ছবি ঘরশিরোনাম-২সাহিত্য ও সংস্কৃতি

আভিজাত্য থেকে বায়োয়ারী সার্বজনীন উৎসব

অর্ণব পাল সন্তু

বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। দুর্গা শক্তির প্রতীক, শক্তির রূপান্তর তত্ত্বানুযায়ী একই শক্তি বিভিন্ন রূপে রূপান্তরিত হয়। হিন্দু শাস্ত্রে শক্তির মুল কল্পনায় নারী শক্তিকে কল্পনা করেছেন। কালী, চামুন্ডা, দুর্গা একই শক্তির ভিন্ন রূপ। আবার দেবী দুর্গারও নানা সময়ের উপাসনা ও বহু রূপ দেখা যায়, বাসন্তী, ক্যাতায়নী, শারদীয়া। বসন্তকালে বাসন্তী, কার্তিক মাসে কাত্যায়নী আর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ শরৎকালে শারদীয় দুর্গোৎসব।
প্রত্নতাত্ত্বিক দুর্গা
দুর্গা পূজা কবে, কখন, কোথায় প্রথম শুরু হয়েছিল তা জানা যায় না। ভারতের দ্রাবিড় সভ্যতায় মাতৃতান্ত্রিক দ্রাবিড় জাতির মধ্যে মাতৃদেবীর পূজার প্রচলন ছিল। সিন্ধু সভ্যতায় (হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতা) দেবীমাতা, ত্রিমস্তক দেবতা, পশুপতি শিবের পূজার প্রচলন ছিল। ৯ম-১২শ শতাব্দীর মধ্যকার সময়ে নির্মিত একাধিক মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তি বাংলার নানা স্থান থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে।
পৌরাণিক দুর্গা
দুর্গা শিবের অর্ধাঙ্গিনী সে হিসাবে অথবা দেবী মাতা হিসাবে পূজা হতে পারে। তবে কৃত্তিবাসের রামায়নে আছে, শ্রী রাম চন্দ্র কালিদহ সাগর (বগুড়া)থেকে ১০১ টি নীল পদ্ম সংগ্রহ করে সাগর কূলে বসে বসন্তকালে সীতা উদ্ধারের জন্য সর্বপ্রথম শক্তি তথা দুর্গোত্‍সবের (বাসন্তি পূজা বা অকাল বোধন) আয়োজন করেছিলেন। তবে মুল বাল্মীকি রামায়নে এর উল্লেখ পাওয়া যায় না।
দুর্গাপূজার উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারতে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পূর্বে কৃষ্ণের পরামর্শে অর্জুন দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আছে, সৃষ্টির আদিতে গোলকস্থ আদি বৃন্দাবনক্ষেত্রের মহারাসমন্ডলে কৃষ্ণ সর্বপ্রথম দুর্গাপূজা করেন। দ্বিতীয়বার দুর্গার আরাধনা করেন ব্রহ্মা। মধু ও কৈটভ দ্বৈত্যদ্বয়ের নিধনে তিনি শরণাপন্ন হন দেবীর। ত্রিপুরাসুরের সঙ্গে যুদ্ধকালে সংকটাপন্ন মহাদেব তৃতীয়বার দুর্গাপূজা করেছিলেন। এরপর দুর্বাসা মুনির শাপে শ্রীভষ্ট হয়ে দেবরাজ ইন্দ্র যে দুর্গাপূজা করেন। এটা চতুর্থ দুর্গোৎসব। দেবী ভাগবত অনুসারে ব্রহ্মা ও ইন্দ্রের ন্যায় ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু পৃথিবীর শাসনভার পেয়ে ক্ষীরোদসাগরের তীরে মৃন্ময়ী মূর্তি নির্মান করে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। জাগতিক মায়ার বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে ঋষি মান্ডব্য, হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধারে সুরথ রাজা ও বৈরাগ্য লাভের জন্য সামাধি বৈশ্য, কার্তাবির্জাজুন বধের জন্য বিষ্ণুর অবতার পরশুরাম দুর্গার আরাধনা করেন।
