নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

দাড়িয়াবান্ধা থেকে ক্যাসিনো!

ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল

আমি যে বাসায় ভাড়া থাকি সে বাসার সামনে একটা ছোট্ট বসার মতো জায়গা ছিল। সেখানে তরুণ ছেলেরা বসে আড্ডা দিতো, মাঝে কখনো সখনো গান করতো, বিড়ি চুরুট ফুকতো। এতে আমার বা আমাদের কারো কোন সমস্যা হয়নি কিন্তু সমস্যা হতো বাড়িওয়ালার আর তার পরিজনদের। একদিন সকালে দেখলাম বসার জায়গাটা ভেঙ্গে ফেলা হলো আর সেখানে কেউ বসতে পারে না। কিন্তু বিপত্তিটা অন্যখানে। এখন বখাটেদের উৎপাত বেড়ে গেছে, গাঁজা খায় তারা। একদিন শুনলাম বাসাতেও চুরির চেষ্টা করেছে। গল্পটা এজন্যই করলাম সারা দেশের চিত্রের সঙ্গে এই গল্পের একটা মিল আমি খুঁজে পাই। যেখানে আমাদের তরুণ যুবদের জন্য কোন সুন্দর পথ নেই, নেই ন্যূনতম সম্মান ও স্বীকৃতির জায়গা। তারা চাকরি পায় না, কোন উদ্যোগ নিতে গেলে পরিবার থেকে সমাজ সর্বত্রই বাধার সম্মুখীন হতে হয়। সুন্দর জীবনের স্বপ্নটা তাদের প্রতিদিনই হোঁচট খায়। কিন্তু উন্নত দেশে এই হোঁচট খেতে খেতে তরুণ যুবরা ঠিকই একটা রাস্তা বের করে ফেলে। সরকার ও রাষ্ট্র তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করে। কিন্তু আমাদের মতো দেশে তা হয় না। এখানে ক্ষমতাবানরা এই সকল তরুণ যুবকদের লাঠিয়াল বাহিনী বানায় কিন্তু তাদের প্রকৃত উন্নয়নের জন্য কেউই কাজ করেন না। একটা সময় এই যুবরাই যুব সমাজের জন্য প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। এক সময় আমরা দেখেছি পাড়া-মহল্লায় এই ক্লাবগুলো তৈরিতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে এই তরুণ যুবারা। কিন্তু আজ দেখছি পাড়ায়-মহল্লায় গড়ে উঠেছে ক্যাসিনোসহ জুয়ার আস্তানা আর তা সরকারদলীর যুব নেতারাই পরিচালনা করে। আর এখানে প্রতিদিন সর্বস্বান্ত হচ্ছেন যারা তাদের বড় অংশই যুবক। অথচ এই যুবকরা উঠে এসেছে সেই গ্রামের মাঠ থেকে, তাদের চোখে স্বপ্ন ছিল, স্বপ্ন ছিল নিজেকে গড়ে তোলার।
কিন্তু সময় বহিয়া যায়! কবির ভাষায় এই বহিয়া যাওয়া সময়ের হিসাব কে রাখে! অথচ এই বাংলাদেশ সৃষ্টি ও তার বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এদেশের তরুণ ও যুব সমাজ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ক্ষুদিরাম আর প্রীতিলতার কথা আমরা কে না জানি! কে না জানি ভাষাশহীদ রফিক, সালাম, বরকত, সফিউলদের কথা। আসাদের রক্তমাখা শার্টের সে অমর কবিতা আমাদের কি মনে করিয়ে দেয় না ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের কথা। একাত্তরের মহান মুক্তির সংগ্রামে কত হাজার, লক্ষ তরুণ আর যুবকের বীরত্বের কথা কে না জানে। বাংলার দামাল তারুণ্যই একদিন মুক্তির সূর্যপতাকা বহন করে এনেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের গণআন্দোলন কত শত আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে আমাদের তারুণ্য।
চারদিকে তাকালেই আমরা সবচেয়ে বেশি দেখতে পাই তরুণদের। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশই হলো তরুণ-তরুণী। কর্মক্ষম মানুষের মধ্যেও সবচেয়ে বেশি অংশও তারা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পপুলেশন কাউন্সিলের গবেষণা মতে, তরুণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ভারতে ৩৫ কোটি ৬০ লাখ, চীনে ২৬ কোটি ৯০ লাখ, ইন্দোনেশিয়ায় ৬ কোটি ৭০ লাখ, যুক্তরাষ্ট্র ৬ কোটি ৫০ লাখ, পাকিস্তানে ৫ কোটি ৯০ লাখ এবং বাংলাদেশে রয়েছে ৪ কোটি ৭৬ লাখ। এই তরুণরাই বাংলাদেশের সকল ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে চলেছে।
