শিরোনাম-২সাহিত্য ও সংস্কৃতি

বিষন্ন মেঘ

সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি

আমি বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে বই পড়ছিলাম। হঠাৎ কানে ভেসে এলো মেইন দরজায় দারোয়ানকে একটা ছেলে বলছে আমি হিমাদ্রীর সাথে দেখা করতে চাই।আমি বারান্দা থেকে দারোয়ানকে বললাম উনাকে উপরে আসতে বলো।
ছেলেটাকে দারোয়ান আমার বারান্দা পর্যন্ত রেখে গেলো।আমি তখন রকিং চেয়ারে বই হাতে বসেই ছিলাম। ছেলেটা আমার সামনে এসে দাড়িয়ে রইলো কোনো কথা বলল না।আমি উঠে দাড়িয়ে বললাম আপনার নাম?
সে আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল আমি কি একবার আপনাকে স্পর্স করতে পারি?
আমি আমার ডান হাতটা বারিয়ে দিলাম তার দিকে। সে আমার হাত স্পর্স করে বলল আমি আপনার অনেক বড় ফ্যান। আপনার গল্প পড়তে আমার খুব ভালো লাগে। আপনার গল্প পড়ার সময় আমি পৃথিবী থেকে আলাদা হয়ে যায়। বদ্ধ উম্মাদ হয়ে যায়।
আমি হাসলাম। জিজ্ঞেস করলাম কি খাবেন চা নাকি কফি?
সে ছেলেটা আমাকে জিজ্ঞেস করল আপনি খাবেন?
আমি বললাম হ্যা খাবো।
ছেলেটা বলল আমি জানি আপনি কফি বেশি পছন্দ করেন। আপনার সব গল্পে আপনি কফি বেশি ব্যবহার করেন তাই আমি এখন আপনার সাথে কফি খেতে চাই।
আমি বারান্দা থেকে উঠে এসে দুই মগ কফি বানিয়ে নিয়ে এলাম।
ছেলেটাকে কফি দিয়ে বললাম এই নেন মেঘ আপনার কফি।
ছেলেটা হতবম্ব হয়ে বলল আমার নাম মেঘ না আমার নাম সিজান।
আমি বললাম প্রত্যেকের একটা কল্পনা থাকে আর সে কল্পনার একটা নাম থাকে সেজন্যই আমি আমার কল্পনার মেঘ নামটা আপনাকে দিলাম। আপনার কোনো অসুবিধা নেইতো?
ছেলেটি বলল না অসুবিধা নেই।
মেঘ কফি শেষ করে যাবার সময় বলল মাঝে মাঝে আপনাকে বিরক্ত করবো।
আমি হাসলাম কিছু বললাম না।
দুদিন পর আবারও মেঘ আমার বাড়িতে এলো। আমি তাকে বললাম চলুন আজ আমরা দুজনে একসাথে প্রকৃতি দেখে আসি।
মেঘকে সাথে নিয়ে আমি বাইরে যাবো বলায় মেঘকে খুব খুশি হতে দেখা গেলো যদিও সে যে খুশি হয়েছে তা আমাকে বুঝতে না দেবার চেষ্টা করছিলো।
আমরা বাড়ি থেকে বের হয়ে একটা রিকশা নিলাম।
টিবাধে গিয়ে দুজন বসলাম। আমি মেঘকে জিজ্ঞেস করলাম আপনি কি আমাকে কিছু বলতে চান?
মেঘ বলল না আপনার সাথে পাশাপাশি বসে আছি আমার কাছে এটাই অনেক।
আমি বললাম আপনি আমাকে কিছু না বললেও আমি কিন্তু আপনার চোখ দেখে সব বলতে পারবো। আপনার চোখ আমি পড়তে পারি।
মেঘ আমার দিক থেকে চোখ সরিরে নিয়ে নদীর পানির দিকে তাঁকিয়ে রইল।
আমি মেঘকে বললাম চলুন এবার ফেরা যাক।
মেঘের সাথে আমি এখন প্রায় প্রতিদিন বাইরে যায়।
একদিন মেঘ হঠাৎ আমাকে বলল আপনি আজ কালো শাড়ি আর কালো টিপ পরে আমার সাথে বাইরে যাবেন প্রিজ?
আমি বললাম আমার কাছে কালো শাড়ি আছে কিনা দেখে আপনাকে বলছি।মেঘ বলল ঠিক আছে। আমি আলমারি খুলে একটা সুতি কালো শাড়ি পরে মেঘের সাথে বাইরে গেলাম।
দেখলাম আজ মেঘের মন খারাপ। তার মনে হয়তো মেঘ জমেছে তাই আমাকে কালো শাড়ি পড়তে বলেছে।কালো রং তো শোকের প্রতীক। কি এমন হয়েছে যে কারনে আমাকে শোকের প্রতীক কালো শাড়ি পড়তে বলেছে! আমার তা না জানলেও চলবে বলে মেঘকে বললাম আকাশে মেঘ করলে আকাশ যেমন বিষন্ন দেখায় আপনাকে আজ ঠিক তেমন দেখাচ্ছে।মেঘ আমার দিকে তাঁকিয়ে উত্তর দিলো আপনার দেওয়া নামের সাথে মিলে গেছে তাই হয়তো।আপনি যদি রৌদ্র রাখতেন তবে হয়তো বিষন্ন না হয়ে সূর্যের মত হাসতাম।
আমি বললাম মেঘও কিন্তু খুব সুন্দর খেলা করতে পারে আর হাসতে পারে।
শরৎ কালে আকাশে সাদা মেঘের ভেলা উড়ে বেরায় বলেই আকাশ এত সুন্দর লাগে। বর্ষাকালে সেটা আলাদা ব্যাপার।
মেঘ চুপচাপ রইলো।কিছুক্ষন চুপচাপ থাকার পর মেঘ আমাকে জিজ্ঞেস করলো আচ্ছা একজন কে কতটুকু ভালোবাসলে আর তাকে না পেলে তার জন্য আত্নহত্যা করা যায়???
আমার এমন প্রশ্ন শুনে অবাক হবার কথা ছিলো কিন্তু আমি অবাক না হয়ে তার প্রশ্নের উত্তর দিলাম আপনি তো নিজেকেই ভালো বাসেন না তাহলে অন্য একজনকে ভালোবাসবেন কি করে!
যদি নিজেকে ভালোবাসতেন তবে আত্নহত্যা করার কথা আপনার মাথায় আসতো না।
মেঘ চুপ রইল।তার মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে সে মনে মনে বলছে এই রকম প্রশ্ন আমাকে করা ঠিক হয়নি।