দুর্গা ও দুর্গাপূজা সংক্রান্ত কাহিনীগুলোর মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় ও লোকমান্য হল দেবীমাহাত্ম্যম্-এ বর্ণিত কাহিনীটি। দেবীমাহাত্ম্যম্ প্রকৃতপক্ষে ‘মার্কন্ডেয় পুরাণ’-এর একটি নির্বাচিত অংশ। সাতশত শ্লোকবিশিষ্ট এই দেবীমাহাত্ম্যম্-ই শ্রীশ্রী চন্ডি গ্রন্থ। চন্ডি পাঠ দুর্গোৎসবের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গও বটে। দেবীমাহাত্ম্যম্-এর কাহিনী অনুসারে পুরাকালে মহিষাসুর দেবগণকে একশ বছর ব্যাপি এক যুদ্ধে পরাস্ত করে স্বর্গের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল । অসুরদের অত্যাচারে পৃথিবী অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। শান্তিপুরী স্বর্গ থেকে বিতাড়িত দেবগণ প্রথমে প্রজাপতি ব্রহ্মা এবং পরে তাকে মুখপাত্র করে শিব ও নারায়ণের সমীপে উপস্থিত হন। মহিষাসুরের অত্যাচার কাহিনী শ্রবণ করে তারা উভয়েই অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হন। সেই ক্রোধে তাদের মুখমন্ডল ভীষণাকার ধারণ করে। ইন্দ্রাদি অন্যান্য দেবতাদের দেহ থেকেও সুবিপুল তেজ নির্গত হয়ে সেই মহাতেজের সঙ্গে মিলিত হয়। সুউচ্চ হিমালয়ে স্থিত ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে সেই বিরাট তেজপুঞ্জ একত্রিত হয়ে এক নারীমূর্তি ধারণ করল। ইনিই দুর্গা। অপরদিকে দৈত্য, বিষ্ম, রোগ, পাপ, ভয় ও শত্রু হতে যিনি রক্ষা করেন তিনিই দুর্গা। আবার মার্কন্ডেয় পুরাণমতে দুর্গম নামক অসুরকে বধ করায় দেবীর নাম হয় দুর্গা। বাঙ্গালিরা একে দশভুজারূপে পূজা করে থাকেন। দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধের মাধ্যমে দেবতাদের স্বর্গ ফিরিয়ে দিয়ে শান্তির পরশ ছড়িয়ে দেন। তাই তাকে বলা হয় দুর্গতিনাশিনী। দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। আবার দুর্গাকে বলা হয় দুর্গতিনাশিনী, দুশভূজা, মঙ্গলময়ী, শক্তিদায়িনী, পরমাপ্রকৃতি, আদ্যশক্তি ও স্নেহময়ী মা। চন্ডীতে দেবীর স্তবে বলা হয়েছে ‘স্বর্গাপবর্গদে দেবী নারায়ণি নমোস্তুতে’। অর্থাৎ, ভোগের স্থান স্বর্গ লাভ করার জন্য এবং মুক্তিলাভের জন্য হে দেবী নারায়ণি, আমি তোমাকে প্রণাম জানাই।
মার্কন্ডেয় পুরাণেই বলা হচ্ছে , রাজ্যহারা রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য মেধস মুনির পরামর্শে নদীর তীরে তিন বছর দেবী মহামায়ার কঠিন তপস্যা করলেন। অনেকে বলেন মেধস মুনির আশ্রমটি হচ্ছে সীতাকুন্ড পাহড়ে।
নানা রূপে নানা অঞ্চলে দুর্গা
কাশ্মীর ও দাক্ষিণাত্যে কন্যাকুমারী নামে দুর্গোৎসব পালিত হয়। সবচেয়ে জাঁক জমক ভাবে পালিত হয় পশ্চিম বঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও ত্রিপুরায়। এছাড়া, আসাম, মনিপুর, ওড়িশ্যাতে প্রভাব রয়েছে। চীনে চানসান, নেপালে মঞ্জুশ্রী,মিশরে আইসিস, হ্যাথার, বেলুচিস্তানে হিংলাজমাতা, রূপে আরাধিত হন দেবী।

