শিরোনাম-২স্বাস্থ্য বার্তা

বয়স্করা যেভাবে ভালো থাকবেন

ডা. মো. ফয়জুল ইসলাম চৌধুরী

আমি যখন এ লেখাটি লিখছি তখন আমার বয়স ৬০ ছুঁই ছুঁই করছে। অর্থাৎ আমি প্রবীণের কাছাকাছি। আর ৫-৬ বছর পরই বয়স্কদের কোটায় পড়ে যাব। তাই বয়স্কদের ব্যাপারে আমার উপলব্ধি বয়োকনিষ্ঠদের চেয়ে খানিকটা বেশি।
বয়স্কদের নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে একটি মৌলিক চিন্তা। যে কোনো মৌলিক চিন্তার ব্যাপারে আমার আগ্রহ অনেক বেশি। তার ওপর আমার প্রৌঢ়ত্ব শেষ হচ্ছে। তাই এ লেখাটির ব্যাপারে আমার মন সতত উৎসারিত।
আজ যারা বয়স্ক তারাই এক সময় ছিলেন যুবা এবং প্রৌঢ়। তারাই পরিবারের হাল ধরেছেন। অর্থাৎ তাদের ভূমিকা না থাকলে আমরা এ পর্যায়ে পৌঁছতাম না। সমাজ ও রাষ্ট্র এ পর্যায়ে পৌঁছত না। কিন্তু আজ তারা বয়সের ভারে, শরীরের ভারে ক্লান্ত হয়ে আছেন। শারীরিক শক্তি নেই। যে যে কাজে ছিলেন ওই কাজ থেকে অবসরপ্রাপ্ত।
তাই তাদের সমাজে বৈষয়িক অর্থে মূল্য নেই। যেহেতু তারা এখন ঘরবন্দি, বাড়িবন্দি, আয়-রোজগার করেন না, তাই বয়োকনিষ্ঠরা তাদের মুখাপেক্ষী নন। যেহেতু তাদের মুখাপেক্ষী নন তাই তাদের তেমন মূল্যায়ন করতে চান না। কিন্তু এটা কি উচিত? আমরা যদি আমাদের অতীতের দিকে তাকাই তাহলে কী দেখি!
এই পৃথিবীর জলবায়ু আবহাওয়া আমরা কাদের দ্বারা উপলব্ধি করেছি। আমাদের শৈশবে কারা যত্ন নিয়েছেন। আমরা যখন নিজ হাত দিয়ে খেতে পারতাম না, কে আমাদের খাইয়েছেন? আমরা যখন হাঁটতে পারতাম না, কে আমাদের হাত ধরে হাঁটা শিখিয়েছেন? কার মাধ্যমে আমরা লেখাপড়া শিখেছি?
এটা যদি ভাবি তাহলে যতদিন প্রবীণরা বেঁচে থাকবেন ততদিন তাদের মূল্যায়ন করতে হবে। এখন তাদের প্রয়োজন নেই বলে তাদের প্রতি আমরা খেয়াল রাখব না, এটা হয় না। এটা অত্যন্ত অমানবিক। আমরা যতই যান্ত্রিক হই না কেন, আমরা তো মানুষ। মানুষ হিসেবে আমাদের পরিপূর্ণ মানবিকতা থাকতে হবে। তাই তাদের প্রতি আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। বয়স্কদের সম্মান দিতে হবে।
বয়স্কদের সেকাল, একাল এবং আগামীকাল
আমাদের ছোটবেলায় আমরা বয়স্কদের যেভাবে ভালো থাকতে দেখেছি, একালে বয়স্করা সেভাবে ভালো নেই। তাদের আগামীকাল কীভাবে যাবে এটা নিয়ে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে এখনই ভাবতে হবে।
একালের বয়স্করা কেন সেকালের তুলনায় ভালো নেই, তার কারণগুলো বিশদভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তখনকার সময়ে পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষিতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে।
তখনকার এবং এখনকার মানবিক মূল্যবোধে আকাশ-পাতাল ফারাক। সে আমলের উপলব্ধিগুলো ছিল অনেক প্রকট। তখনকার জীবনপ্রবাহের গতির সঙ্গে এখনকার গতিতে অনেক অমিল। এ সবকিছুর ভুক্তভোগী হচ্ছেন এখনকার বয়স্করা।
বয়স্কদের ঔরসজাত উত্তরসূরি সংখ্যায় কমে যাচ্ছে। সেকালে বয়স্কদের নাতি-নাতনি থাকত ১৫-১৬ জন, সন্তান থাকত গড়ে ৩-৪ জন। তাদের ঘরে আরও ৩-৪ জন করে সন্তান থাকত। অনুপাত দাঁড়াত ১:৪:১৬। বর্তমানে পিতার এক সন্তান, তার ঘরে এক সন্তান। অনুপাত দাঁড়াচ্ছে ১:১:১।
