আন্তর্জাতিক

অ্যামাজন বাঁচাতে গিয়ে শহীদ হলেন পাওলো পলিনো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত বন অ্যামাজন যখন কাঠুরের হাতিয়ারের আঘাতে উজার হচ্ছে, ভূমি দখলকারীরা যখন হাজার হাজার হেক্টর দখল নেওয়ার চেষ্টায় মত্ত, তখন তাদের বিরুদ্ধে বাধার দেয়াল হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর একদল মানুষ। ‘গার্ডিয়ান অব দ্য ফরেস্ট’ বা বনরক্ষক হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই মানুষগুলো হাতে রাইফেল ও ছুরি নিয়ে টহল দিতে থাকেন বনাঞ্চল। খুঁজে বের করেন কে অবৈধভাবে গাছ কাটছে। সেই দলেরই অন্যতম এক সদস্য পাওলো পলিনো নিহত হওয়ার ঘটনায় নড়ে বসেছে কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় সরকার জানিয়েছে, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২০১৯ সালের ১৫ আগস্ট ব্রাজিলের অ্যামাজন জঙ্গলে ভয়াবহ আগুন লাগে। কিছুদিনের মধ্যেই হাজারেরও বেশি স্থানে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ রকমের আগুনের কুণ্ডলী তৈরি হয় ও ধ্বংস হয়ে যায় অনেক অঞ্চল। এছাড়া বর্তমান প্রেসিডেন্ট জেইর বোলসেনারোর প্রশাসনের সময় বন উজারের হারও হয়েছে দ্বিগুণ। ফলে অনেক বনাঞ্চলও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। নৃগোষ্ঠীদের যে অল্প কিছু বসতি অবশিষ্ট রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো মারানহো রাজ্য। সেখানকার বসতির জন্যই লড়াই করছিলো পলিনোসহ বনরক্ষকদের ওই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি।
অ্যামাজনের বনরক্ষকদের মধ্যে পাওলো পলিনো ‍গুয়াজারা বেশ পরিচিত নাম। যার সঙ্গেই কথা বলতেন, তাকেই মৃত্যুর কথা বলতেন তিনি। পলিনো বলতেন, যেকোনও সময় মৃত্যু হতে পারে তার। এর আগে ভূমি দখলকারীরা তাদের দলের তিনজনকে হত্যা করেছিলো। সেই কথাই সবাইকে বলতেন পলিনো। তারপর আবার বেরিয়ে পড়তেন টহলে।
পাওলো পলিনো সবসময়ই নিজের মৃত্যুর আশঙ্কা করতেন। শুক্রবার সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পলিনো আরেকজনে সঙ্গে নিয়ে পানি আনার সময় সশস্ত্র কয়েকজনের সামনে পড়ে যান। অন্তত পাঁচজন ব্যক্তি তাদের ওপর ‍গুলি চালায়। ২৬ বছর বয়সী পলিনোর ঘাঁড়ে গুলি লাগে এবং ঘটনাস্থলে মারা যান তিনি। প্রেসিডেন্ট বোলসোনারোর সমর্থনে চলা অ্যামাজন বন উজার হাজার হাজার নৃগোষ্ঠীর মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনার শিকার হয়েছেন তিনি। দেশের পরিবেশকর্মীরাও তার সমালোচনার করেছেন। এরমধ্যে পলিনোর মৃত্যুতে আবারও নড়েচড়ে বসেছে সবাই।
মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণের পর কর্মকর্তারাও এই মৃত্যুর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মারানহাওয়ের গভর্নর ঘোষণা দিয়েছেন যে আদিবাসীদের সুরক্ষায় টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। এছাড়া বিচারমন্ত্রী সার্জিও মোরোও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অ্যামাজনে অনেকদিন ধরেই ভূমি দখলের প্রতিযোগিতা চলছে। যেখানে খামারি, ভূমি দখলকারী ও নৃ-গোষ্ঠীগুলো পরষ্পরের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। তবে বোলসোনারো সরকার পরিবেশ আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছে এবং বনায়ন ধ্বংস হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে সাম্প্রতিক এই মৃত্যুর ঘটনা আসলে বড় কিছুর শুরু। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর বোলসোনারো প্রশাসনের প্রথম ৮ মাসে বনায়ন উজারে যেই জরিমানা করা হয়েছে তা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। আর এই সময়ে বনায়ন উজার হয়েছে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। এক বছরে উজার হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য ডেরাওয়ারের আয়তনের চেয়েও বেশি বনাঞ্চল।
