ছবি ঘরনাগরিক মতামতশিরোনাম-২

অভিভক্ত ঢাকার শেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকা

এস.এম আব্দুল্লাহ্ জাহাঙ্গীর

১৬৬০ সাল থেকে ঢাকা বাংলার রাজধানী হয় ৫ বার। ১৮৬৪ সালের ১ আগস্ট ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির সৃষ্টি হয় এবং ঢাকার তৎকালীন ম্যজিস্ট্রেট মিঃ স্কিনার পদাধিকার বলে চেয়্যারমান নিযুক্ত হন। সর্বপ্রথম নির্বাচিত চেয়্যারম্যান হন আনন্দ চন্দ্র রায় ১৮৮৫ সালে। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর থেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন সরকার কতৃক নির্ধারিত ব্যক্তিরাই। এরপর ঢাকা পৌরসভা অধ্যাদেশ জারি হয় ১৯৭৭ সালে। এরপর থেকে চেয়্যারমান সাখে ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিন পদ্ধতি চালু হয়। ঐ অধ্যাদেশ বলে ১৯৭৮ সালে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে প্রবর্তিত হয়। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রথম সরাসরি ভোটে নির্বাচিত মেয়র ছিলেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি মেয়র হানিফ। ১৯৯৪ সালের ১২ মার্চ থেকে ২০০২ সালের ৪ এপ্রিল প্রর্যন্ত এই ৮ বছর ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি । ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন সংশোধনী) বিল, ২০১১ পাশের মাধ্যমে ঢাকা শহর দ্বিখন্ডিত করা হয় । এর মাধ্যমে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন দুইটি ভাগে বিভক্ত হয় ঢাকা উত্তর এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। তার পর ঢাকায় দুইটি সিটি কর্পোরেশনে দুইজন মেয়র নির্বাচিত হয়। ঢাকা সিটি বিলুপ্ত হওয়ার আগে অবিভক্ত ঢাকার শেষ মেয়র ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সদ্য প্রয়াত বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা।

গেরিলা যোদ্ধা থেকে জননেতা।
গেরিলা যোদ্ধা থেকে জননেতা। ওয়ার্ড কমিশনার থেকে মন্ত্রী, মেয়র। দীর্ঘ জীবনে নিজেকে নিজেই ছাড়িয়ে যাওয়া এই মানুষটি সাদেক হোসেন খোকা।
সাদেক হোসেন খোকা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫২ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে এম.এ সম্পন্ন করেন। ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত অবস্থায় মাকে না জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মেঘালয়ে ট্রেনিং সমাপ্ত করে ঢাকায় অপারেশনের মাঝে একবার গোপনে মায়ের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। পরবর্তীতে ২ নং সেক্টরে গিয়ে তৎকালিন মেজর হায়দারের নেতৃত্বে গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সেই সেক্টরের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের নাম ছিল ‌‌‌‌‘মেলাঘর’। ‘মেলাঘর’ জায়াগাটি ছিল বসবাসের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর জায়গা। এ ক্যাম্পে বেশির ভাগই ছিল ঢাকা শহরের ছেলে তারা এ রকম জায়গায় থাকতে অভ্যস্ত ছিলনা এই ক্যাম্পেই তিনি ও তার খুব কাছের বন্ধূ মেসবাহ উদ্দিন সাবু একসঙ্গে থাকতেন। ক্যাম্পে থাকাকালীন তার সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক হয় শাহাদাত হোসেন, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরি মায়া, পল্টনের মানিক (যিনি পরবর্তিতে শহিদ হন) প্রমুখ ব্যক্তির সঙ্গে। এ ক্যম্পে ৩ সপ্তাহ ট্রেনিং শেষে সম্মুখ যুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহন করেন ক্যাপ্টেন গাফ্ফারের নেতৃত্বাধীন সাব সেক্টরে। সেখানে ট্রেনিং শেষ করে প্রথম দিকে কসবা-মন্দভাগ (মির্জাপুর) যুদ্ধের নয় মাসই এক বা একাধিক ঘটনা ঘটিয়েছেন তিনি।

কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন সাদেক হোসেন খোকা ,পপ গুরু খ্যাত শ্রদ্ধেয় আজম খান ও ঢাকা উত্তর মুক্তিবাহিনী (মানিক গ্রুপ) কম্যান্ডার নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর সাথে।
কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন সাদেক হোসেন খোকা ,পপ গুরু খ্যাত শ্রদ্ধেয় আজম খান ও ঢাকা উত্তর মুক্তিবাহিনী (মানিক গ্রুপ) কম্যান্ডার নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর সাথে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক শিবিরে আতঙ্ক ছিলেন তিনি। ঢাকায় তাঁর নেতৃত্বাধীন ইউনিট নিয়ে গেরিলা আক্রমণে তিনি গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন তথ্য অধিদপ্তর, নির্বাচন কমিশন ও বিমানবাহিনীর রিক্রুটিং অফিস। যা ছিল যুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক বিজয়। সেই গেরিলা যোদ্ধার নাম সাদেক হোসেন খোকা।এ প্রসঙ্গে সাদেক হোসেন খোকার ‌‘মুক্তিযুদ্ধের স্বর্ণালী দিনগুলো’ প্রবন্ধে নিজেই লিখেছেন, ‌মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কথা, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নে কথা ভাবলেই নস্টালজিক মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। মন শুধু রণাঙ্গনের সাহসী যোদ্ধাদের হারানোর কারণেই ভারাক্রান্ত হয়না, তার চেয়ে বেশি হয় মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন চেতনার দুর্দশা দেখে। তিনি বলেন জাতীয় মুক্তি না এলেও একটি স্বাধীন দেশ তো আমরা পেয়েছি। যেখানে দাড়িয়ে আমরা দেশকে গড়ে তোলার কথা ভাবতে পারছি, স্বপ্ন দেখতে পারছি সুন্দর আগামীর।
সাদেক হোসেন খোকা স্বাধীনতার পরে ফুটবল নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি ঢাকা মহানগরী ফুটবল সমিতির সাধারণ সম্পাদক পদ পান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক পদে পদোন্নতি লাভ করেন। খেলাধুলার জন্য তিনি তাঁর সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে কাজ করে গেছেন। ক্রীড়াজগতের মানুষগুলোর কাছে এক বড় আস্থার নাম ছিল সাদেক হোসেন খোকা। সাবেক এক ফুটবলার জানান সাদেক হোসেন খোকা তাঁর নিজের দোকান বিক্রি করে খেলোয়ারদের বেতন দিয়েছেন। ক্রীড়াক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ অবদানের জন্য তিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার ২০০৪ লাভ করেন।
১৯৬৮ সালে সাদেক হোসেন খোকা বাম রাজনীতিতে যোগদান করেন এবং এর মাধ্যমে তার রাজনীতিতে প্রবেশ হয়। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দলে (বিএনপি) যোগদান করেন এবং ঢাকা মহানগরীর সভাপতির দায়িত্ব পান।
ভারতে বাবরি মসজিদ যখন ভেঙ্গে ফেলা হয় সেই সময় বাংলাদেশে দাঙ্গা লাগার সম্ভাবনা দেখা দেয় এ দাঙ্গারোধে সাদেক হোসেন খোকা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
তিনি প্রথম জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন ১৯৯১ সালে ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এ নির্বাচনের পর তার দল সরকার গঠন করলে তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এরপর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি ঢাকার ৭ টি আসনেই হেরে যায় শুধু মাত্র সাদেক হোসেন খোকা জয়লাভ করেন। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে জয়ী হন। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর তার দল বিএপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার গঠন করলে তিনি মৎস্য ও পশু সম্পদ মন্ত্রানালয়ের দায়িত্ব পান। ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল তিনি অভিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি সেই সময়ে একই সাথে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০০৪ সালে মৎস্য ও পশু সম্পদ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর প্রর্যন্ত টানা ১০ বছর অভিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বিভক্ত হলে তিনি সেই সালের ২৯ নভেম্বর ঢাকা সিটির মেয়রের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
দীঘদিন যাবৎ সাদেক হোসেন খোকা ক্যান্সারে ভুগছিলেন এবং ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর ক্যান্সারের চিকিৎসাধীন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের স্লোয়ন কাটরিং সেন্টারে শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন। এরি মাধ্যমে বীর মুক্তিযোদ্ধা.বিশিষ্ট ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং অভিভক্ত ঢাকার শেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকার বৃহত্তর জীবনের সমাপ্তি ঘটে।

গেরিলা যোদ্ধা থেকে জননেতা।

Close