তাই দেখভাল করার লোকজন কমে গেছে। তখন ছিল একান্নবর্তী পরিবার। মা, বাবা, ভাইবোন, দাদা-দাদি, ফুপু, চাচাতো ভাইবোন সবাইকে নিয়ে একান্নবর্তী পরিবার। এর মাঝে দাদা-দাদি মধ্যমণি হিসেবে কাজ করতেন। পরিবারের সবকিছুই তাদের অনুমতি সাপেক্ষে হতো।
এমনকি পাকঘরের রান্নাবান্নার আইটেম সিলেকশনও তাদের অনুমতি সাপেক্ষে হতো। এতে করে বয়স্কদের মন থাকত ফুরফুরে। কিন্তু এখন সেই একান্নবর্তী পরিবার আর নেই। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে থাকে স্বামী, স্ত্রী, একটি বা দুটি সন্তান। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই চাকরি করেন।
সন্তানদের কাজের বুয়ার ওপর দায়িত্ব দিয়ে যান। আর বুড়ো মা-বাপ বাড়িতে অবহেলায়, অনাদরে একাকী সময় কাটান। ছেলেমেয়ে সবাই ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে, নিজেদের ছেলেমেয়ে নিয়ে।
প্রয়োজনের তাগিদে একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে আজ মৌলিক পরিবার হচ্ছে। এটাকে নেতিবাচক হিসেবে দেখলে হবে না। ৩-৪ পুরুষ আগে এ দেশে বাড়ি বাড়ি শিক্ষিত লোক দেখা যেত না। যে যেখানে জন্মগ্রহণ করত, ওখানেই মৃত্যুবরণ করত।
শিক্ষার উদ্যোগ বেড়েছে, মানুষ শিক্ষিত হয়েছে, উচ্চশিক্ষার জন্য বাড়ি ছাড়তে হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরির জন্য তাকে পৈতৃক বাড়ি থেকে অনেক দূরে যেতে হচ্ছে। সুতরাং এক-ভাতে পরিবার থাকা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। এতে বয়স্কদের জীবনে একটি ঘাটতি পড়ে। অন্যান্য উপাদান দিয়ে এ ঘাটতি পরিপূর্ণ করা যায়।
উত্তরসূরিদের জীবনপ্রবাহে ব্যস্ততা
অতীতে জীবনের উপকরণগুলো ছিল সহজসাধ্য। জীবনযাপন ছিল অনাড়ম্বর। চাহিদা ছিল কম। ইচ্ছাশক্তি ততটা প্রকট ছিল না। দৈনন্দিন জীবনে শ্বাস ফেলার সময় ছিল। অন্যদিকে তাকানোর ইচ্ছাও ছিল, সময়ও ছিল। যার ফলে অন্যের খোঁজখবর রাখা যেত। অন্যের খোঁজখবর রাখতে গিয়ে মা-বাবার কথা সবার আগে মনে পড়ত।
বর্তমানে জীবনের চাহিদা বেড়ে গেছে। সাধ পরিপূর্ণ করার জন্য অনন্তর চেষ্টা। এতে শ্বাস ফেলার ফুরসত নেই। অন্যের দিকে তাকানোর মতো দৃষ্টিভঙ্গিও নেই, ইচ্ছাশক্তিও নেই। অনুভূতির সেই গভীরতা আর নেই। অতীতে অনুভূতি ছিল হৃদয়ছোঁয়া। আজকাল মনে হয় যেন সেই হৃদয়ের ভেতর জমাটবাঁধা অনুভূতিগুলো বাষ্পায়িত হয়ে উড়ে যাচ্ছে।
কিন্তু একটি কথা বারবার মনে ধাক্কা দেয়- তাই বলে কি নিজের ছেলেমেয়েদের প্রতি মনোযোগ কমে গেছে? অবশ্যই না। ছেলেরা কীভাবে ভালো লেখাপড়া করবে, ভালো খাওয়া-দাওয়া করবে- এ ব্যাপারে সেকালের বাবাদের চেয়ে একালের বাবারা অনেক বেশি সচেতন।
ঔরসজাত সন্তানদের প্রতি যদি এতই সচেতন হওয়া যায়, তাহলে আপনি যার ঔরসজাত তার প্রতি এত অবহেলা কেন? মনে হয় কোথায় যেন একটি ফাঁক রয়েছে। এটি হচ্ছে আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয়। আমাদের যৌক্তিক দায়িত্বশীলতার অবনতি।
