হয় আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানরাইটসের নেতা মহিবুল্লাহর সঙ্গে। ইংরেজিতে দক্ষ মহিবুল্লাহর সেদিন থেকেই একদম অবসর নেই। দিনে বিভিন্ন এনজিও প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা-বৈঠক, বিকাল থেকে ভোররাত পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাম্পের ঘরে ঘরে ছুটে বেড়ান মহিবুল্লাহ। কাজে লাগান তার একনিষ্ঠ দুই হাজার কর্মীর নেটওয়ার্ক। রোহিঙ্গাদের বোঝান পাঁচ দফা দাবির কথা।
পরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য সাড়ে তিন হাজারের তালিকা পাওয়ার পর তালিকায় থাকা প্রত্যেককে আলাদাভাবে পাঁচ দফা দাবির কথা মুখস্থ করান মুহিবুল্লাহ ও তার লোকেরা। যে কারণে প্রত্যাবাসনের সাক্ষাৎকার দিতে আসা প্রত্যেকেই ফিরে না যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে প্রায় একই কথা বলেছেন।
দুপুরের এই ‘সফলতা’র পর ২২ আগস্ট বিকালেই মহাসমাবেশের জন্য নিজ নামে আবেদন করেন মুহিবুল্লাহ। ইংরেজিতে লেখা আবেদনপত্রে উল্লেখ করেন, কোন কোন ক্যাম্প থেকে কতজন কীভাবে এসে আয়োজিত হবে ৩ থেকে ৫ লাখ রোহিঙ্গার এ মহাসমাবেশ। পরে ২৫ আগস্টের এই মহাসমাবেশ তাক লাগিয়ে দেয় বাংলাদেশিদের এবং আনন্দে আত্মহারা করে রোহিঙ্গা ইস্যুতে লেগে থাকা বিদেশি এনজিওগুলোকে।
জানা যায়, রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র বাহিনী রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন ‘আরএসও’র ক্যাডার হিসেবে কাজ করার অভিযোগ ওঠার পর ১৯৯২ সালে মহিবুল্লাহ মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে আসেন। এর পর থেকেই তিনি উখিয়ার ক্যাম্প ও আশপাশে বসবাস করছেন। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে ১৫ জন সদস্য নিয়ে গড়ে তোলেন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানরাইটস’ বা এআরএসপিএইচ। স্থানীয় বাংলাদেশি মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গেও গড়েন যোগাযোগ। ধীরে ধীরে মুহিবুল্লাহ প্রধান পাঁচ রোহিঙ্গা নেতার একজন হয়ে ওঠেন। দেশের বাইরে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে সফর করেন একাধিক দফায়। কিন্তু ২০১৭ সালে রোহিঙ্গার ঢল নামার পর পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে।
সুস্পষ্টভাবে মুহিবুল্লার আজকের অবস্থানের মূল উত্থান হয় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ২০১৮ সালে ইউএনএইচসিআরকে সংযুক্ত করার পর। রোহিঙ্গাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা থেকেই মদদ পায় মুহিবুল্লাহর সংগঠন এআরএসপিএইচ। ইংরেজি ভাষা ও রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে দক্ষ মুহিবুল্লাহ ধীরে ধীরে প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন বিদেশিদের। ২০১৮-এর জুলাইয়ে র‌্যাব একবার মুহিবুল্লাহকে আটক করে উখিয়া থানায় নিয়ে যায়। কিন্তু প্রশাসনের নির্দেশে কোনো প্রকার রেকর্ড ছাড়াই তাকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এরপর গত এক বছরে জাতিসংঘ মহাসচিবসহ যত বিদেশি প্রতিনিধি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গেছেন তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই রোহিঙ্গা প্রতিনিধি হিসেবে মুহিবুল্লাহ ও তার সঙ্গীদের সাক্ষাৎ করানো হয়েছে। এই মুহিবুল্লাহই মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিবকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ১৭ দেশের যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ২৭ প্রতিনিধি সাক্ষাৎ করেন সেখানেও যোগ দেন মুহিবুল্লাহ। যুক্তরাষ্ট্রে এ সফর ও এর আগে একাধিক দফায় মধ্যপ্রাচ্য সফর করলেও মহাসমাবেশের আগে মুহ্বিুল্লাহর বিদেশযাত্রা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি।
