সম্পাদকীয়-কলাম

ছিট মহলের কান্না

মতিউর রহমান মিঠু

পৃথিবীতে বসবাসরত মানবকুল নাকি সভ্য হয়েছে ,এটা তাঁরা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে প্রচার করে! আগের দিনের মানুষ অসভ্য ছিল বটে,কারণ তাঁরা দেশ,রাষ্ট্র নামক ভূখন্ড দখল করে কাটাতারের বেড়া দিয়ে একজন আরেক জনকে চিড়িয়াখানার বন্য প্রানীতে পরিনত করেনি! আর আজ যখন আমরা নিজেদের সভ্য বলে দাবি করছি- একজাতি আরেক জাতিকে আক্রমন করছে, এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রকে আক্রমন করছে, এক ধর্ম আরেক ধর্মকে আঘাত করছে।এই হলো আজকের দিনের সভ্যতা! (যদি কল-কারখানা,যন্ত্রপাতির উন্নয়নকে সভ্যতা বলেন সেটা ভিন্ন কথা)। বৃটিশ বেনিয়ারা ভারতবর্ষ ছাড়ার পূর্বে পুরো ভারতবর্ষকে শুধু পেনসিলের আচড়ে কয়েক খন্ডে বিভক্ত করে গেলেন। সেটাও তাঁরা পেরেছিলেন ঐ মেকলীয় শিক্ষানীতি দ্বারা প্রভাবিত একদল রক্তে-বর্নে ভারতীয় কিন্তু চিন্তা চেতনায় ইংরেজদের দ্বারা। শুরু হলো বিভাজনের খেলা। একটি ভূখন্ড কয়েকটি ভাগে ভাগ হলো। যারা ছিল প্রতিবেশি তারাই হলো শত্রু,যারা ছিল অসম্প্রদায়িক সেখানেই ছড়ালো সাম্প্রদায়িকতার বিষ। রাষ্ট্রযন্ত্র চলে গেল মানুষরুপি দানবদের হাতে। গড়ে উঠলো কাটাতারের বেড়া। একদল মানুষ হয়ে গেল নিজগৃহে পরবাসি! না থাকল সস্থানের,শিক্ষার,স্বাস্থ্যের,অন্নের নিশ্চিয়তা। এ যেন সভ্য যুগের এক অসভ্য রাষ্ট্রের লিলা। যুগের পর যুগ চলে যায় কিন্তু তাঁদের দুঃখ রয়ে যায়,এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম।এযেন মানুষ হয়ে জন্মানো আজন্ম পাপ! যাদের কোন দেশ নেই,কর্মের সুযোগ নেই,শুধু নেই আর নেই,আছে ৬৮ বছরের না পাওয়ার বেদনা।
অবশেষে ৬৮ বছর পর বাংলাদেশ এবং ভারত রাষ্ট্র বিনিময়ের মাধ্যমে নিজগৃহে পরবাসি মানুষদের নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ছিটমহলের নাম হলো-নতুন বাংলা। এবার যেটা হলো নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি পেল বটে কিন্তু নাগরিক হিসাবে যে অধিকারগুলো সেগুলো থেকে আগের মতোই বঞ্চিত থেকে গেল। হাজার হাজার শিক্ষারর্থীর জন্য সরকারি কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই,রাস্তা ঘাট সংস্কার/পাকাকরণ হয়নি এখনো, স্বাস্থ্য সেবা ধরা,চাকুরির বাজারে প্রবেশের সুযোগ খুবই সীমিত। যা হয়েছে টাকার বিনিময়ে ঘরে,ঘরে বিদ্যুৎ। ঝকমকে আলোয় যেন পুরাতন ছিটমহলবাসির একমাত্র উন্নয়ন! দেবীগঞ্জ উপজেলার টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নে একটি ছিটমহলে জনসংখা প্রায় ১০ হাজার,তাঁদের জন্য একটি প্রাথমিক স্কুল সরকারি করন হলেও কোন হাইস্কুল এখনো সরকারের স্বীকৃতি পায়নি। যদিও তাঁদের নিজস্ব খরচে চলছে দুটি স্কুল। আরেক ওর্য়াডে জনসংখা প্রায় দ্বিগুন হলেও প্রাথমিক শিক্ষার কোন ব্যবস্থায় নেই। তিনটি হাইস্কুলে পাঠদানের অনুমতি থাকলেও একাডেমিক স্বীকৃতি মেলেনি গত চার বছরে।অথচ এই তিন স্কুলের দুটিতে গড়ে প্রায় ৩০০ জন ছাত্র-ছাত্রী লেখা পড়া করে। পাকা ভবন,খেলার মাঠ,লাইব্রেরী সবই আছে স্কুলগুলোতে! এবারে পুরাতন ছিটমহলের মোট ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও’র আবেদন করেছিল কিন্তু সরকার বাহাদুরের কৃপায় একটিও এমপিও ভুক্ত হয়নি! কেন হয়নি, অনেকে বলছেন স্কুলগুলোর গড়ে উঠার বয়স কম!মাত্র চার বছর।তাহলে সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদ (গ) “উল্লেখ আছে আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করিবেন”। জেনে অবাক হবেন, গত ৬৮ বছরে ছিটের কোন ছেলে-মেয়েকে বাংলাদেশের কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভর্তি করেনি। এই যে লক্ষ,লক্ষ মানুষের জন্য জরুরী ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য কি,সময়ের কোন অযুহাত খাটে? তবুও অনেক ছেলে-মেয়ে বাংলাদেশী কোন আত্বীয় স্বজনের মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন নিয়ে পড়া-লেখা চালিয়ে গেছেন,তাদের এখনো কোন চাকুরি হয়নি। যেখানে ছেলেদের অবস্থা এই সেখানে মেয়েদের কথা ভাবুন কি হতে পারে, ছিটে আগে কোন বিয়ের রেজিষ্টেশন ছিল না,এখনো যে খুব বেশি সচেতন সেটা বলা যাবে না। এখানের নারীরা যেন গরীবের চেয়েও গরীব। এদের প্রতি রাষ্ট্র যদি আলাদা যত্ন গ্রহন না করে তাহলে পুরাতন ছিটমহল থেকে একদল পুঙ্গ মানুষ সমাজের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে। নিরাপদ মাতৃত্ব এবং শিশুর বেড়ে উঠার জন্য প্রয়োজন মা ও শিশুর জন্য সরকারিভাবে প্রকল্প গ্রহন। ব্যবস্থা করতে হবে নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের। ৬৮ বছর ধরে যে মানুষগুলো নিজগৃহে পরবাসি থাকলো,রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলো,এখন তাদের রাষ্ট্র থাকার পরও কেন তাঁরা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে?
আমাদের সংবিধানের ২৯ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে,“নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশ যাহারা প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন রাষ্ট্র সেই ব্যবস্থা গ্রহন করিবেন।” যে রাষ্ট্র তাঁদের ৬৮ বছর ধরে অনগ্রসর রেখেছিল ,সেই রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে এসকল রাষ্ট্রীয় সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের। মুছে দিতে হবে ৬৮ বছরের কান্নার জল। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে হতে হবে আরো অধিক মানবিক।
লেখক- উন্নয়ন কর্মী

Close