বগুড়াশিরোনাম-২

বগুড়ায় প্রগতিশীল সংগঠনসমূহের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

বগুড়া প্রতিনিধিঃ ভারতের সাথে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী সকল অসম চুক্তি বাতিল, বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত, তুহিন সহ শিশুহত্যার বিচার এবং দূর্নীতি, ক্যাসিনো বাণিজ্য, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্ব বন্ধের দাবিতে দেশব্যাপী কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসাবে আজ বৃহস্পতিবার বগুড়ার ঐতিহাসিক সাতমাথায় সকাল ১১টায় প্রগতিশীল সংগঠনসমূহের বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন কৃষক সমিতি বগুড়া জেলা কমিটির সভাপতি, সন্তোষ কুমার পাল ও পরিচালনা করেন ছাত্র ইউনিয়ন বগুড়া জেলা সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক সম্পাদক মো: ছাব্বির হোসেন। বক্তব্য রাখেন ঐক্য ন্যাপ বগুড়া জেলা কমিটির সম্বনয়ক মাহফুজুল হক দুলু, কমিউনিস্ট পার্টি বগুড়া জেলা কমিটির সভাপতি জিন্নাতুল ইসলাম, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র বগুড়া জেলা কমিটির সহ-সভাপতি ফজলুর রহমান, ক্ষেতমজুর সমিতি বগুড়া জেলা কমিটির সদস্য নিমাই ঘোষ, যুব ইউনিয়ন বগুড়া জেল কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহনিওয়াজ কবির খান পাপ্পু, ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও বগুড়া জেলা সংসদের সভাপতি মো: নাদিম মাহমুদ।

সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও বগুড়া জেলা সংসদের সভাপতি ছাত্রনেতা মো: নাদিম মাহমুদ বলেন, সন্ত্রাস আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ছাত্র ইউনিয়ন গতকাল শুভ্র পদযাত্রা করেছে। সন্ত্রাস-আধিপত্যবাদ থেকে দেশকে বাঁচাতে দরকার ছাত্র-শ্রমিক-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। আবরার, জোবায়ের, আবু বকর, হাফিজুর, বিশ্বজিৎ, সাদ, তাপস, দিয়াজ, আফসানা এ রকম অসংখ্য প্রাণ আমাদের মাঝখান থেকে হারিয়ে গিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকেই শিক্ষাঙ্গন থেকে প্রায় দুইশত শিক্ষার্থীর জীবন ঝরে গিয়েছে। গত এক দশকেই ক্যাম্পাসে হয়েছে অন্তত দুই ডজন খুন। প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেছে এক বা একাধিক খুনের ঘটনা। শিবির ক্যাম্পাসে রগ কেটেছে, হত্যা করেছে, বিগত সময়ে ছাত্রদল-শিবির ক্যাম্পাসগুলোতে সন্ত্রাস, নির্যাতনের যে ধারা শুরু করেছে, এই সময়ে এসে ছাত্রলীগও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে রয়েছে ছাত্রলীগের টর্চার সেল। চর্টার সেলগুলোতে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন ও ভয় দেখিয়ে ভিন্নমত দমনের এক দখলদারি সংস্কৃতি চালু করেছে ছাত্রলীগ। ভিন্নমত দমনে খুনের পথ ধরতেও বাকি নেই ছাত্রলীগের।
সারাদেশে ছাত্রলীগের সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে।
‘আবরার, জোবায়ের, আবু বকর, হাফিজুরসহ সকল হত্যাকাণ্ড একই সূত্রে গাঁথা। সেই সূত্রটি হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ নয়, এই সন্ত্রাসবাদী অপরাজনীতি আইন করে নিষিদ্ধ করা হোক। বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ’ই হোক শেষ ছাত্র খুনের ঘটনা।’
আজকের সন্ত্রাস আধিপত্যবাদের কড়াল গ্রাসে পড়েছে সমগ্র বাংলাদেশ। এ থেকে দেশকে বাঁচাতে দরকার ছাত্র-শ্রমিক-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজ ছাত্র ইউনিয়ন শুরু করেছে। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দিয়েই সন্ত্রাস-আধিপত্য থেকে বাংলাদেশকে মক্ত করব আমরা। বাংলাদেশে স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়ণ করতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