মহাসমাবেশের পর সমালোচনা হলে কক্সবাজার প্রশাসনের সূত্রগুলো জানায়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আডটপাসের ওপর ভিসা ইস্যু করে নিজ দায়িত্বে সফর আয়োজন করে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দেশগুলো। পরে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তার এক্সিটপাসে বিদেশযাত্রার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
প্রশ্ন ওঠে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার প্রস্তুতিতে কীভাবে এত বড় মহাসমাবেশের আয়োজন করলেন মুহিবুল্লাহ ও তার সংগঠন। এর উত্তরে মুহিবুল্লাহ জানান, বিভিন্ন ক্যাম্পে তার সংগঠনের দুই হাজার নেতা-কর্মীকে মোবাইল ফোনে নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে মহাসমাবেশে উপস্থিত হওয়ার কথা জানান। এ কারণেই দুর্গম ও দীর্ঘ পথ পার হয়ে আশ্রিত রোহিঙ্গারা যথাসময়ে সমাবেশস্থলে উপস্থিত হয়েছেন বলে দাবি মুহিবুল্লাহর।
কিন্তু রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর বিভিন্ন সূত্রের দাবি, একসময় সশস্ত্র আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় যত ক্যাডার আশ্রয় নিয়েছেন তার প্রত্যেকেই মুহিবুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। তাদের নিয়েই ক্যাম্পে গোপনের রাজনৈতিক সংগঠনের তৎপরতা চালানো হয়। বিকাল ৪টার পর থেকে সক্রিয় হয়ে ওঠা সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা রাতে অবাধে চলাচল করে এবং অত্যাচার-নির্যাতন চালাতে থাকে। তাদের ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকেন সাধারণ রোহিঙ্গারা। এ কারণে বেশির ভাগ সাধারণ রোহিঙ্গাই রাত ৮টার পর দরজা-জানালা বন্ধ করে ক্যাম্পের ঘরের মধ্যেই থাকেন। কিন্তু ক্যাম্পগুলোয় হৈ-হট্টগোল থাকে প্রতি রাতেই।
স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, ক্যাম্পগুলোয় মুহিবুল্লাহবিরোধী অন্য একটি সশস্ত্র গ্রুপও সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু তারা সংখ্যায় কম, আর্থিকভাবে দুর্বল ও অস্ত্রশস্ত্রও তেমন নেই। এ কারণে মুহিবুল্লাহ গ্রুপের সমর্থিত ক্যাডাররা তাদের ‘কাফির’ বা বিশ্বাসঘাতক অভিহিত করে হত্যা করেছে। এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩২ জন ‘মোনাফেক’ হত্যার স্বীকার হয়েছেন এদের হাতে।
সূত্রের খবর, আরেক পক্ষ থেকে মোনাফেক দাবি করে হত্যার বাইরে আরও কমপক্ষে ১০ রোহিঙ্গা হত্যার শিকার হয়েছে প্রভাবশালী গ্রুপটির কথার অবাধ্য হওয়ায়। সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিক্ষিতদের তিনজন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার পক্ষে কথা বলতে গিয়ে খুন হয়েছেন। তবে এটা গত বছরের ৫ নভেম্বরের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার আগে। এমনকি প্রভাবশালী গ্রুপটি নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে খুনের বাইরেও হুমকি-নির্যাতন চালায় হামেশায়। এমনকি বিদেশি এনজিগুলোর সাহায্য-সহযোগিতা বিতরণ প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা গোষ্ঠীটি ত্রাণও বন্ধ রাখে বিরোধিতাকারী পরিবারগুলোর।
জানা যায়, গোপনে সশস্ত্র গ্রুপটি পরিচালনা করা হলেও প্রকাশ্যে থাকে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানরাইটস। তাই তাদের কোনো কথার অবাধ্য হতে চায় না বা পারে না সাধারণ কোনো রোহিঙ্গাই। বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close