প্রবীণদের ভবিষ্যৎ
যদি প্রবীণদের প্রতি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা এভাবে চলতে থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে প্রবীণরা এক অমানবিক জীবনযাপনে চলে যাবে। তাদের দুর্দশার অন্ত থাকবে না। কথায় বলে- যে পরিবারে প্রবীণরা ভালো থাকে, সে পরিবারে মানবিক মূল্যবোধ অনেক উচ্চপর্যায়ে। প্রবীণদের ভালো থাকা পরিবারের ভালোবাসার নির্দেশক।
আমাদের করণীয়
১. ব্যক্তি এবং পারিবারিক পর্যায়ে বয়স্কদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে ২. যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে ৩. তাদের প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে ৪. দায়িত্বশীল হতে হবে ৫. অনুভূতির গভীরে যেতে হবে ৬. মানবিক মূল্যবোধ বাড়াতে হবে।
যে পরিবারে বয়স্ক মানুষজন আছেন, সে পরিবারের বয়োকনিষ্ঠের উচিত হবে বয়স্কদের নিয়ে নিগূঢ়ভাবে ভাবা। শত ব্যস্ততার মাঝেও আর্থিক টানাপোড়েনের মাঝেও বয়স্কদের প্রয়োজনটাকে তাদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পূরণ করতে হবে। বয়স্করা শিশুদের মতো। তারা খানিকটা আবেগপ্রবণ। অল্পতে ব্যথা পান।
অল্পতে খুশি হন। তাদের প্রতি ভালো ব্যবহার করতে হবে। তাদের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতে হবে, যাতে তারা মনে কোনো কষ্ট না পান। অফিসে যাওয়ার আগে তার রুমে ঢুকে মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে বিদায় নেবেন।
অফিস থেকে আসার পর আবার তার রুমে ঢুকে তার সারা দিনের খোঁজখবর নেবেন- খাওয়া-দাওয়া কী করেছেন; ওষুধপত্র ঠিকমতো নিয়েছেন কি না ইত্যাদি। তাদের সঙ্গে ধমকের সুরে কথা বলবেন না।
সদাচরণ করবেন। সম্মানজনকভাবে কথা বলবেন। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে বলবেন, শৈশবে তারা আমাকে যেরূপ দয়া করে লালন-পালন করেছেন, আপনিও তাদের প্রতি সেরূপ আচরণ করুন।
বয়স্কদের থাকার রুমটি যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন না হয়। আলো-বাতাসের অপ্রতুলতা যেন না থাকে। আপনার যদি সাধ্যে কুলায় ওই রুমে যেন সংযুক্ত বাথরুম থাকে। মেঝেতে যেন পিচ্ছিল টাইলস না থাকে। ওয়াশরুমে যেন হাই কমোড থাকে। স্টিলের বার থাকে। বিছানা-বালিশ যাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও ছিমছাম থাকে।
রাতে মশারি টানিয়ে দেবেন, সকালে মশারি খুলবেন। বয়স্ক ব্যক্তি যদি একা হন তাহলে রাতে রুমে যেন একজন এটেন্ডেন্ট থাকে। তাদের নিয়মিত গোসল করাতে হবে। ভালো জামাকাপড় পরিধান করাতে হবে। তাদের তরল, নরম ও সহজপাচ্য খাবার দেয়া উচিত। শাকসবজি, ফলমূল ও মাছের প্রাধান্য থাকতে হবে।
মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতে হবে, তারা কী খেতে চান। সে অনুযায়ী তাদের খাওয়া জোগাড় করতে হবে। খাওয়ার ব্যাপারে সময়ানুবর্তিতা যথাযথভাবে বজায় রাখতে হবে। এটা মনে রাখতে হবে, বয়স্করা ক্ষুধা সহ্য করতে পারেন না। ক্ষুধা লাগার আগেই তাদের খাবার দিতে হবে।
