আন্তর্জাতিকশিরোনাম-২

২ বিলিয়ন বছরের পুরনো পারমাণবিক চুল্লি!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সম্ভবত পারমাণবিক যুগ শুরু হয়েছিল আমেরিকায়। কিন্তু বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছিল গ্যাবনে। গ্যাবন হচ্ছে আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির অধীন একটি অন্যতম ধনী দেশ। মূলত তেল, কাঠ ও ম্যাঙ্গানিজ ধাতব রপ্তানির মাধ্যমেই দেশটির অর্থনীতির চাকা ঘোরে। এছাড়াও অতীতে স্বল্প সময়ের জন্য গ্যাবন ইউরেনিয়াম রপ্তানি করেছিল। যা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও পারমাণবিক অস্ত্রের খুবই দামি কাঁচামাল ছিল।
বর্তমানে গ্যাবনের ইউরেনিয়াম খনি আর সচল নেই। তবে দুই বিলিয়ন বছর আগে সেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ ইউরেনিয়াম পাওয়া গিয়েছিল। যার ফলে সেখানকার শিলায় নিয়মিত ফিশন বা বিভাজন বিক্রিয়া ঘটত।
প্রকৃতিতে ইউরেনিয়াম তিনটি আইসোটোপে থাকতে পারে। যা নিউক্লিয়াসে থাকা নিউট্রনের সংখ্যার ভিত্তিতে একটি অপরটি থেকে ভিন্ন হয়। অধিক পরিমাণে প্রাপ্ত আইসোটোপ হচ্ছে ইউরেনিয়াম- ২৩৮। এটি পৃথিবীতে প্রাপ্ত ইউরেনিয়ামের শতকরা ৯৯ ভাগ। এছাড়াও ০.৭২ ভাগ হচ্ছে – ২৩৫ এবং ০.০০৬ ভাগ হচ্ছে ইউরেনিয়াম- ২৩৪।
ইউরেনিয়ামের তিনটি আইসোটোপই অস্থিতিশীল এবং দুর্বলভাবে তেজস্ক্রিয়। তবে কেবলমাত্র ইউরেনিয়াম– ২৩৮ এবং ইউরেনিয়াম– ২৩৫ দ্রুত পারমাণবিক ফিশন বিক্রিয়া ঘটাতে পারে। যার ফলে এই দুটি আইসোটোপই অধিকতর পারমাণবিক বৈদ্যুতিক বা শক্তি চুল্লিতে ব্যবহৃত হয়। পারমাণকি বৈদ্যুতিক চুল্লিতে শতকরা ৩-৫ ভাগ ইউরেনিয়াম– ২৩৫ আইসোটোপ প্রয়োজন পড়ে। অপর দিকে পারমাণকি বোমা তৈরিতে শতকরা ৯০ ভাগ ইউরোনিয়ামের প্রয়োজন পড়ে।
১৯৫০ সালে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে, কয়েক মিলিয়ন বছর আগে ভূত্বকে প্রচুর ইউরেনিয়াম– ২৩৫ এর উপস্থিতি ছিল। যেগুলো প্রাকৃতিকভাবে ফিশন বিক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিল। ১৯৫৬ সালে জাপানের পদার্থবিদ পল কুরোদা তাত্ত্বিকভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটা পারমাণবিক ফিশন বিক্রিয়ার কথা বলেছিলেন।
কুরোদা প্রস্তাব করেছিলেন যে, পারমাণবিক ফিশন বিক্রিয়া ঘটার জন্য অধিক পরিমাণে ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি থাকতে হবে। এছাড়াও আকরিকের ঘনত্ব এক মিটারের দুই-তৃতীয়াংশ হতে হবে। পাশাপাশি অবশ্যই মডারেটর বা নিয়ামক থাকতে হবে। নিয়মক এমন হতে হবে যা ফিশন বিক্রিয়ার সময় নিউট্রনের উৎপাদনকে ধীরগতি সম্পন্ন করে ফেলে।
কুরোদার তত্ত্বের ১৬ বছর পর, গবেষকরা ১৯৭২ সালে গ্যাবনে প্রাকৃতিক নিয়ামকের সন্ধান পান। সেই সময় ফরাসিরা গ্যাবনে ইউরিনয়াম খনিতে কাজ করছিলেন। খনিতে কাজের সময় গ্যাবনের দক্ষিণাঞ্চলীয় স্থান ওকলোতে প্রাপ্ত ইউরেনিয়াম আকরিক পরিমাপ করা হয়।
সাধারণত প্রাপ্ত আকরিককে প্রতিদিনই পরিমাপ করা হয়। কিন্তু সেদিন প্রাপ্ত আকরিকে ফরাসিরা ইউরেনিয়াম– ২৩৫ এর পরিমাণ শতকরা ০.৭২ থেকে কিছু কম পান। কোনো কোনো লেখকের মতে, পরিমাণটা ছিল শতকরা ০.৬০ ভাগ।
অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ইউরেনিয়াম আকরিকে সামান্য পরিমাণ অন্যান্য উপাদানের অস্তিত্ব আছে বলে জানা যায়। প্রাপ্ত উপাদানের পরিমাণটা পারমাণবিক বৈদ্যুতিক চুল্লিতে জ্বালানি তৈরিতে যতটুকু লাগে ঠিক সেই পরিমাণই ছিল। এই অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, অতীতে ওকলোর খনিতে ইউরেনিয়ামের স্বতঃস্ফূর্ত ফিশন বিক্রিয়া সংঘটিত হয়েছিল। এই বিক্রিয়ার ফলেই ইউরেনিয়ামের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছিল।
বিস্ময়কর এই আবিষ্কারের পর পদার্থবিদগণ আরও প্রমাণের জন্য ব্যাপক অনুসন্ধান করেন। পরিশেষে, ওকলোর খনিতে ১৬টি স্থানের সন্ধান পান যেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পারমাণবিক বিক্রিয়া সংঘটিত হয়েছিল।
প্রাগৈতিহাসিককালে কিভাবে ফিশন বিক্রিয়া ঘটতো গবেষকরা তা জানাতে সক্ষম হন। তাদের মতে, সায়ানো ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির জন্য বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ বেড়ে যেত। যা অদ্রবণীয় ইউরেনিয়ামকে দ্রবণীয় অক্সাইডে রূপান্তরিত করতো।
পরবর্তীতে বৃষ্টির পানির কারণে ইউরেনিয়াম বেলেপাথরের উপর জমা হতো। অতঃপর জমা হওয়া ইউরেনিয়ামের পরিমাণ একটা নির্দিষ্ট ঘনত্বে পৌঁছালেই ফিশন বিক্রিয়া ঘটতো। খনির প্রাকৃতিক চুল্লিতে যে পরিমাণ ইউরেনিয়াম– ২৩৫ ক্ষয়প্রাপ্ত হতো তাতে সম্ভবত ১০০ কিলোওয়াটের কিছুটা কম শক্তি উৎপন্ন হতো।
ধারণা করা হয় কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য প্রাকৃতিক পারমাণবিক চুল্লির অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু সেগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ভূত্বকে মিশে গেছে। তবে গ্যাবনে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক পারমাণবিক চুল্লি প্রকৃতপক্ষেই অদ্বিতীয়। বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close