শিরোনাম-২সাহিত্য ও সংস্কৃতি

মা এসেছিলেন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরবর্তী সময় ১৯৪৬ সাল। পুজো আসচে। সবাই চাদ্দিকে হৈ হৈ কত্তে নেগেচে। ঢাকীর পাল দলে দলে আসচে রেলগাড়িতে চেপে।
কলকেতার কি জাঁকজমক বাপ রে বাপ!! কি রোশনাই!
কুমোরটুলি থেকে সদ্য মা এয়েচেন গাড়িতে চেপে। জাঁকিয়ে বসেচেন ঠাকুরদালানে। কত্তামশায় পঞ্চাশ ভরি সোনায় এবার মুড়ে দিয়েচেন মাকে। আহা, কি রূপ, কি শোভা!
দ্যাখলে চোখ জুড়োয়। চক্কোত্তিমশায় এসে সাষ্টাঙ্গে পেন্নাম ঠুকে গেলেন। মা, মাগো! আশীর্বাদ কোরো মা!
সক্কালবেলা নায়েব চাঁদমোহন দুই হাত উঁচু গদিখানায় বসে চাঁদির চশমাখানার ওপর দিয়ে বিড়বিড় করে হিসেব কচ্চিলেন – “ধুতি ২৩ জোড়া, তসরের কাপড় ৫০ টা, গামছা একশত, অন্যান্য দানসামগ্রী -”
চাদ্দিকে নৈবিদ্দির থালা, ফলমূলাদির স্তুপ। পঞ্চাশজন যোগাড়ে কোমর বেঁধে কাজে নেগেচে। ত্রুটি রাখচেন না কত্তামশায়। লাটসাহেব আসবেন বলে কতা!
এসে দাঁড়ালেন কত্তামশায় – “সব ঠিকঠাক, চাঁদমোহন?”
– আজ্ঞে, বেঠিক হবার কি জো আচে?
মায়ের পুজো বলে কতা! মা নিজেই সব দেকেশুনে নিচ্চেন।
– দেখো, পাঁচজনে যেন এসে বলতে পারে, হ্যাঁ, এবারে মায়ের পুজো
করেচেন বটে চৌধুরীমশায়!
হঠাৎ একখানা হৈচৈ শোনা গেল। ফটক খোলা পেয়ে কি করে যেন একটা ভিখারিণী ঢুকে পড়েচে। ছুটে আসচে ভেতরে। একা_নয়_সঙ্গে_চা র_চারটে_বাচ্চা । হাঁ হাঁ করে উঠলেন কত্তামশায় -“বেরো হতভাগী, বেরো শিগ্গির!” ভিখারিণী এসে কেঁদে পায়ে পড়লে, “দোহাই বাবু, দুটি ভাত দ্যান! আমার জন্যি না, ঐ ছাওয়ালগুলির জন্যি,মাইয়া পোলা গুলান তিন দিন ধইরা না খাইয়া আসে” – ধুত্তোর, এতো মহা জ্বালা হলো!
অ্যাই লছমন! অ্যাই হারু! – আপনের পায়ে পরতাসি বাবু, তিনদিনের লগে খাইতে পাইনাই মোরা।
– খেতে পাসনা তো বাচ্চা পয়দা করতে কে বলেছিল? একটা-দুটো নয়, চার-চারখানা! যত্তসব ছোটলোকের দল!
অ্যাই লছমন, শিগ্গির তাড়া ওটাকে , এক্ষুণি নৈবিদ্দির থালা ছুঁয়েটুয়ে একটা অনর্থ ঘটাবে!
দারোয়ানরা একটু ইতস্তত করচে।
মেয়েছেলের গায়ে হাত তুলবে? – কি হলোটা কি, কতা কানে যায় না?
ঐ দ্যাক্ বাচ্চাগুনো শশা,সন্দেশ তুলে তুলে মুকে পুরচে! মার! মার! গ্যালো, সব গ্যালো আমার!
আর দেরি কল্লে না দারোয়ানরা।
দুমাদুম লাঠির বাড়ি পড়লে ভিখারিনীর হাতে, পায়ে, মাথায়। বাচ্চাগুলোও বাদ গ্যালো না।সুন্দর দেখতে নাদুস নুদুস ছেলেটার তো ঠোঁটই ফেটে গেল। হাতের সন্দেশ হাত থেকে পড়ে গেলো দারোয়ানদের মারের
চোটে।
মারতে মারতে তাদের ফটকের বাইরে নিয়ে চল্লে দারোয়ানরা।
আপদগুলো চোখের আড়াল হতে বিড়বিড় কত্তে কত্তে একটা সিগ্রেট ধরালেন কত্তামশায়।
– অ্যাই নবু, গঙ্গাজল দিয়ে দালানটা মুছে ফ্যাল। আর ঐ থালাটা ফেলে দে।
নায়েবমশায় আচমকাই ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলেন। চোখ ঠিকরে বেরিয়ে এলো।
– তোমার আবার কি হলো, চাঁদমোহন?
ভির্মি খেলে নাকি?
নায়েবমশায় কাঁপা হাতটা তুলে আঙুল দ্যাখালেন মায়ের মূর্তির দিকে।
ঘুরলেন কত্তামশায়।
ঠোঁট থেকে সিগ্রেটখানা পড়ে গ্যালো টপাৎ করে।
মায়ের শাড়ি ছিঁড়ে গ্যাচে। মায়ের আর তেনার ছেলেমেয়েদের সারা শরীরে লাল-লাল মারের দাগ। আর গণেশ ঠাকুরের ঠোঁটের পাশে সদ্য কেটে যাওয়ার দাগ। রক্ত ঝরছে সেখান থেকে টপ টপ করে।

Close