কৃষক সমিতি বগুড়া জেলা কমিটির সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা সন্তোষ কুমার পাল বলেন, স্বার্থবিরোধী সকল অসম চুক্তি বাতিল, বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদের হত্যাকারিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে পাঁচ বছরের শিশু তুহিনের নির্মম হত্যার সাথে যুক্তদের বিচার এবং ক্যাসিনো বাণিজ্য, দূর্নীতি, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্ব বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক ভারত সফরে সে দেশের ক্ষমতাসীন সরকারের সাথে ৭টি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করে এসেছেন। এসব চুক্তি ও সমঝোতায় বাংলাদেশের অনুকুলে কোন কথা নেই। প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে বাংলাদেশের মানুষ আশা করেছিল দীর্ঘ দিনের কাঙ্খিত তিস্তা নদীর পানি বন্টন এবং বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আদায়, রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে ফেরত পাঠাতে ভারত সরকারের কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ, সীমান্তে বিএসএফের হত্যাযজ্ঞ বন্ধ ও সেখানে চলমান এনআরসি কর্মসূচি সম্পর্কে ভারতের বক্তব্য প্রভৃতি বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকবে। কিন্তু বাস্তবে ভারত সরকার সেদিকে না গিয়ে কৌশলে বাংলাদেশের মানুষের কাঙ্খিত বিষয়সমূহকে উপেক্ষা করে মৌখিক দায়সারা আশ্বাস দিয়েছে। তাও আবার যৌথ ঘোষণায় স্থান পায়নি। পক্ষান্তরে ফেনী নদীর পানি ভারতকে দেয়া, বাংলাদেশের আমদানি করা এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারে করে ভারতের কাছে রপ্তানী করা, দেশের উপকূলীয় এলাকায় অন্তত বিশটি স্ট্রাটিজিক পয়েন্টে ভারতের রাডার স্থাপনসহ ভারতকে এক পাক্ষিক সুবিধা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এসকল অসম চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। ভারতের মোদি সরকারের সাথে স্বাক্ষরিত এসকল চুক্তি দুই দেশের জনগণের ভাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এসকল অসম চুক্তির বিরোধিতা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখায় বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে ছাত্রলীগের নেতারা নির্মম ভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। ইতোপূর্বেও বিশ্বজিৎকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার পর জনমতের চাপে ছাত্রলীগের সেই সব খুনিদের ধরা হয়েছিল। কিন্তু অচিরেই হত্যাকারিরা খালাস পেয়ে যায়। এবারও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সারা দেশে মানুষ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করায় কয়েকজন আসামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের কি হবে বা গ্রেফতারকৃতরাও ছাড়া পেয়ে যাবে কিনা এ বিষয়ে জনগন সন্দিহান।

এ কারনে প্রগতিশীল গণসংগঠনসমূহ আবরার ফাহাদের হত্যাকারিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাচ্ছে। ছাত্রলীগের বেপরোয়া সন্ত্রাসের দায়কে আড়াল করে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে তারও তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে ছাত্র রাজনীতির উপর থেকে সকল ধরণের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহরের দাবি জানিয়েছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সারা দেশে যে বেপরোয়া সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, লূটপাটের স্বর্গরাজ্য বানিয়ে রেখেছে তার খুব সামান্যই আমাদের সামনে আসছে। যুবলীগের নেতাদের ক্যাসিনো বাণিজ্য, টেন্ডারবাজির ঘটনা ইতোমধ্যে দেশবাসি অবগত হয়েছে। কত শত কোটি টাকা একেকজন নেতার রয়েছে তা দেখে জনগণ বিস্মিত, উদ্বিগ্ন। লুটপাটের এ সাম্রাজ্য কত বিস্তৃত ও ভয়ঙ্কর তা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রত্যক্ষ প্রশ্রয় পেয়েই এসব সাম্রজ্য গড়ে উঠেছে। অনতিবিলম্বে সর্বগ্রাসী এ দূর্নীতি, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্ব বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় জনমনে যে তীব্র ক্ষোভ দানা বেঁধেছে তা বিক্ষোভে পরিণত হয়ে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নিবে।

যুব ইউনিয়ন বগুড়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহনিওয়াজ কবির খান পাপ্পু বলেন, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের কেজাউড়া গ্রামের পাঁচ বছর বয়সী শিশু তুহিনের বর্বর ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশেরর সাথে ধিক্কার জানান। পাঁচ বছরের এক নিষ্পাপ শিশুর পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড প্রচলিত পুঁজিবাদী সমাজে মনুষ্যত্বের চুড়ান্ত অধঃপতনেরই বহিঃপ্রকাশ। শিশু তুহিন আর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবরার দুটি হত্যাকাণ্ডই সমাজের অবক্ষয় ও পৈশাচিকতাকেই প্রকাশ করেছে।

যে সমাজে মনুষ্যত্বের কোনো মূল্য নেই সে সমাজ টিকে থাকতে পারে না।
বর্তমান পচা গলা মুনাফাভিত্তিক পুঁজিবাদী সমাজ ভেঙে মানবিক সমাজ গড়ার সংগ্রামে সামিল হতে দেশবাসীকে আহ্বান জানান।
তুহিনের হত্যকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
বরেন্দ্র বার্তা/নাম/ নাসি

Close