নওগাঁশিরোনাম

নওগাঁয় ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ রোগে আক্রান্ত গবাদি পশু; আতঙ্কে খামারিরা

কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ: নওগাঁয় গবাদি পশুর ভাইরাস জনিত চর্মরোগ ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ এর ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে কয়েকটি গরু মারাও গেছে। প্রতিষেধক না থাকায় এ
রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এতে চরম আতঙ্কিত ও দিশেহারা হয়ে পড়েছে খামারি ও কৃষকরা। তবে শঙ্কিত না হয়ে খামারিদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা। জানা গেছে, প্রথমে গরুর চামড়ার উপরি অংশে টিউমার জাতীয় উপসর্গ ও বসন্তের মতো গুটি গুটি উপসর্গ দেখা দেয়। এরপর দু-একদিনের মধ্যেই গরুর শরীর জুড়েই গুটি গুটি হয়ে ঘা-এ পরিণত হচ্ছে। এ সময় গরুর শরীরে ১০৪ থেকে ১০৬ ডিগ্রী তাপমাত্রার জ্বর দেখা দেয় এবং গরু খাওয়া ছেড়ে দেয়। অনেক সময় গরুর বুকের নিচে পানি জমে ক্ষত সৃষ্টি হচ্ছে এবং ক্ষতস্থান পচে গিয়ে সেখান থেকে মাংস খুলে-খুলে পড়ছে। সঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিৎসা কিংবা রোগের লক্ষণ জানা না থাকায় এ রোগে আক্রান্ত হয়ে জেলার রানীনগর উপজেলার গুয়াতা গ্রামের নাজিদুল হকের একটি, বাবলু হোসেনের একটি, আব্দুর রাজ্জাকের একটি সহ ১০-১২টি গরু মারা গেছে।

এছাড়া উপজেলার অলংকার দীঘি, উজালপুর, আতাইকুলা কালীগ্রাম, হরিপুর, মহাদেবপুর উপজেলার এনায়েতপুর, রাইগাঁ ও চেরাগপুর ইউনিয়নে বেশ কয়েকটি গ্রামে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ রোগটি প্রথম ১৯২৯ সালে জাম্বিয়াতে দেখা দেয়। পরে আফ্রিকা মহাদেশের সর্বত্রে ছড়িয়ে পড়ে। পর্যায়ক্রমে ২০১৯ সালে চীন ও ভারতে আক্রান্তের পরেই বাংলাদেশে এ রোগটি সম্প্রতি প্রথম বারের মতো দেখা দেয়। এ রোগ মশা, মাছি, আটালি, আক্রান্ত পশুর লালা, নাক-চোখের ডিসচার্জ, ষাড়ের বীর্য, আক্রান্ত গরু-মহিষের দুধ এবং ব্যবহারিত ইনজেকশনের সিরিঞ্জের মধ্যমে ছড়ায়। অনুকূল পরিবেশে এ ভাইরাস ছয় মাস পর্যন্ত জীবিত থাকে। ভাইরাস জনিত এ চর্মরোগে গবাদিপশু গরু-মহিষ আক্রান্ত হয়। ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ রোগে আক্রান্ত গবাদিপশু দুর্বল হয়ে ওজন কমে যায়, দুধ উৎপন হ্রাস পায় এবং চামড়ার গুনগতমান নষ্ট হয়ে যায়।