ইন্দোনেশিয়ার জাভায় প্রাপ্ত মহিষাসুরসর্দিনী
ইন্দোনেশিয়ার জাভায় প্রাপ্ত মহিষাসুরসর্দিনী

ভারতের অন্যান্য রাজ্যে প্রবাসী বাঙালি ও স্থানীয় জনসাধারণ নিজ নিজ প্রথামাফিক শারদীয়া দুর্গাপূজা ও নবরাত্রি উৎসব পালন করে। এমনকি পাশ্চাত্য দেশগুলিতে কর্মসূত্রে বসবাসরত বাঙালিরাও দুর্গাপূজা পালন করে থাকেন। ২০০৬ সালে গ্রেট ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গ্রেট হলে “ভয়েসেস অফ বেঙ্গল” মরসুম নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর অঙ্গ হিসেবে স্থানীয় বাঙালি অভিবাসীরা ও জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এক বিরাট দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন।
বঙ্গে দুর্গাপূজা: আভিজাত্য থেকে বায়োয়ারী সার্বজনীন উৎসব
বাংলায় দুর্গোৎসবের প্রবর্তন কে কবে করেছিলেন, সে সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য নেই। বাংলায় যে দুর্গাপূজা প্রচলিত, তা মূলত মহিষাসুরমর্দিনীর পূজা। ৯ম-১২শ শতাব্দীর মধ্যকার সময়ে নির্মিত একাধিক মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তি বাংলার নানা স্থান থেকে আবিষ্কৃতও হয়েছে।
একাদশ শতাব্দীর বাঙালি পন্ডিত ভবদেব ভট্ট দুর্গার মাটির মূর্তি পূজার বিধান দিয়ে গেছেন। চতুর্দশ শতাব্দীতে মিথিলার কবি বিদ্যাপতি ‘দুর্গা ভক্তি-তরঙ্গিণী’ ও বাঙালি পন্ডিত শূলপাণি ‘দুর্গোৎসব-বিবেক’ বই দুইটি থেকে দুর্গা পূজার কথা জানা যায়। অর্থাৎ, চতুর্দশ শতাব্দীতেই বাংলায় দুর্গাপূজা ছিল রীতিমতো ‘উৎসব’। দুর্গাপূজার প্রাচীনত্ব অনুধাবনে আরও একটি উল্লেখযোগ্য প্রমাণ রঘুনন্দনের ‘দুর্গাপূজা তত্ত্ব’ গ্রন্থখানি। নবদ্বীপের এই স্মার্ত পন্ডিতের লেখা গ্রন্থটিতে দুর্গাপূজার যাবতীয় বিধান রয়েছে। পুরাণ ও স্মৃতিশাস্ত্র থেকে প্রমান সংগ্রহ করে পূজা পদ্ধতি লিখেছেন তিনি।

তাহেরপুরে অষ্টধাতুর দুর্গামূর্তি
তাহেরপুরে অষ্টধাতুর দুর্গামূর্তি

বাংলার অন্যতম প্রাচীন দুর্গাপূজা হল পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের মৃন্ময়ী মন্দিরের পূজা। দেবী মৃন্ময়ী ছিলেন মল্লভূম রাজ্যের রাজরাজেশ্বরীমূল্ল রাজবংশের কুলদেবী। মল্লরাজ জগৎমল্ল ৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে এই পূজার প্রবর্তন করেন। এখানকার পূজা পদ্ধতি বাংলায় প্রচলিত দুর্গাপূজার থেকে অনেকটাই আলাদা; কিছুটা আলাদা এখানকার দুর্গাপ্রতিমার গড়নও। মৃন্ময়ী দেবী সপরিবারা বটে, কিন্তু লক্ষ্মী-গণেশ ও কার্তিক-সরস্বতী এখানে স্থানবদল করে থাকে। অর্থাৎ, লক্ষ্মীর স্থলে গণেশ ও গণেশের স্থলে লক্ষ্মী এবং কার্তিকের স্থলে সরস্বতী ও সরস্বতীর স্থলে কার্তিক। এই রূপে দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণের রীতিকে জগৎমল্ল-প্রথা বলা হয়। বাঁকুড়া জেলার অনেক প্রাচীন পরিবারেও জগৎমল্ল-প্রথায় নির্মিত দুর্গামূর্তি পূজিত হয়। মল্ল রাজবাড়ির পূজায় দেবী পটের যে ব্যবহার স্বতন্ত্র। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রধান শিষ্য নিত্যানন্দ খড়দহে স্বগৃহে প্রতিমায় দুর্গোৎসব করেছিলেন।
১৫১০ সালে কুচ বংশের রাজা বিশ্ব সিংহ কুচবিহারে দুর্গা পূজার আয়োজন করেছিলেন। ১৬১০ সালে কলকাতার বারিশার রায় চৌধুরী পরিবার প্রথম দুর্গা পূজার আয়োজন করেছিল বলে ধারণা