তাদের নিয়মিত ডাক্তার দেখাতে হবে। ডাক্তার যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেবেন তাতে অবহেলা না করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে। মনে রাখতে হবে, রোগ প্রকাশ হওয়ার আগেই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে। ওষুধের ব্যাপারে অবহেলা করা যাবে না। ওষুধ খাওয়ার ব্যাপারেও খুবই সচেতন হতে হবে।
ওষুধগুলো রাখার জন্য তিনটি পাত্রের ব্যবস্থা করতে হবে; সকালের ওষুধ, দুপুরের ওষুধ এবং রাতের ওষুধ। সাধারণত সকালের ওষুধ বেশি থাকে, তারপর রাতের ওষুধ, দুপুরের ওষুধ কম থাকে। অনেক সময় বয়স্করা রাতের ওষুধ না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। খেয়াল রাখতে হবে, এটা যেন কোনোভাবেই না ঘটে।
বয়স্করা বেশি বিনোদন চান না। তারা চান তাদের সঙ্গে একটু হাসিমুখে কথা বলা। বিভিন্ন উৎসবে তাদের মনে করা, স্মরণ করা। তাদের খোঁজখবর নেয়া, দেখভাল করা। যা পেলে তারা খুশি হন, সে ধরনের আইটেম মাঝে মাঝে তাদের দেয়া। তার উত্তরসূরিরা, আত্মীয়স্বজনরা তার সঙ্গে যেন মাঝে মাঝে একটু দেখা করে, গল্প-গুজব করে।
সামাজিক পর্যায়ে প্রতিটি গ্রামে-মহল্লায় যুব, প্রৌঢ়া, প্রবীণদের খোঁজ রাখতে হবে। তাদের অসহায় অবস্থায় এগিয়ে আসতে হবে। তাদের চিকিৎসায় এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের যে কোনো অনুষ্ঠানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যথাযথ সম্মান দেখাতে হবে।
যেহেতু প্রতিটি পরিবারের লোকসংখ্যা কমে গেছে তাই সমাজবদ্ধভাবে গ্রামের কয়েক বাড়ির যুবকরা মিলে প্রবীণদের সমস্যার সমাধান করতে হবে। প্রয়োজন হলে তাদের জন্য প্রতিটি মহল্লা অথবা গ্রামে ছোট পরিসরে একটি বিনোদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে তারা প্রতিদিন একত্রিত হয়ে গল্প-গুজব করতে পারেন। নিজেদের ধারণা প্রকাশ করতে পারেন।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ও পরিসর বাড়াতে হবে। আইন তৈরি করতে হবে যাতে মানুষ পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন করে। প্রতিটি পাড়া, মহল্লা, কলোনি, গ্রাম, ইউনিয়ন ও উপজেলায় প্রবীণ বিনোদন কেন্দ্র তৈরি করতে হবে। বিনোদন কেন্দ্রে ছোট লাইব্রেরি থাকতে হবে, উপাসনালয়ের জন্য জায়গা থাকতে হবে।
প্রতিদিনের পত্রিকা থাকতে হবে। বিশ্রাম নেয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রবীণদের জন্য বিভিন্ন দিবসের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে সেখানে উপস্থিত হয়ে তারা অতীতের স্মৃতিচারণ করতে পারেন।
বিভিন্ন উৎসবভাতা দিতে হবে। ইউনিয়ন-উপজেলায় ফ্রি চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে একটি ইন্সটিটিউট অব ইন্টারনাল মেডিসিন থাকা প্রয়োজন, যেখানে বয়স্কদের সমন্বিত চিকিৎসা দেয়া যেতে পারে।
ডা. মো. ফয়জুল ইসলাম চৌধুরী : সাবেক অধ্যাপক, মেডিসিন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ; সাবেক মহাসচিব, বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন

Close