রানীনগর উপজেলার গুয়াতা গ্রামের গরু পালনকারী হামিদুল হক বলেন, গত কয়েকদিন আগে তার চারটি গরুর গায়ে গুটি বসন্তের মতো গুটি বের হয়। বিষয়টি রানীনগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়কে জানানো হলেও কেউ আসেননি। পরে স্থানীয় চিকিৎসক দিয়ে গরুর চিকিৎসা করাতে প্রায় ২৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এরপরও একটি গরু মারা গেছে। রানীনগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভেটেরিনারি সার্জন আমিনুল ইসলাম বলেন, এ রোগের ভ্যাকসিন না থাকায় রোগটি দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। উপজেলায় ল্যাম্পি স্কিন রোগে এ পর্যন্ত ১০৫টি গরু আক্রান্ত হয়েছে। তবে এ রোগে কোথাও গরু মারা যাওয়ার খবর জানা নেই। এলাকার মানুষকে সচেতন করতে ইতিমধ্যে প্রচারপত্র বিতরণ ও সভা-সেমিনারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মহাদেবপুর উপজেলার ইন্দাই গ্রামের গরু পালনকারী জিতেন বলেন, গত সপ্তাহে হঠাৎ করেই গরুর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফুলে উঠা শুরু করে। এরপর গরু খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়। স্থানীয় পশু চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা করানো হচ্ছে। গোয়ালে কয়েল জ্বালানো থাকলেও কোন কাজে আসেনি। মশার কারণেই হয়ত এমনটি হয়েছে।

মহাদেবপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: খুরশিদ আলম বলেন, এ উপজেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ২শ’ গরু আক্রান্ত হয়েছে। এ রোগে কোথাও গরু মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। লোকজনকে সচেতন করতে লিফলেট বিতরণ এবং ফ্রি চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। সাপাহার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা.সাইফুল ইসলাম বলেন, এ রোগের ভ্যাকসিন না থাকায় রোগটি দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে এ পর্যন্ত এ রোগে ১৩টি গরু আক্রান্ত হয়েছে। নিয়ামতপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হেমন্ত কুমার রায় বলেন, আমাদের উপজেলায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৮টি গরু আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়েছি। পোরশা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শফিউল আলম বলেন, এ রোগের প্রার্দুভাব বেড়েছে এ পর্যন্ত ১০ গরুটি গরু গরু আক্রান্তের তথ্য পেয়েছি। আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করেছি। বদলগাছী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা.মো.জিয়াউর রহমান বলেন, আমাদের উপজেলায় ১২টি গরুর এ রোগ ধরা পরেছে। আমরা সাধ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও ব্যবস্থা গ্রহন করছি।

আত্রাই উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা.মো.রুবায়েত রেজা বলেন, এ রোগে আমাদের উপজেলায় ১৩টি গরু আক্রান্তের হয়েছে । আমরা খামারীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। ধামইরহাট উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: ইমরান আলী বলেন, এ পর্যন্ত ১১টি গরু ‘ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ’ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। আমাদের অফিস থেকে আমরা খামারীদের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। মান্দা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা.অভিমুন্নু চন্দ্র বলেন, আমাদের মান্দাতে ১৪টি গরু ‘ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ’ রোগে রোগে আক্রান্ত হয়েছে। আমরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা প্রদান করছি। পত্নীতলা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা.আবু ফায়সাল বলেন, ১৩গরু এ রোগে আক্রান্তের খবর পেয়েছি। আমরা খামারীদের সার্বিক পরামর্শ দিচ্ছি।

নওগাঁ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. উত্তম কুমার সরকার বলেন, ‘ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ’ রোগটি মশা বাহিত ভাইরাস জনিত রোগ। সারাদেশে ব্যাপক আকারে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। জেলার ১১টি উপজেলার প্রতিটি উপজেলাতেই ১০-১৫ টি করে গরু আক্রান্ত হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে কর্মকর্তারা সচেতনতামুলক উঠান বৈঠক ও লিফলেট বিতরণ করছেন। অফিসে আক্রান্ত পশু নিয়ে আসা হলে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এ রোগে আক্রান্ত পশু জবাই করে খাইলেও মানুষের ক্ষতি হবে না। কারণ এ রোগটা মানুষের হয়না। তবে অসুস্থ পশুকে যেন কেউ জবাই না করে এবং কেউ যেন মাংস না খাই সে বিষয়ে নিষেধ করা হচ্ছে।
বরেন্দ্র বার্তা/ নাসি

Close