ফেডারেল রাজ্য ও ডেভেলপারদের সীমালঙ্ঘনে বিকল্পধারার বনরক্ষকদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। কৃষক, নৃগোষ্ঠীর সদস্য ও পুলিশ সদস্যরা মিলে এই রক্ষাকর্তার ভূমিকা পালন করে। সংরক্ষণবাদীরা মনে করেন কাঠামোগত পূর্ণতা নিশ্চিতে এই গোষ্ঠীর প্রয়োজন রয়েছে। তবে তাদের কার্যক্রম প্রায়ই সহিংস হয়ে ওঠে। বেসরকারি সংস্থা প্যাস্টরলার ল্যান্ড কমিশনের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত বছরগুলোতে ভূমি রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা আর বেশি। অ্যামাজনের মতো বড় অঞ্চলে পুলিশ সব জায়গায় যেতে পারে না। আর প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটে যার কোন নথি থাকে না।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সিনিয়র গবেষক সিজার মুনোজ বলেন, ‘কিছু তদন্ত প্রতিবেদনের অবস্থা এত খারাপ যে সেখানে ময়নাতদন্তের তথ্যও ছিলো না। তিনি বলেন, এখানে অনুসন্ধানে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক হত্যারই তদন্ত হওয়া দরকার ছিলো কিন্তু সেভাবে হয়নি। বনের বৃহত্তর পরিসরে যা ঘটছে, যেমন আইন প্রয়োগের অভাব, সহিংসতা, কারও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকা, তা আসলে সবই মারানহাও রাজ্যের ক্ষুদ্র পরিসরেই ঘটছে।
গত বছর মারানহাও সফরে যান মুনোজ। সেখানে তিনি বনের রক্ষকদের ব্যাপারে জানতে পারেন। ১৮০ জনের একটি দল আরারিবোইয়া অঞ্চল টহল দেয়। সেখানে মারাত্মক সহিংসতা ঝুঁকি দেখতে পান মুনোজ। ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছে তিনজন সদস্য। আরও হতাহতের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। মুনোজ বলেন, কাঠুরেরা প্রায়ই নৃগোষ্ঠীর নেতাদের ‍হুমকি দেয় আর এটা সেখানে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। আমরা সবগুলো ঘটনাই পর্যবেক্ষণ করেছি। কিন্তু কোনও একটি হুমকির ঘটনাতেও পুলিশের ব্যবস্থা নেওয়ার কোনও প্রমাণ পাইনি।
পলিনোর পরিবারের সদস্যরাও এই হুমকি পেয়ে আসছিলেন। ইন্ডিয়ান মিশন কাউন্সিলের কর্মকর্তা গিল রদ্রিগেজ বলেন, ছোট থেকেই পলিনোর পরিবারের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। তারা নিজেদের বনের রক্ষক হিসেবে বিবেচনা করতো। নিজেদেরকে ‘কোরাকাও মাতা’ বলে সম্বোধন করতো তারা, যার মানে হচ্ছে বনের হৃদয়। রদ্রিগেজ বলেন, পলিনো ছোট থেকে এই আদর্শ নিয়ে বড় হয়েছিলো। সে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সবকিছু রক্ষা করতে চাইতো। সে বনরক্ষকদের দলে যোগ দিয়েছিলো। একটি কালো ভেস্ট পড়ে হাতে রাইফেল ও বড় ছুরি নিয়ে বন টহল দিতে বেরিয়ে পড়তেন পলিনো।
নৃগোষ্ঠীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনালের ব্রাজিল অঞ্চলের গবেষক সারাহ শেঙ্কার বলেন, উজার হওয়ার বনের সাগরের মধ্যে যেন মারানহাও একটি দ্বীপ। বিগত তিন বছরে বেশ কয়েকবার সেখানে গিয়েছেন সারাহ। পলিনোকেও ভালোভাবেই চিনতেন তিনি। সবশেষ এপ্রিলে পলিনোর সঙ্গে দেখা হয়েছে সারাহ’র। সেসময় শুস্ক মৌসুম শুরু চ্ছিলো। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাও সেসময় রক্তক্ষয়ী সহিংসতার আশঙ্কা করেছিলো। সে অনুযায়ী সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বানও জানায় তারা।
সারাহ বলেন, ‘আমি বলছি না পলিনো অকুতোভয় ছিলেন। আর সব মানুষের মতো ভয় ছিলো তারও। আর তার সবচেয়ে বড় ভয় ছিলো মৃত্যু। তার মনে হতো যেকোনও সময়ই মারা যাবেন তিনি। আর তাই সত্যি হয়েছে।
এপ্রিলে বনরক্ষকদের সঙ্গে বেশ গভীর বনে গিয়েছিলেন সারাহ। সেখানে গিয়ে দেখেছেন অবৈধ বন উজার। সেখানে একটি ঘাঁটিরও সন্ধানও পান তারা যা সম্প্রতি ত্যাগ করা হয়েছে। বনরক্ষকরা ঘাঁটিটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সারাহ শেঙ্কার বলেন, সেসময় পলিনোকে খুবই ক্ষুব্ধ দেখেছেন তিনি। চারপাশে আবর্জনা ছড়ানো ছিটানো ছিলো। এখান থেকে একপক্ষ লাভ করবে আর আরেকপক্ষ দুর্দশায় ভুগবে বলে মন্তব্য করেন সারাহ। বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close