মহানগরশিরোনাম

রাজশাহীতে হিমাগারের সুদের ফাঁদে আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীতে আলু রাখার একটি হিমাগার কর্তৃপক্ষের সুদের ফাঁদে পড়েছেন কয়েক হাজার চাষি। চাষিদের অভিযোগ, হিমাগার কর্তৃপক্ষ তাদের সুদমুক্ত ঋণ দেয়ার প্রলোভন দিয়েছিল। তাদের প্রলোভনে পরে চাষিরা ঋণ নিয়ে ছিলেন। কিন্তু এখন কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে কৃষকদের নিকট থেকে আদায় করছেন ১৬ শতাংশ সুদ। আর হিমাগারে প্রতিবস্তা আলু রাখার জন্য ভাড়ার কথা বলা হয়েছিল ২০০ টাকা। কিন্তু এখন বিক্রির সময় বস্তাপ্রতি আলু ভাড়া নিচ্ছেন ২৬০ টাকা। রাজশাহীর রহমান কোল্ড স্টোরেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ। এই প্রতিষ্ঠানের মালিক শিল্পপতি ফজলুর রহমান। রাজশাহীর পবা ও তানোর উপজেলায় তার পাঁচটি হিমাগার রয়েছে। এর মধ্যে পবার আলাইবিদিরপুর এলাকার একটি হিমাগারের সামনে বুধবার আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ করেন।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় শতাধিক আলুচাষি ও ব্যবসায়ী রহমান ব্রাদার্স কোল্ড স্টোরেজের প্রধান ফটকের সামনে বিক্ষোভ করেন। তারা চাষি ঋণের সুদ ও বস্তা প্রতি অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধের দাবিতে নানা শ্লোগান দেন। বিক্ষোভকারীরা বলছেন, নানা প্রলোভন দিয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের হিমাগারে আলু রাখিয়েছেন। এখন আলু বিক্রির সময় কেটে নেওয়া হচ্ছে বাড়তি টাকা।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ছিলেন বড় আলুচাষি পবার বেড়াবাড়ি গ্রামের মুরাদ হোসেন। তিনি জানান, গত মৌসুমে আলু চাষের শুরু থেকে রহমান কোল্ড স্টোরেজের কর্মকর্তারা মাঠে মাঠে গিয়ে চাষিদের নানা প্রলোভন দেন। তারা বলেছিলেন, চাষিদের সুবিধার্থে বিনাসুদে ঋণও দেবেন। আলু বিক্রির সময় টাকা পরিশোধ করা যাবে। আর আলু উৎপাদনের পর হিমাগারে রাখা যাবে ২০০ টাকা ভাড়ায়। চাষিরা ঋণ নিয়ে আলু চাষ করেছেন। কিন্তু এখন আলু বের করার সময় ঋণের সুদ ধরা হচ্ছে। ভাড়াও বস্তাপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ৬০ টাকা বেশি। এতে তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
মুরাদ জানান, আলু চাষের সময় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিনি প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন। আলু রেখেছেন সাড়ে ৬ হাজার বস্তা। নিয়ম অনুযায়ী, মার্চে আলু তোলার পর ডিসেম্বর পর্যন্ত হিমাগারে সংরক্ষণ করা যায়। আর আলু বিক্রির টাকা সরাসরি হিমাগার কর্তৃপক্ষের হাতেই পড়ে। তারপর ভাড়াসহ আনুসাঙ্গিক পাওনা কেটে নেয়ার পরই কর্তৃপক্ষ চাষি ও ব্যবসায়ীদের টাকা দেন। এখন চাষিরা আলু বিক্রি শুরু করেছেন। আর টাকা হাতে পেয়ে কেটে নিচ্ছেন কর্তৃপক্ষ।
