মহানগরশিরোনাম

ছোট শিশুদের নিয়ে বড় আতঙ্ক

সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি: হেলেনা খাতুনের বাড়ির দুয়ার নদীর তীররক্ষা বাঁধের ওপর। আর বাঁধের কয়েকহাত নিচ দিয়েই বয়ে যাচ্ছে প্রমত্তা পদ্মার তীব্র স্রোত। হেলেনা খাতুন তার চার বছরের নাতি আলিফকে নিয়ে খুব আতঙ্কে থাকেন। কারণ, সে কেবল হাঁটতে শিখেছে। কখন জানি সে নদীর দিকেই যায়!
রাজশাহী মহানগরীর কেশবপুর পদ্মা নদীর পাড়ে হেলেনা খাতুনের বাড়ি। এলাকাটিতে নদীর পাড়েই অন্তত দেড় হাজার পরিবারের বাস। এখানকার শুধু হেলেনা খাতুনই নয়, শিশুদের নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন লতিফা, হাবিবা, শারমিন, নাহিদাসহ আরও অনেক শিশুর মা।
হেলেনা খাতুন বলেন, ঘরের দুয়ারে পানি। শিশু আলিফকে নিয়ে বড় আতঙ্কের মধ্যে থাকি। নিশ্চিতে রান্না করতে পারি না। অন্য কোনো কাজও করতে পারি না। কারণ, সুযোগ পেলেই আলিফ বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যাবে। আর বাড়ি থেকে বেরুলেই পানি।
এলাকার বাসিন্দা কোহিনুর বেগম (৪২) বলেন, তিনিও তার নাতনিকে নিয়ে ভীষণ আতঙ্কের মধ্যে আছেন। পাঁচ বয়স তার নাতনি মারুফার। সে-ও সারাক্ষণ ছোটাছুটি করে। তাই বাড়ির দরজা বন্ধ করে রঅখতে হয়। কোহিনুর বলেন, তিনি রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন না এই ভেবে যে, ঘুমালেই মনে হয় ঘরের মধ্যে পানি ঢুকে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
শিল্পি খাতুন (৩০) নামে আরেক গৃহবধূ বলেন, তার দুই সন্তান। বড় মেয়ে নুপুর (৯) আর ছোট ছেলে ইমরান আলী (২)। শিল্পি বলেন, ছেলে-মেয়ের চিন্তার জন্য তিনি কাজে মনোযোগ দিতে পারেন না। সব সময় মনের মধ্যে ভয় কাজ করে, এই বুঝি তার ছেলে মেয়ে পানিতে ভেসে গেলো!
শিল্পি জানালেন, আগের বছর এলাকার এক মায়ের কোল খালি হয়েছে পদ্মা নদীর এই পানিতে। তারপর থেকেই তিনি আতঙ্কে থাকেন। এবার পানি এতো বেশি বেড়েছে যে আতঙ্কের মাত্রাও অনেক বেড়েছে।
নদীর পানির ধারেই বাঁধে বসে রান্না-পাতিল খেলছিলো শিশু রোজা খাতুন (৯)। সে বলে, নদীতে পানি বাড়লে তার ভয় করে। বাড়ির পাশেই নদী এমন অবস্থার কারণে তারা ঠিক মতো দৌড়াদোড়ি করে খেলতে পারে না। নদীতে পানি কমে গেলে তার ভালো লাগে। রোজার মা ডলি খাতুন (৩২) বলেন, নদীতে পানি বাড়ার জন্য তিনি তার মেয়েকে ঘর থেকে বের হতে দিতে ভয় পান।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, গত সপ্তাহে হঠাৎ করেই নদীতে দ্রুত পানি বাড়তে শুরু করে। তারপর রাজশাহীতে সর্বোচ্চ ১৮ দশমিক ১৯ মিটার পর্যন্ত উঠেছে পানিপ্রবাহ। তবে এর পর থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় পানির উচ্চতা ছিলো ১৮ দশমিক ১২ মিটার। তারপরেও নদীতে রয়েছে প্রবল স্রোত।
কেশবপুরের বাসিন্দারা বলছেন, নদীতে যে স্রোত তাতে পড়ে গেলে সাঁতার জানা থাকলেও ছোট ছোট বাচ্চাগুলো টিকে থাকতে পারবে না। তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে স্রোত। তাই উত্তাল নদী থেকে তাদের বাড়িঘর হারানোর ভয় যতখানি তার চেয়েও বেশি ভয় সন্তান হারানোর।
এলাকার বাসিন্দা পারভিন বেগম (২৩) বলেন, তার ছেলে তাসলিমুল হাসানের বয়স দুই বছর। কেবল হাঁটতে শিখেছে। কোল থেকে নামালেই ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়। তার জন্য ঘরের দরজা সব সময় লাগিয়ে রাখতে হয়। তাছাড়াও পানি কমলেই বাঁধের ব্লক খুলে যাবার আশঙ্কা থাকে। সে জন্য সন্তানকে নিয়ে তিনি সব সময় সতর্ক থাকেন।
রানী বেগম (৪৫) নামে আরেক নারী বলেন, তার বাড়িতে কোনো ছোট ছেলে-মেয়ে নেই। কিন্তু তাতে কী! আশেপাশের বাড়িতে আছে ছোট বাচ্চা আছে, তার জন্য তিনিও ভীষণ ভয়ে থাকেন। ছোট বাচ্চাদের পানির কাছে দেখলেই তার ভয় করে। নিজেও পানির কাছে যেতে ভয় পান।
বৃষ্টি নামে ১২ বছরের এক কিশোরী জানালো, তার মা তাকে বেশিরভাগ সময় বাড়ির দরজায় তালা দিয়ে রাখেন। যেনো সে বের হতে না পারে আর নদীতে গোসল করতে যেতে না পারে। বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে তার মা আনোয়ারা খাতুন বললেন, মাঝে মাঝে দোকান যাই। তখন দরজায় তালা দিয়ে যাই। তা না হলে চোখের আড়ালে কী হয় তা কে জানে! বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close