ইতিহাস সৃষ্টির প্রতিটি পলেস্তারায় সেই তরুণ যুবকরাই জোগান দিয়েছিল। আজও বাংলাদেশের সকল অভূতপূর্ব সৃষ্টিগুলোর জন্মই দেয় তরুণরা। ওয়াসফিয়ার হিমালয় জয় বা সেভেন সামিটর্স জয় আমাদের সাহসী করে, মোহিত করে স্বপ্নজালে। নারী ক্রিকেটারদের বীরত্ব আমাদের উজ্জীবিত করে ঘুরে দাঁড়াতে। একজন নারী সাংবাদিক নাদিরা যখন ঘুরে দাঁড়ায় মৌলবাদের বিরুদ্ধে আমরা আশায় বুক বাঁধি। ৫৯তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম স্বর্ণপদক জয় করেছে এদেশের গর্ব আহমেদ জাওয়াদ চৌধুরী। লক্ষ লক্ষ তরুণ গার্মেন্টস শ্রমিকরা আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকাকে করেছে গতিশীল। প্রতিদিন হাজারো নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের জন্ম দিচ্ছে এদেশের তরুণরা। আমরা প্রতিদিন একেকটি সকাল শুরু করি এসকল তরুণদের নতুনত্বের আলোয়। কিন্তু এসকল সাফল্য আর আশার পাশাপাশি উঁকি দেয় আগামীর দুঃস্বপ্ন আর ভাবনা। কোন পথে যাবে বাংলার তারুণ্য। সবুজ একটা মাঠে দৌড়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য ছেলে মেয়ে আর তাদের চিৎকার, আনন্দে ভেসে যাচ্ছে চারিপাশ। সবাই মিলে বনভোজন আর গোল্লাছুট, সিনেমা দেখতে যাওয়া, দুষ্টুমি করে পরের গাছের ফল পেড়ে খাওয়া এগুলোতো তারুণ্যেরই চিহ্ন। সন্ধ্যায় সাহিত্য আড্ডা, কবিতার আসর, প্রভাত ফেরির ফুল, আমাদের ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো গান এইতো আমাদের বাল্যকালের স্মৃতিকাতরতা। আমরা জীবনের সঞ্জিবনী শক্তি পাই এগুলো থেকে।
কিন্তু আজকে ক্ষমতার রাজনীতির লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে লাখো তরুণ। তাদের দিয়ে সমাজের সবচেয়ে কলুষিত কাজগুলো করানো হচ্ছে। দেশের অপরাধমূলক কাজগুলোর দিকে তাকালেও আমরা একটি ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাই। হত্যা, খুন, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ নানান অপরাধে যুক্ত হয়ে পড়ছে তারা। কে এই নিদারুণ দুঃসময়ে দাঁড়াবে বাংলাদেশের তরুণ যুবকদের পাশে। প্রতিদিন দেশব্যাপী আমরা অসংখ্য তরুণ যুবদের দেখি আর হতাশ হতে হয়। এক অন্ধকারের দিকে যাত্রা করেছে লাখ লাখ তরুণ মাদকের যাত্রী হয়ে।
বাংলাদেশের তারুণ্য ইতিহাসের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছিল একদিন। ৫০/৬০-এর দশকে এদেশের তরুণরাই আমাদের সৃজনশীলতা, শিল্পকলা, সংস্কৃতি ও রাজনীতির প্রধান বাহক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দেশ গঠনেও তরুণদের ছিল ইতিবাচক ভূমিকা। কিন্তু বর্তমান তরুণ সমাজের বড় অংশই ব্যক্তিগত লাভ, ভোগবাদে নিমজ্জিত। তরুণদের উপর চালানো এক জনমত জরিপে দেখা যায় আমাদের দেশের প্রায় ৬০ ভাগ তরুণই প্রচলিত রাজনীতিকে পছন্দ করেন না। এক্ষেত্রে রাজনীতির নগ্ন রূপকেই তারা দায়ী করেন। তাদের কাছে রাজনীতির সজ্ঞায়নটাই হলো ক্ষমতার ভাগাভাগী আর সুবিধাবাদ কেন্দ্রীয় দলীয় চর্চা। তারা মনে করেন সুস্থ ধারার রাজনীতি এদেশে চালু হওয়া জরুরি। যেখানে থাকবে সঠিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং সকল ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা।
আজকের আলোচনার একটা প্রধান বিষয় ছিল সাম্প্রতিক ক্যাসিনো সমাচার। কিন্তু প্রসঙ্গক্রমের বাংলাদেশের রাজনীতি ও তার সঙ্গে এদেশের তারুণ্যের যোগসূত্র নিয়েই আলোচনাটা হলো। এই দেশের তারুণ্যকে ক্ষমতাশালীরা দাড়িয়াবান্ধার মাঠ থেকে ক্যাসিনোতে নিয়ে বসিয়েছে। যুব সমাজকে নষ্ট করে দিতে পারলে আর কোন কিছুই লাগে না সমাজকে ধ্বংস করতে। আমরা এই ধ্বংসের উদ্যোগ দেখেছি সামরিক আচ্ছাদনে, নৌবিহারে বা আজকের ক্যাসিনোতে। আজকে ভোগবাদী চিন্তা-দর্শনই এই সকল অধঃপতনের মূলে আর যা পেয়েছে তারা দল,পদ আর নেতাদের কাছ থেকে। পুরো সমাজটাকে কলুষিত করার যে তৎপরতা আমরা দেখি সর্বত্রই তারই দৃষ্টান্ত এগুলো। আজকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে খুঁজলেই মিলবে এই নষ্টস্রোত থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব। তারাই এই অপকর্মকে জায়েজ করতে হম্বিতম্বি করেই যাচ্ছেন প্রতিদিন। তাদের ন্যূনতম লজ্জাও নেই। আসলে এসব কিছুর মূলেই রয়েছে ক্ষমতা কেন্দ্রীয় রাজনীতি ও তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য অর্থ বিত্তের পাহাড় তৈরির নষ্ট প্রতিযোগিতা। তাই আমার কাছে এই সাম্প্রতিক ক্যাসিনো সমাচার কোন আলাদা অলীক বিষয় নয়, এটি ক্ষমতাসীনদের নষ্ট কর্মের মধ্যে আরেকটি শব্দ ছাড়া কিছুই নয়। একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ছাড়া ক্যাসিনো বোর্ডের দানেই পড়ে থাকবে আমাদের তারুণ্য ও সমাজ। সর্বশেষ কথা রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ছাড়া কোন পরিবর্তন আসবে না কোথাও।
লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন

Close