আমি বললাম আজ তাহলে যাওয়া যাক। মেঘ আমার সাথে আমার বাড়ি পর্যন্ত এলো। আমি বাড়িতে ঢুকতে যাবো ঠিক সে সময় বলল আচ্ছা আপনি এখনো বিয়ে করেননি কেনো?আপনি কি কাউকে ভালোবাসেন?

আমি তার দিকে এগিয়ে এসে বললাম আমার কাউকে হারিয়ে ফেলার ভয় নেই তাই খোজারও প্রয়োজন নেই।
আর ভালোবাসা???
তা যদি বলেন তাহলে আমি বলব আমি একজন লেখক। কল্পনা আমার ভালোবাসা আশা করি বুঝতে পেরেছেন?
মেঘ আমার দিকে তাঁকিয়ে রইর।আমি বাড়ির ভিতরে চলে এলাম।

পর দিন সকালে মেঘ এলো আমার জন্য একগুচ্ছ কদম হাতে নিয়ে। কারন সে জানত আমি কদম ফুল অনেক পছন্দ করি। আর আমি এইও জানি মেঘ আমার গল্পের বই পড়তে পড়তে ভিষন ভাবে ভালোবেসে ফেলেছে আমাকে। আর গত কাল সে আমার কথায় মন খারাপও করেছে। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। আমি একজন লেখক অামার গল্প অনেকের ভালো লাগবে আবার অনেকের খারাপ লাগবে।
আমি চাই আমার পাঠকরা আমাকে ভালোবাসুক। তাই বলে মেঘ যা করছে তা ভুল করছে।
মেঘ বারান্দায় বসে আছে। আমি গিয়ে তার সামনের চেয়ারটাই বসলাম।
মেঘের দিকে তাঁকিয়ে বললাম আজ কিন্তু আমি আপনাকে বেশি সময় দিতে পারবো না।
মেঘ কদম ফুলগুলো আমার দিকে এগিয়ে দিলো।
আমি মেঘকে ধন্যবাদ দিয়ে বললাম মেঘ আপনাকে আমার কিছু কথা বলার আছে।
মেঘ আমার দিকে তাঁকিয়ে রইল কি বলব শুনার আশাই।

আমি কদম ফুলগুলো হাতে নিয়ে বললাম মেঘ স্বার্থ ছাড়া পৃথিবীতে কিছুই ঘটে না।সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি, মায়ের ভালোবাসা কোনো কিছুই নয়। আপনি কিংবা আমি কেউ আমরা স্বার্থের বাইরে না। দীর্ঘ সাত মাস আমার লেখার ঘুড়িতে আমি কিছুই খুজে পাচ্ছিলাম না।আমার কলম দিয়ে একটা শব্দও বের হয়নি।যেদিন আপনি আমার সাথে দেখা করতে এলেন আমি আপনার চোখে গল্প পেলাম। আপনার সাথে গল্প করা,সময় কাটানো সব আমার নতুন গল্পের জন্য। আর তাই আপনার নাম দিয়েছিলাম মেঘ।আমি আমার নতুন গল্পের ছন্দ পেয়ে গেছি। আর গল্পের নাম দিয়েছি “কালো শাড়ি এবং বিষন্ন মেঘ”
মেঘ আর কোনো কথা না বলে খুব অভিমান নিয়ে চলে গেলো। আমি বারান্দায় দাড়িঁয়ে তার চলে যাওয়া দেখছিলাম। তারপর মেঘেরর সাথে আমার আর দেখা হয়নি।বই মেলাতে বইটা যখন বের হয়েছিলো তখন আমি ভেবেছিলাম হয়তো সে আমার সাথে দেখা করতে আসবে কিন্তু সে আসেনি। আমার জন্য একগুচ্ছ লাল গোলাপ আর একটা চিরকুট পাঠিয়েছিলো।
সে চিরকুটে লেখা ছিলো_______
“আপনি আমার কাছে এক রহস্যময়ী নারী। আপনার গল্পের প্রেমে পড়েছিলাম আপনার প্রথম গল্প ডুব পড়ে। দ্বিতীয় বার প্রেমে পড়ি আপনাকে যেদিন প্রথম দেখি। তারপর হাজার বার কারনে অকারনে আপনার প্রেমে পড়েছি।কিন্তু জানা ছিলো না আমার আপনার প্রেমে পড়া বারন।কারন আপনি লেখক এবং আমি পাঠক।
ভালো থাকবেন।
ইতি
” বিষন্ন মেঘ”

Close