শিরোনাম-২সাহিত্য ও সংস্কৃতি

অমরত্ব

অর্ণব পাল সন্তু

আজ যদি পৃথিবীর সব লোক মরে যায়, তুমি বাদে। শুধু তুমি বেঁচে আছ। আর আছে বাড়ি ঘর, দোকান ভরা খাবার, পাম্প ভরা
পেট্রোল, অন্যান্য বাড়ির রান্নাঘরে রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডার।।। কারো কাছে ভালো -খারাপ সাজার নেই।
কী করবে তুমি? কীভাবে সময় কাটাবে? কী কী করবে দৈনন্দিন রুটিনের সময়টুকু বাদ দিয়ে?

আমার কাছে সময়ের কোন হিসাব নেই। কত অযুত নিযুত বছর ধরে আমি রয়েছি তার কোন হিসাব আজ আর আমার কাছে নেই। আমার মিশন টা শুরু হয়েছিল তুচ্ছ এলাকার গুন্ডাপান্ডাদের নিধন করে করে,ক্রমান্বয়ে জাতিগত, ধর্মীয়, মানুষদের বধ করতে লাগলাম। একের পর এক মানুষ জবাই করার পর আমার হাত সব সময় রক্তে ভিজেই থাকত। এক সময়ে দেখলাম রক্ত ছাড়া, রক্তের উষ্ণ স্পর্শ ছাড়া,গন্ধ ছাড়া আমি দুর্বল হয়ে পড়তাম। হত্যা আমার কাছে হয়ে দাড়াল এক নেশা। বোধহয় সেজন্য ই
প্রাচীন কাল থেকে যত্রতত্র হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কেন না হিংস্র প্রানীরাও একবার মাত্র একবার রক্তের স্বাদ পেলেই বদলে যায় তাদের চরিত্র। পৃথিবীর কোন প্রাণী তাদের স্বজাতিদের বধ করেনা, মানুষই একমাত্র প্রানী যে মানুষকে হত্যা করতে পারে! আমি সেই গর্বিত মানুষ।
পৃথিবীতে অসংখ্য বিপ্লবের চেষ্টা করা হয়েছিল, রক্ত বিপ্লব কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিপ্লবীরা খুনীই থেকে গেছে। কেন না হত্যার নেশা ভয়াবহ। যে স্বপ্ন নিয়ে রক্ত বিপ্লব সংগঠিত হয়, সে স্থানের বিপ্লবী শাসকেরা খুনী “শাসক” ই থেকে যায়। হত্যার রক্তের চিহ্ন কখনো বিলীন হয় না। রক্তের চিহ্ন নিশ্চিহ্ন করার মত কোন পরিস্কারক দ্রব্য আবিষ্কৃত হয়নি।
দুষ্টের দমন সৃষ্টির পালন করতে ব্রত নিয়েছিলাম। পৃথিবীকে স্বর্গ রাজ্য বানাতে চেয়েছিলাম।
দুষ্টের দমন করতে করতে পৃথিবী থেকে সমগ্র মানুষ জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছি। কিন্তু সৃষ্টির পালন আর করা হয়নি। কারন ভাল মন্দের ফারাক আর আপেক্ষিকতা আমাকে বিভ্রান্ত করত। ক্রমে দ্বিধা ঝেড়ে ঘর থেকে ঘর এলাকা থেকে এলাকা,শহর থেকে গ্রাম, রাজ্য থেকে দেশ মহাদেশ জুড়ে হত্যার পর গনহত্যা করে প্রানীজগত নির্মুল করতে শুরু করলাম।
এক সময় অহং বোধ মাত্রাতিরিক্ত হয়ে উঠল। আমি অমর হতে চাইলাম।
কিন্তু কোন কৃত্রিম পদ্ধতিতে নয়। রবিন উইলিয়ামসের মত রোবট থেকে মাত্র ২০০ বছরের মানব স্বীকৃতির বায়োবট হিসেবে তাও মৃত্যুর পরর্বতী স্বীকৃতি চাইনি। আমার
কাছে ছিল না পিতামহ ভীস্মের মত কোন ইচ্ছামৃত্যুর বর।
