চাঁপাই নবাবগঞ্জজয়পুরহাটনাটোরবগুড়াবাগমারামহানগরশিরোনাম

রাজশাহী: রাতারাতি ভোল পালটে তারা এখন আওয়ামী লীগার

নিজস্ব প্রতিবেদক: সারাদেশে গত পৌনে ১১ বছরে কমপক্ষে অর্ধলক্ষাধিক অনুপ্রবেশ ঘটেছে আওয়ামী লীগে। দল বদল করে আওয়ামী লীগে এসে রাতারাতি পুনর্বাসিত হয়েছেন তারা। ‘অন্য দল থেকে আওয়ামী লীগে নয়’ দলের হাইকমান্ডের এমন নির্দেশনা থাকলেও তোয়াক্কা করেননি মন্ত্রী-এমপি ও নেতারা।নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিশাল জয়ের পর থেকেই দলের বিভিন্ন স্তরে শুরু হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল ভারি করার প্রবণতা। কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী-এমপিরা নিজ বলয় ভা’রি করতে ‘ফুলের তোড়ায়’ বরণ করে নেন বিএনপি ও জামায়াত-শিবির নেতাদের। যাদের অনেকের বি’রুদ্ধে ছিল আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী হত্যাসহ নাশ’কতা ও অবৈধ অস্ত্রের একাধিক মামলা। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শবিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীরা এখন জেলা-উপজেলায় চালকের আসনেও বসেছেন।
বিএনপি ও জামায়াত-শিবির ছেড়ে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ শুরু হয় ২০০৯ সাল থেকে। আর এই অনুপ্র’বেশ স্রোতের আকার ধারণ করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন পূর্ব ও পরবর্তী চারদলীয় জোটের সহিংস আন্দোলন দমে যাওয়ার পর থেকে। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে এখন বিএনপি-জামায়াত খুঁজে পাওয়া ভার। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার এবার টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষ’মতায় আসার পর স্থানীয় পর্যায়ে যেন সবাই আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে। যাদের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ‘কাউয়া’ এবং ‘হাইব্রিড’ নামে অভিহিত করে আলোচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে বাস্তবতা এমন যে এসব নব্য আওয়ামী লীগারদের দাপ’টে সারা দেশে মূল স্রোতের আওয়ামী লীগাররাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
অনুসন্ধানে দুই থেকে আড়াইশ নেতার নাম এসেছে যারা বিএনপি, জামায়াত-শিবির এবং ফ্রীডম পা’র্টি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েই ‘পরশ পাথরের’ ছোঁয়ায় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, সহ-সভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি পেয়েছেন। কেউ কেউ উপজেলা, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রও হয়েছেন বঙ্গবন্ধুর প্রতীক নৌকা নিয়ে। তারাই এখন ছড়ি ঘুরাচ্ছেন জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়নে। পরিস্থিতি এমন যে কোথাও কোথাও নব্য আওয়ামী লীগারদের হাতে আওয়ামী লীগ বা তার সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা মা’র খাচ্ছেন, অপমান-অপদস্ত হচ্ছেন।
রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, কুমিল্লা, জামালপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীরা আওয়ামী লীগে বেশি যোগদান করেছেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা করার নির্দেশ দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো তালিকা করা হয়নি। জেলা-উপজেলার নেতারাও কেন্দ্রে কোনো তালিকা জমা দেননি। বাধ্য হয়ে দলীয় সভানেত্রী নিজের তত্ত্বাবধানে পাঁচ হাজার অনুপ্রবেশকারীর তালি’কা করে ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের হাতে দিয়েছেন। ফলে টনক নড়েছে দায়িত্বপ্রাপ্তদের।
গত পৌনে ১১ বছরে বিএনপি, জামায়াত-শিবির ও ফ্রীডম পা’র্টি থেকে রাজশাহীতে যারা আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েই পদ-পদবি পেয়েছেন তাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তুলে ধরা হলো।
বাগমারা উপজেলা ও পশ্চিম জেলা শিবির সভাপতি বাংলাভাইয়ের সহযোগী মোল্লা এম আলতাফ হোসেন এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক।
রাজশাহীর বাগমারার দয়ারামপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি আলী আকবর বর্তমানে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য।
পুটিয়া জামায়াতের রোকন আরিফ হোসেন এখন উপজেলার জিউপাড়া ইউনিয়ন কৃষক লীগের সভাপতি।
উপজেলা জামায়াতের সদস্য মজিবর রহমান উপজেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক।
মো. ইসহাক রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আওয়ামী লীগে যোগদান করলেও এখনো পদ-পদবি পাননি। জামায়াত নেতা জাহিদুল ইসলাম ও বাগমারা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি নূরুল ইসলাম আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। আগামী সম্মেলনে পদের আশায় রয়েছেন। মোহনপুর উপজেলা জাতীয় পার্টির নেতা রুস্তম আলী ও কামরুজ্জামান রানা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। জাতীয় পার্টির সাবেক সদস্য রোকনুজ্জামান টিটু কেশরহাট পৌর যুবলীগের সভাপতি।