নবদুর্গা, পোরশা, রাজশাহী

করা হয়। আধুনিক দুর্গা পূজার প্রাথমিক ধাপ ১৮ শতকে নানা বাদ্য যন্ত্র প্রয়োগে ব্যক্তিগত, বিশেষ করে জমিদার, বড় ব্যবসাযী, রাজদরবারের রাজ কর্মচারী পর্যায়ে প্রচলন ছিল। পাটনাতে 1১৮০৯ সালের দুর্গা পূজার ওয়াটার কালার ছবির ডকুমেন্ট পাওয়া গেছে। ওরিষ্যার রামেশ্বরপুরে একই স্থানে ৪০০ শত বছর ধরে সম্রাট আকবরের আমল থেকে দুর্গা পূজা হয়ে আসছে।
সম্রাট আকবর বাংলা-বিহারের দেওয়ান নিযুক্ত করেন রাজা কংসনারায়ণকে। তবে বয়সের কারণে কংসনারায়ণ দেওয়ানী ছেড়ে রাজশাহীর তাহেরপুরে এসে আত্মনিয়োগ করেন ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে। আহ্বান করেন তাহেরপুরে এসে তাঁর জমিদারির ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের মহাযজ্ঞের জন্য। ওই সময় নাটোরের বাসুদেবপুরের ভট্টাচার্যরা ছিলেন বংশানুক্রমে তাহেরপুর রাজাদের পুরোহিত। এদের মধ্যে ছিলেন রমেশ শাস্ত্রী নামে একজন বাংলা-বিহারের বিখ্যাত পণ্ডিত। তিনি শাস্ত্রমতে বললেন, বিশ্বজিৎ, রাজসুয়, অশ্বমেদ ও গোমেধ—এই চারটি মহাযজ্ঞ রয়েছে। বিশ্বজিৎ ও রাজসুয় নামক মহাযজ্ঞ শুধু সম্রাটরা করতে পারবেন। অশ্বমেধ ও গোমেধ যজ্ঞ দুটিও নিষিদ্ধ। একমাত্র দুর্গোৎসব ছাড়া অন্য কোনো মহাযজ্ঞ করা সঠিক নয়। রাজা রামচন্দ্রের বিধানে ভক্তিসহ দুর্গোৎসব করলে সর্বযজ্ঞের ফল লাভ করা সম্ভব বলে মতপ্রকাশ করেন রমেশ শাস্ত্রী। উপস্থিত অন্য পণ্ডিতরাও ওই মতের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেন। আর রাজা কংসনারায়ণ সেই মতেই পূজার বিশাল আয়োজন করেন। ওই সময় সাড়ে ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজকীয় পরিবেশে দুর্গোৎসব শুরু করেন তিনি। আর এই বিশাল পূজার পূরোহিত ছিলেন রমেশ শাস্ত্রী নিজে। আর এখান থেকেই শুরু হয় মহা ধুমধামে দুর্গোৎসব। এই মহাযজ্ঞে আনন্দ, ধুমধাম ও উৎসাহে সবাই মোহিত হয়েছিলেন সেসময়ে। পরের বছর থেকে এ অঞ্চলের অনেক সামন্ত রাজা ও ধনী ব্যক্তি পণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রীর পদ্ধতি অনুসারে দুর্গাপূজার আয়োজন শুরু করেন। মার্কণ্ডেয় পুরাণে যদিও দুর্গোৎসবের কিছু বৃত্তান্ত রয়েছে, কিন্তু সমগ্র যজ্ঞটির বিধান প্রাচীন কোনো গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে নেই। এ কারণে পণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রীর প্রণীত আচারেই সানন্দে দুর্গোৎসব পালন শুরু করে আসছে সনাতন হিন্দুসমাজ।

তবে এতদিনকার এ ইতিহাসে দেখা দিলো মতান্তর। সম্প্রতি ইতিহাস পর্যালোচনা করে কয়েকজন বিশ্লেষক অভিমত দিয়েছেন : কংসনারায়ণ দুর্গোৎসব করেছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর শেষে কিংবা সপ্তদশ শতাব্দীর শুরু দিকে। কিন্তু তারও আগেকার প্রাচীন সাহিত্যে ও অন্যান্য সূত্রে বাংলায় দুর্গাপূজার উল্লেখ পাওয়া যায়। খুব সম্ভবত, যে বিপুল ব্যয়ে কংসনারায়ণ দুর্গোৎসব করেন, তা-ই সেযুগের জনমানসে দুর্গাপূজার সংজ্ঞা বদলে দিয়েছিল। আর সেই থেকেই কংসনারায়ণী মিথের উৎপত্তি।
এখানেই শেষ নয় তার দেখাদেখি একটাকিয়ার (একটাকিয়া সম্ভবত রংপুর জেলায়) রাজা জগৎবল্লভ সাড়ে আটলক্ষ স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে আরো জাঁকজমক করে দুর্গাপূজা করলো। তাদের দেখাদখি অন্যান্য জমিদাররা ভাবলো, ‘আমরাইবা কম কিসে, আমরাও টাকার খেলা দেখাতে পারি।’ তারাও জাঁকজমক করে দুর্গাপূজা শুরু করলো। প্রতি হিন্দু জমিদার বাড়িতে শুরু হয়ে গেলো দুর্গাপূজা। অর্থ্যাৎ দুর্গাপুজা পাল্লা-পাল্লি দিয়ে আভিজাত্য প্রকাশের প্রতীক হয়ে উঠেছিল?
বারোয়ারী পূজা:
পারিবারিক স্তরে দুর্গাপূজা প্রধানত ধনী পরিবারগুলিতেই আয়োজিত হয়। কলকাতা শহরের পুরনো ধনী পরিবারগুলির দুর্গাপূজা “বনেদি বাড়ির পূজা” নামে পরিচিত। পারিবারিক দুর্গাপূজাগুলিতে শাস্ত্রাচার পালনের উপরেই বেশি জোর দেওয়া হয়। পূজা উপলক্ষে বাড়িতে আত্মীয়-সমাগম হয়ে থাকে। অন্যদিকে আঞ্চলিক স্তরে এক একটি অঞ্চলের বাসিন্দারা যৌথভাবে যে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন তা বারোয়ারি পূজা বা সর্বজনীন পূজা নামে পরিচিত।