হত্যাযজ্ঞটা আমার কাছে এক সময় হয়ে দাড়িয়েছিল ফিলিপ কে ডিকের “সেকেন্ড ভ্যারাইটির” মত। রক্ত ছাড়া জীবন অর্থহীন। বেঁচে থাকার অবলম্বন। কারন দেখলাম,যেদিন রক্তপাত করতাম নাম, আমি দুর্বল হয়ে পড়তাম, জরায় আক্রান্ত হতাম। রক্তস্নানে আমি পুর্নবার যুবক হয়ে উঠতাম। এক সময় দেখলাম দিনকেদিন আমার শিরায় প্রবাহিত রক্ত লাল থেকে কালো বর্ণ ধারন করতে শুরু করেছে। আমি আর মানুষ নই।
পৃথিবীর সৃষ্টি জগতে আমি এক বিচিত্র প্রানী, আমিই প্রথম আমিই শেষ ও একমাত্র। হয়ত আমাকে দানবের সাথে তুলনা করা যেতে পারে মহাদানব!
কত শত বছর ধরে আমার ধধংস যজ্ঞ চলতে চলতে আমি সমগ্র পৃথিবী মানুষ হীন করে ফেলেছি। কারন দ্বিমত আমার কাছে অসহ্য। সমগ্র মানুষ প্রজাতি নিধন করার পর আমি ক্রমান্বয়ে জীব জগত ধধংস করতে লাগ্লাম। কেন না আমার রক্ত চাই, রক্ত চাই। রক্ত আমাকে অমরত্ব দেয়। ক্রমে জীব জগত নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছি। এখন সমগ্র পৃথিবীতে শুধু আমিই বিরাজ করছি। আর কেউ নেই, একা। প্রাচীন কালে মানুষেরা ঈশ্বর নামক একজনকে প্রতিভু মনে করত। তিনি একাই নাকি সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করে সাজিয়েছিলেন। তিনি সর্ম্পুন একা ছিলেন, তার সাথে কেউ ছিলনা। কি অদ্ভুদ! সৃষ্টিকর্তাকে কখনো একাকিত্ব গ্রাস করেনি? করেছে করেছে, তার একাকিত্বের ফসল এই সৃষ্টি জগত! মানুবীয় গুনাবলী শেষ পর্যন্ত মুক্তি দেয়নি তাকে। তিনি অমর ছিলেন।
আমি সমগ্র পৃথিবীর জীব জগত নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছি। বৃক্ষ,তরু আর আমি ছাড়া জীবনের কোন চিহ্ন আজ আর নেই। আমি চুপ করে বসে থাকি এখন। এখন বিষন্নতা গ্রাস করছে, প্রাচীন রবিন সন ক্রুশোর মত, এভাবে একা বাস এখন অসম্ভব! সবাইকে মানিয়ে নিতে হয় শেষ পর্যন্ত।
কদিন আগে বিরাট ঝড় হয়ে গেল, কিছু দূরে একটা পাহাড়ে ফাটল দেখছি। আজ ওখানে গিয়ে দেখলাম প্রাচীন মানুষ দের কিছু দেয়াল চিত্র। তার মধ্যম নি হয়ে আছে অর্পুব সুন্দর একটা নারী মুখ। এত টা সুন্দর, চোখ ফেরানো মুশকিল। তাকিয়ে থাক তে থাকতে এখানেই জমে গেছি কখন। আজ সকালে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখি ছবিটার মুখ কথা বলছে, কান পেতে শুনলাম বলছে অনন্ত যৌবনা হয়ে লাভ কি? যদি কেউই না থাকে। মৃত্যু। একমাত্র মৃত্যু ই দিতে পারে প্রকৃত অমরত্ব।
আমার মনে হচ্ছে ঠিক ই ত, অনন্ত অমরত্ব মুল্যহীন। এ ই মুখটার জন্য মৃত্যু ই শ্রেয়।
এক মাত্র মৃত্যু ই দিতে পারে অস্তিত্বহীন কিংবা অমরত্ব দিতে। এখন আমি মৃত্যু চাই। নেমে আসুক। এই মৃত্যুতে অবসান হোক সমস্ত দ্বন্দের।

Close