লালপুরের জামায়াতের কর্মী লালপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। জাতীয় পার্টির সদস্য নাসির এখন সিংড়ার কলম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। জামায়াতের কট্টর সমর্থক একরামুল হক শুভ লালোর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। চৌগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য ফারুক হোসেন এখন ওই ইউনিয়নের যুবলীগের সভাপতি। সিংড়া পৌর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ আবদুল আউয়াল এখন পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি। সুকাশ ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য এখন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। সাবেক শিবির কর্মী তানভির রহমান এখন নলডাঙ্গা উপজেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।
শিবিরের সাথী ছিলেন আকরামুল হোসেন। সে বর্তমানে নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সমাজকল্যাণ সম্পাদক।
নাটোর জেলা বিএনপির সদস্য আকরামুল ইসলাম আক্কু বিহারী ছিলেন বিএনপির সদস্য। ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিয়েই পেয়েছেন জেলা শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদকের প’দ। জেলা তাঁতী দলের সভাপতি মাসুদুর রহমান এখন আওয়ামী লীগের ক্রীড়া সম্পাদক। মাধনগর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাসান আলী নলডাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। লালপুর উপজেলা জামায়াতের সদস্য বিত্তবান আমজাদ হোসেনকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। রতন সাহা এক সময় বিএনপির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এখন নলডাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক। বড়াইগ্রাম উপজেলা বিএনপির প্রভা’বশালী নেতা মাহবুবুল হক বাচ্চু এখন পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। পৌর বিএনপির সহ-সভাপতি জহুরুল হক লাড্ডু পৌর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।
আবদুল মজিদ মাস্টার ছিলেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি। আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েই বাগিয়ে নিয়েছেন কাকনহাট পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ। একই সঙ্গে নৌকা নিয়ে তিনি কাকনহাট পৌর মেয়রও নির্বাচিত হয়েছেন। একই উপজেলার যুবদলের সভাপতি রবিউল আলম এখন পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
বেদারুল ইসলাম বেদীন জয়পুরহাট জেলা শ্রমিক দলের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রদল নেতা মোয়াজ্জেম হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামি। সাজাও হয়েছে যাবজ্জীবন। দীর্ঘ সময় ভারতে ছিলেন। দেশে এসে আওয়ামী লীগে যোগদান করেই মামলার জামিন নেন। এরপর স্বেচ্ছাসেবক লীগের জেলা কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য। গোলাম মতুর্জা শিপলু শহর শ্রমিক দলের আহ্বায়ক ছিলেন। এরপর ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ নেতাদের হাত ধরে এখন শ্রমিক লীগের সদস্য। আবদুস সালাম পাঁচবিবি উপজেলার কুসুম্বা ইউনিয়নের জামায়াতের আমির ছিলেন। নাশ’কতা ও হ’ত্যা মামলাও ছিল তার বি’রুদ্ধে। ২০১৪ সালের পর তিনি এখন আওয়ামী লীগের নেতা। সিরাজুল ইসলাম পাঁচবিবি উপজেলার শিবির নেতা ছিলেন। এখন পাঁচবিবি পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। ফয়েজ উদ্দিন জয়পুরহাট সদরের বিএনপির নেতা এবং রাজাকার আবদুল আলীমের সহযোগী ছিলেন। এখন জয়পুরহাট সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি।
গত পৌনে নয় বছরে স্রোতের মতো অনুপ্রবেশকারীরা জায়গা করে নিয়েছে আওয়ামী লীগে। শুধু তাই নয়, তাদের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে সাধারণ নেতা-কর্মীরা। কিছু দিন আগে বগুড়ার শাজাহানপুরে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েই আলী আতোয়ার ফজু চেয়ারম্যান গোহাইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রবীণ রাজনৈতিক ইউসুফ আলীকে বেধ’ড়ক পে’টান। আমি এখন শিবির করি না, আওয়ামী লীগ করি। তোর মতো সাংবাদিককে আমি মেরেই ফেলব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, তাহলে কি আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ গণমানুষের কিংবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষের দখলে নয় লুটেরা ও স্বাধীনতা বিরোধীদের দখলে চলে যাবে? বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close