মহিষমর্দিনী (পোড়ামাটি), শারসাবাজ, বগুড়া

ভারতে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের সময় সর্বজনীন পূজা শুরু হয়। মুলত দেবী দুর্গাকে মাথায় রেখেই দেশমাতা বা ভারতমাতা বা মাতৃভূমির জাতীয়তাবাদী ধারনা বিপ্লবের আকার নেয়। দেবী দুর্গার ভাবনা থেকেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বন্দে মাতরম গানটি রচনা করেন যা ভারতের স্বাধীনতা-আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র। সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ বিল্পবী ও জাতীয়তাবাদী নেতারা বিভিন্ন সর্বজনীন পূজার সঙ্গে যুক্ত থাকতেন।
পলাশী যুদ্ধের পর বিশ্বাসঘাতক নবকৃষ্ণ চেয়েছিলো ক্লাইভকে সংবর্ধনা দিতে। কিন্তু সে সময় কলকাতায় বড় কোন গির্জা ছিলো না। তাই নবকৃষ্ণ এক ফন্দি আটলো। সে বাড়িতে ৪দিন দিন ব্যাপী এক পার্টি দিতে চাইলো, যা সেকলের কাছে পরিচিত ছিল কোম্পানীর পূজো হিসেবে।
যা আজও শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজো বলে টিকে আছে। কালক্রমে এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান পরিণত হয় শারদীয় দূর্গা পূজা রূপে।
তাই দেশপ্রেমিকরা এই পুজোকে ‘বেইমানের পুজো’ বলে আখ্যা দিতো৷ বঙ্কিমচন্দ্রও জানত যে লর্ড ক্লাইভের আমলেই দুর্গার সৃষ্টি। সে এও জানত যে ওটা ইংরেজদেরই কারসাজি। “বঙ্কিমচন্দ্র বিদ্রুপ করিয়া লিখিয়াছিল যে, পরে দুর্গাপূজার মন্ত্রও ইংরাজিতে পঠিত হইবে।”
ক্রমে রাজ-রাজাদের দিন ফুরিয়ে এলা। দুর্গা হয়ে উঠলেন সাধারন জনমানুসের সার্বজনীন দেবী। আধুনিক সময়ে এর এত প্রচারের কারণ হোলেও ভারতে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের সময় সর্বজনীন পূজা শুরু হয়। হুগলী জেলার বলাগড় থানার গুপ্তিপাড়ার (জায়গাটার আসল নাম গুপ্তবৃন্দাবন) বারোজন বন্ধু ভাবলো যে আমরা এককভাবে পারবো না, কিন্তু বারোজন মিলে তো পূজার আয়োজন করতে পারি। উর্দুভাষায় বন্ধুকে ইয়ার বলে, তাই বারোজন ইয়ারে মিলে যে দুর্গাপূজা করলো সেটা হলো বারো ইয়ারী পূজা বা বারোয়ারী ।
আর এই বারোয়ারী পূজায় যেহেতু অন্ত্যজ লোকদের অঞ্জলি দেবার অধিকার থাকে না, তাই সবার অধিকার যাতে থাকে সেজন্য আধুনিককালে বারোয়ারী পূজা বিবর্তিত হয়ে তাদের ভাষায় হলো সার্বজনীন পূজা।

Close