হিমাগারে ৪১৩ বস্তা আলু রেখেছেন পবার মথুরা গ্রামের চাষি আসলাম আলী। তিনি বলেন, আলু চাষের শুরুতে হিমাগারের লোকজন মাঠে মাঠে গিয়ে তাদের আলুবীজও দেন। আলু বিক্রির পরই বীজের মূল্য পরিশোধের কথা। তিনি বীজ নেন ৫১ মণ। কিন্তু সে বীজ অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়ায় আলুর ফলন ভালো হয়নি। আসলাম তার উৎপাদিত ৪১৩ বস্তা আলু রেখেছেন হিমাগারে। আর বিনাসুদের কথা শুনে ঋণ নিয়েছেন ১ লাখ ৩ হাজার টাকা। এখন ১৬ শতাংশ সুদ ধরা হচ্ছে।
আরেক চাষি মোহনপুর উপজেলার টেমা গ্রামের আবদুল মতিন আলু রেখেছেন ৮০০ বস্তা। আর ঋণ নিয়েছেন আড়াই লাখ টাকা। মতিন বলেন, কোল্ড স্টোরেজের লোকজন অনেক প্রলোভন দিয়েছেন। বিনাভাড়ায় মাঠ থেকে গাড়িতে করে আলু নিয়ে এসেছেন। কথা ছিলো, বস্তাপ্রতি ভাড়া ২০০ টাকা। কিন্তু এখন কাটা হচ্ছে ২৬০ টাকা। আর ঋণের কোনো সুদ না নেয়ার কথা থাকলেও লাখে তাঁর নিকট থেকে ১৬ হাজার টাকা করে সুদ কেটে নেওয়া হচ্ছে।
আলাইবিদিরপুর গ্রামের চাষি মিলন আলী আলু রেখেছেন ৪০০ বস্তা। বিনাসুদের প্রলোভনে তিনিও ঋণ নিয়েছেন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। মিলন বলেন, রাজশাহীতে আরও অনেক কোল্ড স্টোরেজ আছে। তারাও চাষিঋণ দিয়ে থাকেন। কিন্তু তারা সুদের কথা আগেই বলে দেন। গেল বছর রহমান কোল্ড স্টোরেজেও ১৫ শতাংশ সুদ ধরা হয়। কিন্তু এবার কোনো সুদ নেয়ার কথা ছিলো না। কিন্তু এখন টাকা হাতে পেয়ে তারা সুদ কাটতে শুরু করেছে। কর্তৃপক্ষ কৃষককে ফাঁদে ফেলে প্রতারণা করছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরো বলেন, তারা খোঁজ নিয়ে জেনেছেন ফজলুর রহমানের অন্য চারটি হিমাগার থেকেও নানা প্রলোভন দিয়ে চাষিদের আলু রাখানো হয়েছে। এখন চাষিদের সাথে এমন প্রতারণা করা হচ্ছে। পাঁচটি হিমাগারে সব মিলিয়ে কয়েক হাজার চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারা সবাই অতিরিক্ত ভাড়া ও সুদ আদায় বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন। এটা বন্ধ না করা হলে একযোগে আন্দোলনে নামবেন বলে হুঁশিয়ারী দেন তিনি। মিলনের মত উপস্থিত সকল চাষী ও ব্যবসায়ী একই অভিযোগ করেন এবং সুদ নেওয়া বন্ধের দাবী জানান। রাজশাহীতে হিমাগারের সুদের ফাঁদে আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রহমান গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক আবদুল হালিম বলেন, রাজশাহীর সব কোল্ড স্টোরেজে বস্তাপ্রতি আলুর ভাড়া ২৬০ টাকা। আমাদের এখান থেকে ২০০ টাকা নেয়ার কথা বলা হয়েছিল কি না সেটা আমার জানা নেই। বিনাসুদে ঋণ দেয়ার প্রলোভনের বিষয়ে বলেন, যারা নিয়মিত আলু সংরক্ষণ করেন তাদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছিল এক বস্তা আলুর বিপরীতে ২০০ টাকা পর্যন্ত চাষিঋণ নিলে সেটার কোনো সুদ ধরা হবে না। কিন্তু কেউ কেউ তো ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্তও নিয়েছেন। সে জন্য সুদ আদায় করা হচ্ছে। এটা প্রতারণা নয়। বরেন্দ্র বার্তা/ফকবা/অপস

Close